विवेचन सारांश
ধ্যানযোগ ও তার বিধি

ID: 1898
बंगाली - বাংলা
রবিবার, 20 নভেম্বর 2022
অধ্যায় 6: আত্মসংযমযোগ
2/3 (শ্লোক 13-19)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ ড: আশু গোয়েল মহাশয়


দীপ প্রজ্জ্বলন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্তুতির সাথে বিবেচন সত্রের শুভারম্ভ হয়। ভগবানের মঙ্গলময় কৃপায় আজ আমরা পুনরায় গীতাজীর চিন্তন করছি। বর্তমান অধ্যায়টি খুবই মহত্ত্বপূর্ণ। এটি আত্মসংযমযোগ আবার ধ্যানযোগ - দুই নামেই পরিচিত। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানযোগ ও তার বিধি বিষয়ক আলোচনা করেছেন। গীতার এই একটি অধ্যায়েই ধ্যানযোগের চিন্তন করা হয়েছে। 
 ধ্যানযোগের আলোচনার আগে ধ্যান কী, এটি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। পতঞ্জলির যোগদর্শনে অষ্টাঙ্গ যোগের কথা বলা হয়েছে। যম, নিয়ম,আসন,প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা এবং সমাধি -এই আটটি হলো যোগের সোপান বা সিঁড়ি। যমের আবার পাঁচটি অঙ্গ- সত্য, অহিংসা, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ। নিয়মেরও পাঁচটি অঙ্গ -শৌচ,সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রনিধান।  জীবনে এই দশটি গুণ যখন আয়ত্ত্ব হবে তখন আসনের অভ্যাস সহজেই হবে। আসন সিদ্ধির অভ্যাস  করতে হবে। শাস্ত্রকাররা বলেছেন, কোন আসনে বসবে সেটা বড়ো কথা নয়। স্বস্তিকাসন, সিদ্ধাসন, পদ্মাসন,সুখাসন বা বজ্রাসন - যে কোনো একটি আসনে বসে ধ্যান করা যেতে পারে, এতে তেমন কোনো তারতম্য নেই। তবে আসনে স্থির হয়ে কতটা সময় বসতে পারি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। যদি তুমি তিন ঘন্টা একটানা হেলদোল বিনা বসতে না পারো তবে তোমার আসন সিদ্ধ হয়েছে বলা যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো একটানা কিভাবে বসবো? সত্য হলো এই যে আমরা যখন ধ্যানযোগ দ্বারা ঈশ্বর প্রাপ্তি করতে চাই, তাঁর অনুভব করতে চাই  তখন একথা ঐচ্ছিক থাকে না। আসন সিদ্ধি ছাড়া কেউ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করতে পারি না। যম, নিয়ম, আসনের পর আসে প্রাণায়াম। আজকাল প্রাণায়াম বলতে অনেকে স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় সমস্যার নিদানকে বোঝেন। এর মাধ্যমে ঐ লাভ অবশ্যই পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাণায়ামের মূল অর্থ প্রাণকে সংযমিত করা, প্রাণকে নিয়ন্ত্রণে আনা। আমাদের শ্বসন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ছন্দে চলতে থাকে। আপনি যদি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস নিতে পারেন তবে বুঝতে হবে আপনি সুস্থ আছেন।আপনার শ্বসনহার ১৫ অপেক্ষা বেশি হলে বুঝতে হবে আপনার স্বাস্থ্য ঠিক নেই। প্রাণায়ামের অভ্যাসে শ্বসনহার ১৫ বারের কম হতে থাকে। কেউ  যদি ছয়মাস বা একবছর একটানা প্রাণায়ামের অনুশীলন করতে থাকেন তখন তিনি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আমরা যখন শ্বাস নিই তখন তা নাভি পর্যন্ত যাওয়া উচিত। বিশেষ কথা হলো যে সব প্রাণীর শ্বসনহার যত কম তাদের আয়ু তত বেশি। যদিও ব্রহ্মাজী আমাদের আয়ু দেন। মনে রাখতে হবে তিনি বর্ষ হিসাবে নয় শ্বসন হিসাবে আয়ু দান করেন, আপনি যদি দ্রুত নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চালাতে থাকেন আপনার আয়ু আগে শেষ হয়ে যাবে। যত ধীরে শ্বাস নেওয়া যায় তত আয়ু বৃদ্ধি পায়। মুনি ঋষিরা দীর্ঘ সময় শ্বাস রোধ করে রেখে তপস্যা করেন। অনেক তপস্বী এক বছর পর্যন্ত শ্বাস রোধ করে রাখতে পারেন। তাই তাঁরা দীর্ঘ আয়ুর অধিকারী হন,৪০০-৫০০ বছর এমনকি হাজার বছর বেঁচে থাকেন। মাতা পার্বতী শিবজীকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের শ্বাসরোধ করে রেখেছিলেন। প্রাণায়ামে শ্বাসের উপর নিয়ন্ত্রণ আসে। যে যোগী  নিজের শ্বাসের গতি যতটা কম করতে পেরেছেন তিনি তত বেশি সিদ্ধি লাভ করতে সক্ষম। সিদ্ধযোগীরা অন্তর্দৃষ্টিরও অধিকারী, তাঁরা স্বভাবকবিও বটে। আপনি যদি মীরাবাঈকে দেখেন, সুরদাসজীকে দেখেন, তুলসীদাসজীকে দেখেন, রহিম-রুসমানজীকে দেখেন, তাঁরা সবাই অল্পবয়সেই কবি হয়েছিলেন। তাঁদের কবিত্বের সিদ্ধি প্রাণায়ামের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এসে যায়। প্রাণায়ামে এরকম আরও অনেক সিদ্ধি এসে যায়।

যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়ামের পর আসে প্রত্যাহার। প্রত্যাহার হলো প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের আহার। যম পালন সঠিক হলে, নিয়ম ঠিক হলে, আসন সিদ্ধ হলে, প্রাণায়ামের অভ্যাস ঠিকমতো চলতে লাগলো, এরপর আপনাকে ধ্যানে মনঃসংযোগ করতে হবে। আমি চোখ দিয়ে কি দেখবো, কানে কি শুনবো,মুখে কি বলবো,কি খাবো, কি খাবো না,কি স্পর্শ করবো, কিরকম ঘ্রাণ নেবো, নিজের পাঁচ ইন্দ্রিয়কে আমি কি প্রকার আহার দেবো বা দেবো না তার উপর নিয়ন্ত্রণই হলো প্রত্যাহার।

  এরপর আসে ধারণা। প্রথম পাঁচটি বহিঃরঙ্গ সাধনার পর ধারণা, ধ্যান ও সমাধি হলো অন্তিম তিনটি অন্তরঙ্গ সাধন। যতক্ষণ  আমাদের বহিঃরঙ্গের সাধন সিদ্ধ না হয় ততক্ষণ  অন্তরঙ্গ সাধন সিদ্ধ হতে পারে না। আমরা প্রথম পাঁচটি সিঁড়ি ছেড়ে শেষের সিঁড়িতে উঠতে পারি কি ! পরমশ্রদ্ধেয় স্বামী শরণানন্দজী মহারাজ বলেছেন, যিনি যথাসময়ে তার বিদ্যুৎ -এর বিল জমা দিতে  পারেন না তিনি কখনো ধ্যান করতে পারেন না। স্বামীজীর এই কথার তাৎপর্য হলো -যার বাহ্যিক জীবন ব্যবস্থিত নয় তিনি অন্দরের জীবন কিভাবে ব্যবস্থিত করবেন। 
 ধারণা কি - এটি অনেক মহত্ত্বপূর্ণ বিষয়। তাই একে বোঝা খুবই জরুরি। ধারণার অর্থ হলো কোন পদ্ধতিতে ধ্যান করতে হবে। আমাদের অনেক জন্মের সংস্কার রয়েছে, ঐ সংস্কার অনুযায়ী আমি কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় হয়েছি, আমার গুরু পরম্পরা, পারিবারিক শাস্ত্র পরম্পরা, স্বভাব, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভক্তি কি প্রকার, মিত্রমহল কেমন, যে সমাজে রয়েছি তার প্রভাব  - এই সব কিছুর উপর নির্ভর করে ধারণা গড়ে ওঠে। ভিন্ন ভিন্ন ধারণার কারণে ধ্যানের পদ্ধতি ভিন্ন হয়। ধ্যানের সিদ্ধি তখনই আসবে যখন আমি একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি ধরে সারাজীবন অনুশীলন করে যাবো। 
ধ্যানের বিষয়ে তিনটি কথা - ধ্যাতা, ধ্যান আর ধ্যেয়। ধ্যাতা হলেন যিনি ধ্যান করেন, ধ্যান হলো বিধি বা পদ্ধতি, ধ্যেয় হলো ধ্যানের মাধ্যমে আপনি যে লক্ষ্য প্রাপ্ত করতে চান। এখন কেউ যদি এ ব্যাপারে বলেন একটি পদ্ধতিতে ধ্যান লাগতে কত সময় লাগে, তার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ধ্যাতার কত জন্মের পূর্বাভ্যাস রয়েছে কে বলতে পারে ! পূর্ববর্তী জন্মে যদি একভাবে ধ্যান করে আসা যায় তবে তার প্রভাব এই জন্মে পাওয়া যায়। এমনও হতে পারে মূহুর্তের মধ্যে কারও ধ্যান লেগে যায় আবার কারো ধ্যান লাগতে গোটা জীবন কেটে যায়। রাজা জনকজী তাঁর গুরু  অষ্টাবক্রকে শর্ত দিয়েছিলেন যে আমি ঘোড়ার এক রেকাবে পা রেখে দ্বিতীয় পা রাখতে যতটা সময় লাগে তার মধ্যে যেন আমার ধ্যান লেগে যায়। এর বেশি সময় আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। গুরুজী বলেন, হে রাজন ! এটা সম্ভব, তবে এর জন্য গুরুদক্ষিণা দিতে হবে। তারা ঘোড়াশালে গেলেন। অষ্টাবক্র জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাজন কি গুরুদক্ষিণা দেবেন? রাজা বললেন, আমার রাজ্য আপনাকে দিতে চাই। গুরুজী বলেন,  এই রাজ্য আপনার নয়, আপনার পূর্বপুরুষদের। আমাকে এমন কিছু দেবেন যা একান্তই আপনার নিজের। অনেক বিচার করে জনকজী বলেন, একমাত্র আমার মন আছে যা আপনাকে দিতে পারি। অষ্টাবক্র বলেন, বেশ ! তাই আমাকে অর্পণ করো। রাজা জনক সংকল্প করে তাঁর মন গুরু অষ্টাবক্রকে দান করলেন। গুরুজী বললেন, আপনি ঘোড়ার রেকাবে এক পা রাখুন। রাজা তাই করলেন। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, এবার কি করবো ? অষ্টাবক্রজী বললেন, হে রাজন ! আপনার মন তো আমাকে দিয়ে দিয়েছেন, তাহলে এখন কোনো সংকল্প বিকল্প বিচার করার কথা তো আপনার থাকার  নয়। জনক তাঁর  নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। অষ্টাবক্র তাঁর মাথায় হাত রেখে শক্তিপাত করলেন। এটি করতেই রাজা জনকের  অন্য পা দ্বিতীয় রেকাবে চলে গেল এবং তিনি ধ্যানে সমাহিত হয়ে গেলেন  এ সকল ব্যাখ্যা অষ্টাবক্র গীতায় লেখা আছে। 

