विवेचन सारांश
অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন
একাদশ অধ্যায়ের নাম " বিশ্বরূপ দর্শন যোগ " বা ভগবানের অলৌকিক ঐশ্বরিক রূপ। দশম অধ্যায়ে অর্থাৎ বিভূতি যোগে ভগবান নিজের বিরাশীটি বিভূতির কথা জানিয়েছেন। বিভূতি যোগ হল ভগবানের অনন্ত ঐশ্বর্য, মহিমা ও গুণের বর্ণনা। দশম অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে ভগবান বলেছেন --
বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ ।।
অর্থাৎ " হে অর্জুন, তোমার এই বহুবিধ বিভূতি জানার কী প্রয়োজন? আমি নিজের একাংশ মাত্র দিয়ে জগৎকে ধারণ করে অবস্থান করছি অর্থাৎ আমার মাত্র কোন একাংশেই অনন্ত ব্রহ্ম অবস্থান করছে।"
বিভিন্ন প্রকার বিভূতির কথা শুনে ভগবানের ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত বিশ্বরূপ স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছা অর্জুনের হয়েছিল। অর্জুনও বুঝতে পেরেছিলেন এতদিন ধরে তিনি যে কৃষ্ণকে জানতেন, তা তাঁর সত্ত্বার মাত্র এক অংশ। আসলে তিনিই অসীমের মতো অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে আছেন। তিনি যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের সেই ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করতে চেয়েছিলেন।
এই একাদশ অধ্যায়ে ভগবান তাঁর মহাজাগতিক রূপ অর্জুনের সামনে প্রকাশ করেছেন। এই অধ্যায়েই আমরা দেখবো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সেই অকল্পনীয় রূপ দর্শন করার জন্য অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেছেন ।
যদিও আপাতদৃষ্টিতে অর্জুনের এই ইচ্ছা সাধারণ বলে মনে হয়, কিন্তু অতীতে ভগবানের ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করার ইচ্ছা কোন ভক্তের হৃদয়ে জাগৃত হয়নি। ভগবান তাঁর প্রিয় শিষ্য এবং সখা অর্জুনের ইচ্ছাপূরণের জন্য নিজের যে ঐশ্বরিকরূপ দেখিয়েছিলেন সেটিই এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়।
11.1
অর্জুন উবাচ
মদনুগ্রহায় পরমং(ঙ্), গুহ্য়মধ্য়াত্মসংজ্ঞিতম্
য়ত্ত্বয়োক্তং(ম্) বচস্তেন, মোহোऽয়ং(ম্) বিগতো মম॥1॥
যেমন আলোর স্পর্শে অন্ধকার দূর হয়ে যায় -- তেমনই অর্জুনের মোহ বিদূরিত হয়েছে । অর্জুনের মোহ কীভাবে নাশ হল, তা তিনি পরবর্তী শ্লোকে বিস্তারিত ভাবে জানিয়েছেন।
ভবাপ্য়য়ৌ হি ভূতানাং(ম্),শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া
ত্বত্তঃ(খ্) কমলপত্রাক্ষ , মাহাত্ম্য়মপি চাব্যয়ম্॥2॥
ভগবান দশম অধ্যায়ে এও বলেছিলেন যে, যাঁরা ভগবানের বিভূতি ও যোগ তত্ত্বতঃ জানেন, তাঁরা অবিচল ভক্তিযুক্ত হয়ে থাকেন। ভগবানের বিভূতি ও যোগের তত্ত্বতঃ জানার মাহাত্ম্যের কথা অর্জুন এখানে উল্লেখ করেছেন। ভগবানের এই মাহাত্ম্যকে অব্যয় অর্থাৎ অবিনাশী বলার অর্থ হল এই যে ভগবানের বিভূতি এবং যোগ তত্ত্বতঃ জানলে ভগবানের প্রতি যে ভক্তি ও প্রেম হয়, ভগবানে যে অভিন্নতা হয়, তা সবই অব্যয়। কারণ ভগবান যেহেতু অব্যয় এবং নিত্য, তাঁর প্রেম ও ভক্তিও অবিনাশী।
