विवेचन सारांश
অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন

ID: 5192
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 13 জুলাই 2024
অধ্যায় 11: বিশ্বরূপদর্শনযোগ
1/4 (শ্লোক 1-15)
ব্যাখ্যাকার: বরিষ্ঠ প্রশিক্ষক মাননীয়া শ্রদ্ধা রাও দেব মহাশয়া


পরম্পরাগত দীপ প্রজ্জ্বলন, গুরু বন্দনা, ঈশ্বর স্মরণ ও প্রার্থনার পর আজকের বিবেচন সত্র শুরু হয়। ভগবদ্গীতা প্রকৃত অর্থে মনোমুগ্ধকর -- আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও জাগতিক জ্ঞানের মেল-বন্ধন। এ হল মহৎ এবং সর্বোচ্চ জ্ঞান। সনাতন ধর্মে এই গ্রন্থই সর্বাধিক সম্মানিত। এই গ্রন্থ দৈবত্ব বর্ণনা করে, কর্মের মহত্ত্ব বোঝায় এবং শ্রদ্ধা -ভক্তির সূক্ষ্মানুভূতি শেখায়, জ্ঞানের যে শক্তি তার বর্ণনা করে। এই পরম আধ্যাত্মিক জ্ঞান ভগবান তাঁর প্রিয় সখা অর্জুনকে দিয়েছিলেন। সেই সময় অর্জুন হতাশাগ্রস্ত ছিলেন ও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। অর্জুনকে কর্ম,ভক্তি ও জ্ঞান যোগ ব্যাখ্যা করার পরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আরও কিছু জ্ঞানের পথ দেখাতে চাইলেন। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতা অধ্যায় ক্রমান্বয়ে বলেন নি.. বরং এ যেন মহান দুই বন্ধুর বিষয় -ভিত্তিক কথোপকথন। দুই বন্ধুর মধ্যে অর্জুন হলেন শ্রীকৃষ্ণের গুণমুগ্ধ অনুসরণকারী। আবার অর্জুন হলেন শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত স্নেহভাজন, তাই তিনি কিছু গুহ্য তত্ত্বজ্ঞানও অর্জুনের কাছে প্রকাশ করেছেন।
একাদশ অধ্যায়ের নাম " বিশ্বরূপ দর্শন যোগ " বা ভগবানের অলৌকিক ঐশ্বরিক রূপ। দশম অধ্যায়ে অর্থাৎ বিভূতি যোগে ভগবান নিজের বিরাশীটি বিভূতির কথা জানিয়েছেন। বিভূতি যোগ হল ভগবানের অনন্ত ঐশ্বর্য, মহিমা ও গুণের বর্ণনা। দশম অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে ভগবান বলেছেন --
অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তবার্জুন।
বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ ।।

 অর্থাৎ " হে অর্জুন, তোমার এই বহুবিধ বিভূতি জানার কী প্রয়োজন? আমি নিজের একাংশ মাত্র দিয়ে জগৎকে ধারণ করে অবস্থান করছি অর্থাৎ আমার মাত্র কোন একাংশেই অনন্ত ব্রহ্ম অবস্থান করছে।"
 বিভিন্ন প্রকার বিভূতির কথা শুনে ভগবানের ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত বিশ্বরূপ স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছা অর্জুনের হয়েছিল। অর্জুনও বুঝতে পেরেছিলেন এতদিন ধরে তিনি যে কৃষ্ণকে জানতেন, তা তাঁর সত্ত্বার মাত্র এক অংশ। আসলে তিনিই অসীমের মতো অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে আছেন। তিনি যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের সেই ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করতে চেয়েছিলেন।
এই একাদশ অধ্যায়ে ভগবান তাঁর মহাজাগতিক রূপ অর্জুনের সামনে প্রকাশ করেছেন। এই অধ্যায়েই আমরা দেখবো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সেই অকল্পনীয় রূপ দর্শন করার জন্য অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেছেন ।
যদিও আপাতদৃষ্টিতে অর্জুনের এই ইচ্ছা সাধারণ বলে মনে হয়, কিন্তু অতীতে ভগবানের ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করার ইচ্ছা কোন ভক্তের হৃদয়ে জাগৃত হয়নি। ভগবান তাঁর প্রিয় শিষ্য এবং সখা অর্জুনের ইচ্ছাপূরণের জন্য নিজের যে ঐশ্বরিকরূপ দেখিয়েছিলেন সেটিই এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়।

11.1

অর্জুন উবাচ

মদনুগ্রহায় পরমং(ঙ্), গুহ্য়মধ্য়াত্মসংজ্ঞিতম্
য়ত্ত্বয়োক্তং(ম্) বচস্তেন, মোহোऽয়ং(ম্) বিগতো মম॥1॥

অর্জুন বললেন—হে ভগবান ! আমার প্রতি অনুগ্রহ করে আপনি যে পরম গুহ্য অধ্যাত্মতত্ত্ব বললেন, তাতে আমার মোহ দূর হয়েছে।