এই বিষয়ে সুতীক্ষ্ণ জী মহারাজের আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তিনি ছিলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পরম ভক্ত। একদিন  ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সুতীক্ষ্মজীকে দর্শন দেবার জন্য তাঁর আশ্রমে আসেন। তখন সুতীক্ষ্মজী ধ্যানরত অবস্থায় শ্রীরাম জীর সাথে একাত্ম ছিলেন। ভগবান সামনে দাঁড়িয়ে আর তিনি কিনা তাঁরই ধ্যানে মগ্ন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র একবার ভাবেন তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করবেন আবার ভাবেন দর্শন না দিয়ে ফিরে  গেলে তার খুবই দুঃখ হবে। তিনি কৌশল করে সুতীক্ষ্মজী যে ভগবানের ছবির ধ্যান করছিলেন সেটি সরিয়ে নেন। হঠাৎ ছবি অদৃশ্য হওয়ায় সুতীক্ষ্মজী তার চোখ খুললেন, দেখেন যে ভগবানের ছবির ধ্যান করছিলেন তিনি স্বয়ং তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই দৃশ্য দেখে তার দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে গেল। 
এই রকম স্বামী বিবেকানন্দ এবং ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের একটি কাহিনী রয়েছে। স্বামীজী ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি কি ভগবানকে দেখেছেন ? রামকৃষ্ণ জী বলেন, হ্যাঁ, দেখেছি। এবার স্বামীজীর প্রশ্ন -আমাকে দর্শন করাতে পারেন ? ঠাকুর বলেন, যেভাবে তুমি আর আমি সামনে বসে আছি ঠিক এভাবেই দর্শন করাতে পারি। চোখ বন্ধ করো। স্বামী বিবেকানন্দ চোখ বন্ধ করতেই ঠাকুর তার মাথায় হাত রেখে শক্তিপাত করেন। মূহুর্তের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ সমাধি প্রাপ্ত হলেন যা অনেকের কয়েক জন্মের অভ্যাসের ফলে আসে। 
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব অন্তিম সময়ে গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে। খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিছু খেতে পারছিলেন না। তা দেখে সব শিষ্যরাও  খুব দুঃখ পেতেন। একদিন বিবেকানন্দ তাঁকে বলেন, হে ঠাকুর !  আপনি তো এত বড় যোগী, আপনার তো এতো সিদ্ধি, আপনি কি ধ্যান লাগিয়ে এই ক্যান্সার সারিয়ে দিতে পারেন না? ঠাকুর মুচকি হেসে বলেছিলেন, আমি ধ্যানে শুধু এই ক্যান্সার কেন পৃথিবীর সব মানুষের ক্যান্সার সারিয়ে দিতে পারি, কিন্তু তার জন্য আমার ইষ্টকে আমার ধ্যান থেকে সরাতে হবে।  আমি তা কি করে করতে পারি ? স্বামী বিবেকানন্দ বুঝতে পারলেন না যে, ঠাকুর কোথা থেকে ধ্যান সরানোর কথা বলছেন,  এটি  হলো সিদ্ধ যোগীদের ব্যাপার, তাদের ধ্যান লাগাতে হয় না বরং ধ্যান সরাতে হয় ।

