विवेचन सारांश
সমত্ব বুদ্ধি এবং কর্মযোগ দ্বারা সচ্চিদানন্দ প্রাপ্তি
শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্।।২.০৭
তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আত্মতত্ত্বের মূল তত্ত্বের কথা বললেন। আত্মা সম্পর্কে ভগবান বলেছেন যে এটি চিরন্তন, অবিনশ্বর, একে হত্যা করা যায় না বা জ্বালানোও যায় না, মনুষ্যের দেহ মারা যায়, যার জন্য শোক করা উচিত নয়। পরের অধ্যায়ে, ভগবান আত্মার পরিচয় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়টিকে "সূচী অধ্যায়" বলা হয়, কারণ এতে সংক্ষেপে সমগ্র গীতার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। এ পর্যন্ত সাংখ্য যোগের সারমর্ম ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এরপর ভগবান কর্মযোগের কথা বলবেন। এটি এমন একটি যোগ যার অনুশীলন কারো ক্ষতি করে না এবং এ বৃথাও যায় না।
বৃত্তিমূলক বুদ্ধি বা স্থিরবুদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, যার সাহায্যে পরমাত্মা, সচ্চিদানন্দকে প্রাপ্ত করা যায়। এটি কেবল মানুষ্য যোনিতেই সম্ভব কারণ একমাত্র মানুষই এমন একটি প্রাণী যার চিন্তা করার বুদ্ধি আছে। অর্থাৎ সৎকর্ম করার ক্ষমতা তার আছে, অন্যথায় সে তো এক পশুর মতো।
"ধর্মেণহীন: পশুভি: সমান:"
ধর্ম বা কর্তব্য কিভাবে পালন করলে ভগবদ প্রাপ্তি করা যাবে ?
2.42
য়ামিমাং(ম্) পুষ্পিতাং(ব্ঁ) বাচং(ম্), প্রবদন্ত্য়বিপশ্চিতঃ।
বেদবাদরতাঃ(ফ্) পার্থ, নান্য়দস্তীতি বাদিনঃ॥2.42॥
কামাত্মানঃ(স্) স্বর্গপরা, জন্মকর্মফলপ্রদাম্
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং(ম্), ভোগৈশ্বর্য়গতিং(ম্) প্রতি॥43॥
ভোগৈশ্বর্য়প্রসক্তানাং(ন্),তয়াপহৃতচেতসাম্
ব্য়বসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ(স্), সমাধৌ ন বিধীয়তে॥44॥
অবিপশ্চিত: অর্থাৎ যারা অস্থিরচিত্ত, যারা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। কেন এমন হয় ? মন যখন সুন্দর কথার জালে জড়িয়ে যায় এবং তাকেই সত্য ভেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
বেদ শাস্ত্রে সুখ প্রাপ্তির অনেক উপায় বলা হয়েছে, কি করলে স্বর্গের সুখ পাওয়া যায়? একজন বিবেকহীন ব্যক্তি এটিকেই সবচেয়ে বড় সুখ বলে মনে করে এবং এর বন্ধনে আটকে যায়। বেদ আমাদের মা এবং একজন মা যেমন সর্বদা তার সন্তানের মঙ্গলকামনা করেন, সেইপ্রকার বেদও আমাদের কল্যাণ চায়, কিন্তু একজন মানুষ যদি তার মায়ের প্রতি ভালবাসায় আটকে যায় তবে সে সন্তানই থেকে যাবে, উন্নতি কীভাবে করবে? মায়ের সাথে আমাদের তো থাকতে হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি আমাদের লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। শুধু সুখে ডুবে থাকলে হবে না, সুখের অধীন হয়ে আমরা কীভাবে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাই, তা একটি উদাহরণ দ্বারা বোঝা যাবে।