গীতার প্রথম অধ্যায় থেকে এ পর্যন্ত ভগবান সব কিছুই কৃপাপরবশ হয়ে বলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ভগবানের সকল ক্রিয়াই কৃপাপূর্ণ, কিন্তু মানুষ তা বুঝতে পারে না। ভগবানের কৃপা বুঝতে পারলে ভগবদ্তত্ত্ব অত্যন্ত সহজ এবং শীঘ্রই বোধগম্য হয়ে যায়। দশম অধ্যায়ের শেষে ভগবান অর্জুনকে বিশেষ কৃপা করে বলেছিলেন যে, সমস্ত জগৎ অর্থাৎ অনন্ত ব্রহ্মান্ড তাঁর একাংশে মাত্র স্থিত এবং এই যুদ্ধক্ষেত্রে সেই তিনিই অর্জুনের রথের সারথী হয়ে অর্জুনের আদেশ পালন করছেন। সমস্ত বিভূতি এবং যোগের মহান আধার স্বয়ং ভগবান যাঁর রথের সারথী, তাঁর আর ভগবানের বিভূতি পৃথকভাবে জানার কী প্রয়োজন? এই কথা শুনে অর্জুন ভাববিহ্বল হয়ে বলেন যে স্বয়ং ভগবানের কৃপায় তাঁর মোহ ভঙ্গ হয়েছে।
যেমন আলোর স্পর্শে অন্ধকার দূর হয়ে যায় -- তেমনই অর্জুনের মোহ বিদূরিত হয়েছে । অর্জুনের মোহ কীভাবে নাশ হল, তা তিনি পরবর্তী শ্লোকে বিস্তারিত ভাবে জানিয়েছেন।

11.2

ভবাপ্য়য়ৌ হি ভূতানাং(ম্),শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া
ত্বত্তঃ(খ্) কমলপত্রাক্ষ , মাহাত্ম্য়মপি চাব্যয়ম্॥2॥

কারণ হে কমললোচন ! আমি আপনার কাছে ভূতগণের উৎপত্তি ও বিনাশ সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে শুনেছি এবং আপনার অক্ষয় মাহাত্ম্যও জেনেছি।

ভগবান দশম অধ্যায়ে বলেছিলেন যে সমস্ত সৃষ্টির আদি, মধ্যে এবং অন্তে তিনিই থাকেন। সেজন্য অর্জুন এখানে বলেছেন যে, তিনি ভগবানের কাছ থেকে সবিস্তারে প্রাণীদের উৎপত্তি ও লয়ের বর্ণনা শুনেছেন। এর তাৎপর্য প্রাণীদের উৎপত্তি ও বিনাশের কথা শোনা নয়, এর তাৎপর্য হল এটি জানা যে সকল প্রাণীই ভগবান থেকে উৎপন্ন হয়, ভগবানেই অবস্থান করে এবং ভগবানেই লীন হয়ে যায় অর্থাৎ সবকিছুই ভগবান। 
ভগবান দশম অধ্যায়ে এও বলেছিলেন যে, যাঁরা ভগবানের বিভূতি ও যোগ তত্ত্বতঃ জানেন, তাঁরা অবিচল ভক্তিযুক্ত হয়ে থাকেন। ভগবানের বিভূতি ও যোগের তত্ত্বতঃ জানার মাহাত্ম্যের কথা অর্জুন এখানে উল্লেখ করেছেন। ভগবানের এই মাহাত্ম্যকে অব্যয় অর্থাৎ অবিনাশী বলার অর্থ হল এই যে ভগবানের বিভূতি এবং যোগ তত্ত্বতঃ জানলে ভগবানের প্রতি যে ভক্তি ও প্রেম হয়, ভগবানে যে অভিন্নতা হয়, তা সবই অব্যয়। কারণ ভগবান যেহেতু অব্যয় এবং নিত্য, তাঁর প্রেম ও ভক্তিও অবিনাশী। 
পরবর্তী দুটি শ্লোকে অর্জুন ঐশ্বরিকরূপ দর্শন করাবার জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা জানিয়েছেন।

11.3

এবমেতদ্য়থাত্থ ত্বম্, আত্মানং(ম্) পরমেশ্বর
দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপং(ম্), ঐশ্বরং(ম্) পুরুষোত্তম॥3॥

হে পরমেশ্বর ! আপনি যে আত্মতত্ত্ব বলছেন, তা যথার্থ ; কিন্তু হে পুরুষোত্তম ! আমি আপনার জ্ঞান, ঐশ্বর্য, শক্তি, বল, বীর্য এবং তেজঃসমন্বিত ঈশ্বরীয় বিশ্বরূপ দেখতে ইচ্ছা করি।

অর্জুন ভগবানকে 'পুরুষোত্তম' নামে সম্বোধন করে বলেছেন যে, এখন অবধি ভগবান তাঁর নিজের অলৌকিক প্রভাব,বিভূতি ও সামর্থ্য সম্বন্ধে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা সব যথার্থ। ভগবানের মাহাত্ম্যসহ প্রভাবগুলো তিনি ভগবানের কাছ থেকে শুনেছেন এবং সেগুলো সম্পর্কে তাঁর নিজের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে। 'সমস্ত জগৎ আমার শরীরের একাংশ' --- ভগবানের এই উক্তি শুনে অর্জুনের মনে সেই ঐশ্বরিকরূপ দর্শন করার প্রবল বাসনা জেগেছে।
দশম অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোকে অর্জুন ভগবানকে তাঁর সমস্ত বিভূতির বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ভগবান বিভূতিগুলোর বর্ণনা করে শেষে বলেছিলেন যে তাঁর বিভূতির কোন অন্ত নেই এবং সেইজন্য তিনি সংক্ষেপে বিভূতিসমূহের বর্ণনা করেছেন। ভগবানের এই কথায় অর্জুন ভেবেছিলেন যে তিনি যতটা চেয়েছিলেন, ততটার যোগ্যতা হয়তো তাঁর নেই এবং সেজন্য হয়ত ভগবান তাঁর বিভূতির বর্ণনা সংক্ষেপে করেছেন। তাই পরবতী শ্লোকে অর্জুন সসঙ্কোচে ভগবানকে বলেছেন ---

