विवेचन सारांश
শ্রী কৃষ্ণের দুর্লভ রূপ দর্শন

ID: 5189
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 20 জুলাই 2024
অধ্যায় 11: বিশ্বরূপদর্শনযোগ
2/4 (শ্লোক 16-29)
ব্যাখ্যাকার: বরিষ্ঠ প্রশিক্ষক মাননীয়া শ্রদ্ধা রাও দেব মহাশয়া


বিবেচন সত্রর শুরুতে দেবদেবীর অর্চনা ও দীপ প্রজ্বলন করা হল। বিবেচনের বক্তা গুরু বন্দনা ও শ্রীকৃষ্ণ বন্দনা করে তার বিবেচন শুরু করলেন। প্রথমেই বললেন "গীতার একাদশ অধ্যায়টি খুবই আনন্দদায়ক অধ্যায়। আর এটি আমরা আলোচনা করতে চলেছি ঠিক গুরু পূর্ণিমার (ব্যাস পূর্ণিমা) আগের দিন। আগামীকাল আমরা নিজেদের গুরু দেবের পায়ে সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করব। এর সাথে মহাকবি বেদব্যাসের রচিত মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত গীতার আলোচনা করার আমাদের আজ সৌভাগ্য হয়েছে বলে খুবই কৃতার্থ বোধ করছি। মহাকবি বেদব্যাস অনেক শাস্ত্র রচনা করেছেন কিন্তু এই অধ্যায়টির সাথে সে সকল শাস্ত্রের কোন অধ্যায়েরই যেন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না, এটি একটি অপূর্ব অধ্যায় যেখানে শ্রীকৃষ্ণের জীবন্ত রূপ অর্জুন দিব্যদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করছেন। বক্তা বলছেন একদা জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছিলেন এই ব্রহ্মাণ্ডের মতো শত সহস্র ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে সৃষ্টি এগিয়ে চলেছে। অসংখ্য নক্ষত্র খচিত আকাশে দিকে তাকালে যেমন রাতের আঁধারে অগণিত নক্ষত্র চোখে পড়ে তেমনি অগন্য ব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টি লীলা চলেছে। মহাকবি বেদব্যাস তার রচনায় নানান অবতারের কথা বর্ণনা করেছেন, তার মধ্যে দশাবতার আছেন, বিষ্ণুর অসংখ্য অবতার আছেন তাই এই কৃষ্ণ অবতারের ছবিটি যখন আমরা পাই তখন সেটি একটি সাগরের বুদবুদ মাত্র। অবতারের লীলা গুলি যেন চেতন সাগরের এক একটি ঢেউ। বিশ্বরূপ দর্শন এর ঘটনাটি যখন আমরা পড়ি বা শুনি তখন সেটি আমাদের চেতনাকে নাড়া দিয়ে যায়। অর্জুন ভগবানের রূপ প্রত্যক্ষ করছেন দিব্যদৃষ্টিতে এবং তারই সাহায্যে আমরাও কিন্তু প্রত্যক্ষ করছি শ্রীভগবানের রূপটি। আমাদেরও দৃষ্টি খুলে যাচ্ছ। বুঝতে পারছি ভগবান তার, প্রিয় ভক্তকেই নিজের রূপ দর্শন করার সৌভাগ্য দিয়েছেন এর আগে নিজের বিভূতি ভগবান ভক্তের ভক্ত অর্জুন এর কাছে বিবৃত করেছেন। অনন্যা ভক্তি ছাড়া দর্শন লাভ যে অসম্ভব তাও যেন বুঝতে পারছি আমরা এই অধ্যায়টি পড়ে।

11.16

অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং(ম্),
পশ্য়ামি ত্বাং(ম্) সর্বতোऽনন্তরূপম্
নান্তং(ন্) ন মধ্য়ং(ন্) ন পুনস্তবাদিং(ম্),
পশ্য়ামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ॥16॥

হে বিশ্বপতি ! আপনার বহু বাহু, বহু উদর, বহু মুখ এবং বহু নেত্র বিশিষ্ট এবং সব দিকেই অনন্তরূপযুক্ত বিরাট মূর্তি দেখছি। হে বিশ্বরূপ ! আমি আপনার অন্ত, মধ্য এবং আদি দেখতে পাচ্ছি না।