গ্রীষ্মে পরীক্ষার সময় দুই বন্ধু একসাথে পড়াশোনা করে, তাদের একজনের বাড়িতে রুম কুলার আছে, তবুও সে ছাদের ঘরে গরমের মধ্যে বসে পড়াশোনা করে কারণ কুলারের ঠান্ডা হাওয়ায় সে ঘুমিয়ে পড়লে সে তার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে এবং জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্য থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।
বেদে অনেক প্রকার ক্রিয়ার বিবরণ আছে, যা সম্পন্ন করলে স্বর্গের সুখও পাওয়া সম্ভব, কিন্তু পরমাত্মা তত্ত্ব পাওয়া সম্ভব নয়। এর অর্থ এই নয় যে বেদ ভুল। বেদ ভুল নয়, আমাদের এর তাৎপর্য বুঝতে হবে এবং স্থিরবুদ্ধি হয়ে কাজ করতে হবে। এখানে ভগবান অর্জুনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন যে বেদকে রক্ষা করতে হবে, এর পালন করতে হবে এবং এর যা নিহিত আছে, তা আমাদের নিজের আচরণে প্রয়োগ করতে হবে, কতদিন তুমি মায়ের আঁচলের নীচে থাকবে? আর কতকাল সুখের সমুদ্রে ডুবে থাকবে? পরম লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য জাগতিক সুখ-সমৃদ্ধিকে বিস্মৃত হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
ত্রৈগুণ্য়বিষয়া বেদা, নিস্ত্রৈগুণ্য়ো ভবার্জুন
নির্দ্বন্দ্বো নিত্য়সত্ত্বস্থো, নির্য়োগক্ষেম আত্মবান্॥45॥
নির্যোগ ক্ষেম: যোগক্ষেমের চিন্তা ত্যাগ করে আমরা যখন পরমাত্মা তত্ত্বের পথে চলি তখন আমাদের চিন্তা স্বয়ং ভগবান করবেন, নবম অধ্যায়ে ভগবান বলেছেন- "যোগক্ষেমং বহাম্যহম্"।
যোগ মানে অপ্রাপ্যকে প্রাপ্ত করা এবং ক্ষেম মানে যা অর্জিত হয়েছে তা রক্ষা করা।
যে ব্যক্তি ভাড়া বাড়িতে থাকে, সে তার নিজস্ব বাড়ি বানাবার আশা রাখে, এ হলো যোগ। তার সেই বাড়ি যেন টেকসই হয় যাতে সেই বাড়ি দীর্ঘকাল মজবুত থাকে, বাড়ির দেখাশুনো করা হলো ক্ষেম। গুণাতীত এসব অতিক্রম করেছেন। তিনি জিতেন্দ্রিয়, যাঁর ইন্দ্রিয় এবং ইচ্ছার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে ভগবান আত্মসংযম করার জন্য জ্ঞান প্রদান করে ব্যাখ্যা করবেন যে, কীভাবে একজন মানুষ জিতেন্দ্রিয় হতে পারেন, আত্মবান হয়ে উঠতে পারবেন। প্রকৃতির তিনটি গুণের চিন্তন ত্যাগ করে, আমাদের সাক্ষীভাব নিয়ে দেখতে হবে এবং শিখতে হবে যে কোন গুণটি কার উপর আধিপত্য বিস্তার করে।
"বেদঃ সর্ব হিতার্থায় " জ্ঞানীরা সকলের কল্যাণের জন্য বেদের প্রয়োগ করেন এবং যিনি সকলের কল্যাণ কামনা করেন তাকে যোগী বলা হয়।
য়াবানর্থ উদপানে, সর্বতঃ(স্) সম্প্লুতোদকে
তাবান্সর্বেষু বেদেষু, ব্রাহ্মণস্য় বিজানতঃ॥46॥
যেমন, কোনো বড় জলাশয়ের ধারে বা গঙ্গার তীরে বসে কেউ তার বাড়ির জলের নল বা জলের কোনও ছোট উৎসের কথাও চিন্তাও করে না, কারণ তিনি জলের মহাস্রোতের খোঁজ পেয়ে গেছেন। একইভাবে একজন পরম জ্ঞানী বেদের উপযোগ অন্যের কল্যাণের জন্য করেন। তিনি ছোট ছোট আনন্দপ্রাপ্তির অহেতুক কামনা করেন না এবং তিনি এসব দ্বারা প্রভাবিতও হন না। সচ্চিদানন্দ প্রাপ্তির পর, তার নিজের জন্য বেদের প্রয়োজন নেই, তিনি নিজের জন্য কিছু চান না, তার অভীষ্ট কেবল পরমার্থ।
কর্মণ্য়েবাধিকারস্তে, মা ফলেষু কদাচন
মা কর্মফলহেতুর্ভূ:(র্), মা তে সঙ্গোऽস্ত্বকর্মণি॥47॥
এর চারটি চরণে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা হয়েছে:-