11.4

মন্য়সে য়দি তচ্ছক্য়ং(ম্), ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো
য়োগেশ্বর ততো মে ত্বং(ন্),দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্॥4॥

হে প্রভু ! আমাকে যদি আপনার সেই বিশ্বরূপ দেখার যোগ্য বলে মনে করেন, তা হলে হে যোগেশ্বর ! আমাকে আপনার সেই অবিনাশী স্বরূপ দেখান।

অর্জুন ভগবানকে অনুরোধ করেছিলেন যে, যদি তিনি অর্জুনকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে যেন তাঁর সেই অনন্ত ঐশ্বরিকরূপ দর্শন করান। অর্জুন জানতেন যে যোগ্যতা না থাকলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অপার রহস্য প্রকাশ করবেন না। শুধুমাত্র যোগ্য ব্যক্তিই এই অনুভূতি লাভ করতে পারেন। তাই অর্জুন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ভগবানের কাছে তাঁর নিবেদন রেখেছেন । তিনি জানতেন প্রার্থনাকারীরও অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্যতা থাকা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে একটা ছোট গল্প বলা যায়। একটা চশমার দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল পড়ার জন্য চশমা পাওয়া যায়। একজন বয়স্ক মানুষ সেই দোকানে এলেন। দোকানদার তাকে একটা চশমা পরিয়ে কিছু পড়তে দিলেন। কিন্তু সেই মানুষ টি পড়তে পারলেন না। দোকানদার বিভিন্ন পাওয়ারের চশমা পরিয়েও দেখা গেল তিনি লেখা পড়তে পারেন না। শেষে জানা গেল যে তিনি অক্ষরই চেনেন না।
বহু মানুষের বিভিন্ন রকমের পেশার প্রতি আগ্রহ থাকে -- কিন্তু সেই পেশার যোগ্য না হলে তবে সেই আগ্রহ নিরর্থক। নিজের নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী ইচ্ছা প্রকাশ করা উচিৎ।

এখানে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে যোগেশ্বর নামে অভিহিত করেছেন -- অর্থাৎ, সমস্ত যোগের যিনি গুরু বা ঈশ্বর । এই নাম দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন -- যিনি সর্বব্যাপী ও ক্ষমাশীল । ভগবান যে পাপীদের বারবার ক্ষমা করেছেন এরকম উদাহরণ আছে । পুতনা, কংসের মতো হিংস্রদের ও মুক্তি প্রদান করেছেন শ্রীকৃষ্ণ ... যারা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

এই কথা টা সবাই জানে ---
मूकं करोति वाचालं पंगुं लंघयते गिरि ।
यत् कृपा तमहं वंदे परमानंद माधवम्

অর্থাৎ ভগবানের কৃপায় বোবা মানুষও কথা বলতে পারে এবং পঙ্গু মানুষও পাহাড় চূড়ায় পৌঁছে যায়।

এখানে অর্জুন অতি বিনয়ের সাথে ভগবানের কাছে অনুরোধ করেছেন যে, যদি তিনি মনে করেন অর্জুন সেই রূপ দর্শনের যোগ্য, তাহলে তিনি যেন তাঁর বিশ্বরূপ অর্জুনকে দর্শন করান। অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে গভীর এক বন্ধুত্বপূর্ণ ভালবাসা ছিল। পরমেশ্বর হয়েও মানবরূপধারী শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ মানুষের মতোই ব্যবহার করতেন। তিনি কখনো নিজের দেবত্বভাব অর্জুনের সামনে প্রকাশ করেননি। অর্জুন ও তাঁকে নিজের প্রিয় সখা  বলেই জানতেন । কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেছেন যে তাঁর সখা শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ মানুষ নন। তাঁর দৈব গুণ সম্বন্ধে অর্জুন সচেতন হয়ে উঠেছেন।

মহাভারতের "খাণ্ডবদহন " খুব প্রসিদ্ধ অংশ । এই পর্বের শেষে অগ্নিদেব এবং দেবরাজ ইন্দ্র -- অর্জুন ও কৃষ্ণের সামনে আবির্ভূত হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেছিলেন । ক্ষত্রিয় অর্জুন মহান অস্ত্রশস্ত্র প্রাপ্ত করার বর চাইলেন এবং শক্তিশালী অস্ত্রের সাথে কপিধ্বজ নামক রথও প্রাপ্ত করলেন । আর শ্রীকৃষ্ণ... স্বয়ং ভগবান হয়েও ইন্দ্রদেব ও অগ্নিদেবের কাছে প্রার্থনা করলেন অর্জুনের সাথে আজীবনের বন্ধুত্ব। এইরকম অতুলনীয়, দুর্লভ বন্ধুত্ব তাঁদের মধ্যে ছিল । অর্জুনের নিষ্পাপ ও পবিত্র হৃদয়, সহানুভূতিশীল মন... এসবই তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল। গীতায় অনেক জায়গায় ভগবান অর্জুনকে অনঘ অর্থাৎ নিষ্পাপ বলে সম্বোধন করেছেন। 
অর্জুনের মতো যারা পবিত্র ও নিষ্পাপ, ভগবান তাদেরও পছন্দ করেন। আমরা সবাই জ্ঞানী হতে চাই, ঈশ্বরের ভক্ত হতে চাই -- কিন্তু নিজেকে পরিশুদ্ধতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাই না। আমরা সবাই ভগবদ্গীতা পড়ছি --- জীবনকে শিল্পে পরিণত করার উপায় গীতাই আমাদের শেখায় । আমাদের উচিত গীতা কে আত্মস্থ করে অর্জুনের মতো শুদ্ধ হয়ে ওঠা( অনঘ) । গীতার মাধ্যমে ভগবান অর্জুনরূপ সমগ্র মানবজাতিকে উপদেশ প্রদান করেছেন।
অর্জুন ভগবানের কাছে তাঁর ঐশ্বরিক রূপ দেখাবার জন্য প্রার্থনা জানিয়েছিলেন এবং তাঁর নিজের যোগ্যতা যাচাই করার বিষয়টি ভগবানের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। অর্জুনের এই বিনীত অনুরোধ শুনে ভগবান পরবর্তী শ্লোকে বলেছেন --

