विवेचन सारांश
অর্জুন দ্বারা ভগবানের বিশ্বরূপ দর্শন

ID: 1249
बंगाली - বাংলা
রবিবার, 07 আগস্ট 2022
অধ্যায় 11: বিশ্বরূপদর্শনযোগ
1/4 (শ্লোক 1-15)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ মাননীয় শ্রীনিবাস বর্ণেকর মহাশয়


ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্য অনুসারে, ঈশ্বর স্তুতি , দীপ প্রজ্জ্বলন, গুরু বন্দনা  এবং ভারত মাতার নমণ করে এই পবিত্র শ্রাবণ মাসে  দেবাত্মা হিমালয়ের কোলে মা গঙ্গার তীরে পূজ্য গুরুদেবের সান্নিধ্যে একাদশ অধ্যায় বিশ্বরূপদর্শনযোগ বিবেচন পর্বের সূচনা হলো ।
यह कल-कल छल-छल बहती क्या कहती गंगा धारा।
युग-युग से बहता आता यह पुण्य प्रवाह हमारा।
অর্থাৎ : এই গঙ্গা নদীর জলপ্রবাহে যুগ যুগ ধরে আমাদের এই পবিত্র স্রোত (অর্থাৎ সংস্কৃতি) প্রবাহিত হয়ে আসছে।

ভগবান  অর্জুনকে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন। সমস্ত গোপনীয় গুহ্য তথ্য জানালেন । নিজের অলৌকিক শক্তির কথা বললেন।  তিনি তাঁর সমস্ত দিব্য অলৌকিক শক্তি ও মহিমার বর্ণন করলেন এবং সব শেষে কৃষ্ণ বললেন এই সমস্ত জগৎ সংসারকে আমি আমার একটি অংশে ধারণ করেও আমি পূর্ণরূপে সিদ্ধি লাভ করেছি । পরমাত্মার মাহাত্ম্য শোনার  পর অর্জুনের মনে এই চিন্তা এলো যে, আমিও কি সর্বব্যাপী পরমাত্মার দর্শন  প্রাপ্ত করতে পারি? ওঁনার বিশ্বরূপ দর্শন করার যোগ্যতা কি আমার আছে ? এইরকম চিন্তা করতে করতে অর্জুন কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন :


11.1

অর্জুন উবাচ

মদনুগ্রহায় পরমং(ঙ্), গুহ্য়মধ্য়াত্মসংজ্ঞিতম্
য়ত্ত্বয়োক্তং(ম্) বচস্তেন, মোহোऽয়ং(ম্) বিগতো মম॥1॥

অর্জুন বললেন—হে ভগবান ! আমার প্রতি অনুগ্রহ করে আপনি যে পরম গুহ্য অধ্যাত্মতত্ত্ব বললেন, তাতে আমার মোহ দূর হয়েছে।

বিবেচন : অর্জুন বললেন, ভগবান ! আপনার অশেষ কৃপা যে আমার স্বল্প বিনতিতেই আপনি স্নেহের বশবর্তী হয়ে, আপনি সেই আত্মজ্ঞান আমাকে দিয়েছেন ,তা জানার জন্য মানুষকে শুধু এক জীবন নয়, বরং অসংখ্য জন্ম নিতে হয়। আপনার এই পরমজ্ঞান শুনে আমার অজ্ঞান মোহ রূপী অহংকার নষ্ট হয়েছে। জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছেন : 

मी जगीं एक अर्जुनु। ऐसा देहीं वाहे अभिमानु। आणि कौरवांतें इयां स्वजनु । आपुले म्हणैं॥
याहीवरी यांतें मी मारीन। म्हणैं तैणै पापें कें रिगेन। ऐसे देखत होतों दुःस्वप्न। तों चेवविला प्रभु॥