1. কর্মণি এব তে অধিকার: আমাদের শুধুমাত্র কাজ করার অধিকার বা ক্ষমতা আছে। কর্মের পরিমাণের ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই।
2. মা ফলেষু কদাচন -- আমাদের ফলের প্রত্যাশা করার অধিকার নেই। কর্ম করলে অবশ্যই ফল পাওয়া যায়। আমাদের কর্ম কখন এবং কতখানি করতে হবে তার ওপরও কোনো অধিকার আমাদের নেই। মন, বুদ্ধি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্যে আমরা কর্ম তো করতে পারি, কিন্তু কর্মফল আমাদের বশে থাকে না। যদি ফলই না পাওয়া যায়, তাহলে কাজ করার প্রেরণা কি করে আসবে?
3. মা কর্ম ফল হেতুর্ভু - আমরা যদি কাজই না করি তাহলে ফল পাওয়ার আশা করাই বৃথা, সুতরাং, আমাদের ফলের আশা না রেখেই কাজ করা উচিত। এর অর্থ এই নয় যে আপনি চাকরি করুন বা ব্যবসাই করুন, তাতে যা আয় হবে বা যে সুখ আপনি প্রাপ্ত করবেন, সেটি ত্যাগ করে দেওয়া উচিত, তবে এটাও ঠিক যে এর আশা করে আপনার কাজ করা উচিত নয়।
যেমন, একটি বালক কোন সাহায্য ছাড়াই তার পড়াশোনা করে, জ্ঞান অর্জন করাই তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য, সে কোন লোভের জন্য পড়াশোনা করে না বরং সে নিজের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য পড়াশোনা করে। অন্যদিকে, অন্য একটি বালক পড়াশুনা করতে বসে না যতক্ষণ না তার মা তাকে চকোলেট বা আইসক্রিম দিয়ে তাকে পড়ার জন্য প্রলুব্ধ করেন। সেই বালকটি প্রলোভনে পড়েই লেখাপড়া করে। ফল পাব না বলে কি আমাদের কাজই করা উচিত নয়?
4. মা তে সংগোস্ত্ব কর্মণি -- না, অকর্মণ্য হয়ে থাকা ঠিক নয়। আমাদের অভীষ্ট সকলের কল্যাণ কামনা হওয়া উচিত, জ্ঞানের মর্ম বুঝে তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, আমরা এইরকম ফলের আশা করতে পারি। কিন্তু আমরা যদি স্বার্থপরের ন্যায় সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন হয়ে শুধুমাত্র নিজের জন্য সুখ কামনা করি, সেটা ঠিক হবে না।
বিপ্লবী বীর সাভরকর একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, লেখক এবং কবিও ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে তার পড়াশুনা যদি দেশের কোনো উপকারে না লাগে তবে তা বৃথা। দেশকে স্বাধীন করা এবং দেশের নাম উঁচু করারই তার মনের সর্বপ্রথম ইচ্ছা ছিল ।
সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ, সর্বে সন্তু নিরাময়া। সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু, মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ্ভবেৎ।।
সকলের কল্যাণ হোক, সাধু মহাত্মাগণের এই অভীষ্টই হওয়া উচিত।
শুধুমাত্র নিজের কল্যাণ চাওয়া হলো, একটি সংকীর্ণ ফলের প্রত্যাশা করা, কিন্তু ফল যখন প্রসারিত করা হয়, তখন এটি "আমি"-র উপরে উঠে যায় এবং অভীষ্টে পরিণত হয়। আত্মকেন্দ্রিক
(ego centric) হওয়া উচিত নয় কারণ স্বার্থপর মানুষ অভীষ্ট প্রাপ্ত করতে পারে না তাই আমাদের পরোপকারী (geo centric) হওয়া উচিত।
Ego এবং Geo তে একই অক্ষর আছে, কিন্তু Ego হল স্বার্থপরতার সূচক এবং এর বিপরীত Geo হল পরমার্থের সূচক।