ধ্যানের চারটি বিধি - অক্রিয়, সক্রিয়, সবিকল্প এবং নির্বিকল্প। এই চারটি বিধির মধ্যে ধ্যানের সকল নিয়ম সমাহিত রয়েছে। এর যে কোনো একটি বিধি অনুসরণ করলে ধারণা পরিস্কার হয়ে যায়। যিনি নিজের ধারণাকে বার বার বদলাতে থাকেন তার ধ্যান কখনো লাগে না। প্রথম হলো অক্রিয় ধ্যান, টাট বাবা এর প্রচার করেন। অক্রিয় ধ্যানের অর্থ - কিছুই করবো না, কিছু বিচার করবো না, কিছু বিচার মনে আসবে যাবে - একে রোধ করবো না। আমি শুধু বসবো আর আশেপাশে যা ঘটছে তাকে সাক্ষীভাবে দেখতে থাকবো। কোনো কথায় আগ্রহ দেখাবো না। দ্বিতীয় হলো ত্রাটক ধ্যান, অন্ধকারে কোনো একটি বিন্দুতে দৃষ্টিকে কেন্দ্রীত করে একটি শব্দের ধ্যান করতে হবে। গুরুদেব  যে মন্ত্র বা শব্দ দিয়েছেন তার চিন্তন করতে হবে, সেটি মনে মনেই শুনতে হবে। অভ্যাস করতে করতে একসময় এমন হবে যে ধ্যাতা এবং  ধ্যান দুই  বিলীন  হয়ে শব্দব্রহ্ম অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে যাবে, এছাড়া আর কিছুই থাকবে না। এই হলো সমাধি অবস্থা। এরপর আছে ভ্রূকুটি ধ্যান - গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এটির কথাই  বলেছেন। দুটি ভ্রুকুটির মধ্যে সুষুম্না নাড়ির অবস্থান, এক হলো আজ্ঞাচক্র। এর উপর আপনার ধ্যানকে কেন্দ্রীত করতে হবে। এরপর হলো সাকার ধ্যান। শ্রদ্ধেয় গোয়েঙ্কাজী সাকার ধ্যানের প্রচারক। "প্রভুর সাথে বাক্যালাপ"- বইতে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।  এছাড়া আছে প্রকাশ ধ্যান, এর প্রধান কেন্দ্র হলো ভ্রূকুটি বা হৃদয়, যে স্থানটি গুরুদেব বলেছেন, সেখানে প্রকাশের অনুভব করা, প্রকাশ দেখা। এইভাবে এক হৃদয় ধ্বনির ধ্যানও হয়, সোজা হয়ে বসে নিজের হৃদয়ের ধুকপুক শোনা। আরেকটি আছে সোওহম্ ধ্যান। উপনিষদে, রামচরিতমানসে এর বিবরণ পাওয়া যায়। এখানে সোজা হয়ে বসে নাভির উপর ধ্যান লাগাতে হয়। শ্বাস নেবার সময় "সোও" এবং শ্বাস ছাড়ার সময় আজ্ঞা চক্রে ধ্যান রেখে "হম্" উচ্চারণ করতে হয়। মানসে গোস্বামী জী লিখেছেন "সোহমস্মী ইতিবৃতি অখণ্ডা /দীপশিখা সোই পরম প্রচণ্ডা "।। সোওহম্ একদম পরম প্রচণ্ড হয়ে যায় এবং এর কোন অন্যথা নেই। আরেক প্রকার ধ্যান এখন খুবই প্রচলিত - বিপসনা। আদরণীয় গোয়েঙ্কাজী এই ধ্যানের প্রচার করেন, একে আনাপান ধ্যানও বলা হয়। শ্বাস নিতে নিতে আর ছাড়তে ছাড়তে ধ্যান। সাক্ষীভাবে নিঃশ্নাস প্রশ্বাসে ধ্যানকে কেন্দ্রীভূত করে এটি করতে হয়। এরপর হলো গুরুমন্ত্রের ধ্যান। গুরু বা কোনো মহাপুরুষের কাছে প্রাপ্ত মন্ত্রকে চোখ বন্ধ করে দেখা। আরেকটি হলো গুরু স্বরূপের ধ্যান, অর্থাৎ গুরুকে পরমাত্মারূপে দেখে তাঁর ধ্যান করা। 

  ধ্যানমূলং গুরুর্মূর্তি পূজামূলং গুরুর্পদম্
  মন্ত্রমূলং গুরুবাক্য মোক্ষমূলং গুরুকৃপা।।  

