विवेचन सारांश
ভগবদ্প্রীতির শ্রেষ্ঠ মার্গ ভক্তিযোগ

ID: 1203
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 16 জুলাই 2022
অধ্যায় 12: ভক্তিযোগ
1/2 (শ্লোক 1-12)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ ড: আশু গোয়েল মহাশয়


গীতা পরিবারের পরম্পরা অনুসারে গুরুপ্রণাম, দীপ প্রজ্জ্বলন, দেশবন্দনা প্রমুখের মধ্য দিয়ে অদ্যকার বিবেচন সত্র শুরু হয়। সুপ্রাচীন কাল থেকে অসংখ্য সন্ত ও মহাপুরুষ গীতার মহিমাকীর্তন করে আসছেন। গীতা প্রেসের কর্ণধার ব্রহ্মলীন পরম শ্রদ্ধেয় জয়দয়াল গোবিন্দজী গীতার প্রস্তাবনায় যথার্থই বলেছেন,  সমস্ত গ্রন্থ পর্যালোচনা করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সমকক্ষ মানবকল্যাণকারী দ্বিতীয় কোন গ্রন্থ নেই। জগদ্গুরু শঙ্করাচার্যও বলেছেন, "ভগবদ্গীতা কিঞ্চিত্ধীতা গঙ্গাজল লবকণিকা পীতা "। 
আমাদের জন্মজন্মান্তরের পূণ্যফলস্বরূপ আমরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শ্রবণ, পঠন ও রসাস্বাদনের সৌভাগ্য লাভ করেছি। বর্তমানকালেও অনেক মনিষী - গোখলে, তিলক, মহাত্মা গান্ধী, ঋষি অরবিন্দ, বিনোভা ভাবে প্রমুখরা গীতার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন। সন্ত রামসুখদাসজী লিখিত 'সাধক সঞ্জীবনী", হনুমানপ্রসাদজী লিখিত 'তত্ত্ব বিবেচনী' গ্রন্থেও গীতার কথা সুন্দর ভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাইবেলের প্রায় ১২০০ অনুবাদ হয়েছে, একটিরও ব্যাখ্যা  নয়। অন্যদিকে গীতার ১৮০০ এর বেশি ব্যাখ্যা সহ অনুবাদ রয়েছে। 
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার উৎপত্তির কারণ তথা পটভূমিকা জেনে এই পথে অগ্রসর হওয়া উচিত। গীতা প্রকৃতপক্ষে মহাভারতের অংশ। অষ্টাদশ পর্ব মহাভারতের ভীস্মপর্বের ২৫ থেকে ৪২ অধ্যায় পর্যন্ত অংশটি হলো গীতা।
হস্তিনাপুরের রাজা ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্র কৌরব এবং পান্ডুর পঞ্চপুত্র পান্ডব নামে পরিচিত। এদের মধ্যে জেষ্ঠ্যপান্ডব যুধিষ্ঠির সকলের বড় হওয়ায় তিনিই ছিলেন হস্তিনাপুরের সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী  । কিন্তু পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে রাজত্ব না দিয়ে রাজ্যকে ভাগ করে খান্ডববন নামক একদুর্গম অরণ্যে জনবিরল এক অনুর্বর ভূভাগ পান্ডবদের দেন।পান্ডবরা কঠোর পরিশ্রম আর কৃষ্ণের কৃপায় সেখানে ইন্দ্রপ্রস্থ নামে এক অপরূপ রাজধানী গড়ে তোলেন। অবিলম্বে তার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। রাজসূয় যজ্ঞ করে যুধিষ্ঠির রাজাধিরাজ উপাধি লাভ করেন।  