য়োগস্থঃ(খ্) কুরু কর্মাণি, সঙ্গং(ন্) ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয়।
সিদ্ধ্য়সিদ্ধ্য়োঃ(স্) সমো ভূত্বা, সমত্বং(য়্ঁ) য়োগ উচ্য়তে॥2.48॥
যোগস্থ- যোগের মধ্যে স্থিত হয়ে, পরমাত্মার সাথে নিজেকে একাত্ম করে দেওয়া, ভারত মাতাকে বিশ্বগুরুর স্থানে উপস্থাপন করা, তাকে সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা, আমাদের অভীষ্ট হওয়া উচিত। কর্তব্য করে যেতে হবে। এর প্রাপ্তি কবে হবে তা নিয়ে চিন্তন করা উচিত নয়। এই কাজ কি শেষ করা যাবে ? আমাদের এসব কথা না ভেবে শুধু কাজ করে যেতে হবে।
বিপ্লবী সর্দার ভগৎ সিংকে যখন ফাঁসিতে ঝোলাবার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন তিনি বলেছিলেন- যতবারই ফাঁসি দেওয়া হোক না কেন, তিনি প্রতিবারই জন্ম নেবেন এবং ভারত মাতার মুক্তির জন্য লড়তে থাকবেন, কারণ তখন ভারতের স্বাধীনতাই ছিল একমাত্র উদ্দিষ্ট লক্ষ্য, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। যোগ অর্থাৎ সমত্ব, সমভাবে স্থিত থাকা। ফুলের কোমল স্পর্শই হোক বা কাঁটা বিঁধে যাওয়ার যন্ত্রণা হলেও, পাহাড় রূপী বাধা এলে বা পাথরের বৃষ্টি হলেও, প্রতিনিয়ত কর্তব্যরত থাকাকেই যোগ বলে।
समत्व चित्ताचें, ये च सार मानवावे
সাধক জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছেন, লাভ-ক্ষতির চিন্তা না করে কাজ করে যেতে হবে, তাতেই আনন্দ প্রাপ্ত করতে হবে। মা যখন ভালো খাবার রান্না করেন, তখন তিনি সেই কাজ করেই আনন্দ ও তৃপ্তি পান। কর্মকে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা নয়, কর্ম করে সুখ প্রাপ্ত করাই প্রকৃত সমাধি, প্রকৃত যোগ।
দূরেণ হ্য়বরং(ঙ্) কর্ম, বুদ্ধিয়োগাদ্ধনঞ্জয়
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ, কৃপণাঃ(ফ্) ফলহেতবঃ॥49॥
বুদ্ধিয়ুক্তো জহাতীহ, উভে সুকৃতদুষ্কৃতে
তস্মাদ্য়োগায় য়ুজ্য়স্ব, যোগঃ(খ্) কর্মসু কৌশলম্ ॥50॥
আমরা যখন আমাদের সঞ্চিত পুঁজির হিসাব রাখি, সেখানে টাকা জমার পাশাপাশি খরচেরও হিসেবে লেখা হয়। জমাকৃত অর্থ থেকে খরচ বাদ দিয়ে লাভ-ক্ষতি জানতে পারি এবং এভাবেই আমাদের হিসাব চলতে থাকে। পাপ ও পুণ্যের হিসাব কিছুটা আলাদা। আমরা যত ভালো কাজ করেছি তার হিসাব আমাদের পুণ্যের পুঁথিতে চলে যায় এবং আমাদের পূর্বের পুণ্যগুলোও সেখানে জমা হয়, আমাদের তা ভোগ করতে হয়। একইভাবে, আমাদের দুষ্কর্মগুলি পাপের খাতায় জমা হয়ে যায় এবং আমাদের তা ভোগ করতে হয়। সৎকর্ম করতে গিয়ে যদি কোনো দোষ বা ভুল হয়ে যায়, তাহলে সেগুলিও পাপের খাতায় জমা হয়ে যায়। আমরা যেমন সঞ্চয় থেকে খরচ কমাতে পারি, তেমনি কিন্তু পুণ্য থেকে পাপ কমাতে পারি না, এই দুটোই আমাদের ভোগ করতে হয়, পুণ্য বেশি হলে পাপ কমে না, তা ভোগ করতে হলে আবার জন্ম নিতে হয় এবং পুনঃ কর্ম করতেই হয়। তৃতীয় অধ্যায়ে কর্মযোগের মাধ্যমে এই বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