11.5

শ্রীভগবানুবাচ

পশ্য় মে পার্থ রূপাণি ,শতশোऽথ সহস্রশঃ
নানাবিধানি দিব্য়ানি, নানাবর্ণাকৃতীনি চ॥5॥

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন—হে পার্থ ! তুমি আমার বহুবিধ এবং নানা বর্ণ ও নানা আকৃতিবিশিষ্ট শত শত এবং সহস্র সহস্র দিব্যরূপ দর্শন করো।

অর্জুনের সসঙ্কোচ প্রার্থনা শুনে ভগবান অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন এবং অর্জুনকে 'পার্থ' সম্বোধনে ভূষিত করে ভগবানের নানাপ্রকার বর্ণ ও আকৃতিবিশিষ্ট শত-সহস্র দিব্যরূপ দর্শন করতে বললেন। দশম অধ্যায়ে বিভূতির বিষয়ে ভগবান যেমন বলেছিলেন যে তাঁর বিভূতির কোন অন্ত নেই, ঠিক তেমনই এখানেও তিনি তাঁর অনন্ত রূপের কথা বলেছেন। সেই রূপসমূহের বৈশিষ্টের বর্ণনা করে তিনি বলেছেন যে সেগুলোর সাজ নানারকমের, তার রঙও নানাবিধ। রূপসমূহ নানা আকৃতিবিশিষ্ট। 
পৃথিবীর ছোট একটি কণাও যেমন পৃথিবী, তেমনই জগৎও ভগবানের অনন্ত,অপার বিশ্বরূপের একটি ক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু তা সকলের কাছে দিব্য বিশ্বরূপে প্রকটিত নয়, তা জগৎরূপেই প্রকাশিত। কারণ মানুষের লক্ষ্য পরমাত্মার দিকে না গিয়ে বিনাশশীল জগতের দিকেই থাকে। যেমন অবতাররূপে এই ধরাধামে আবির্ভাব হলেও ভগবান সকলের কাছে ভগবদ্-রূপে প্রকটিত হন না, বরং মনুষ্যরূপেই প্রকটিত হয়ে থাকেন, তেমনই বিশ্বরূপী ভগবান সকলের কাছে জগৎসংসার রূপেই প্রকটিত থাকেন। কিন্তু এখানে ভগবান তাঁর দিব্য অবিনাশী বিশ্বরূপে প্রত্যক্ষ প্রকটিত হয়ে অর্জুনকে তাঁর দিব্যরূপসমূহ দর্শন করার উপদেশ দিয়েছেন।
এই শ্লোকে ভগবান তাঁর বিশ্বরূপে নানাপ্রকার বর্ণ এবং আকৃতির দেখার কথা বলেছেন। পরবর্তী শ্লোকে দেবতাদের দেখার কথা বলেছেন। 

11.6

পশ্য়াদিত্য়ান্বসূন্রুদান্ , অশ্বিনৌ মরুতস্তথা
বহূন্য়দৃষ্টপূর্বাণি ,পশ্য়াশ্চর্য়াণি ভারত॥6॥

হে ভরতবংশীয় অর্জুন ! তুমি আমার মধ্যে দ্বাদশ আদিত্য (অদিতির পুত্রদের), অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও ঊনপঞ্চাশ মরুদ্গণ (বায়ু)কে দর্শন করো এবং পূর্বে যা কখনও দেখোনি এরূপ বহু আশ্চর্যময় রূপ দর্শন করো।

শ্রী ভগবান অর্জুনকে তাঁর মধ্যে যাঁদের অবস্থান সেই দ্বাদশ আদিত্য (অদিতির পুত্র), অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে দেখতে বললেন। শাস্ত্রে এঁদের একত্রে তেত্রিশ কোটি দেবতা বলা হয়। এছাড়াও শ্রী ভগবান ধারণ করে আছেন ঊনপঞ্চাশ জন মারুদ্ গণ ও অদৃষ্টপূর্ব বহু আশ্চর্যময় রূপ।
অর্জুনও একজন যথেষ্ট অভিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি স্বর্গলোক ভ্রমণ করে এসেছেন, নাগলোকও তাঁর দেখা হয়ে গেছে। পাতাল লোকের কথা তিনি তাঁর দাদা ভীমের কাছে শুনেছেন। সেই ভূয়োদর্শী অর্জুনের সামনে শ্রীভগবান তাঁর অসীম, অনন্ত রূপ প্রকাশ করলেন।