তা দেখে দূর্যোধন ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে এবং কুচক্রী মামা শকুনির পরামর্শে পান্ডবদের হস্তিনাপুরে আমন্ত্রণ জানান। ধৃতরাষ্ট্র দূত পাঠিয়ে তাদের সসম্মানে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন। কৌরবরা জানত যুদ্ধে তারা পান্ডবদের পরাজিত করতে সক্ষম হবে না। দূর্যোধন সেখানে যুধিষ্ঠিরকে পাশাখেলার আমন্ত্রণ জানায়। যুধিষ্ঠির অনিচ্ছা সত্যেও ঐ খেলায় তার রাজ্য, চার ভাই এমনকি কূলবধু দ্রৌপদীকেও বাজি রাখতে বাধ্য হয় এবং শেষপর্যন্ত শকুনির ছলনায় সর্বস্বান্ত হন। প্রকাশ্য রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণাদি নানাবিধ অসম্মান করা হয়। পিতামহ ভীস্ম, গুরু দ্রোণাচার্য ও অন্যান্য মহারথীরা নীরব দর্শকের ভূমিকা নেন। খেলার শর্ত হিসাবে পান্ডবদের বারো বৎসর বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাসে পাঠানো হয়। বলা হয় ফিরে এসে পান্ডবরা তাদের রাজ্য সসম্মানে ফিরে পাবে।
কিন্তু কৌরবরা তাদের প্রতিশ্রুতি মানলেন না, পান্ডবরা ফিরে এলে তাদের রাজ্য ফেরত দিতে অস্বীকার করা হয়। শেষ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবদের জন্য মাত্র পাঁচটি গ্রাম দাবী করেন। কিন্তু তাঁকেও চরম অসম্মানিত করা হয়। বলা হয়- বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী। 
ধর্মপ্রাণ যুধিষ্ঠির প্রথমে যুদ্ধে যেতে চান নি, শেষ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের অনুরোধে ধর্মযুদ্ধে সম্মত হন। এরপর কুরুক্ষেত্র নামক বিশাল প্রান্তরে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। কৌরবপক্ষে একাদশ অক্ষৌহিণী এবং পান্ডবদের পক্ষে সাত অক্ষৌহিণী সৈন্য অংশ নেয়। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধে পান্ডবদের পক্ষে যোগ দিলেও নিজে অস্ত্র ধারণ করলেন না, তিনি অর্জুনের রথের সারথি হিসেবে যোগ দেন। 
যুদ্ধের প্রাক্কালে   অর্জুনের অনুরোধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রথটিকে উভয় পক্ষের সেনাদলের মধ্যবর্তী স্থানে রাখেন যাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণেকারী মহারথীদের ভালোভাবে দেখা যায়। সেখানে অবস্থানরত অবস্থায় অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তাই হলো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। 
পরমপূজ্য স্বামিজীর মার্গদর্শন ও গীতা পরিবারের পরম্পরা অনুসারে গীতা শিক্ষার্থীদের প্রথমে গীতার দ্বাদশ অধ্যায় অনুশীলন করানো হয়। অধ্যায়টি প্রথমত ছোট, সহজবোধ্য ও সরল, এর নাম ভক্তিযোগ। এখানে অনন্য ভক্তির মাহাত্ম্য সুন্দর ভাবে বর্ণিত হয়েছে। 
