विवेचन सारांश
মহাভারতের প্রেক্ষাপট

ID: 2978
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 27 মে 2023
অধ্যায় 1: অর্জুনবিষাদয়োগ
1/4 (শ্লোক 1-1)
ব্যাখ্যাকার: গীতা প্রবীণ মাননীয়া রুপল শুক্লা মহাশয়া


যে গ্রন্থের কথা চিন্তা করা মাত্র অন্তরাত্মা শুদ্ধ হয় এবং দুষ্ট বুদ্ধির বিনাশ হয় সেই মহানতম গ্রন্থই হল গীতা।

গীতার অনেক গুলো অধ্যায় পঠন ও অনুধাবনের পরে আমরা প্রথম অধ্যায়ে এসেছি। স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন আসে সবসময় তো প্রথম অধ্যায় থেকেই শুরু হয়, এখানে কেন হলো না ? আসলে, আমাদের শাস্ত্রাদি পঠন পাঠনের রীতি অনুযায়ী ক্রমানুসারে এগিয়ে চলার উপর খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বরং শাস্ত্রের যে অধ্যায়টি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ সেটাকেই পূূর্বে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিষযটি শুধুমাত্র 'গীতা' অধ্যায়নের ক্ষেত্রেই নয়, বেদ, বেদাঙ্গ, বেদান্তের অধ্যয়ন কালেও এমনটা দেখা যায়
অর্থাৎ তাৎপর্য অনুযায়ী-ই অধ্যয়ন করা হয়, ক্রমানুসারে নয়। আমরা প্রথমে দ্বাদশ অধ্যায় পাঠ করেছি যা "ভক্তিযোগ" নামে পরিচিত এবং এই যোগই সবচেয়ে সহজবোধ্য। আমরা ছোট থেকেই পূজা, অর্চনা, ভক্তির সাথে পরিচিত, তাই এটা অতি সহজে গ্রহণ করা যায়। এরপর পঞ্চদশ অধ্যায় "পুরুষোত্তমযোগ" ও পরে ষোড়শ অধ্যায় "দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ" পঠনকালে আমাদের ভিতরে কিছুর উপলব্ধি হতে শুরু করে। এখন আমরা গীতার সারমর্ম অল্প অল্প করে বুঝতে পারি এবং গীতা বর্ণিত পথে চলতে মন চায়। এখন আমরা যদি গীতার প্রথম অধ্যায় থেকে শুরু করতাম, যেখানে অর্জুনের বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে আবার দ্বিতীয় অধ্যায়ে যেখানে ভগবান স্থিতপ্রজ্ঞার লক্ষণ সমূহ বর্ণনা শুরু করেছেন, এগুলো প্রাথমিক স্তরে মন গ্রহণ করতে পারত না। মন কে এগুলো গ্রহণ করার মতো তৈরি করে আমরা তৃতীয় স্তরে এসে প্রথম অধ্যায় শুরু করেছি।

গীতার আঠারোটি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম অধ্যায়েই অনুধাবন করার মতো বিষয় সবচেয়ে কম। কিন্তু এই অধ্যায় আমাদের জানিয়ে দেয় যে কেন এই "গীতা" উপস্থাপন করা প্রয়োজন হয়েছিল। গীতা জানতে গিয়ে অবশ্যই মহাভারতের কথা চলে আসে। মহাভারত কথা না জানলে বোঝা যাবে না গীতার মহত্বপূর্ণ ভূমিকা কি ছিল। মহাভারত কী, তা গীতার প্রথম অধ্যায় থেকেই জানা যায়।

বিষাদ : হৃদয় যখন বেদনায় ভরে যায় সেই ভাবটিই বিষাদ। রণক্ষেত্রে অর্জুন যখন দেখলেন, তাঁরই আত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধ করতে হবে, এবং সেই ভয়াবহ যুদ্ধের পরিনাম অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, তখন তিনি বিষাদগ্রস্ত হলেন। তিনি তাঁর সারথি ও পরামর্শদাতা শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, তিনি যুদ্ধ চান না, রাজ্য চান না, তিনি ভিখারি হয়ে জীবন কাটাতেও রাজি। কিন্তু এই লোকক্ষয় বন্ধ হোক। তাঁর ভাই, বন্ধুদের মৃত্যু চান না। এমতাবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহানুভূতির সাথে অর্জুনের অনুভূতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং শেষে অর্জুন কে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করে তাঁকে যুদ্ধে রত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে যে উপদেশ দিয়েছিলেন রণভূমিতে দাঁড়িয়ে তাহাই "গীতা" -- শ্রী ভগবানের মুখনিঃসৃত অমৃতবাণী।