 আরেকটি হলো ভগবত লীলা দর্শন ধ্যান। গীতাপ্রেসের সংস্থাপক শ্রীহনুমান প্রসাদ জী পোদ্দার, তাঁর উপাধি ছিল নিত্য লীলা লীন। তিনি যখন ধ্যানে বসতেন তাঁর চোখ খোলা থাকতো,তিনি ভগবানের নানা প্রকার লীলার প্রত্যক্ষ দর্শন করতেন। তিনি যেমন যেমন দর্শন পেতেন তা বলতে থাকতেন এবং একজন চিত্রকর তাই শুনে ঐসব লীলার চিত্র তৈরি করতেন। গীতা পরিবারের গীতার সব চিত্রই এভাবে তৈরি হয়। এরকমই একটি ভগবতলীলার কথা মহাভারতে পাওয়া যায়। পিতামহ ভীষ্ম তখন শরশয্যায়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে দেখতে তাঁর কাছে এসেছেন  ভীষ্ম পিতামহ  তখন শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানে মগ্ন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা লক্ষ্য করেন। কিছু সময় পরে পিতামহ চোখ খুলে পাশে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে খুব খুশী হলেন। ভগবান জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কার ধ্যান করছিলেন ? ভীষ্মজী বলেন, আপনারই ধ্যান করছিলাম। এবার ভগবান জানতে চান, আপনি আমার কোন রূপের ধ্যান করছিলেন? পিতামহ ভীষ্ম বলেন, হে কৃষ্ণ ! আমি আপনার সেই রূপের ধ্যান করছিলাম, যেখানে আপনি আমার প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য, আমাকে বধ করার জন্য লীলা করছিলেন, লাফ দিয়ে রথ থেকে নেমে রথের চাকা তুলতে গিয়ে প্রণাম করছিলেন, আপনার কপালে চুল এসে পড়ছিলো, আপনি ধুলোমাখা হাতে চাকা তুলে আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। সূর্যের সোনালি কিরণ আপনার চুলে  - আপনার কপালে এসে পড়ছিলো, মনে হচ্ছিল আপনি বুঝি সোনার তিলক পড়ে আছেন। কি অপূর্ব সেই রূপ! হে কেশব !  আজকাল আমি আপনার এই স্বরূপেরই ধ্যান করি। ভগবানের কোনো একটি লীলার চিন্তনই ভাগবত লীলার ধ্যান। 
  আরেকটি আছে ওঁ-কারের ধ্যান। নিরাকার পদ্ধতির সব সাধক এই প্রকার ধ্যানের প্রয়োগ করে থাকেন। এই ধ্যান আবার দুই ভাবে হয়। ওঁ- এর দুটি স্বরূপ  - এক হলো ওঁ-এর অক্ষর স্বরূপের ধ্যান আর দ্বিতীয়টি হলো ওঁ -এর ধ্বনির ধ্যান। দুই পদ্ধতিতেই পরম তত্ত্ব প্রাপ্তি হয়। এছাড়া আছে বিচার ধ্যান। কোনো একটি শ্লোক বা শাস্ত্রবচনের উপর ধ্যানকে যুক্ত করা। আরেকটি হলো কুন্ডলিনী ধ্যান। এছাড়া আছে ভাবনা ধ্যান। আমাদের পূজ্য গুরুদেবজী মহারাজ ঋষিকেশের সাধনা শিবিরে এই প্রকার ধ্যান করে থাকেন। এই ধ্যানে প্রথমে সোজা  স্থির হয়ে বসে ভাবনাগুলি স্বামীজী বলতে থাকেন। সেই সব ভাবনা সাধকরা অন্তর দিয়ে অনুভব করার প্রয়াস করেন। আমি স্বচ্ছ, আমি তেজোময়, আমি আনন্দস্বরূপ ইত্যাদি ইত্যাদি। এই রকম আরও অনেক প্রকার ধ্যান আছে। সব ক্ষেত্রেই  ধ্যেয়ের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়াই ধ্যানের চূড়ান্ত কথা। 

ভগবান বলেন কূশ আদি দিয়ে আসন তৈরি করবে। কূশের বিশেষত্ব হলো ইহা শীতে ঠান্ডা হয় না আবার গরমের সময় গরম হয় না। দ্বিতীয় হলো মৃগছাল - যা শরীরের শক্তিকে  রক্ষা করে। এতে কোনো কীট আসে না। আজকাল অনেকে পশমী বস্ত্রের উপযোগ করেন, তার উপর সুতী বস্ত্র রেখে তিন স্তর বিশিষ্ট  আসন তৈরি করবে। এটি খুব বেশি উঁচু হবে না আবার বেশি নিচুও হবে না। 

 এই রকম আসনে বসে একাগ্র চিত্ত হয়ে নিজের চিত্ত ও  ইন্দ্রিয়গুলিকে  নিয়ন্ত্রণ করে মনকে একাগ্র করে অন্তঃকরণের শুদ্ধির জন্য যোগাভ্যাস করবে। আমাদের জানা উচিত আমরা কেন ধ্যান করছি। শ্রীমদ্ভগবতগীতায় ভগবান ধ্যানের উদ্দেশ্য বলতে অন্তঃকরণের শুদ্ধিকে নির্দেশ  করেছেন। এছাড়া ধ্যানের আর কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। 






6.13

সমং(ঙ্)কায়শিরোগ্রীবং(ন্), ধারয়ন্নচলং(ম্) স্থিরঃ ।
সম্প্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং(ম্) স্বং(ন্), দিশশ্চানবলোকয়ন্॥13॥

মেরুদণ্ড, মস্তক, গ্রীবাকে সমান ও নশ্চলভাবে স্থির করে, নিজ নাসিকার অগ্রভাগে স্থির দৃষ্টি স্থাপন করে, ব্রহ্মচর্য ব্রতে রত হয়ে, ভয় রোহিত ও প্রশান্তচিত্ত যোগী সতর্ক হয়ে মনকে সংযত করে মদ্গতচিত্ত এবং মৎপরায়ণ হয়ে অবস্থান করেন।

6.13 বিবেচন - আপনার শরীর, মাথা ও মেরুদণ্ডকে এক সরলরেখায় রেখে সোজা হয়ে বসুন। তেত্রিশটি পুঁতিকে এক সরলরেখায় রাখলে যেমন হয়। এভাবে সোজা রাখার তাৎপর্য  হলো শরীর যেন বেঁকে বা ঝুঁকে না থাকে। কোনো প্রকার নড়াচড়া চলবে না। এরপরে ধারণা স্থির করুন, নাসিকার অগ্রভাগে দৃষ্টিকে স্থির রাখুন। ধ্যানের সময় সাধারণত চোখ বন্ধ রাখা হয়, চোখ খোলা থাকলে ধ্যান হয় না, মনোযোগ এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে পারে। চোখ বন্ধ থাকলেও মনের ভিতর অনেক প্রকার খেয়াল আসতে পারে। তাই ভগবান বলছেন নাসিকার অগ্রভাগে দুই চোখের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখতে। এর ফলে আপনার চোখ এতটা বন্ধ থাকবে যে আপনি সামনে কিছু দেখতে পাবেন না, মন অন্য  কিছু ভাববার অবকাশ পাবে না। ধ্যানে কোনো প্রতিবন্ধকতা আসবে না। 