প্রসঙ্গত একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একসময় নারায়ণ স্বামী একজন ভক্তিমার্গের সাধক এবং শ্রমণ নামক একজন জ্ঞানমার্গের সাধকের মিত্রতা হয়। একদিন শ্রমণজী স্বামিজীকে বলেন, কৃপা করে আমাকে ভক্তিবিষয়ক কিছু উপদেশ দিন। স্বামিজী তাকে হাতমুখ ধুঁইয়ে একটি পাত্রে জল পান করতে দেন। আবার কিছুটা সুগন্ধী শরবত ঐ পাত্রে ঢালতে থাকেন। শরবত গড়িয়ে বাইরে পড়তে থাকে। শ্রমণজি ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, আরে করেন কি, করেন কি, সব তো বাইরে পড়ে গেল। স্বামিজী তখন শান্তভাবে বলেন, আমি আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছি ভরা পাত্রে আর কিছু ভরা যায় না। এই হলো প্রথম শিক্ষা। যখন সব কিছু ভুলে আমি কিছুই জানি না মনে এইভাব আসবে তখন আপনি ভক্তির উপদেশ ও মাহাত্ম্য নিতে সমর্থ হবেন। 
যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে মহামন্ত্রী সঞ্জয় কুরুযুদ্ধের প্রান্তরেই ছিলেন। দশমদিন পিতামহ ভীস্ম শরশয্যায় পতিত হলে তিনি ধৃতরাষ্ট্রের কাছে সেই সংবাদ দিতে যান। তখন ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তরে দূরদৃষ্টিপ্রাপ্ত সঞ্জয় তাকে যুদ্ধের খুঁটিনাটি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেন। মহর্ষি বেদব্যাস এখান থেকেই গীতা শুরু করেন। 
গীতায় মোট ৭০০টি শ্লোক আছে, এর মধ্যে একটি মাত্র শ্লোক ধৃতরাষ্ট্র, ৪২টি সঞ্জয়, ৮৪টি অর্জুন এবং বাকি ৫৭৪টি শ্লোক স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অর্থ হলো শ্রীযুক্ত ভগবানের মুখনিঃসৃত গীতি বা গান। 
ইতিপূর্বে অর্জুনের বীরত্বের কথা বলতে গিয়ে বিবেচক বলেছেন যে অর্জুন কোনো সাধারণ যুবক নন, তখন তার বয়স ৮৪ বৎসর। তিনি ছিলেন বিশ্ববিজয়ী বীর। রাজসূয় যজ্ঞের সময় ভীম্, নকুল ও সহদেব তিনজন মিলে যে পরিমান ধনসম্পদ এনেছিলেন তিনি একাকী তার থেকে বেশি ধন সম্পদ জয় করে আনেন, তাই তার আরেক নাম ধনঞ্জয়। বিরাটনগরে যুদ্ধের সময় তিনি বৃহন্নলার ছদ্মবেশে একাই পিতামহ ভীস্ম, গুরু দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য প্রমুখ মহারথীসমৃদ্ধ কৌরবদের পরাজিত করেছেন। তিনি মহাদেবের তপস্যা করে তাঁকে সন্তুষ্ট করে পাশুপত নামক দিব্যাস্ত্র লাভ করেন। মহাদেব তাকে সশরীরে স্বর্গে যাবার আশীর্বাদ দেন। তিনি ছিলেন অনন্য পরাক্রমী ও নীতিজ্ঞ বীর। তিনি জীবনে কখনো ভাইদের আজ্ঞাপালনে অথবা ধর্মকে উলঙ্ঘন করেন নি । পরন্তু যুদ্ধে পিতামহ ভীস্ম, দ্রোণাদি গুরুজনদের দেখে তিনি মোহাচ্ছন্ন ও শোকবিহ্বল হয়ে ওঠেন। ঐ অবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে গীতার উপদেশ প্রদান করেন।