অর্জুন দিব্যদৃষ্টি দিয়ে ভগবানের যে রূপ প্রত্যক্ষ করছেন তাই তিনি বলে চলেছেন। শ্রী ভগবানের দেব দেহে তিনি দেখছেন বহু হস্ত, বহু উদর, বহু মুখ গ্রথিত রয়েছে। সেই হস্ত, উদর ও মুখের সংখ্যা গণনা করা যায় না।তার সংখ্যা অসংখ্য এবং চারিদিকেই সন্নিবেশিত। সেই দৈব দেহ বিশালকায়। 
অর্জুন যেদিকেই দৃষ্টিপাত করছেন সেদিকেই দেখছেন তার এই অনন্ত রূপ প্রসারিত হয়ে রয়েছে। সে রূপের আদি খুঁজতে গিয়ে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না ,অন্ত বা শেষ খুঁজে পাচ্ছেন না কাজেই মধ্যবর্তী অংশ কিভাবে নিরূপণ করবেন? তাই তিনি বলছেন যে আদি অন্তহীন এই রূপ দেখে তিনি শুধু বিস্মিতই নয় তিনি এর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন না কোথায় তার সেই চিহ্ন গুলি যার দ্বারা তিনি সখা কে চিনে নিতেন। সুন্দর মুকুট শঙ্খ ধারী রূপের সন্ধান করছেন। অর্জুন সকল বিশ্বের অধিপতি যিনি সেই বিশ্বেশ্বর কে দেখতে চাইছেন। 

11.17

কিরীটিনং(ঙ্)গদিনং(ঞ্)চক্রিণং(ঞ্)চ,
তেজোরাশিং(ম্) সর্বতো দীপ্তিমন্তম্
পশ্য়ামি ত্বাং(ন্) দুর্নিরীক্ষ্য়ং(ম্) সমন্তাদ্-
দীপ্তানলার্কদ্য়ুতিমপ্রমেয়ম্॥17॥

আপনাকে আমি কিরীটি, গদা ও চক্রধারী, সর্বত্র দীপ্তিমান, তেজঃপুঞ্জরূপ, প্রজ্বলিত অগ্নি ও সূর্যের ন্যায় জ্যোতিসম্পন্ন, দুর্নিরীক্ষ্য এবং সর্বত্র অপ্রমেয়স্বরূপ দেখছি।

ভগবান ভক্তকে তাই তার সেই রূপ এইবার দেখাচ্ছেন! দৃষ্টি প্রসারিত করে অর্জুন দেখছেন মুকুট, শঙ্খ ,চক্রপাণি কৃষ্ণ ভগবান সর্বত্র যেন প্রজ্জ্বলিত অগ্নির মতো, অতি উজ্জ্বল আলোর মত সর্বদিকে ছড়িয়ে রয়েছেন। সেই আলোর দীপ্তি সহস্র সূর্যকেও হার মানায়, চারিদিকের সেই আলোর প্রখরতা অর্জুনের চোখ দুটিকে ধাঁধা লাগিয়ে দিচ্ছে। শুধু একটি সূর্য নয় চারিদিকে যেন বহু সূর্য উদিত হয়ে আলোক রাশি ছড়িয়ে দিচ্ছে। অর্জুন বুঝতে পারছেন কৃষ্ণ ভগবান শুধু তার সারথি বা সখা নয়। তিনি সকল আলোর উৎস। সকল সৃষ্টির কারণ ।আমরাও অর্জুনের চোখ দিয়ে পরম পিতা পরম পুরুষ এর সন্ধান লাভ করতে চলেছি। এই খানেই গীতা অধ্যয়নের সুফল।

11.18

ত্বমক্ষরং(ম্) পরমং(ম্) বেদিতব্য়ং(ন্),
ত্বমস্য় বিশ্বস্য় পরং(ন্) নিধানম্
ত্বমব্য়য়ঃ(শ্) শাশ্বতধর্মগোপ্তা,
সনাতনস্ত্বং(ম্) পুরুষো মতো মে॥18॥

আপনি পরম ব্রহ্ম ও একমাত্র জ্ঞাতব্য। আপনি জগতের পরম আশ্রয় ও সনাতন ধর্মের রক্ষক, আপনিই অবিনাশী সনাতন পুরুষ, এই আমার মত।