অর্থাৎ :
অর্জুন বলছেন , আমি ভেবেছিলাম ,আমি অর্জুন, আমার নিজের ওপর গর্ব ও অভিমান ছিল যে আমি, কৌরবগণ যারা আমার স্বজন ,তাদের আমি পরাজিত করতে পারি।  এই দুঃস্বপ্ন থেকে তুমি, হে কৃষ্ণ ! আমাকে জাগ্রত করেছো। 

অর্জুন বলছেন যে আমি ভুল ভেবেছিলাম, আপনি তো জগতের বিধাতা। আপনি আমার রথের সারথি হয়ে আমার সাথে এসেছেন। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পেরেছি যে আপনি কে, আপনার আসল স্বরূপ আমি এখন জ্ঞাত হয়েছি। আমার যে অভিমান ছিল যে আমি অর্জুন,সেই  আমার অহংকার ,অভিমান যা আপনি দূর করে দিয়েছেন এবং আমাকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে জাগ্রত করেছেন। যদিও অর্জুন এখানে বলেছেন যে তার মোহ ভঙ্গ হয়েছে, কিন্তু তবুও অর্জুন এখনো বলেননি যে তিনি যুদ্ধ করবেন। আধ্যাত্মের জ্ঞান প্রাপ্ত করার পর অষ্টাদশ অধ্যায়ে অর্জুন বলেছেন  करिष्ये वचनं तव। অর্থাৎ : হে কৃষ্ণ! আপনি যা বলছেন, আমি তাই করবো। এখন আমি আপনার আজ্ঞার পালন করবো।

11.2

ভবাপ্য়য়ৌ হি ভূতানাং(ম্),শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া
ত্বত্তঃ(খ্) কমলপত্রাক্ষ , মাহাত্ম্য়মপি চাব্যয়ম্॥2॥

কারণ হে কমললোচন ! আমি আপনার কাছে ভূতগণের উৎপত্তি ও বিনাশ সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে শুনেছি এবং আপনার অক্ষয় মাহাত্ম্যও জেনেছি।

বিবেচন : অর্জুন ভগবানকে পদ্মলোচন (অর্থাৎ পদ্ম পাতার মতো যাঁর চক্ষু) বলে সম্বোধন করে বলছেন যে সৃষ্টির উৎপত্তি এবং বিনাশ সম্পর্কে আপনার থেকেই বিস্তারিত ভাবে শুনেছি। আপনার অবিনাশী মাহাত্ম্যের কথা শুনেছি যার কখনো বিলয় হয় না। সাধারণ মানুষের মহত্ত্ব কিছুকালের জন্য স্থায়ী হয়, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য অক্ষয়, অবিনশ্বর, চিরন্তন।

11.3

এবমেতদ্য়থাত্থ ত্বম্, আত্মানং(ম্) পরমেশ্বর
দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপং(ম্), ঐশ্বরং(ম্) পুরুষোত্তম॥3॥

হে পরমেশ্বর ! আপনি যে আত্মতত্ত্ব বলছেন, তা যথার্থ ; কিন্তু হে পুরুষোত্তম ! আমি আপনার জ্ঞান, ঐশ্বর্য, শক্তি, বল, বীর্য এবং তেজঃসমন্বিত ঈশ্বরীয় বিশ্বরূপ দেখতে ইচ্ছা করি।

বিবেচন: ভগবানকে অর্জুন বলেছেন যে যিনি আমার বন্ধু, সখা ও সারথি, তিনিই পরমাত্মা, তিনিই পরমেশ্বর। আপনি আপনার পরমাত্মা রূপের সম্পর্কে যা বলেছেন ,তা সত্য। আপনার এই কথা শুনে আমার আপনার ঐশ্বরিক রূপ দেখার ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছে। ভগবান এবং অর্জুনের প্রেমের প্রসঙ্গে জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছেন যে যখন অর্জুনের মনে এই ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছিল, তখন একই সাথে তিনি মনে মনে এই চিন্তাও করেছিলেন যে আমার কি এই রূপ দেখার যোগ্যতা আছে ?