12.1

এবং(ম্) সততয়ুক্তা য়ে, ভক্তাস্ত্বাং(ম্) পর্য়ুপাসতে য়ে চাপ্যক্ষরমব্যক্তং(ন্), তেষাং(ঙ্) কে য়োগবিত্তমাঃ।।1।।

যে সকল ভক্ত নিবিষ্ট চিত্তে নিরন্তর আপনার (সগুণ ভগবানের) উপাসনা করেন, এবং যাঁরা অবিনাশী নিরাকারের উপাসনা করেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোগী কে?

12.1 পূর্ববর্তী একাদশ অধ্যায়ে ভগবান অর্জুনকে বিশ্বরূপ দর্শন করান। এখানে অর্জুন তাঁর কাছে জানতে চায় ভক্তিমার্গ আর জ্ঞানমার্গ -এই দুয়ের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ, সগুন সাকারের সরল উপাসনা নাকি নির্গুন নিরাকারের সাধনা? 

12.2

শ্রী ভগবানুবাচ

ময়‍্যাবেশ্য মনো য়ে মাং(ন্), নিত্যয়ুক্তা উপাসতে
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাঃ(স্), তে মে য়ুক্ততমা মতাঃ।।2।।

শ্রীভগবান বললেন—আমাতে মন নিবিষ্ট করে নিত্য-নিরন্তর আমাতে যুক্ত হয়ে যেসব ভক্ত পরম শ্রদ্ধা সহকারে আমার (সগুণ-সাকারের) উপাসনা করেন আমার মতে তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী ।

12.2 ভগবান বলছেন, যিনি মনকে আমার প্রতি একাগ্র করে নিত্যযুক্ত অবস্থায় শ্রদ্ধাপূর্বক আমার উপাসনা করেন সেই ভক্ত আমার প্রিয়। 
এখানে নবধা ভক্তির উল্লেখ করা যায়-
১. শ্রবণম্ - রাজা পরীক্ষিত,
২. কীর্তনম্ - শুকদেব
৩. স্মরণম্ - ভক্ত প্রহ্লাদ 
৪. পাদসেবনম্ - লক্ষীদেবী
৫. অর্চণম্ - রাজা পৃথু
৬. বন্দনম্ - অক্রুর 
৭  সখ্য - অর্জুন,  এবং 
৮. আত্মনিবেদন - বলি রাজা। 

12.3

য়ে ত্বক্ষরমনির্দেশ্যম্, অব্যক্তং(ম্) পর্য়ুপাসতে
সর্বত্রগমচিন্ত্যং(ঞ্) চ, কূটস্থমচলং(ন্) ধ্রুবম্।।3।।

যাঁরা সম্পূর্ণরূপে নিজ ইন্দ্রিয় বশীভূত করে অচিন্ত্য, সর্বত্র পূর্ণভাবে অবস্থিত, অনির্দেশ্য, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব,।

 

12.4

সন্নিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং(ম্), সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ
তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব, সর্বভূতহিতে রতাঃ।।4।।

অক্ষর এবং অব্যক্তের একাগ্রের সঙ্গে উপাসনা করেন, সেই প্রাণীমাত্রেরই হিতপরায়ণ এবং সর্বত্র সমবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ আমাকেই প্রাপ্ত হন।

12.3- 12.4 - ভগবান নিরাকার স্বরূপের আটটি লক্ষ্মণের কথা বলেছেন - অক্ষর, অনির্দেশ্য, অব্যক্ত,সর্বত্র, অচিন্ত্য, কূটস্থ, অচল এবং ধ্রুব। নিরাকার ভক্তির জন্য প্রথম আবশ্যক হলো ইন্দ্রিয় সংযম (পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়)। যিনি সর্বদা সকলের মধ্যে  সমভাব দেখেন এবং সকল প্রাণীর হিতের জন্য কাজ করেন তিনি আমাকে প্রাপ্ত হন।

12.5

ক্লেশোধিকতরস্তেষাম্, অব্যক্তাসক্তচেতসাম্
অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং(ন্), দেহবদ্ভিরবাপ্যতে।।5।।

অব্যক্তে (নির্গুণ ব্রহ্মে) আসক্তচিত্ত সেই সাধকদের (নিজ নিজ সাধনে) অধিক ক্লেশ হয়ে থাকে, কারণ দেহধারী ব্যক্তিদের অব্যক্তের প্রাপ্তি কষ্টে লাভ হয়।

12.5 ভগবান বলেন, নিরাকারের উপাসনা বড় কঠিন। সাকারের ধ্যান করা সহজ। আত্মদেহাভিমানযুক্ত হয়ে জ্ঞানমার্গের সাধনা বড় কঠিন।

12.6

য়ে তু সর্বাণি কর্মাণি, ময়ি সন্ন্যস্য মত্পরাঃ
অনন্যেনৈব য়োগেন, মাং(ন্) ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।6।।

কিন্তু যাঁরা সমস্ত কর্ম আমাতে অর্পণ করে, মৎ-পরায়ণ হয়ে অনন্যভাবে আমারই ধ্যান বা উপাসনা করেন।

12.6 তিনি বলেন, সকল কর্ম আমাকে অর্পণ করে, যিনি কেবলমাত্র আমারই ধ্যান করেন তিনি আমার প্রিয়। 

12.7

তেষামহং(ম্) সমুদ্ধর্তা, মৃত্যুসংসারসাগরাত্
ভবামি নচিরাত্পার্থ, ময়‍্যাবেশিতচেতসাম্।।7।।

হে পার্থ ! আমাতে সমর্পিত চিত্ত সেই ভক্তদের আমি মৃত্যুরূপ সংসার-সমুদ্র থেকে শীঘ্রই উদ্ধার করে থাকি।