পরবর্তী দুটি শ্লোকে অর্জুন ঐশ্বরিকরূপ দর্শন করাবার জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা জানিয়েছেন।
এবমেতদ্য়থাত্থ ত্বম্, আত্মানং(ম্) পরমেশ্বর
দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপং(ম্), ঐশ্বরং(ম্) পুরুষোত্তম॥3॥
দশম অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোকে অর্জুন ভগবানকে তাঁর সমস্ত বিভূতির বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ভগবান বিভূতিগুলোর বর্ণনা করে শেষে বলেছিলেন যে তাঁর বিভূতির কোন অন্ত নেই এবং সেইজন্য তিনি সংক্ষেপে বিভূতিসমূহের বর্ণনা করেছেন। ভগবানের এই কথায় অর্জুন ভেবেছিলেন যে তিনি যতটা চেয়েছিলেন, ততটার যোগ্যতা হয়তো তাঁর নেই এবং সেজন্য হয়ত ভগবান তাঁর বিভূতির বর্ণনা সংক্ষেপে করেছেন। তাই পরবতী শ্লোকে অর্জুন সসঙ্কোচে ভগবানকে বলেছেন ---
মন্য়সে য়দি তচ্ছক্য়ং(ম্), ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো
য়োগেশ্বর ততো মে ত্বং(ন্),দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্॥4॥
উদাহরণ হিসেবে একটা ছোট গল্প বলা যায়। একটা চশমার দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল পড়ার জন্য চশমা পাওয়া যায়। একজন বয়স্ক মানুষ সেই দোকানে এলেন। দোকানদার তাকে একটা চশমা পরিয়ে কিছু পড়তে দিলেন। কিন্তু সেই মানুষ টি পড়তে পারলেন না। দোকানদার বিভিন্ন পাওয়ারের চশমা পরিয়েও দেখা গেল তিনি লেখা পড়তে পারেন না। শেষে জানা গেল যে তিনি অক্ষরই চেনেন না।
বহু মানুষের বিভিন্ন রকমের পেশার প্রতি আগ্রহ থাকে -- কিন্তু সেই পেশার যোগ্য না হলে তবে সেই আগ্রহ নিরর্থক। নিজের নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী ইচ্ছা প্রকাশ করা উচিৎ।
এখানে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে যোগেশ্বর নামে অভিহিত করেছেন -- অর্থাৎ, সমস্ত যোগের যিনি গুরু বা ঈশ্বর । এই নাম দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন -- যিনি সর্বব্যাপী ও ক্ষমাশীল । ভগবান যে পাপীদের বারবার ক্ষমা করেছেন এরকম উদাহরণ আছে । পুতনা, কংসের মতো হিংস্রদের ও মুক্তি প্রদান করেছেন শ্রীকৃষ্ণ ... যারা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল।
এই কথা টা সবাই জানে ---
यत् कृपा तमहं वंदे परमानंद माधवम्
অর্থাৎ ভগবানের কৃপায় বোবা মানুষও কথা বলতে পারে এবং পঙ্গু মানুষও পাহাড় চূড়ায় পৌঁছে যায়।
এখানে অর্জুন অতি বিনয়ের সাথে ভগবানের কাছে অনুরোধ করেছেন যে, যদি তিনি মনে করেন অর্জুন সেই রূপ দর্শনের যোগ্য, তাহলে তিনি যেন তাঁর বিশ্বরূপ অর্জুনকে দর্শন করান। অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে গভীর এক বন্ধুত্বপূর্ণ ভালবাসা ছিল। পরমেশ্বর হয়েও মানবরূপধারী শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ মানুষের মতোই ব্যবহার করতেন। তিনি কখনো নিজের দেবত্বভাব অর্জুনের সামনে প্রকাশ করেননি। অর্জুন ও তাঁকে নিজের প্রিয় সখা বলেই জানতেন । কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেছেন যে তাঁর সখা শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ মানুষ নন। তাঁর দৈব গুণ সম্বন্ধে অর্জুন সচেতন হয়ে উঠেছেন।