11.7


ইহৈকস্থং(ঞ্) জগত্কৃত্স্নং(ম্),পশ্য়াদ্য় সচরাচরম্।
মম দেহে গুডাকেশ , য়চ্চান্য়দ্দ্রষ্টুমিচ্ছসি॥7॥

হে অর্জুন ! আমার এই বিরাট শরীরে একস্থানে অবস্থিত চরাচরসহ সমগ্র জগৎ অবলোকন করো এবং আরও যা কিছু তোমার দেখবার ইচ্ছা তা-ও দেখো।

শ্রী ভগবান অর্জুনকে খুব মনোযোগ সহকারে সবকিছু দেখতে বললেন। তিনি বললেনযে, যা কিছু আবর্তিত হচ্ছে এবং যা কিছু স্থিতিশীল, সবই অর্জুন তাঁর সেই মহাজাগতিক রূপের মধ্যে দেখতে পাবেন; এমনকি অর্জুন যদি আরও কিছু দেখতে চান, তাও সেই রূপের মধ্যে বিদ্যমান। ভগবান এখানে অর্জুনকে গুড়াকেশ নামে সম্বোধন করেছেন। গুড়াকেশ অর্থাৎ -- 'নিদ্রা যাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন' গুড়াকেশ নামে সম্বোধন করে তিনি অর্জুনকে তাঁর অপরিসীম একাগ্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন ।

"পশ্য" শব্দের অর্থ হল--- দেখা। উপরোক্ত তিনটি শ্লোকে চারবার 'পশ্য' পদ দ্বারা তাঁর রূপ দর্শনের জন্য অর্জুনকে বলেছেন। সেই অনুযায়ী অর্জুন বিস্ফোরিত চক্ষে ভগবানের অলৌকিক রূপ দর্শনের যদিও চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পারছিলেন না। তাই ভগবান পরবর্তী শ্লোকে অর্জুনের দেখতে না পাওয়ার কারণ জানিয়ে বলেছেন ---

11.8

ন তু মাং(ম্) শক্য়সে দ্রষ্টুম্, অনেনৈব স্বচক্ষুষা
দিব্য়ং(ন্) দদামি তে চক্ষুঃ(ফ্), পশ্য় মে য়োগমৈশ্বরম॥8॥

কিন্তু তুমি নিজ চর্ম চক্ষুর দ্বারা আমার এই বিশ্বরূপ দেখতে সমর্থ হবে না ; সেইজন্য আমি তোমাকে দিব্য চক্ষু প্রদান করছি, সেই চক্ষু দ্বারা তুমি আমার ঈশ্বরীয় যোগশক্তি দর্শন করো।

শ্রী ভগবান জানতেন যে অর্জুন চর্মচক্ষুর দ্বারা তাঁর দিব্য ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করতে পারবেন না। অর্জুনকে সেই কথা জানিয়ে ভগবান অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করলেন যার সাহায্যে অর্জুন ভগবানের সেই ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করতে সক্ষম হবেন।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ক্ষমতা সীমিত। কোন বিশেষ কাজ করতে গেলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। চশমা পরে নিলেই পড়তে পারেন সেটা যে নিরক্ষরের জন্য নয়... এই গল্পটা আগেই বলা হয়েছে।
মহর্ষি বেদব্যাসের কৃপায় সঞ্জয় আগেই দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন। সুতরাং তিনি মহাভারতের যুদ্ধের সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন এবং তা অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু অর্জুন ও সঞ্জয়ের এই দিব্যরূপ দর্শনের মধ্যে পার্থক্য হলো ... একজনের মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখা এবং অন্যজন টেলিকাস্টে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছেন... এইরকম। মাঠে বসে ম্যাচ দেখলে ৩৬০° ই ঘুরে দেখা সম্ভব কিন্তু টেলিকাস্টে শুধু ক্যামেরা যেটুকু দেখাবে সেটুকুই দেখা সম্ভব।
সঞ্জয় এই অত্যাশ্চর্য রূপকে কিভাবে দেখেছেন তা পরের শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে।

11.9

সংজয় উবাচ

এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ ,মহায়োগেশ্বরো হরিঃ
দর্শয়ামাস পার্থায় ,পরমং(ম্) রূপমৈশ্বরম্॥9॥

সঞ্জয় বললেন—হে রাজন্ ! মহাযোগেশ্বর এবং সর্বপাপনাশকারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই কথা বলে অর্জুনকে নিজের পরম ঐশ্বর্যযুক্ত দিব্যরূপ দেখালেন।

সঞ্জয় মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন যে অর্জুনকে দিব্যচক্ষু প্রদান করে মহাযোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করালেন। সঞ্জয় ভগবানকে 'মহাযোগেশ্বর' বলে আখ্যাত করেছেন কারণ ভগবান সমস্ত যোগের অধিপতি অর্থাৎ সমস্ত যোগই ভগবানের অন্তর্গত। 
পরবর্তী দুটি শ্লোকে সঞ্জয় ভগবানের পরম ঐশ্বরিকরূপ বর্ণনা করেছেন।

11.10

অনেকবক্ত্রনয়নম্ ,অনেকাদ্ভুতদর্শনম্
অনেকদিব্য়াভরণং(ন্), দিব্য়ানেকোদ্য়তায়ুধম্॥10॥

সেই বিশ্বরূপ অনেক মুখ ও অনেক নেত্রযুক্ত, অসংখ্য অদ্ভুত আকৃতি বিশিষ্ট, বহু দিব্যভূষণাদি পরিহিত এবং বহু দিব্য আয়ুধে সজ্জিত,....