11.4

মন্য়সে য়দি তচ্ছক্য়ং(ম্), ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো
য়োগেশ্বর ততো মে ত্বং(ন্),দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্॥4॥

হে প্রভু ! আমাকে যদি আপনার সেই বিশ্বরূপ দেখার যোগ্য বলে মনে করেন, তা হলে হে যোগেশ্বর ! আমাকে আপনার সেই অবিনাশী স্বরূপ দেখান।

বিবেচন: অর্জুন কৃষ্ণকে বিনতি করে বলছেন যে নিজের সীমার মধ্যে থেকেই আমার কোনও প্রার্থনা করা উচিত। আপনার যেন এই না মনে হয় যে আমি কোনো অবাঞ্ছিত দাবি করছি। আপনি যদি আমাকে এর যোগ্য মনে করেন তাহলে আমাকে আপনার অব্যয়,অবিনশ্বর বিশ্বরূপ দেখান। অর্জুনের বাচন কৌশল থেকে আমরা বুঝতে পারি যে তিনি সরাসরি নিজের ইচ্ছাপ্রকাশ করেননি, কিন্তু তিনি কৃষ্ণকে বিনতি করে নিজের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। অর্জুনের মনে নিজের যোগ্যতা সম্বন্ধে সংশয় ছিল। অবশ্য অর্জুন এটাও জানতেন যে যদি ভগবান চান, তাহলে তাকে যোগ্যতা প্রদান করার শক্তিও ভগবানের আছে। জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছেন: সদ্গুরু যখন মাথায় হাত রাখেন, তখন কথার মধ্য দিয়ে যে কোনো প্রকারের বাণী বের হতে পারে। তেমনই অর্জুনের মনে হয় যে করেন ভগবান যখন আমার সাথে আছেন, তখন তিনিই আমাকে এই যোগ্যতা প্রদান করতে পারেন। ঈশ্বরের কৃপায় অযোগ্য ব্যক্তিও যোগ্য হয়ে উঠতে পারে, তার কৃপায় সবই সম্ভব।  
पंगुम लंघयते गिरिम।
অর্থাৎ : ঈশ্বরের কৃপা থাকলে পঙ্গুও পাহাড় আরোহণ করতে পারে।

অর্জুন ভগবানকে বলেন যে আপনি যখন পুতনা এবং শিশুপালের মতো পাপী ও অযোগ্য লোকদেরও মুক্তি প্রদান করেছেন, তখন আমি তো আপনার সখা, আমাকে আপনি কৃপা করে নিজের বিশ্বরূপের দর্শন করান। ভগবান ও অর্জুনের মধ্যে প্রীতি ভালোবাসার ভাব এমন প্রগাঢ় ছিল যে অর্জুনের কোনো ইচ্ছা ভগবান পূরণ করবেন না, এটা সম্ভব নয়। 

11.5

শ্রীভগবানুবাচ

পশ্য় মে পার্থ রূপাণি ,শতশোऽথ সহস্রশঃ
নানাবিধানি দিব্য়ানি, নানাবর্ণাকৃতীনি চ॥5॥

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন—হে পার্থ ! তুমি আমার বহুবিধ এবং নানা বর্ণ ও নানা আকৃতিবিশিষ্ট শত শত এবং সহস্র সহস্র দিব্যরূপ দর্শন করো।

বিবেচন: কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তুমি আমার নানা প্রকারের ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি দেখো, আমার অনেক বর্ণের হাজার হাজার দিব্যরূপ দর্শন করো। 

11.6

পশ্য়াদিত্য়ান্বসূন্রুদান্ , অশ্বিনৌ মরুতস্তথা
বহূন্য়দৃষ্টপূর্বাণি ,পশ্য়াশ্চর্য়াণি ভারত॥6॥