মহাভারতের "খাণ্ডবদহন " খুব প্রসিদ্ধ অংশ । এই পর্বের শেষে অগ্নিদেব এবং দেবরাজ ইন্দ্র -- অর্জুন ও কৃষ্ণের সামনে আবির্ভূত হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেছিলেন । ক্ষত্রিয় অর্জুন মহান অস্ত্রশস্ত্র প্রাপ্ত করার বর চাইলেন এবং শক্তিশালী অস্ত্রের সাথে কপিধ্বজ নামক রথও প্রাপ্ত করলেন । আর শ্রীকৃষ্ণ... স্বয়ং ভগবান হয়েও ইন্দ্রদেব ও অগ্নিদেবের কাছে প্রার্থনা করলেন অর্জুনের সাথে আজীবনের বন্ধুত্ব। এইরকম অতুলনীয়, দুর্লভ বন্ধুত্ব তাঁদের মধ্যে ছিল । অর্জুনের নিষ্পাপ ও পবিত্র হৃদয়, সহানুভূতিশীল মন... এসবই তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল। গীতায় অনেক জায়গায় ভগবান অর্জুনকে অনঘ অর্থাৎ নিষ্পাপ বলে সম্বোধন করেছেন।
অর্জুনের মতো যারা পবিত্র ও নিষ্পাপ, ভগবান তাদেরও পছন্দ করেন। আমরা সবাই জ্ঞানী হতে চাই, ঈশ্বরের ভক্ত হতে চাই -- কিন্তু নিজেকে পরিশুদ্ধতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাই না। আমরা সবাই ভগবদ্গীতা পড়ছি --- জীবনকে শিল্পে পরিণত করার উপায় গীতাই আমাদের শেখায় । আমাদের উচিত গীতা কে আত্মস্থ করে অর্জুনের মতো শুদ্ধ হয়ে ওঠা( অনঘ) । গীতার মাধ্যমে ভগবান অর্জুনরূপ সমগ্র মানবজাতিকে উপদেশ প্রদান করেছেন।
অর্জুন ভগবানের কাছে তাঁর ঐশ্বরিক রূপ দেখাবার জন্য প্রার্থনা জানিয়েছিলেন এবং তাঁর নিজের যোগ্যতা যাচাই করার বিষয়টি ভগবানের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। অর্জুনের এই বিনীত অনুরোধ শুনে ভগবান পরবর্তী শ্লোকে বলেছেন --
শ্রীভগবানুবাচ
পশ্য় মে পার্থ রূপাণি ,শতশোऽথ সহস্রশঃ
নানাবিধানি দিব্য়ানি, নানাবর্ণাকৃতীনি চ॥5॥
পৃথিবীর ছোট একটি কণাও যেমন পৃথিবী, তেমনই জগৎও ভগবানের অনন্ত,অপার বিশ্বরূপের একটি ক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু তা সকলের কাছে দিব্য বিশ্বরূপে প্রকটিত নয়, তা জগৎরূপেই প্রকাশিত। কারণ মানুষের লক্ষ্য পরমাত্মার দিকে না গিয়ে বিনাশশীল জগতের দিকেই থাকে। যেমন অবতাররূপে এই ধরাধামে আবির্ভাব হলেও ভগবান সকলের কাছে ভগবদ্-রূপে প্রকটিত হন না, বরং মনুষ্যরূপেই প্রকটিত হয়ে থাকেন, তেমনই বিশ্বরূপী ভগবান সকলের কাছে জগৎসংসার রূপেই প্রকটিত থাকেন। কিন্তু এখানে ভগবান তাঁর দিব্য অবিনাশী বিশ্বরূপে প্রত্যক্ষ প্রকটিত হয়ে অর্জুনকে তাঁর দিব্যরূপসমূহ দর্শন করার উপদেশ দিয়েছেন।
এই শ্লোকে ভগবান তাঁর বিশ্বরূপে নানাপ্রকার বর্ণ এবং আকৃতির দেখার কথা বলেছেন। পরবর্তী শ্লোকে দেবতাদের দেখার কথা বলেছেন।
পশ্য়াদিত্য়ান্বসূন্রুদান্ , অশ্বিনৌ মরুতস্তথা
বহূন্য়দৃষ্টপূর্বাণি ,পশ্য়াশ্চর্য়াণি ভারত॥6॥