গঙ্গাদেবী পুত্র দেবব্রত কে মহারাজ শান্তনুর কাছে ফিরিয়ে দিয়ে গেছেন পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো। দেবব্রত এখন মহাপরাক্রমশালী এক যুবক। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন পিতা সর্বদা বিমর্ষচিত্ত। বহুবার জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন তাঁর পিতা ধীবররাজের কন্যা সত্যবতীর প্রতি অনুরক্ত এবং পাণিপ্রার্থী কিন্তু ধীবররাজ একটি শর্তে এই বিবাহ দিতে পারেন যদি মহারাজ প্রতিশ্রুতি দেন যে সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই হস্তিনাপুরের উত্তরাধিকার পাবে। দেবব্রত ধীবররাজের কাছে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি কখনো হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসবেন না। ধীবররাজ একধাপ এগিয়ে বললেন, দেবব্রতর পুত্রেরা এই দাবি করতে পারে। দেবব্রত কখনো বিয়ে করবেন না এই প্রতিজ্ঞাও করলেন। এরপর ধীবররাজ এই সত্যবদ্ধ করালেন যে দেবব্রত আজীবন সত্যবতীর পুত্রদের পাশে থেকে হস্তিনাপুর কে রক্ষা করবেন। এই তিনটি ভীষণ প্রতিজ্ঞা করার জন্য দেবব্রত 'ভীষ্ম' নামে খ্যাত হলেন।

সত্যবতীর সাথে মহারাজ শান্তনুর বিবাহ হলো, তাঁদের দুই পুত্র -- চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। চিত্রাঙ্গদ অকালে প্রাণ হারান। সিংহাসনে বসেন বিচিত্রবীর্য। তাঁকে বিবাহ দেওয়ার জন্য কাশীরাজের তিন কন্যাকে স্বয়ংবর সভা থেকে হরণ করে নিয়ে আসেন ভীষ্ম। অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকা। এঁদের মধ্যে অম্বা রাজাকে বিবাহ করতে অসম্মত হন। তাই অম্বিকা ও অম্বালিকার সাথে বিচিত্রবীর্যের বিবাহ হয়। কিন্তু, রানীদের সন্তানাদি হওয়ার আগেই রাজার মৃত্যু হয়। মহারানী সত্যবতী কুরুবংশ রক্ষার দায়িত্ব নিতে বললেন মহামতি ভীষ্ম কে। কিন্তু ভীষ্ম অসম্মত হলেন। তিনি ব্রহ্মচর্য বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। অগত্যা মহারানী সত্যবতী তাঁর পূর্বতন পুত্র ঋষি পরাশরের ঔরসজাত সন্তান মহর্ষি ব্যাসদেব এর সাহায্যে পুত্রবধূদের সন্তান উৎপাদন করালেন। কিন্তু অদ্ভুতদর্শন ব্যাসদেবকে দেখে রানী অম্বিকা চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন। তাই তাঁর জন্মান্ধ এক পুত্র ধৃতরাষ্ট্রের জন্ম হলো। অন্যদিকে রানী অম্বালিকা ব্যাসদেব কে দেখে ভয়ে পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিলেন তাই তাঁর পাণ্ডুবর্ণ এক পুত্র হয়। নাম রাখা হয় পাণ্ডু। যেহেতু ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন তাই পাণ্ডু হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেন। এবং পরে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করে স্ত্রীদের সাথে বনবাসী হলেন। সিংহাসনে বসলেন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র। তাঁর মনে সবসময় এক হীনতা ও অসূয়া ছিল। তিনি সবসময় ভাবতেন পাণ্ডুর পুত্রেরা হয়তো সিংহাসনের দাবি করবে। তাঁর নিজের পুত্রেরাও একইরকম মনোভাব পোষণ করতেন। প্রথমে পাণ্ডবদের অর্ধেক রাজ্য দেওয়ার কথা হলেও রাজকুমার দুর্যোধন রাজি হলেন না। শেষে খাণ্ডবপ্রস্ত নামে একটা জঙ্গল দেওয়া হলো পাণ্ডবদের। পাণ্ডবরা সেখানে এক মোহময় প্রাসাদ ইন্দ্রপ্রস্থ গড়ে তুললেন। সেই প্রাসাদ দেখে দুর্যোধন লোভাতুর হয়ে তা দখল করার চক্রান্ত করলেন। তাঁর মামা শকুনি কপট পাশাখেলায় পাণ্ডবদের হারিয়ে বারো বছর বনবাসে বাধ্য করলেন। বনবাস ও অজ্ঞাতবাস শেষে ফিরে এসে ইন্দ্রপ্রস্থ ফেরত চাইলেন পাণ্ডবরা কিন্তু দুর্যোধন কিছুতেই রাজি হলেন না ফিরিয়ে দিতে। এমনকি শ্রীকৃষ্ণ দৌত্য করে মাত্র পাঁচটি গ্রাম চাইলেন পাণ্ডব দের জন্য। কিন্তু দুর্যোধন অনড়। সূচাগ্র পরিমাণ জমি দিতেও রাজি হলেন না। অতএব অন্তিম পরিণাম কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ।

1.1

ধৃতরাষ্ট্র উওয়াচ ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে, সমবেতা য়ুয়ুৎসবঃ
মামকা: (ফ্) পাণ্ডবাশ্চৈব, কিমকুর্বত সঞ্জয়॥1॥

ধৃতরাষ্ট্র বললেন- হে সঞ্জয়! ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের ইচ্ছায় সমবেত আমার এবং পাণ্ডুর পুত্রগণ কি করল?