 

11.11

দিব্য়মাল্য়াম্বরধরং(ন্),দিব্য়গন্ধানুলেপনম্
সর্বাশ্চর্য়ময়ং(ন্) দেবম্, অনন্তং(ম্) বিশ্বতোমুখম॥11॥

...দিব্য মাল্য এবং দিব্য বস্ত্রে ভূষিত, দিব্যগন্ধ অনুলিপ্ত, সর্বাশ্চর্যযুক্ত, অনন্ত ও সর্বতোমুখ—সেই বিশ্বরূপ পরমদেব পরমেশ্বরকে অর্জুন দর্শন করলেন।

ভগবানের অভূতপূর্ব দিব্যরূপ বর্ণনা করার সময় সঞ্জয় অনেক বিশেষণ প্রয়োগ করেছেন। 
'অনেকবক্ত্রনয়নম্' --- ভগবানের এই বিরাটরূপে প্রকাশিত যতগুলো মুখ ও চোখ দেখা যাচ্ছিল, তা সবই দিব্য। বিরাটরূপে যত প্রাণী দেখা যাচ্ছিল তাদের মুখ, চোখ,নাক, হাত,পা অর্থাৎ সর্বঅঙ্গই বিরাটরূপ ভগবানের। কারণ তিনি স্বয়ং বিরাটরূপে প্রকটিত হয়েছেন। 
'অনেকাদ্ভুতদর্শনম্' --- ভগবানের বিরাটরূপে যত রূপ,আকৃতি, বর্ণ এবং সাজ-দেখা যাচ্ছিল, তা সবই অতি অদ্ভুৎ দেখাচ্ছিল। 
'অনেকদিব্যাভরণম্' --- বিরাটরূপে দেখতে পাওয়া নানা অঙ্গে যত গহনাদি ছিল তা সবই দিব্য। 
'দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্' --- বিরাটরূপ ভগবান তাঁর হাতে নানাপ্রকার আযুধ ধারণ করেছিলেন,তা সবই দিব্য। 
'দিব্যমাল্যাম্বরধরম্' --- বিরাটরূপ ভগবান তাঁর গলায় ফুলের, সোনার,রুপোর ইত্যাদি নানাপ্রকার যেসব মালা ধারণ করেছিলেন,সেগুলো সব দিব্য।  তিনি নানা রঙের যেসব বস্ত্র পরিধান করেছিলেন, সেগুলোও সব  দিব্যবস্ত্র। 
'দিব্যগন্ধানুলেপনম্' ---বিরাটরূপ ভগবান তাঁর  ললাটে কস্তুরী,চন্দন,কুমকুম ইত্যাদি যেসব তিলক ধারণ করেছিলেন এবং শরীরে যত সুগন্ধ লেপন করেছিলেন, তা সবই দিব্য। 
'সর্বাশ্চর্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বতোমুখম্' --- এইপ্রকার আশ্চর্যময় অনন্তরূপশালী এবং চতুষ্পার্শে মুখবিশিষ্ট পরম ঐশ্বর্যময় নিজরূপ ভগবান অর্জুনকে দেখালেন।   

11.12

দিবি সূর্য়সহস্রস্য় ,ভবেদ্য়ুগপদুত্থিতা
য়দি ভাঃ(স্) সদৃশী সা স্য়াদ্, ভাসস্তস্য় মহাত্মনঃ॥12॥

সহস্র সূর্য একসঙ্গে আকাশে উদিত হলে যে প্রকাশ উৎপন্ন হয়, সেই প্রকাশও বিশ্বরূপ পরমাত্মার প্রকাশের কিঞ্চিৎ তুল্য হতে পারে।

ভগবানের বিরাটরূপের প্রভাকে সূর্যের প্রভার সাথে তুলনা করে সঞ্জয় বলেছেন যে, যদি একই সাথে হাজার সূর্য উদয় হয়, তাহলেও সেই সবগুলোর প্রভা একসাথে ভগবানের এই প্রভার সমকক্ষ হতে পারে না। সঞ্জয়ের এই কথায় মনে হয় যে ভগবানের এই দিব্যরূপের জ্যোতি সহস্র সূর্যের প্রভার সাথে তুলনা করতে তিনি দ্বিধাবোধ করেছেন।  কারণ সূর্যের প্রভা হল ভৌতিক এবং বিশ্বরূপ ভগবানের প্রভা দিব্য। ভৌতিক প্রভা যত উজ্জ্বলই  হোক না কেন, তা দিব্য প্রভার তুলনায় সদাই তুচ্ছ। 
পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১২ নম্বর শ্লোকে ভগবান স্বয়ং বলেছেন ---
য়দাদিত্যগতং তেজো জগদ্ভাসয়তেऽখিলম্ ।
য়চ্চন্দ্রমসি য়চ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্ ।।

অর্থাৎ সূর্যের যে তেজ জগৎকে উদ্ভাসিত করে এবং যে তেজ চন্দ্রমা  ও অগ্নিতে আছে , তা সবই ভগবানেরই  তেজ। 
সহস্রাধিক সূর্যের প্রভা একত্রে মিলিত হলেও ভগবানের প্রভার সমকক্ষ হতে পারে না, কারণ সূর্যের প্রভা ভগবানের প্রভা থেকেই উৎসারিত। 
ডঃ ওপেনহেইমার, একজন আমেরিকান পদার্থবিদ, যাঁকে  অ্যাটম-বোমার জনক বলা হয়। তিনি ভগবদ্গীতার অনুরাগী ছিলেন। পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে যে উজ্জ্বল আলো  উদ্ভাসিত হয়েছিল, তার বর্ণনা করার সময় তিনি এই শ্লোকটি উল্লেখ করে সেই বিশাল আলোকরশ্মিকে জ্বলন্ত সূর্যের  সাথে তুলনা করেছিলেন। 
ভগবানের ঐশ্বরিকরূপ এবং তাঁর প্রভার বর্ণনা করার পর সঞ্জয় এবার অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের কথা বলেছেন। 