হে ভরতবংশীয় অর্জুন ! তুমি আমার মধ্যে দ্বাদশ আদিত্য (অদিতির পুত্রদের), অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও ঊনপঞ্চাশ মরুদ্গণ (বায়ু)কে দর্শন করো এবং পূর্বে যা কখনও দেখোনি এরূপ বহু আশ্চর্যময় রূপ দর্শন করো।

বিবেচন : শ্রীভগবান বলেছেন যে অদিতির বারোটি পুত্র - আদিত্য, শক্তির উৎস অষ্ট বসুকে, একাদশ রুদ্র, সূর্যপুত্র অশ্বিনীপুত্রদ্বয় - যারা যেকোনো ব্যাধি থেকে সুস্থ করে তুলতে পারেন, ঊনপঞ্চাশজন মরুদ্গণ এবং আরো অনেক আশ্চর্যজনক রূপ, যা আগে কখনো দেখোনি, তাই এখন দেখে নাও।

11.7


ইহৈকস্থং(ঞ্) জগত্কৃত্স্নং(ম্),পশ্য়াদ্য় সচরাচরম্।
মম দেহে গুডাকেশ , য়চ্চান্য়দ্দ্রষ্টুমিচ্ছসি॥7॥

হে অর্জুন ! আমার এই বিরাট শরীরে একস্থানে অবস্থিত চরাচরসহ সমগ্র জগৎ অবলোকন করো এবং আরও যা কিছু তোমার দেখবার ইচ্ছা তা-ও দেখো।

বিবেচন : ভগবান বলেছেন,হে গুডাকেশ (নিদ্রার স্বামী) ! অর্জুনের নিদ্রার (গুডা) ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল তাই ভগবান অর্জুনকে গুডাকেশ বলে সম্বোধন করছেন। ভগবান বলছেন, অর্জুন ! তুমি জাগ্রত অবস্থায়, একাগ্রচিত্ত হয়ে আমার এই অসংখ্য রূপকে  দেখো।  আরও অন্য যা কিছু দেখতে চাও, সেটাও একসাথে দেখে নাও, এই বিশ্বের যা কিছু তুমি দেখতে চাও, আমার এই এক শরীরের মধ্যেই দেখে নাও। অর্জুন ভগবানকে বিনতি করেছিলেন আর ভগবান তাঁকে নিজের বিশ্বরূপের দর্শন দিতে আরম্ভ করলেন। কৃষ্ণের দৃষ্টি যখন অর্জুনের ভাবলেশহীন চেহারার দিকে পড়লো, তখন অর্জুনকে দেখে মনে হলো যে তিনি কিছুই দেখছেন না। তখন কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, বিশ্বরূপ দর্শন করার জন্য যে দৃষ্টির প্রয়োজন, সেই দৃষ্টি তিনি অর্জুনকে প্রদান করেননি।

11.8

ন তু মাং(ম্) শক্য়সে দ্রষ্টুম্, অনেনৈব স্বচক্ষুষা
দিব্য়ং(ন্) দদামি তে চক্ষুঃ(ফ্), পশ্য় মে য়োগমৈশ্বরম॥8॥

কিন্তু তুমি নিজ চর্ম চক্ষুর দ্বারা আমার এই বিশ্বরূপ দেখতে সমর্থ হবে না ; সেইজন্য আমি তোমাকে দিব্য চক্ষু প্রদান করছি, সেই চক্ষু দ্বারা তুমি আমার ঈশ্বরীয় যোগশক্তি দর্শন করো।