ভক্ত অর্জুন ভগবানের পায়ে নিজেকে নিবেদন করছেন এবং তার স্তুতি উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করে বলছেন কৃষ্ণ ভগবান অবিনশ্বর অর্থাৎ অক্ষরস্বরূপ। এই কথা আগেও অন্য অধ্যায়ে ভগবান নিজের সম্বন্ধে বলেছেন। ভগবানের বিশ্বরূপ দর্শন করে অর্জুন সেই তথ্যই প্রকাশ করছেন আরেকবার। বেদ আমাদের সর্ব জ্ঞানের আধার। এটি স্বয়ং ভগবানের মুখ থেকে উৎসারিত বাণী। কাজেই যা কিছু আমাদের জানার তা এই বেদেই বলা হয়েছে। জীবন পরিচালনার জন্য কি কর্তব্য তাও এই বেদে ই বলা আছে। বৈদিক সূত্র অনুসারে আমাদের ধর্ম জীবন গঠিত। অর্জুন উপলব্ধি করছেন কৃষ্ণ ভগবান আমাদের ধর্মের রক্ষক আর এই ধর্ম সনাতন অর্থাৎ অ তীর, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান, সর্বকালে এটি প্রযোজ্য। অর্জুন আরও প্রশংসা করে বলছেন কৃষ্ণ ভগবান শুধু ভক্ত নয় সকলের আশ্রয় স্বরূপ। এই প্রসঙ্গে বক্তা বললেন যে মনে রাখতে হবে আমাদের পরম লক্ষ্য এই ভগবানকে জানা। জীবনে প্রথমত আমরা জানি আমাদের চারিপাশকে তারপরে জানতে চেষ্টা করি নিজেকে এবং তারপরে চরম লক্ষ্য হলো শ্রী ভগবানকে জানা আর সেই ভগবানই হলেন কৃষ্ণ ভগবান যিনি তার স্বরূপ অর্জুনের সামনে প্রকাশ করে চলেছেন। গীতা অধ্যায়নের মাধ্যমে এই জীবনের লক্ষ্যকে অনুধাবনের চেষ্টা করে চলেছি, আমরাঅর্থাৎ পরম পিতা পরম পুরুষকে জানতে ইচ্ছা করে চলেছি। 

11.19

অনাদিমধ্য়ান্তমনন্তবীর্য়ম্,
অনন্তবাহুং(ম্) শশিসূর্য়নেত্রম্ |
পশ্য়ামি ত্বাং(ন্) দীপ্তহুতাশবক্ত্রং(ম্),
স্বতেজসা বিশ্বমিদং(ন্) তপন্তম্॥19॥

আপনাকে আমি আদি, মধ্য ও অন্তহীনরূপে দেখছি, আপনি অনন্ত শক্তিসম্পন্ন ও অসংখ্য বাহুবিশিষ্ট, চন্দ্র ও সূর্য আপনার নেত্র, মুখ প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় এবং স্বীয় তেজে এই বিশ্বকে আপনি সন্তপ্ত করছেন।

দশ দিক প্রখর তেজে দীপ্ত ভগবানের বিশাল কায় দেহে সহস্র বাহু ,শত সহস্র মুখ ,শত সহস্র উদার গ্রথিত দেখে অর্জুন বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে পড়েছেন। তিনি প্রশংসায় মুখর ভগবানের রূপ দেখে, কিন্তু এখন তিনি বলছেন তিনি শুধু বিস্ময়ে নয় তিনি ভয়ে কম্পিত হচ্ছেন কারণ ভগবানের মুখ অত্যন্ত প্রখর আলোকে দীপ্ত হয়ে উঠেছে তার দুটি নেত্র একটি মনে হচ্ছে সূর্য, একটি মনে হচ্ছে যেন চন্দ্র আর এই রূপের কোথাও শুরু বা শেষ বা মধ্য অংশ কিছুই তার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। দশ দিক পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে ভগবানের এই আদিমধ্য অন্তহীন রূপ দ্বারা। বক্তা বলছেন সূর্য চন্দ্র যেন ভগবানের দুটি নেত্র বলার অর্থ হলো ভগবান একাধারে দয়াময় করুণাময় ভালোবাসার আধার তাই তার একটি নেত্র চন্দ্রের মত স্নিগ্ধ আলোক বিচ্ছুরণ করছে। নঅপরদিকে ভগবান প্রখর রুদ্র রূপেরও ধারক সেই ভাব প্রকাশ করছে তার সূর্যের মতো আরেকটি নেত্র। অর্জুন দুই রূপে ভগবানের অর্চনা করে চলেছেন, বলছেন ভগবান যেন তার তেজ দিয়ে সকল বিশ্ব কে সম্যক ভাবে উত্তপ্ত করে চলেছেন। বিশ্ব বলতে বক্তা বলছেন শুধু এই ব্রহ্মাণ্ড নয় অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির মধ্যে যে রয়েছে সেগুলোর সবগুলিকে নিয়েই অর্জুন বিশ্ব বলছেন। যেহেতু আমদের কল্পনা সীমিত তাই বিশ্ব বলতে সাধারণ ভাবে এই পৃথিবীকে বুঝি।