11.13

তত্রৈকস্থং(ঞ্)জগত্কৃত্স্নং(ম্), প্রবিভক্তমনেকধা
অপশ্য়দ্দেবদেবস্য় ,শরীরে পান্ডবস্তদা॥13॥

পাণ্ডুপুত্র অর্জুন সেই নানা ভাগে বিভক্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে দেবাদিদেব ভগবান একস্থানে অবস্থিত দেখলেন।

সঞ্জয় বলছেন যে, অর্জুন দেবাদিদেবের দেহের কোন এক অংশে স্থিত নানাভাবে বিভক্ত সমস্ত জগৎ দেখেছিলেন। নানাভাবে বিভক্ত অর্থাৎ দেবতা, মানুষ, পশু-পক্ষী, পৃথিবী, সমুদ্র,আকাশ, সৌরজগৎ ইত্যাদি বিভাগগুলোর সাথে সমস্ত চরাচর জগৎ অর্জুন ভগবানের শরীরের একাংশে ভগবদ্প্রদত্ত দিব্যচক্ষুর সাহায্যে দেখলেন। তাৎপর্য হল এই যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই মনুষ্যদেহের একাংশে চরাচর, স্থাবর জঙ্গমসহ সমস্ত জগৎ অবস্থিত। সেই জগৎও নানা ব্রহ্মাণ্ডের রূপে, নানা দেবলোকের রূপে, নানা ব্যক্তি ও পদার্থের রূপে বিভক্ত ও বিসৃত  --- অর্জুন ভগবানের এই রূপ পরিষ্কারভাবে প্রত্যক্ষ করলেন। সঞ্জয় এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে 'দেবাদিদেব' নামে ভূষিত করেছেন কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং দেবগণের  দেবতা অর্থাৎ প্রভু। 
ভগবানের অলৌকিক বিশ্বরূপ দেখে অর্জুনের কী  অবস্থা হয়েছিল --- পরবর্তী শ্লোকে সঞ্জয় সেটি বর্ণনা করেছেন। 

11.14

ততঃ(স্) স বিস্ময়াবিষ্টো, হৃষ্টরোমা ধনংজয়ঃ
প্রণম্য় শিরসা দেবং(ঙ্), কৃতাঞ্জলিরভাষত॥14॥

এরপর বিস্ময়াবিষ্ট রোমাঞ্চিত অর্জুন বিশ্বরূপধারী ভগবানকে শ্রীকৃষ্ণের শরীরে শ্রদ্ধা-ভক্তিসহ নতমস্তকে প্রণাম করে করজোড়ে বললেন।

ধনঞ্জয় অর্থাৎ অর্জুন যা কখনও কল্পনা করতে পারেন নি, ভগবানের সেই অত্যাশ্চর্য বিশ্বরূপ দেখে তিনি বিস্ময়াবিষ্ট হলেন। ভগবান তাঁর  উপর কৃপাপরবশ হয়ে নিজে থেকেই অনেক আধ্যাত্মিক উপদেশ দিয়েছেন। উপরন্তু ভগবান এখন অর্জুনকে আবার নিজের বিশ্বরূপ দেখাচ্ছেন --- এই কথা ভেবে অর্জুন রোমাঞ্চিত হলেন। তাঁর প্রতি ভগবানের এই বিশেষ কৃপার কথা অনুভব করে অর্জুন অবনত মস্তকে সেই দেবাদিদেবকে প্রণাম করে করজোড়ে বললেন ---

11.15

অর্জুন উবাচ

পশ্য়ামি দেবাংস্তব দেব দেহে ,
সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসংঘান্
ব্রহ্মাণমীশং(ঙ্) কমলাসনস্থম্,
ঋষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্॥15॥

অর্জুন বললেন—হে দেব ! আপনার শরীরে আমি সমস্ত দেবতা এবং বহুবিধ ভূত সমুদয়, কমলাসনে অধিষ্ঠিত সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে, মহাদেবকে এবং সমস্ত ঋষি ও দিব্য সর্পগণকে দেখতে পাচ্ছি।

অর্জুন অবনত মস্তকে দেবাদিদেবকে প্রণাম করে বললেন যে তিনি ভগবানের দেহে সমস্ত দেবগণ, স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিবিধ ভূতসমূহ, সৃষ্টিকর্তা কমলাসনস্থ ব্রহ্মা, মহাদেব,সমস্ত ঋষিকুল এবং অনন্ত-তক্ষকাদি সমস্ত দিব্য সর্পগুলোকে দেখছেন।  তাৎপর্য হল এই যে অর্জুন এই মরজগতে  থেকেই দেবলোক, ব্রহ্মলোক, বৈকুন্ঠ, কৈলাশ, নাগলোক আদি সমস্ত লোকগুলো  ভগবানের দেহে দেখছিলেন। সুতরাং যা কিছু দেখা যায় বা শোনা যায় তা সবই ভগবানের দেহের একাংশে স্থিত। সমগ্র জগৎ তাঁর  থেকেই উৎপন্ন হয়, তাঁতেই অবস্থান করে আবার তাঁতেই লীন  হয়ে যায়। কিন্তু ভগবান একইভাবে বিরাজ করেন। 
বিস্ময়াবিষ্ট অর্জুন দ্বারা ভগবানের এই অলৌকিক বিশ্বরূপের আরও বর্ণনা পরবর্তী সত্রের আলোচ্য বিষয়, এই বলে আজকের বিবেচন সত্র  এখানেই শেষ হয় এবং তারপর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। 