বিবেচন: কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন এই চর্ম চক্ষু দিয়ে তুমি আমার দিব্যরূপ দেখতে পারবে না। বিজ্ঞান শাস্ত্রে ভৌত বস্তু দেখার জন্য অনেক যন্ত্রপাতির দরকার হয়। একইভাবে আমাদের অনেক প্রকারের দৃষ্টিও রয়েছে। প্রথম হল আমাদের চর্ম চক্ষু,  দ্বিতীয় হল প্রজ্ঞা দৃষ্টি। যখন আমাদের প্রজ্ঞা দৃষ্টি অর্থাৎ বুদ্ধি জাগ্রত হয়ে যায়, তখন আমরা সেই শুদ্ধ বুদ্ধির মাধ্যমে কিছু কিছু ব্যাপারে জ্ঞান প্রাপ্ত করি। যেমন আমরা বাতাসকে দেখতে পারি না, কিন্তু তাকে অনুভব করতে পারি, কিন্তু সেই বাতাস কোন কোন গ্যাস দিয়ে তৈরি, সেটা আমরা আমাদের জ্ঞান চক্ষুর মাধ্যমে দেখতে পারি। ভগবান বললেন যে এই দৃষ্টি  দিয়ে আমাকে দেখা সম্ভব নয়, তাই আমি তোমাকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করছি। 
অনেক পূর্বে কৃষ্ণ মা যশোদাকে তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন এই দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেছিলেন।  কৃষ্ণ মা যশোদাকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেছিলেন এবং তিনি কৃষ্ণের মুখের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করেছিলেন। সেই দিব্যদৃষ্টিই কৃষ্ণ অর্জুনকে  প্রদান করলেন। জ্ঞানেশ্বর মহারাজ এই প্রসঙ্গে খুব সুন্দর বলেছেন এবং ভগবান ও অর্জুনের অন্তরঙ্গ কথোপকথন প্রস্তুত করেছেন। কৃষ্ণ মনে মনে হেসে ভাবছেন, আমি তোমাকে বিশ্বরূপ দেখাচ্ছি আর অর্জুন, তুমি তা দেখছোও না। অর্জুনও মনে মনে বলেছেন, এতে দোষ কার, অন্ধকে আয়না দেখালে সে কি করে দেখবে?  বধিরকে  গান শোনালে সে কেমন করে শুনবে? আপনার বিশ্বরূপ দেখার যোগ্যতাই আমার নেই, তাহলে দেখব কী করে? সেই যোগ্যতা তো আপনাকেই দিতে হবে। তখন ভগবানের মনে মনে বললেন  যে তোমার সাথে প্রেম পূর্বক কথা বলতে গিয়ে আমি তোমাকে  দিব্যদৃষ্টি প্রদান দিতেই  ভুলে গেছি । আমি এক্ষুনি তোমাকে তা দিচ্ছি। এবং কৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করলেন। এই কথা সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন, যিনি নিজেই এই দিব্যদৃষ্টি  তাঁর গুরু মহর্ষি বেদব্যাস থেকে প্রাপ্ত করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনিও এই রূপটি দেখছেন এবং ধৃতরাষ্ট্রকে সব বর্ণনা করছেন। 


11.9

সংজয় উবাচ

এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ ,মহায়োগেশ্বরো হরিঃ
দর্শয়ামাস পার্থায় ,পরমং(ম্) রূপমৈশ্বরম্॥9॥

সঞ্জয় বললেন—হে রাজন্ ! মহাযোগেশ্বর এবং সর্বপাপনাশকারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই কথা বলে অর্জুনকে নিজের পরম ঐশ্বর্যযুক্ত দিব্যরূপ দেখালেন।

বিবেচন : সঞ্জয় বলছেন যে সমস্ত পাপের বিনাশকারী মহা যোগেশ্বর হরি, তার বিরাট রূপ দেখানো আরম্ভ করেছেন।

11.10

অনেকবক্ত্রনয়নম্ ,অনেকাদ্ভুতদর্শনম্
অনেকদিব্য়াভরণং(ন্), দিব্য়ানেকোদ্য়তায়ুধম্॥10॥

সেই বিশ্বরূপ অনেক মুখ ও অনেক নেত্রযুক্ত, অসংখ্য অদ্ভুত আকৃতি বিশিষ্ট, বহু দিব্যভূষণাদি পরিহিত এবং বহু দিব্য আয়ুধে সজ্জিত,....