অর্জুনও একজন যথেষ্ট অভিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি স্বর্গলোক ভ্রমণ করে এসেছেন, নাগলোকও তাঁর দেখা হয়ে গেছে। পাতাল লোকের কথা তিনি তাঁর দাদা ভীমের কাছে শুনেছেন। সেই ভূয়োদর্শী অর্জুনের সামনে শ্রীভগবান তাঁর অসীম, অনন্ত রূপ প্রকাশ করলেন।
ইহৈকস্থং(ঞ্) জগত্কৃত্স্নং(ম্),পশ্য়াদ্য় সচরাচরম্।
মম দেহে গুডাকেশ , য়চ্চান্য়দ্দ্রষ্টুমিচ্ছসি॥7॥
"পশ্য" শব্দের অর্থ হল--- দেখা। উপরোক্ত তিনটি শ্লোকে চারবার 'পশ্য' পদ দ্বারা তাঁর রূপ দর্শনের জন্য অর্জুনকে বলেছেন। সেই অনুযায়ী অর্জুন বিস্ফোরিত চক্ষে ভগবানের অলৌকিক রূপ দর্শনের যদিও চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পারছিলেন না। তাই ভগবান পরবর্তী শ্লোকে অর্জুনের দেখতে না পাওয়ার কারণ জানিয়ে বলেছেন ---
ন তু মাং(ম্) শক্য়সে দ্রষ্টুম্, অনেনৈব স্বচক্ষুষা
দিব্য়ং(ন্) দদামি তে চক্ষুঃ(ফ্), পশ্য় মে য়োগমৈশ্বরম॥8॥
সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ক্ষমতা সীমিত। কোন বিশেষ কাজ করতে গেলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। চশমা পরে নিলেই পড়তে পারেন সেটা যে নিরক্ষরের জন্য নয়... এই গল্পটা আগেই বলা হয়েছে।
মহর্ষি বেদব্যাসের কৃপায় সঞ্জয় আগেই দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন। সুতরাং তিনি মহাভারতের যুদ্ধের সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন এবং তা অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু অর্জুন ও সঞ্জয়ের এই দিব্যরূপ দর্শনের মধ্যে পার্থক্য হলো ... একজনের মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখা এবং অন্যজন টেলিকাস্টে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছেন... এইরকম। মাঠে বসে ম্যাচ দেখলে ৩৬০° ই ঘুরে দেখা সম্ভব কিন্তু টেলিকাস্টে শুধু ক্যামেরা যেটুকু দেখাবে সেটুকুই দেখা সম্ভব।
সঞ্জয় এই অত্যাশ্চর্য রূপকে কিভাবে দেখেছেন তা পরের শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে।
সংজয় উবাচ
এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ ,মহায়োগেশ্বরো হরিঃ
দর্শয়ামাস পার্থায় ,পরমং(ম্) রূপমৈশ্বরম্॥9॥
পরবর্তী দুটি শ্লোকে সঞ্জয় ভগবানের পরম ঐশ্বরিকরূপ বর্ণনা করেছেন।
অনেকবক্ত্রনয়নম্ ,অনেকাদ্ভুতদর্শনম্
অনেকদিব্য়াভরণং(ন্), দিব্য়ানেকোদ্য়তায়ুধম্॥10॥
দিব্য়মাল্য়াম্বরধরং(ন্),দিব্য়গন্ধানুলেপনম্
সর্বাশ্চর্য়ময়ং(ন্) দেবম্, অনন্তং(ম্) বিশ্বতোমুখম॥11॥
'অনেকবক্ত্রনয়নম্' --- ভগবানের এই বিরাটরূপে প্রকাশিত যতগুলো মুখ ও চোখ দেখা যাচ্ছিল, তা সবই দিব্য। বিরাটরূপে যত প্রাণী দেখা যাচ্ছিল তাদের মুখ, চোখ,নাক, হাত,পা অর্থাৎ সর্বঅঙ্গই বিরাটরূপ ভগবানের। কারণ তিনি স্বয়ং বিরাটরূপে প্রকটিত হয়েছেন।
'অনেকাদ্ভুতদর্শনম্' --- ভগবানের বিরাটরূপে যত রূপ,আকৃতি, বর্ণ এবং সাজ-দেখা যাচ্ছিল, তা সবই অতি অদ্ভুৎ দেখাচ্ছিল।
'অনেকদিব্যাভরণম্' --- বিরাটরূপে দেখতে পাওয়া নানা অঙ্গে যত গহনাদি ছিল তা সবই দিব্য।
'দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্' --- বিরাটরূপ ভগবান তাঁর হাতে নানাপ্রকার আযুধ ধারণ করেছিলেন,তা সবই দিব্য।