সঠিকভাবে বিচার করতে গেলে, মহাভারতের যুদ্ধের কারণ দুর্যোধন নয়। স্বামীজি বলেছেন, ধৃতরাষ্ট্র যদি আপন কর্তব্য পালন করতেন তাহলে এই যুদ্ধের পরিস্থিতি আসত না। যদি পিতা তাঁর পুত্রকে সঠিক সময়ে শাসন করতেন তাহলে পুত্র কিভাবে খারাপ পথে যেতে পারে? কিন্তু দুর্যোধন বিভিন্ন ভাবে বারবার পাণ্ডবদের উপর নির্যাতন করলেও ধৃতরাষ্ট্র কখনো পুত্রকে নিরস্ত করেন নি, এ কারণেই মহাভারতের সূচনা। গীতার প্রথম শ্লোকটি সেই ধৃতরাষ্ট্রের উক্তি :
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ।। ১.১ ।।

সঞ্জয় কে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমার পুত্ররা আর পাণ্ডুর পুত্ররা কুরুক্ষেত্রে কি করল? আমাদের শাস্ত্রানুযায়ী ভাইয়ের মৃত্যু হলে ভাইয়ের পুত্ররা নিজের পুত্রের মতো প্রতিপালিত হবে। তারা নিজের পুত্রের মতোই স্নেহ আদর পাওয়ার যোগ্য। পাণ্ডবরা ধৃতরাষ্ট্র কে নিজের পিতার মতো সম্মান করলেও ধৃতরাষ্ট্র কিন্তু পাণ্ডবদের পুত্র বলে মানতে পারেননি। পাশা খেলায় সকলে যখন যুধিষ্ঠিরকে নিষেধ করছিলেন তখন যুধিষ্ঠির বলেছেন, পিতা (ধৃতরাষ্ট্র) আদেশ দিয়েছেন, আমি তো এ খেলা ছাড়তে পারবো না। তাতে যদি আমার সর্বনাশও হয়ে যায় তবুও। ধৃতরাষ্ট্রের এই অসূয়ক মনোভাবই মহাভারতের যুদ্ধের মূল কারণ।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সঞ্জয় দশদিন সেই যুদ্ধভূমিতে ছিলেন। পিতামহ ভীষ্ম যখন শরশয্যা নিলেন, তখন সঞ্জয় সেই সংবাদ নিয়ে হস্তিনাপুর ফিরে এলেন। মহর্ষি ব্যাসদেব সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেছিলেন যার দ্বারা সঞ্জয় দ্বিতীয়বার যুদ্ধের ঘটনা প্রত্যক্ষ করে সবিস্তারে ধৃতরাষ্ট্র কে বর্ণনা করেন।

গীতার কথক এই সঞ্জয় কে ছিলেন ?
সঞ্জয় এক রথচালকের সন্তান, যাদের বলা হতো সূত। তাঁর পিতার নাম ছিল গাবলাগন। কিন্তু সূত হয়েও সঞ্জয় শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন, সেজন্য তিনি মহর্ষি ব্যাসের অতি স্নেহধন্য ছিলেন। মহর্ষি তাঁকে শিষ্যরূপে শিক্ষা দান করেছিলেন। সেই সময় সমাজের যে কোন বর্ণে জন্মগ্রহণ করেও কর্মের দ্বারা অন্য বর্ণের মানুষ হিসাবে পরিচিত হওয়া যেত। সঞ্জয় তার উদাহরণ। মহর্ষি ব্যাসদেব সঞ্জয়কে ব্রাহ্মণত্ব প্রদান করেছিলেন ও পরে তাঁকে দিব্যদৃষ্টিও প্রদান করেন। ব্যাসদেবের নির্দেশে ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে তাঁর মন্ত্রী, রথচালক এবং বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসাবে সাথে রেখেছিলেন।

সঞ্জয়ের একটি উক্তি -
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম ।। ১৮.৭৮ ।।

যেখানে তিনি ধৃতরাষ্ট্র কে বলেছেন, এটাই সত্য যে যেখানে যোগেশ্বর কৃষ্ণ আছেন অর্জুনের সাথে, সেখানে জয় নিশ্চিত।

বলা হয়, সমস্ত পৃথিবীতে যা কিছু ঘটতে চলেছে তার সবকিছুই মহাভারতে বর্ণিত আছে, এতটাই বিশাল এবং অনবদ্য সৃষ্টি মহর্ষি ব্যাসদেবের।

এর পরে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। 

প্রশ্ন : মণিকা দিদি

গীতার সাথে সম্পর্ক হওয়ার পরে অন্যান্যরা বলেন আমার ভিতর একটা সদর্থক ভাব এসেছে। এটা কি করে সম্ভব?

উত্তর: তুমি যতই আলোর দিকে এগিয়ে যাবে ততই তুমি উজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হবে। আমরা যত বেশি শ্রী গীতা দর্শনের সাথে সংযুক্ত হবো ততই এক ঐশ্বরিক গুণ, এক আনন্দের বিস্তার ঘটবে আমাদের জীবনে। আলাদা করে আর কোন আনন্দ খুঁজতে হবে না।

হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে সত্রের সমাপন হয়।