 

11.11

দিব্য়মাল্য়াম্বরধরং(ন্),দিব্য়গন্ধানুলেপনম্
সর্বাশ্চর্য়ময়ং(ন্) দেবম্, অনন্তং(ম্) বিশ্বতোমুখম॥11॥

...দিব্য মাল্য এবং দিব্য বস্ত্রে ভূষিত, দিব্যগন্ধ অনুলিপ্ত, সর্বাশ্চর্যযুক্ত, অনন্ত ও সর্বতোমুখ—সেই বিশ্বরূপ পরমদেব পরমেশ্বরকে অর্জুন দর্শন করলেন।

বিবেচন: ভগবানের যে বিশ্বরূপ সঞ্জয় দেখছেন, তার বর্ণনা করার সময় তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন যে আমি যা দেখছি তা অপূর্ব, অভূতপূর্ব, অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। ভগবানের  অনেক মুখ ও চোখ এবং অনেক প্রকারের অভূতপূর্ব দর্শন দেখা যাচ্ছে। ভগবান দিব্য বস্ত্র, দিব্য অলঙ্কার পরিধান করেছেন, অনেক দিব্য অস্ত্রও তিঁনি হাতে ধারণ করেছেন। ভগবান গলায় দিব্য বৈজয়ন্তীর মালা, অলৌকিক বস্ত্র পরিধান করেছেন । তাঁর ললাটে ও শরীরে  দিব্য চন্দন ও কুমকুম ইত্যাদি লাগানো আছে।  সম্পূর্ণ আশ্চর্য্যময় অনন্ত রূপ,এবং আরও অনেক দিব্য রূপ দেখা যাচ্ছে। সম্পূর্ণ বিশ্বজগতে একমাত্র তার রূপই দৃশ্যমান এবং এই রূপ অনন্ত, যার কোনো অন্ত  নেই। 
এই অধ্যায়টি অভূতপূর্ব। আমরাও যদি অর্জুনের মতো ভগবদ্গীতাকে বুঝতে চাই, তবে তাঁর মতোই ভগবানের শরণাপন্ন হতে হবে। অর্জুনের ভূমিকায় গেলে আমরাও সেই রূপটিকে অনুভব করতে পারব। অর্জুন ভগবানকে বলেন আমি আপনার শিষ্য, আপনার শরণাগত হই। আমরাও যদি একইভাবে ভগবানের শরণাগত হয়ে যাই,তবেই সেই রূপের অন্তত কিছু অংশ আমরাও দেখতে পাব।

11.12

দিবি সূর্য়সহস্রস্য় ,ভবেদ্য়ুগপদুত্থিতা
য়দি ভাঃ(স্) সদৃশী সা স্য়াদ্, ভাসস্তস্য় মহাত্মনঃ॥12॥

সহস্র সূর্য একসঙ্গে আকাশে উদিত হলে যে প্রকাশ উৎপন্ন হয়, সেই প্রকাশও বিশ্বরূপ পরমাত্মার প্রকাশের কিঞ্চিৎ তুল্য হতে পারে।

বিবেচন: একটি সূর্যের আলো দেখাও আমাদের পক্ষে কঠিন। এমন হাজারটি  সূর্য হঠাৎ আকাশে উদিত হলেও তার প্রভা ও প্রকাশ ভগবানের তেজ ও মহিমা থেকে কমই হবে। 
১৯৪৫ সালের ১৪ জুলাই জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এটম বোমা ফেলা হয়। বৈজ্ঞানিক ওপেন হাইমার যিনি এই বোমা তৈরি করেছিলেন, তিনি বিমানে বসে যখন সেই বিস্ফোরণ দেখছিলেন এবং সেই দৃশ্য দেখে তার মুখ থেকেও এই শ্লোক উচ্চারিত  হয়।  এতে প্রমাণিত হয় যে, বিজ্ঞানীরাও বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করার পূর্বে গীতার জ্ঞান প্রাপ্ত করে থাকেন, কারণ বিশ্বজগতের ব্যাপারে জানতে হলে প্রথমে ভগবদ্গীতাকে জানতে হবে  এবং গীতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা জ্ঞানের সন্ধান করতে হবে।