11.20

দ্য়াবাপৃথিব্য়োরিদমন্তরং(ম্) হি ,
ব্য়াপ্তং(ন্) ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ
দৃষ্ট্বাদ্ভুতং(ম্) রূপমুগ্রং(ন্) তবেদং(ম্),
লোকত্রয়ং(ম্) প্রব্য়থিতং(ম্) মহাত্মন্॥20॥

হে মহাত্মন্ ! স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষ এবং সর্বদিক আপনি পরিব্যাপ্ত করে আছেন। আপনার এই অলৌকিক ও উগ্র রূপ দেখে ত্রিলোক অত্যন্ত ভীত হচ্ছে।

ভক্ত অর্জুন ভগবানের এইরূপে মুগ্ধ কিন্তু আবার ভীত চকিত হয়ে বলছেন তিনি যেন তার এই উগ্র রূপ সংবরণ করেন কারণ সকলেই এই রূপ দেখে ভয় পাচ্ছেন সকলেই বলতে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালবাসীদেরও বুঝিয়েছেন তিনি। 

11.21

অমী হি ত্বাং(ম্) সুরসঙ্ঘা বিশন্তি,
কেচিদ্ভীতাঃ(ফ্) প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি
স্বস্তীত্যুক্ত্বা হবে মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘা(স্),
স্তুবন্তি ত্বাং(ম্) স্তুতিভিঃ(ফ্) পুষ্কলাভিঃ॥21॥

ওই দেবগণ আপনাতেই প্রবিষ্ট হচ্ছেন । কেউ কেউ ভীত হয়ে করজোড়ে আপনার গুণগান করছেন এবং মহর্ষি ও সিদ্ধগণ ‘জগতের কল্যাণ হোক' বলে বহু স্তুতিবাক্য দ্বারা আপনার স্তব করছেন।

ভক্ত অর্জুন বিস্তারিত ভাবে ভগবানের বিশ্বরূপ বর্ণনা করে চলেছেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন স্বর্গবাসী দেব লোকের সকল দেব দেবী শত সহস্র উপাস্য দেবতা সবাই সেই বিশ্বরূপের মধ্যে গ্রথিত রয়েছেন তারা যেন একে একে সেই রূপের মধ্যে প্রবেশ করছেন শুধু দেবদেবী নয় শত সহস্র সিদ্ধ পুরুষ সত্যদ্রষ্টা ঋষি মহর্ষি একে একে সেই রূপের মধ্যে প্রবেশ করছেন কেউবা কর জোরে ভগবানের স্তুতি গান করছেন কেউবা ভগবানের প্রসন্নতা কামনা করছেন। এই রূপ সকল দিকে মাটি থেকে শুরু করে অন্তরীক্ষ পর্যন্ত ব্যপ্ত রয়েছে। মহর্ষিগণ সকলের মঙ্গল হোক এই কামনা করে চলেছেন। অর্জুন উপলব্ধি করছেন শুধুমাত্র বিশ্বরূপের ধারক ভগবান এবং অর্জুনের অর্থাৎ নিজের অস্তিত্ব যেন সেখানে বিদ্যমান রয়েছে। 

11.22

রুদ্রাদিত্য়া বসবো য়ে চ সাধ্য়া-
বিশ্বেSশ্বিনৌ মরুতশ্চোষ্মপাশ্চ
গন্ধর্বয়ক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা ,
বীক্ষন্তে ত্বাং(ম্) বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে ॥22॥

একাদশ রুদ্র ও দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, সাধ্যগণ, বিশ্বদেবগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মরুদ্গণ, পিতৃগণ এবং গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস ও সিদ্ধগণ সকলেই বিস্মিত হয়ে আপনাকে দেখছেন।

অর্জুন দেখছেন একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য ,অষ্ট বসু, অশ্বিনী কুমার দুইজন সকল পিতৃ পুরুষগণ মরুৎ, যক্ষ রাক্ষস, দেব দেবী কেউ বাকি নেই। সবাই সেই বিশ্বরূপের মধ্যে যেন নিহিত রয়েছেন।অপার বিস্ময়ে তারা এই বিশ্ব রূপ দেখছেন। গন্ধর্ব গণ আর বহু সিদ্ধ পুরুষগণ রয়েছেন এদের মধ্যে। 