6.14

প্রশান্তাত্মা বিগতভী:(র্), ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ ।
মনঃ(স্) সংয়ম্য মচ্চিত্তো, য়ুক্ত আসীত মত্পরঃ ॥14॥

মেরুদণ্ড, মস্তক, গ্রীবাকে সমান ও নশ্চলভাবে স্থির করে, নিজ নাসিকার অগ্রভাগে স্থির দৃষ্টি স্থাপন করে, ব্রহ্মচর্য ব্রতে রত হয়ে, ভয় রোহিত ও প্রশান্তচিত্ত যোগী সতর্ক হয়ে মনকে সংযত করে মদ্গতচিত্ত এবং মৎপরায়ণ হয়ে অবস্থান করেন।

6.14 বিবেচন - ব্রহ্মচারী ব্রতে স্থিত হয়ে শান্ত অন্তঃকরণে ভয়রহিত হয়ে মনকে সংযমিত করে আমার ধ্যান করবে। ভগবানের এই কথার তাৎপর্য হলো এই যে এভাবে   আপনি যে ধ্যানই করুন না কেন তা আপনার অন্তঃকরণের শুদ্ধি করবে। আপনি মদ্গতচিত্ত ও মদ্পরায়ণ হয়ে উঠবেন। 

6.15

য়ুঞ্জন্নেবং(ম্) সদাত্মানং(ম্), য়োগী নিয়তমানসঃ ।
শান্তিং(ন্) নির্বাণপরমাং(ম্), মত্সংস্থামধিগচ্ছতি ॥15॥

সংযতচিত্ত যোগী এইভাবে আত্মাকে নিরন্তর পরমেশ্বররূপ আমাতে সমাহিত করে আমাতে স্থিত পরমানন্দের পরাকাষ্ঠারূপ শান্তি লাভ করেন।

6.15 বিবেচন- ভগবান এরপর ধ্যানের ফলের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ধ্যানের মাধ্যমে মনকে বশ করে পরমেশ্বরের স্বরূপে একাত্ম হলে আমার মধ্যে যে পরমানন্দের পরাকাষ্ঠারূপী পরমশান্তি রয়েছে তা প্রাপ্ত হওয়া যায়। যতক্ষণ ধ্যানের অবস্থায় না আসবে ততক্ষণ এই প্রকার পরমশান্তির অনুভব করা যায়  না। ধ্যানের পরমাবস্থার রস যিনি একবার আস্বাদন করেছেন তাঁর কাছে সাংসারিক আনন্দ নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে যায়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী যোগীদের জীবনে কোনো রসই অবশিষ্ট নেই। বরফের মধ্যে বসে ধ্যান করা, খাবার জায়গা নেই, পান করার জায়গা নেই, ঘুমানোর কোনো  ঠিকানা নেই, চারিদিকে জনমানবশূন্য, কথা বলার কেউ নেই। এখানে যারা ধ্যান করেন তাঁরাই এর রস, এর আনন্দ, এর শান্তিকে অনুভব করতে পারেন, তাঁদের কাছে অন্য সব আনন্দ, অন্য সুখ তুচ্ছ মনে হয়। আমরা অনেক সময় কোনো বড় অনুষ্ঠানে যখন যোগ দিতে যাই তখন বাড়ির ছোটরা হয়তো খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, বার বার যাবার তাড়া দিলেও তারা তাদের খেলায় মগ্ন থাকে। অনেক সময় বলে আমরা যাবো না, তোমরা যাও। তাদের কাছে অনুষ্ঠানে যাবার আনন্দের চাইতে খেলাটাই বেশি মজার। সন্তদের সম্বন্ধেও এই বিচার কাজ করে। আবার তাঁরা যখন চান আমরাও তাঁদের মতো পরমানন্দ প্রাপ্ত করি তখন আমরা বলি আমাদের সংসারেই অনেক বড় মজা রয়েছে, আমরা এই সব পার্থিব আনন্দেই থাকতে চাই। 

6.16


নাত্যশ্নতস্তু য়োগোsস্তি , ন চৈকান্তমনশ্নত: ।
ন চাতিস্বপ্নশীলস্য, জাগ্রতো নৈব চার্জুন ॥16॥

হে অর্জুন ! এই যোগ, যাঁরা অত্যধিক আহার করেন অথবা যাঁরা একান্ত অনাহারী, যাঁরা অতিশয় নিদ্রালু অথবা অত্যন্ত জাগরণশীল তাঁদের সিদ্ধ হয় না।