'দিব্যমাল্যাম্বরধরম্' --- বিরাটরূপ ভগবান তাঁর গলায় ফুলের, সোনার,রুপোর ইত্যাদি নানাপ্রকার যেসব মালা ধারণ করেছিলেন,সেগুলো সব দিব্য। তিনি নানা রঙের যেসব বস্ত্র পরিধান করেছিলেন, সেগুলোও সব দিব্যবস্ত্র।
'দিব্যগন্ধানুলেপনম্' ---বিরাটরূপ ভগবান তাঁর ললাটে কস্তুরী,চন্দন,কুমকুম ইত্যাদি যেসব তিলক ধারণ করেছিলেন এবং শরীরে যত সুগন্ধ লেপন করেছিলেন, তা সবই দিব্য।
'সর্বাশ্চর্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বতোমুখম্' --- এইপ্রকার আশ্চর্যময় অনন্তরূপশালী এবং চতুষ্পার্শে মুখবিশিষ্ট পরম ঐশ্বর্যময় নিজরূপ ভগবান অর্জুনকে দেখালেন।
দিবি সূর্য়সহস্রস্য় ,ভবেদ্য়ুগপদুত্থিতা
য়দি ভাঃ(স্) সদৃশী সা স্য়াদ্, ভাসস্তস্য় মহাত্মনঃ॥12॥
পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১২ নম্বর শ্লোকে ভগবান স্বয়ং বলেছেন ---
য়চ্চন্দ্রমসি য়চ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্ ।।
অর্থাৎ সূর্যের যে তেজ জগৎকে উদ্ভাসিত করে এবং যে তেজ চন্দ্রমা ও অগ্নিতে আছে , তা সবই ভগবানেরই তেজ।
সহস্রাধিক সূর্যের প্রভা একত্রে মিলিত হলেও ভগবানের প্রভার সমকক্ষ হতে পারে না, কারণ সূর্যের প্রভা ভগবানের প্রভা থেকেই উৎসারিত।
ডঃ ওপেনহেইমার, একজন আমেরিকান পদার্থবিদ, যাঁকে অ্যাটম-বোমার জনক বলা হয়। তিনি ভগবদ্গীতার অনুরাগী ছিলেন। পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে যে উজ্জ্বল আলো উদ্ভাসিত হয়েছিল, তার বর্ণনা করার সময় তিনি এই শ্লোকটি উল্লেখ করে সেই বিশাল আলোকরশ্মিকে জ্বলন্ত সূর্যের সাথে তুলনা করেছিলেন।
ভগবানের ঐশ্বরিকরূপ এবং তাঁর প্রভার বর্ণনা করার পর সঞ্জয় এবার অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের কথা বলেছেন।
তত্রৈকস্থং(ঞ্)জগত্কৃত্স্নং(ম্), প্রবিভক্তমনেকধা
অপশ্য়দ্দেবদেবস্য় ,শরীরে পান্ডবস্তদা॥13॥
ভগবানের অলৌকিক বিশ্বরূপ দেখে অর্জুনের কী অবস্থা হয়েছিল --- পরবর্তী শ্লোকে সঞ্জয় সেটি বর্ণনা করেছেন।
ততঃ(স্) স বিস্ময়াবিষ্টো, হৃষ্টরোমা ধনংজয়ঃ
প্রণম্য় শিরসা দেবং(ঙ্), কৃতাঞ্জলিরভাষত॥14॥
অর্জুন উবাচ
পশ্য়ামি দেবাংস্তব দেব দেহে ,
সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসংঘান্
ব্রহ্মাণমীশং(ঙ্) কমলাসনস্থম্,
ঋষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্॥15॥
বিস্ময়াবিষ্ট অর্জুন দ্বারা ভগবানের এই অলৌকিক বিশ্বরূপের আরও বর্ণনা পরবর্তী সত্রের আলোচ্য বিষয়, এই বলে আজকের বিবেচন সত্র এখানেই শেষ হয় এবং তারপর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়।
প্রশ্নকর্ত্রী: শ্রীমতী নীতু গিরী দিদি
প্রশ্ন: আমার ছেলে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র কিন্তু মোবাইল এবং বন্ধু-বান্ধবের নেশায় তার মন অত্যন্ত চঞ্চল। পড়াশুনায় নিজের সময়কে সদুপযোগ করছে না। ছেলের এসব কার্যকলাপে আমি অত্যন্ত চিন্তিত। এই পরিবেশের সাথে শান্ত মনে নিজেকে মানিয়ে নেবার উপায় কী ?