11.23

রূপং(ম্) মহত্তে বহুবক্ত্রনেত্রং(ম্),
মহাবাহো বহুবাহূরুপাদম্
বহূদরং(ম্) বহুদংষ্ট্রাকরালং(ন্),
দৃষ্ট্বা লোকাঃ(ফ্) প্রব্য়থিতাস্তথাহম্॥23॥

হে মহাবাহো ! আপনার বহু মুখ, বহু চক্ষু, বহু বাহু, বহু উরু, বহু চরণ, বহু উদর এবং ভয়ানক দন্তযুক্ত বিকট রূপ দেখে সমস্ত লোক অত্যন্ত ভীত হচ্ছে এবং আমিও অতিশয় ভীত হচ্ছি।

এইবার অর্জুন স্বীকার করছেন ভগবানের এই বিশ্বরূপ দেখে তিনি ভীত হয়েছেন। ভগবানের বহু মুখ, বহু উদার, বহু জঙ্ঘা, বহু পদ দেখে, বিরাট বিশালকায় দেহ ভয়ংকর বিকট এক একটি দন্তযুক্ত মুখ দেখে তিনি ভয়ে ভীত। তিনি শুধু নন যারা এ রূপ দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তারা সবাই ভীত হয়েছেন। 

11.24

নভঃস্পৃশং(ন্) দীপ্তমনেকবর্ণং(ম্)
ব্য়াত্তাননং(ন্)দীপ্তবিশালনেত্রম্
দৃষ্ট্বা হি ত্বাং(ম্)প্রব্য়থিতান্তরাত্মা ,
ধৃতিং(ন্) ন বিন্দামি শমং(ঞ্) চ বিষ্ণো॥24॥

কারণ হে বিষ্ণো ! আকাশস্পর্শকারী, তেজোময়, নানাবর্ণবিশিষ্ট, বিস্ফারিত মুখমণ্ডল তথা জাজ্বল্যমান বিশাল চক্ষুবিশিষ্ট আপনাকে দেখে আমি ভীত হচ্ছি এবং ধৈর্য ও শান্তি পাচ্ছি না।

অর্জুন বলছেন আকাশ স্পর্শ করছে এমনই বিশ্ব রূপ নানান রঙের ছটায় দীপ্তিময়। বিশাল মুখে তেজোদ্দীপ্ত বিরাট নয়ন দুটি অর্জুনকে শান্তি দিতে পারছে না, তার যেন ধৈর্য্য চ্যুতি ঘটছে তার মন বিষন্ন হয়ে পড়ছে। এই ভীতি, এই বিষণ্ণতা, এই ধৈর্যচ্যুতির কারণ পরবর্তী শ্লোকে অর্জুন বিশদভাবে বলছেন। 

11.25

দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি,
দৃষ্ট্বৈব কালানলসন্নিভানি হবে
দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম,
প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস॥25॥

বিকট দন্তদ্বারা বিকৃত এবং প্রলয়াগ্নিসম প্রজ্বলিত আপনার মুখ দেখে আমি দিশাহারা হচ্ছি, শান্তি পাচ্ছিনা। হে দেবেশ ! হে জগন্নিবাস ! আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হোন।

ভগবানের বিকৃত ভয়ংকর মুখমণ্ডল যার মধ্যে বিকট দন্ত গুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলি দেখে অর্জুনের মনে হচ্ছে তার সেই ভালোবাসার ধন সখা কৃষ্ণ তার ওপর বিরক্ত হয়ে, ক্রোধযুক্ত হয়ে এই ভয়ংকর রূপ দেখাচ্ছেন। তার মন কিছুতেই তাই স্বস্তি পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন চারিদিকে প্রলয়ের অগ্নি জ্বলছে আর অর্জুন চারিদিকে মৃত্যুর কুরাল রূপ এই বিশ্ব রূপের মধ্যেই যেন মিশে রয়েছে বলে মনে করছেন। মনে ধৈর্য, শান্তি, স্বস্তি কিছু ধরে রাখতে পারছেন না। তাই ব্যাকুল হয়ে নানা নামে ভগবানকে সম্বোধন করে বারবার বলছেন তিনি যেন প্রসন্ন হন।

11.26

অমী চ ত্বাং(ন্) ধৃতরাষ্ট্রস্য় পুত্রাঃ(স্),
সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ
ভীষ্মো দ্রোণঃ(স্) সূতপুত্রস্তথাসৌ
সহাস্মদীয়ৈরপি য়োধমুখৈঃ॥26॥

রাজন্যবর্গসহ ঐসব ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ এবং পিতামহ ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ এবং আমাদের পক্ষের প্রধান যোদ্ধাগণসহ সকলেই....