:: প্রশ্নোত্তর পর্ব ::

প্রশ্নকর্ত্রী: শ্রীমতী নীতু গিরী দিদি
প্রশ্ন: আমার ছেলে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র কিন্তু মোবাইল এবং বন্ধু-বান্ধবের নেশায় তার মন অত্যন্ত চঞ্চল। পড়াশুনায় নিজের সময়কে সদুপযোগ করছে না। ছেলের এসব কার্যকলাপে আমি অত্যন্ত চিন্তিত। এই পরিবেশের সাথে শান্ত মনে নিজেকে মানিয়ে নেবার উপায় কী ?
উত্তর: সাধারণত এটা দেখা যায় যে অভিভাবকরা নিজেদের মানসিক চাপ ও উদ্বিগ্নতা সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেয়। আপনার ক্ষেত্রে এটি ভাল লক্ষণ যে সমস্যাটি আপনি বুঝতে পেরেছেন। এটা মনে রাখতে হবে যে আপনার ছেলে একজন স্কুলের ছাত্র যার মধ্যে চঞ্চলতা, ছেলেমানুষী ভাব থাকা স্বাভাবিক। আমাদের মানসিক চাপ বা উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি হলে আমরা আমাদের সমস্যার সমাধানের জন্য একজন শান্তস্বভাবের কোন বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তির কাছে সেটি প্রকাশ করি। হয়ত এমনও হতে পারে যে আপনার ছেলে স্বয়ং নিজে পড়াশুনা নিয়ে মানসিক চাপে আছে। সর্বদা ওর দোষ না দেখে, অন্যের সাথে তুলনা না করে ওর সাথে বন্ধুর মত ব্যবহার করুন। সর্বদা উপদেশ না দিয়ে ওর সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করুন। এভাবে সম্পর্ক যখন সহজ হবে তখন ও তার মানসিক উদ্বিগ্নতার সমাধানের জন্য সবকিছু আপনার সাথে বন্ধুর মত আলোচনা করবে। শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে নিজে নিজেই সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবেন।

প্রশ্নকর্তা: শ্রী এম বি কৌশিক দাদা
প্রশ্ন: বিরাটরূপ এবং বিশ্বরূপের পার্থক্য কী ?
উত্তর: বিরাটরূপ বিশ্বরূপের একটি ক্ষুদ্র অংশ। বিরাটরূপ বিশাল হলেও সসীম কিন্তু বিশ্বরূপ হচ্ছে অসীম।

প্রশ্ন: পরমাত্মা যদি আজন্মা অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুরহিত, তাহলে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এবং মৃত্যু কেন হয়েছিল?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার অবতার রূপে ধরাধামে আবির্ভাব হয়েছিলেন। পরমাত্মা যখন অবতাররূপে মনুষ্যদেহ ধারণ করেন, তখন তাঁর ক্রিয়া-কলাপ সবই সাধারণ মানুষের ন্যায় হয়। পরমাত্মা ত্রিগুণাতীত, তিনি জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ নন। অবতারের লীলা শেষ হলে তিনি এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করে বৈকুন্ঠধামে চলে যান। সাধারণ মানুষ চর্মচক্ষুর দ্বারা অবতারের প্রকৃত রূপ দেখতে পায় না। তাই তাঁর আবির্ভাবকে জন্ম এবং তাঁর নশ্বর দেহত্যাগকে মৃত্যু বলে মেনে নেয় ।

প্রশ্ন: মাতা যশোদাকে শৈশবকালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মুখের ভিতর যা দর্শন করিয়েছিলেন, সেই রূপের নাম কী ?
উত্তর: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাল্যলীলায় নিজের মুখের ভিতরে মা যশোদাকে ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করিয়েছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে কথিত আছে যে, মা যশোদা একদিন জানতে পারেন যে শিশু কৃষ্ণ মাটি খেয়েছে। তিনি সেই কথা জিজ্ঞাসা করে তাঁর আদরের কৃষ্ণকে হাঁ করতে বলেছিলেন। শিশু কৃষ্ণ হাঁ করলে মা যশোদা কৃষ্ণের ছোট মুখগহ্বরে সম্পূর্ণ জগৎ, নন্দগ্রাম,নন্দভবন, শিশু কৃষ্ণ এবং স্বয়ং নিজেকে দেখলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পেরেছিলেন যে মা যশোদা এরপর তাঁকে ঈশ্বররূপে পূজো করবেন এবং মা যশোদার বাৎসল্য প্রেম থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন। তাই ভগবানের লীলায় এই দৃশ্য দেখার পর মা যশোদা মূর্ছিত হয়েছিলেন এবং চেতনা ফিরে আসলে তাঁর স্মৃতিপট থেকে এই ঘটনা ভগবান মুছে দিয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলায় এই রূপদর্শনের কোন নামাকরণ পাওয়া যায়নি।