উত্তর: সাধারণত এটা দেখা যায় যে অভিভাবকরা নিজেদের মানসিক চাপ ও উদ্বিগ্নতা সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেয়। আপনার ক্ষেত্রে এটি ভাল লক্ষণ যে সমস্যাটি আপনি বুঝতে পেরেছেন। এটা মনে রাখতে হবে যে আপনার ছেলে একজন স্কুলের ছাত্র যার মধ্যে চঞ্চলতা, ছেলেমানুষী ভাব থাকা স্বাভাবিক। আমাদের মানসিক চাপ বা উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি হলে আমরা আমাদের সমস্যার সমাধানের জন্য একজন শান্তস্বভাবের কোন বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তির কাছে সেটি প্রকাশ করি। হয়ত এমনও হতে পারে যে আপনার ছেলে স্বয়ং নিজে পড়াশুনা নিয়ে মানসিক চাপে আছে। সর্বদা ওর দোষ না দেখে, অন্যের সাথে তুলনা না করে ওর সাথে বন্ধুর মত ব্যবহার করুন। সর্বদা উপদেশ না দিয়ে ওর সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করুন। এভাবে সম্পর্ক যখন সহজ হবে তখন ও তার মানসিক উদ্বিগ্নতার সমাধানের জন্য সবকিছু আপনার সাথে বন্ধুর মত আলোচনা করবে। শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে নিজে নিজেই সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবেন।
প্রশ্নকর্তা: শ্রী এম বি কৌশিক দাদা
প্রশ্ন: বিরাটরূপ এবং বিশ্বরূপের পার্থক্য কী ?
উত্তর: বিরাটরূপ বিশ্বরূপের একটি ক্ষুদ্র অংশ। বিরাটরূপ বিশাল হলেও সসীম কিন্তু বিশ্বরূপ হচ্ছে অসীম।
প্রশ্ন: পরমাত্মা যদি আজন্মা অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুরহিত, তাহলে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এবং মৃত্যু কেন হয়েছিল?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার অবতার রূপে ধরাধামে আবির্ভাব হয়েছিলেন। পরমাত্মা যখন অবতাররূপে মনুষ্যদেহ ধারণ করেন, তখন তাঁর ক্রিয়া-কলাপ সবই সাধারণ মানুষের ন্যায় হয়। পরমাত্মা ত্রিগুণাতীত, তিনি জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ নন। অবতারের লীলা শেষ হলে তিনি এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করে বৈকুন্ঠধামে চলে যান। সাধারণ মানুষ চর্মচক্ষুর দ্বারা অবতারের প্রকৃত রূপ দেখতে পায় না। তাই তাঁর আবির্ভাবকে জন্ম এবং তাঁর নশ্বর দেহত্যাগকে মৃত্যু বলে মেনে নেয় ।
প্রশ্ন: মাতা যশোদাকে শৈশবকালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মুখের ভিতর যা দর্শন করিয়েছিলেন, সেই রূপের নাম কী ?
উত্তর: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাল্যলীলায় নিজের মুখের ভিতরে মা যশোদাকে ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করিয়েছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে কথিত আছে যে, মা যশোদা একদিন জানতে পারেন যে শিশু কৃষ্ণ মাটি খেয়েছে। তিনি সেই কথা জিজ্ঞাসা করে তাঁর আদরের কৃষ্ণকে হাঁ করতে বলেছিলেন। শিশু কৃষ্ণ হাঁ করলে মা যশোদা কৃষ্ণের ছোট মুখগহ্বরে সম্পূর্ণ জগৎ, নন্দগ্রাম,নন্দভবন, শিশু কৃষ্ণ এবং স্বয়ং নিজেকে দেখলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পেরেছিলেন যে মা যশোদা এরপর তাঁকে ঈশ্বররূপে পূজো করবেন এবং মা যশোদার বাৎসল্য প্রেম থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন। তাই ভগবানের লীলায় এই দৃশ্য দেখার পর মা যশোদা মূর্ছিত হয়েছিলেন এবং চেতনা ফিরে আসলে তাঁর স্মৃতিপট থেকে এই ঘটনা ভগবান মুছে দিয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলায় এই রূপদর্শনের কোন নামাকরণ পাওয়া যায়নি।