অর্জুন লক্ষ্য করছেন ধৃতরাষ্ট্র আর তার পুত্রেরা, কৌরবপক্ষের অন্যান্য রাজন্যবর্গ, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ তার পক্ষের অন্যান্য যোদ্ধাগন যেন সবাই সবেগে সেই ভয়ংকর মুখমণ্ডল অভিমুখে চলে তারই ভিতর প্রবেশ করছে। এই দৃশ্য অর্জুন আর সহ্য করতে পারছেন না যদিও তিনি অসম সাহসী যোদ্ধা। এই দৃশ্য তার পক্ষে ভীষণ বলে বোধ হচ্ছে।

11.27

বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি,
দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি হবে
কেচিদ্বিলগ্না দশনান্তরেষু,
সন্দৃশ্যন্তে হবে চূর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ॥27॥

...আপনার দংষ্ট্রাকরাল ভীষণ মুখগহ্বরে সবেগে প্রবেশ করছেন। কারও চূর্ণিত মস্তক খণ্ড আপনার দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে লেগে রয়েছে দেখছি। 

অর্জুন আরো লক্ষ করছেন এই প্রাণী গণ কৃষ্ণ ভগবানের মুখগহ্বরে প্রবেশ করলে বিকট দাঁতের দ্বারা এদের মস্তক গুলি চুর্নিত হয়ে যাচ্ছে। এইসব দেহ ধারীদের মাংস কণা গুলো দাঁতের ফাঁকে, ফাঁকে আটকে রয়েছে। এই ভয়ানক দৃশ্য অর্জুনকে ভগবান কেন দেখাচ্ছেন সে বিষয়ে অর্জুনের মনে ভয়ানক অশান্তি হচ্ছে।

11.28

য়থা নদীনাং(ম্) বহবোऽম্বুবেগাঃ(স্),
সমুদ্রমেবাভিমুখা দ্রবন্তি
তথা তবামী নরলোকবীরা,
বিশন্তি বক্ত্রাণ্য়ভিবিজ্বলন্তি॥28॥

যেমন নদীসমূহের বহু জলপ্রবাহ সমুদ্রাভিমুখে যায় অর্থাৎ দ্রুতবেগে সমুদ্রে প্রবেশ করে, তেমনই এই বীরপুরুষগণও আপনার প্রজ্বলিত মুখবিবরে প্রবেশ করছেন।

অর্জুনের মনে হচ্ছে যেমন করে নদী সমূহ তীব্র বেগে সমুদ্রের দিকে চলে তেমনি যোদ্ধসহ ভীষ্মদেব, দ্রোণাচার্য সবাই তীব্র বেগে ভয়ানক মুখমণ্ডলে প্রবেশ করে মৃত্যুবরণ করছেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে যাদের তিনি আত্মীয় স্বজন ভেবে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে চাইছিলেন না, তাদের চোখের সামনে বধ হতে দেখছেন। কাজেই এদের মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী হতে পারেন না এই উপলব্ধি তার মনে উদয় হচ্ছে। আমরা বুঝতে পারি ভগবান ভক্ত মনে এই বোধ জাগরণের জন্যই আপন দুর্লভ রূপ দেখাচ্ছেন।

11.29

য়থা প্রদীপ্তং(ঞ্) জ্বলনং(ম্) পতঙ্গা হবে ,
বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ
তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকা:(স্),
তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ॥29॥

যেমন পতঙ্গগণ অতিবেগে ধাবিত হয়ে মরণের জন্য জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করে, তেমনি এইসব লোকও মৃত্যুর জন্যই অতিবেগে ধাবমান হয়ে আপনার মুখগহ্বরে প্রবেশ করছেন।

অর্জুনের আরো মনে হচ্ছে পতঙ্গ যেমন আগুনের মধ্যে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে নিজেদের বিনাশ ডেকে আনে তেমনি এই সকল প্রাণী গন যারা যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে তারাও তেমনি সবেগে কৃষ্ণ ভগবানের মুখ গহ্বরে প্রবেশ করে মৃত্যুবরণ করছেন। ভগবান মৃত্যুর নিয়ন্ত্রক। এই বোধ অর্জুনের মধ্যে যেন উদয় হতে চলেছে।