নিষ্কাম কর্ম করে ভুলে যেতে হয়। তাহলে পাপ-পুণ্যের কোনো হিসেব থাকে না এবং মুক্তি লাভ হয়। কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চাইলে কর্মযোগ গ্রহণ করতে হবে। সুতরাং, নিজের কর্ম করুন। এটাই মুক্তির একমাত্র সরল উপায়, এটিই কাজ করার কুশলতা। কিন্তু চুরি করার ক্ষেত্রে চোরের যে দক্ষতা, তা কখনোই কর্ম যোগ হতে পারে না কারণ এটি নিষ্কাম কর্ম নয়। কর্ম সম্পাদনের সময়ে যোগের চিন্তন করা এবং নিজের অভীষ্ট স্মরণে রাখাই হলো কর্ম কুশলতা।
কর্মজং(ম্) বুদ্ধিয়ুক্তা হি, ফলং(ন্) ত্য়ক্ত্বা মনীষিণঃ
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ(ফ্), পদং(ঙ্) গচ্ছন্ত্য়নাময়ম্॥51॥
বিবেচন: ফলের চিন্তা ত্যাগ করে কর্তব্যভাব নিয়ে কর্ম কর। ঋষিগণ কর্মযোগে যুক্ত হয়ে ফল ত্যাগ করেন। ত্যাগ মানেই সবকিছু ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং ফলের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া। জন্ম হলে মৃত্যু হবেই, এটি একটি অন্তহীন চক্র। মানুষ এটা বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর পরে মুক্তিলাভ হয়, কিন্তু এমন নয়। এই দেহে বাস করেও কর্মফল ত্যাগ করে মুক্ত হওয়া যায়। পরমার্থ প্রাপ্ত করে যখন লক্ষ্যে পরিণত হয়ে যায়, তখন সুখ-দুঃখ বা অন্য কোনো সংকটের পরিণামের চিন্তা থাকে না এবং তখন নির্ভয়ে পরমাত্মা তত্ত্ব প্রাপ্ত করা যায়। এটি পরমতত্ত্ব একমাত্র মনুষ্যই অনুভব করতে পারে ও প্রয়োগ করতে পারে। এই জ্ঞানই ভগবান নবম অধ্যায়ে রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ রূপে বলেছেন।
য়দা তে মোহকলিলং(ম্), বুদ্ধির্ব্য়তিতরিষ্য়তি
তদা গন্তাসি নির্বেদং(ম্), শ্রোতব্য়স্য় শ্রুতস্য় চ॥52॥
শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে, য়দা স্থাস্য়তি নিশ্চলা
সমাধাবচলা বুদ্ধি:(স্),তদা যোগমবাপ্স্য়সি॥53॥"
এক শহরে একজন কীর্তনকার কীর্তন করছেন, অনুষ্ঠানের পর অত্যন্ত সুস্বাদু খাবারেরও আয়োজন করা হয়েছিল। তার গানে মুগ্ধ হয়ে পরের বছর তাকে আবার একই শহরে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যখন তারা তাদের সহকর্মীদের সাথে সেই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তাদের একজনের মনে পড়ল সুন্দর কীর্তন আর অন্যজনের মনে পড়ল সুস্বাদু খাবার কারণ তার মন খাবারে আটকে গেল। এই যে খাবারের প্রতি আসক্তি এখন সে একই খাবার পেলে সুখী নাহলে দুঃখ পায়। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমাদের মন যা বিক্ষিপ্ত, তাকে ভারসাম্যের দিকে নিয়ে আসা, স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজন।
দুঃখে ডুবে যাবে না, সুখের মধ্যে থাকবে না
এখন অর্জুনের মনে এই প্রশ্ন জেগে উঠলো যে মানুষ এত স্থিরবুদ্ধি নিয়ে বাঁচবে কী করে? একেই কি স্থিতপ্রজ্ঞ বলে? তাঁর পরিচয় কি? আগামী বিবেচনে এই সব প্রশ্নের নিবারণ করা হবে। এই অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ বিবেচন সত্রের পর একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্নোত্তর পর্ব :
প্রশ্নকর্তাঃ মিঃ কৃষ্ণ ভট্ট
প্রশ্নঃ তৃপ্তি অনুভব করা যায়, কিন্তু জীবাত্মা কি আনন্দ অনুভব করতে পারে?