6.16 বিবেচন -ভগবান বলছেন, হে অর্জুন ! যে অধিক ভোজন করে আর যে মোটেই ভোজন করে না, যে অধিক ঘুমায় আর যে মোটেই ঘুমায় না, তারা কেউ যোগী হতে পারে না। অর্থাৎ মাত্রাতিরিক্ত কোনো কিছুই  যোগের অনুকূল নয়। 
     অতি কা ভলা ন বোলনা, অতি কী ভলী ন চুপ, 
      অতি কা ভলা ন বরসনা, অতি কী ভলী ন ধূপ। 
কোনো কিছুরই অতিরিক্ত ভালো নয়। 

6.17

য়ুক্তাহারবিহারস্য , য়ুক্তচেষ্টস্য কর্মসু ।
য়ুক্তস্বপ্নাববোধস্য, য়োগো ভবতি দুঃখহা ॥17॥

দুঃখনাশক এই যোগ নিয়মিত আহার-বিহারকারী, কর্মে যথাযথ চেষ্টাকারী এবং নিয়মিত নিদ্রা ও জাগরণশীলেরই সিদ্ধ হয় ।

6.17 বিবেচন - ভগবান বলছেন, হে অর্জুন ! কখন কতটুকু খেতে হবে, ঋতু অনুসারে খাবে, ক্ষুধা অনুসারে খাবে। কম খাওয়ার অর্থ হলো যুক্তাহার গ্রহণ করা, যুক্ত  বিহার করা। যুক্ত কর্ম করার অর্থ নিত্যকার কর্তব্য পালন করার সময় ভগবানের সাথে যুক্ত হয়ে তা করা। আপনি মা হলে সন্তান এবং স্বামীর দেখাশুনা করবেন, বাবা হলে সন্তান ও স্ত্রীর জন্য অর্থোপার্জন করবেন, কিন্তু সকল অবস্থাতেই ভগবানের সাথে যুক্ত থেকে তা করতে হবে। 

6.18

য়দা বিনিয়তং(ঞ্) চিত্তম্, আত্মন্য়েবাবতিষ্ঠতে ।
নিঃস্পৃহঃ(স্) সর্বকামেভ্যো, য়ুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা ॥18

চিত্ত যখন একান্তভাবে বশীভূত হয়ে পরমাত্মাতেই অবস্থান করে তখন ভোগে সম্পূর্ণভাবে আকাঙ্ক্ষাশূন্য সেই পুরুষকে যোগযুক্ত বলা হয়।

6.18 বিবেচন - এইভাবে যোগ  অনুশীলনের দ্বারা চিত্ত যখন নিয়ন্ত্রিত হয়, আপন স্বরূপে স্থিত হয়, তখন সকল প্রকার ভোগ ও বাসনা থেকে মুক্ত হওয়া যায়। 

6.19

য়থা দীপো নিবাতস্থো, নেঙ্গতে সোপমা স্মৃতা ।
য়োগিনো য়তচিত্তস্য, য়ুঞ্জতো য়োগমাত্মনঃ ॥19

বায়ুবিহীন স্থানে দীপশিখা যেমন চঞ্চল হয় না, পরমাত্মার ধ্যানে সংযতচিত্ত একাগ্রীভূত চিত্তেরও সেই অবস্থা জানবে।

6.19 বিবেচন -ভগবান বলছেন, হে অর্জুন ! যেভাবে বায়ুরহিত স্থানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় না , তেমনি হলো পরমাত্মার ধ্যানে রত যোগীর অবস্থা। যখন আমরা প্রদীপ  প্রজ্জ্বলন করি তা স্থির থাকে  না, এর শিখা কাঁপতে থাকে, এই অবস্থায় এর চারপাশে কাঁচের আবরণে ঢেকে দিলে এবং উপরে খোলা থাকলে শিখা স্থির হয়ে যায়। একইভাবে এই চঞ্চল  মনকে যদি জ্ঞানের, ভক্তির, গুরুকৃপার, গুরুদেবের আজ্ঞা পালনের আবরণ দেওয়া যায়, তবে মন স্থির হয়ে যায়। অর্থাৎ  যে সাধনার দ্বারা মন শান্ত হয় মনকে সেই  সাধনের বেড়া দিতে হয়। এখানে জলধারা বৃত্তি আর তৈলধারা বৃত্তির উল্লেখ করা যায়। যখন আমরা উপরের কোনো একটি পাত্র থেকে নিচের পাত্রে জল ঢালি তখন জল একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে, কিন্তু একই ভাবে ওপর থেকে  নিচের পাত্রে তেল ঢাললে তেল এক ধারায় পড়তে থাকে। আমাদের মন হলো জলধারা বৃত্তি সম্পন্ন, একে তৈলধারা সম্পন্ন করে তুলতে হবে, চঞ্চল মনকে শান্ত করতে হবে। 
 মহর্ষি পতঞ্জলি মনের পাঁচটি অবস্থার কথা বলেছেন, মূঢ়, চিত্ত, বিক্ষিপ্ত, একাগ্র এবং নিরূদ্ধ। মূঢ় এবং  চিত্ত হলো জড়, এদের সম্বন্ধে কোনো কথা নয়। বিক্ষিপ্ত হলো যেখানে অনেক চঞ্চলতা। একাগ্র হলো স্থির আর নিরূদ্ধ হলো অন্তিম অবস্থা।
 একাগ্র মনের একটি কাহিনী আছে। ভগবান দত্তাত্রেয় একদিন এক গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে এক লোহার তার কামারশালায় একমনে কূটের উপর উত্তপ্ত লোহা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে দা, বটি ইত্যাদি তৈরি করছিলেন। সেই সময় সামনের পথ দিয়ে সেখানকার রাজার এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা যাচ্ছিল, বাদকেরা ঢাক- ঢোল, নাকারা ইত্যাদি বাজাচ্ছিলো। পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট ধরে সেই মনোরম শোভাযাত্রা গেল। গ্রামের লোকেরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল।  লোহার একবারের জন্যও মাথা তুলে সেই দিকে তাকিয়ে দেখলো না। দত্তাত্রেয় সব লক্ষ্য করছিলেন। একটু সময় পরে পিছিয়ে পড়া এক সিপাহি ঐ লোহারকে এসে জিজ্ঞাসা করলে, রাজামশায়ের সওয়ার কোন দিকে এগিয়ে গেছে। লোহার এবার মাথা তুলে বললো, কোন রাজা? আমি তো কিছুই দেখি নি। সিপাহি তাকে একটা আস্ত পাগল ভেবে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে গেল। এবার দত্তাত্রেয় লোহারের সামনে এসে তাকে দন্ডবত্ প্রণাম করলেন। তা দেখে লোহার ঘাবড়ে গিয়ে বললে, আরে আরে, মহারাজ করেন কি ! আপনি আমাকে প্রণাম করছেন কেন? দত্তাত্রেয় বললেন, আজ তুমি আমাকে এমন গুরুমন্ত্র দিলে যে তুমি  আমার গুরু হয়ে গেলে। আজ আমি তোমার কাছে শিখলাম কিভাবে মনকে কোনো বিষয়ে একাগ্র করলে মন অন্য কিছু  দেখতে পায় না। এর কারণে তুমি আমার গুরু হয়ে গেলে। 
এরপর হরি শরণম্ ভজন সংকীর্তনের সাথে বিবেচন সত্র সমাপন  হলো। 