11.13

তত্রৈকস্থং(ঞ্)জগত্কৃত্স্নং(ম্), প্রবিভক্তমনেকধা
অপশ্য়দ্দেবদেবস্য় ,শরীরে পান্ডবস্তদা॥13॥

পাণ্ডুপুত্র অর্জুন সেই নানা ভাগে বিভক্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে দেবাদিদেব ভগবান একস্থানে অবস্থিত দেখলেন।

বিবেচন: পরমাত্মা একই কিন্তু আমরা তাঁকে বিভিন্ন রূপে দেখতে পাই। সঞ্জয় বলছেন যে অর্জুন একই শরীরে স্থিত পরমাত্মার রূপ দর্শন করলেন। অর্জুন জানতে পেরেছেন যে ভগবান তার সারথি তিনিই সাক্ষাৎ পরমেশ্বর। সেই কারণেই তিনি অর্জুনকে একই শরীরে স্থিত অনেক রূপ দেখান।

11.14

ততঃ(স্) স বিস্ময়াবিষ্টো, হৃষ্টরোমা ধনংজয়ঃ
প্রণম্য় শিরসা দেবং(ঙ্), কৃতাঞ্জলিরভাষত॥14॥

এরপর বিস্ময়াবিষ্ট রোমাঞ্চিত অর্জুন বিশ্বরূপধারী ভগবানকে শ্রীকৃষ্ণের শরীরে শ্রদ্ধা-ভক্তিসহ নতমস্তকে প্রণাম করে করজোড়ে বললেন।

বিবেচন : ভগবানের দিব্যরূপ দর্শন করে অর্জুন বিস্ময়ে রোমাঞ্চিত হলেন এবং পুলকিত হয়ে ভগবানের সমক্ষে নতমস্তক হয়ে জোড়হাতে প্রণাম করে অর্জুন বললেন ।

11.15

অর্জুন উবাচ

পশ্য়ামি দেবাংস্তব দেব দেহে ,
সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসংঘান্
ব্রহ্মাণমীশং(ঙ্) কমলাসনস্থম্,
ঋষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্॥15॥

অর্জুন বললেন—হে দেব ! আপনার শরীরে আমি সমস্ত দেবতা এবং বহুবিধ ভূত সমুদয়, কমলাসনে অধিষ্ঠিত সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে, মহাদেবকে এবং সমস্ত ঋষি ও দিব্য সর্পগণকে দেখতে পাচ্ছি।

বিবেচন : সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন যে ভগবানের দিব্যরূপ দেখে অর্জুন ভাব পরিবর্তন হয়ে গেলো এবং বিস্ময়ে অর্জুনের ভাষাও পাল্টে গেলো। অনুষ্টুপ ছন্দে কথা না বলে ত্রিষ্টুপ ছন্দে তিনি যা যা দেখছেন তার বর্ণনা দিচ্ছেন। রোমাঞ্চিত হয়ে অর্জুন বললেন যে তিনি সমস্ত দেবতাগণ, সমস্ত প্রাণী, ভূতলোকের বিশেষ সম্প্রদায়, কমলাসনে উপবিষ্ট ভগবান ব্রহ্মা, শঙ্কর ভগবান ,সমস্ত ঋষি-সাধুগণ এবং দিব্যসর্পগণকে দেখতে পাচ্ছেন। অর্জুনের মতো আমরাও যেন ভগবানের এই দিব্য রূপ দেখার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি এই প্রার্থনার সাথে এই বিবেচন সভা সমাপ্ত হলো।