উত্তর: সুখের বিপরীত শব্দ দুঃখ, কিন্তু আনন্দের কোনো বিপরীত শব্দ হয় না। যখন বুদ্ধি শুদ্ধ হয়ে ভগবানের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটিই সচ্চিদানন্দের প্রাপ্তি, যা জ্ঞানীরা অনুভব করতে পারে।
প্রশ্নঃ আশীর্বাদ চাওয়াকে ফলের আশা করা বলা যায় কি ?
উত্তর: বড়দের কাছে আশীর্বাদ চাওয়া আমাদের অধিকার। সমর্পিত ভাব নিয়ে, নতমস্তকে আশীর্বাদ চাওয়া যায়। জীবনরূপী জ্বরের অবস্থায় পরমাত্মাতত্ত্ব প্রাপ্ত করা দুধের মধ্যে চিনি মেশানোর মতো। এটা বেদ থেকে শেখা যায়। ভগবদ্গীতা বেদান্তের সাথে আছে।
প্রশ্নকর্তা: শ্রী নরেন্দ্র প্রসাদ
প্রশ্ন: তৃতীয় অধ্যায়ে, ঈশ্বর কর্ম সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন (উনিশ, বাইশ, বাইশ এবং তেইশতম শ্লোক), যে আত্মতৃপ্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে একরূপ হয়ে যেতে এবং নিজের কোনো ইচ্ছা ত্যাগ করতে, তাহলে আমাদের কি করা উচিত ? ।
উত্তর: নিজের জন্য কিছু করার প্রয়োজন নেই, তবে অন্যের হিতের জন্য তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যখন কারুর সন্তানের বিয়ে হয়ে যায়, তখন সে তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এর অর্থ এই নয় যে সে তার বন্ধু বা আত্মীয়কে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। স্বয়ং ভগবান, ত্রিভুবনের হয়েও, গোকুলে গোয়ালা রূপে তাঁর নিজের দায়িত্ব পালন করে গরু লালন পালন করেছিলেন এবং মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুনের সারথিও হয়েছিলেন, রথের ঘোড়াগুলিরও যত্ন নেন। ভগবানের এই সব করার দরকার ছিল না, কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত যোগী ছিলেন, তাই মানুষের কল্যাণের জন্য কর্তব্য পালনে কোনো ক্ষতি নেই।
প্রশ্নকর্তাঃ শ্রী লক্ষ্মী নারায়ণ
প্রশ্নঃ আমরা যখন কোন পাপ করি, গুরু তার প্রতিকার বলে দেন, তাহলে কি আমাদের ফল ভোগ করতে হবে না?
উত্তর: পাপ ও পুণ্য পূর্ব কর্মের ফলস্বরূপ হতে পারে, এগুলোকে প্রারব্ধ কর্ম বলে। বেদে এমন পদ্ধতি আছে যার দ্বারা তাদের প্রভাব হ্রাস করা যায়।
প্রারব্ধ তিন প্রকারের-
- ধীর প্রারব্ধ
- মধ্যম প্রারব্ধ
- তীব্র প্রারব্ধ
কৃষ্ণ বন্দনার মাধ্যমে আজকের বিবেচন সত্র সমাপ্ত হয়।