 এরপর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হলো। 
 প্রশ্নকর্তা -শশাঙ্ক ভাইয়া
প্রশ্ন - আমি পনেরো মিনিটের বেশি ধ্যান করতে পারি না, এটি কিভাবে বাড়ানো যায় ? 
উত্তর - যখন ধ্যান আমাদের শরীরের উপর লেগে থাকে তখন আমাদের বাইরের দিকের  টান থাকে, ধ্যান বেশি সময় হবে কি করে?  এইজন্য আসন সিদ্ধির কথা বলা হয়। যদি আসন সিদ্ধি হয়ে যায় তখন বাইরের  কিছু বিচার করার দরকার হয় না। এইজন্য  একাসনে বসে অভ্যাস বাড়াতে হয়। কম করে তিরিশ  মিনিট থেকে চল্লিশ  মিনিট অভ্যাস তো করতেই হবে। 
 প্রশ্নকর্তা - বজরঙ্গ ভাইয়া
প্রশ্ন - আমাদের পূর্ব জন্মের কোন কোন বিষয় মনে থাকে, আর কোন কোন বিষয় মনে থাকে না ? যদি আমাদের ধর্ম পরিবর্তন করানো হয় তবে ঐ পরিবর্তনকারীর কি পাপ লাগে ? 
উত্তর -কোনো কিছু মনে পড়ে না। চিত্তে বৃত্তিগুলি রয়ে যায়। বৃত্তিও সকলের থাকে না,  যদি কিছু থাকে তা আমাদের জীবনে মার্গদর্শন করে। ধর্মান্তরকারীর সব থেকে বেশি পাপ লাগে। কিন্তু যদি কোনো গুরু ধর্মবিরুদ্ধ বা শাস্ত্র বিরূদ্ধ জ্ঞান দান করেন তাকে সব থেকে বেশি পাপ ভোগ করতে হয়। 
প্রশ্ন কর্ত্রী - সুরেখা দিদি
প্রশ্ন - যম নিয়মের বিষয়ে কিছু বলুন। 
উত্তর -সত্য, অহিংসা, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য আর অপরিগ্রহ - এই হলো পাঁচ নিয়ম। অস্তেয় অর্থ চুরি না করা, যে জিনিসে আমার অধিকার নেই তার বাসনা না করা, তার বিষয়ে কামনা না করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহ  না করা হলো অপরিগ্রহ। 
প্রশ্নকর্ত্রী - বরখা দিদি
প্রশ্ন - কত সময় পরে প্রকাশচক্র দেখা যায়?  কোন সময় ধ্যান করা উচিত ? 
উত্তর - ১৫-২০ মিনিট ধ্যানের পর প্রকাশের অনুভূতি হয়, এটি কতসময় স্থায়ী হয় সেটি হলো অধিক মহত্ত্বপূর্ণ। ধ্যান বা মেডিটেশন সকালে ঘুম থেকে উঠেই করা উচিত। সকালে যত আগে উঠবে ধ্যানের পক্ষে তত ভালো বাতাবরণ পাওয়া যায়। 
 এই রকম জ্ঞানগর্ভী প্রশ্নোত্তরের মধ্যে দিয়ে আজকের বিবেচন সত্র সম্পূর্ণ হলো ।