12.7 শাস্ত্রে পঞ্চদেবতার উপাসনার কথা বলা হয়েছে- বিষ্ণুর উপাসনা, দেবীর উপাসনা, গনেশ উপাসনা, শিবের উপাসনা এবং সূর্যদেবতার উপাসনা। গীতায় মাম্ শব্দের অর্থ ইষ্ট ভগবান সম্বন্ধিত। আমরা ভগবানের যে রূপ বিশ্বাস করি সেই রূপেই তাঁর উপাসনা করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, অনন্যতার সাথে,নিরন্তরতার সাথে ইষ্টের পূজনকারী ভক্ত অবশ্যই আমাকে প্রাপ্ত হন। 
ভক্তির নিরন্তরতার একটি দৃষ্টান্ত -
এক পরিবারে দুই জা ছিল। বড় জায়ের পুত্র ছিলো না। ছোট জায়ের এক পুত্র ছিলো। একদিন বড় জা এক সাধু মহারাজকে পুত্র প্রাপ্তির উপায় জিজ্ঞাসা করে। সাধুজি বলেন, আমি তোমাকে ভগবান শিবজীর একটি মন্ত্র বলে দিচ্ছি, এক বৎসর প্রতিদিন মন্দিরে গিয়ে প্রদীপ জ্বেলে এই মন্ত্র বলতে হবে,একদিন বাদ গেলে পূনরায় এক বৎসর এই ব্রত পালন করতে হবে।  
তখন থেকে বড় জা প্রতিদিন মন্দিরে গিয়ে প্রদীপ জ্বেলে শিবের পূজো করত, কিন্তু হিংসুটে ছোট জা পশ্চাতে  গিয়ে ঐ প্রদীপ নিভিয়ে দিত। বর্ষার সময় তিনদিন ধরে লাগাতার বৃষ্টির কারণে তৃতীয় দিন জেঠানী মন্দিরে যেতে পারলো না, মাঝপথে ফিরে এল। ঈর্ষা পরায়ণ ছোট জা কিন্তু প্রদীপ নেভানোর জন্য যথারীতি মন্দিরে হাজির হলো। তার এই নিরন্তরতা দেখে শিবজী সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং তাকে দেখা দিয়ে বরদান দিতে চাইলেন। শিব ভগবানের দর্শনে ছোট জায়ের মনের ঈর্ষাভাব দূর হয়ে গেল, সে তখন শিবের কাছে বড় জায়ের জন্য পুত্র প্রার্থনা করলো। 

ভগবান রাম শবরীকে বলেছিলেন -
"মম দরশন ফল পরম অনুপা
জীব পায় নিজ সহজ স্বরূপা "। 

12.8

ময়‍্যেব মন আধত্স্ব, ময়ি বুদ্ধিং(ন্) নিবেশয়
নিবসিষ্যসি ময়‍্যেব, অত ঊর্ধ্বং(ন্) ন সংশয়ঃ।।8।।

তুমি আমাতে মন নিবিষ্ট কর এবং আমাতেই বুদ্ধি নিয়োগ কর ; তাহলে তুমি আমাতেই বাস করবে (স্থিতিলাভ করবে) এতে কোনো সন্দেহ নেই ।

12.8  ভগবান বলছেন, যে ভক্ত নিজের মন ও বুদ্ধি কেবল আমাতে নিয়োজিত করেন তিনি আমাকেই প্রাপ্ত হন। পরম শ্রদ্ধেয় স্বামী রামসুখদাসজি এই প্রসঙ্গে বলেছেন, কিছু সময় পর পর বলতে থাকো-
হে নাথ, ম্যায় তুম্হে ভূলূ নহী । 

12.9

অথ চিত্তং(ম্) সমাধাতুং(ন্), ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্
অভ্যাসয়োগেন ততো, মামিচ্ছাপ্তুং(ন্) ধনঞ্জয়।।9।।

যদি তুমি আমাতে চিত্ত অচলভাবে স্থির (অর্পণ) করতে সক্ষম না হও, তাহলে হে ধনঞ্জয় ! অভ্যাসযোগের সাহায্যে তুমি আমাকে পাবার চেষ্টা কর।

12.9 ভগবান বলেন, অভ্যাসের দ্বারা সব কিছুই সম্ভব হয়।
"রাম রাম রটতে রহো জব তক ঘটমে প্রাণ 
কভীতো দীনদয়াল কী ভমক পড়েগী কান।। "
নিত্য পূজা, মালাজপ ইত্যাদি শুদ্ধ আসনে বসে করা উচিত, কিন্তু ২৪ ঘন্টার ভজন নামস্মরণ কেবলমাত্র একাগ্র ভাবে যেকোন অবস্থায় করা যায়। 

12.10

অভ্যাসেপ্যসমর্থোসি, মত্কর্মপরমো ভব
মদর্থমপি কর্মাণি, কুর্বন্ সিদ্ধিমবাপ্স্যসি।।10।।

যদি তুমি অভ্যাসযোগেও অসমর্থ হও তবে আমার জন্য কর্মপরায়ণ হও। আমার জন্য কর্ম করতে থাকলেও তুমি সিদ্ধিলাভ করবে।

12.10 ভগবান আরও বলছেন, যদি তাও করতে না পারো তবে যা কিছু করছো সব আমাকে অর্পণ করে দাও। "শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু" ভাবপূর্বক বলার মাধ্যমে সবকিছুই ভগবানে অর্পিত হয়ে যায়। 

12.11

অথৈতদপ্যশক্তোসি, কর্তুং(ম্) মদ্যোগমাশ্রিতঃ
সর্বকর্মফলত্যাগং(ন্), ততঃ(খ) কুরু য়তাত্মবান্।।11।।

যদি তুমি আমার যোগের (সমত্বের) আশ্রিত থেকে এইগুলিও (পূর্বশ্লোকে কথিত সাধনগুলি) করতে অসমর্থ হও তাহলে মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করে সমস্ত কর্মফলের ইচ্ছা ত্যাগ কর।

12.11 ভগবান বলছেন, সকলপ্রকার কর্মফলের আশা ত্যাগ করে মদ্গতচিত্ত হয়ে কর্তব্য করে যাওয়াই তোমার কাজ। 
" তুলসী মেরে রাম কো রোজ ভজ য়া খীজ
ভৌম পড়া জামে সভী  উল্টা -সীধা বীজ।।"
জমিতে বীজ ফেলার সময় উল্টো সোজা  যেভাবেই পড়ুক না কেন, সময়ে সব বীজই অঙ্কুরিত হয়। 
ভায়ঁ অভায়ঁ অনখ আলস হুঁ
নাম জপত মঙ্গল দিসি দশহুঁ।।
ভালো ভাব (প্রেম), মন্দ ভাব (বৈরী), ক্রোধ বা আলস্য- যে ভাবেই নাম জপ করো না কেন সর্বত্র কল্যাণই হয়। 

12.12

শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্, জ্ঞানাদ্ধ্যানং(ব্ঁ) বিশিষ্যতে।
ধ্যানাত্কর্মফলত্যাগঃ(স্),ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্।।12.12।।

অভ্যাসের থেকে শাস্ত্রজ্ঞান শ্রেষ্ঠ, শাস্ত্রজ্ঞান থেকে ধ্যান শ্রেষ্ঠ, ধ্যানের থেকে সমস্ত কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কারণ কর্মফল ত্যাগের সাহায্যে অচিরাৎ পরম শান্তি লাভ হয়।

12.12 নিস্কামভাবে সর্বকর্মফলত্যাগপূর্বক কর্মই আমাদের পক্ষে শ্রেয়ঃ। পরবর্তী ১৩ থেকে ২০ নং শ্লোকে ভগবান ভক্তের ৩৯টি লক্ষণ সম্বন্ধে বলেছেন। ভক্তির সামান্য এবং প্রচলিত লক্ষণ ভিন্ন ভগবানের নিজস্ব সূত্র ও মানদণ্ড রয়েছে, আগামী আলোচনা সভায়  সেসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
পরিশেষে "হরি শরণম্" নাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে অদ্যকার বিবেচন সভার সমাপণ হল।