विवेचन सारांश
স্থিতপ্রজ্ঞ জ্ঞানী পুরুষের লক্ষণ এবং আচরণ

ID: 1999
बंगाली - বাংলা
রবিবার, 27 নভেম্বর 2022
অধ্যায় 2: সাংখ্যযোগ
5/5 (শ্লোক 54-72)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ মাননীয় শ্রীনিবাস বর্ণেকর মহাশয়


 শ্রী কৃষ্ণ প্রার্থনা ও দীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে আজকের বিবেচন সত্র শুরু হয়। গুরু বন্দনা, জগদ্গুরু শ্রী কৃষ্ণের বন্দনা ও ভারত মাতার বন্দনাও করা হয়। সেই সঙ্গে গীতা মাতা ও মহর্ষি বেদ ব্যাসকে প্রণাম করা হয়। পরিশেষে, পরম পূজনীয় শ্রী গোবিন্দ দেব গিরি জি মহারাজের চরণে প্রণাম করা হয়। পূর্ববর্তী বিবেচন সত্রেরও উল্লেখ করা হয়েছিল যেখানে ভগবান অর্জুনকে সাংখ্য যোগের সাথে সাথে কর্ম যোগের কথা বলেছিলেন।

য়দা তে মোহকলিলং(ম্), বুদ্ধির্ব্য়তিতরিষ্য়তি
তদা গন্তাসি নির্বেদং(ম্), শ্রোতব্য়স্য় শ্রুতস্য় চ॥২.৫২

এখানে ভগবান বলেছেন যে যখন তোমার বুদ্ধি মোহ রূপী পঙ্ক অতিক্রম করবে, তখন তুমি বৈরাগ্য প্রাপ্ত করবে। বৈরাগ্য মানে কোনো প্রকার আসক্তি না থাকা, কোনো বস্তুকে আঁকড়ে না থাকা। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয় এমন কোনো বিকারে বিচলিত না হওয়া। কোন প্রকার আকর্ষণ বা প্রলোভনে বিচলিত না হওয়া।

শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে, য়দা স্থাস্য়তি নিশ্চলা
সমাধাবচলা বুদ্ধি:(স্),তদা যোগমবাপ্স্য়সি॥ ২.৫৩

ভগবান এর জন্য উপায়ও বলেছেন। ভগবান বলেছেন যখন আমাদের অন্তরাত্মা পরমাত্মার সাথে এক হয়ে যায়, তখন কোন প্রকারের প্রলোভনে বিক্ষিপ্ত হয় না এবং মন, বুদ্ধি, মন, অহং সবই পরমাত্মার সাথে একাকার হয়ে যায় এবং একেই যোগ বলে। সমাধিতে বুদ্ধি অচল হয়ে যায় অর্থাৎ বুদ্ধি যখন পরমাত্মার মধ্যে স্থির হয়ে যায়, তখন যোগের প্রাপ্তি হয়। এখানে অর্জুনের মনে একটি প্রশ্ন জাগে যে, এমন কোন ব্যক্তি কি আছে যার অন্তরাত্মা পরমাত্মায় স্থির? তাকে কিভাবে চিনতে পারবো ?

2.54

অর্জুন উবাচ

স্থিতপ্রজ্ঞস্য় কা ভাষা, সমাধিস্থস্য় কেশব
স্থিতধীঃ(খ্) কিং(ম্) প্রভাষেত,কিমাসীত ব্রজেত কিম্॥54॥

অর্জুন বললেন, হে কেশব ! সমাধিতে স্থিত পরমাত্মাকে প্রাপ্ত স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তির লক্ষণ কী ? স্থিতধী ব্যক্তি কীভাবে কথা বলেন ? কীরূপে অবস্থান করেন ? কীভাবে চলেন ?

বিবেচন: অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন, যে স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ কি কি, তাঁর সংজ্ঞা কি ? সমাধিস্থ ও স্থিতধী মানে যিনি সমাধি প্রাপ্ত করেছেন এবং পরমাত্মার সাথে একনিষ্ঠ রয়েছেন, এমন ব্যক্তি কি পরমাত্মার সাথে একরূপ হওয়ার পর বাক্শক্তিরহিত হয়ে যান? আর যদি তিনি কথা বলেন, তাহলে তিনি কি প্রকারের কথা বলেন ? তিনি কিভাবে বসেন ? তিনি কিভাবে কাজ করেন ? তাঁর লক্ষণ কি?
প্রজ্ঞা অর্থাৎ -

शुद्ध, विवेकवति बुद्धि। অর্থাৎ প্রগাঢ় এবং সম্যক জ্ঞান। যাঁর প্রজ্ঞা পরমাত্মায় স্থিত আছে, তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলে। স্বামী সমর্থ রামদাস শিবাজী মহারাজের পুত্র সম্ভাজী মহারাজকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে আপনি আপনার পিতার জীবনী দেখুন এবং তাকে অনুসরণ করুন। এইটুকু করলেই আপনার জীবন পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।

शिवरायां चे कैसे बोलणे, शिवरायांचे कैसे चालणे, शिवरायांचे सलगी देणे कैसे।

ভগবান এখানে স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ বলেছেন। ভগবান আমাদের সমস্ত সদগুণের তালিকা দিয়েছেন। এই মানবজীবনের অভীষ্টই হলো সদগুণের সাধনা।

सद्गुणों की साधना में, ध्येय-ज्योति नित जले,
संग्राम मय जीवन धरा पर, विजय रथ हम ले चले।

আমাদের অভীষ্ট দৃঢ় হওয়া উচিত। আমরা যদি বিজয়ের রথে আরোহণ করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজের মধ্যে সদগুণ (half d sadgun) আত্মস্থ করতে হবে। পরবর্তী শ্লোকগুলিতে ভগবান সিদ্ধপুরুষদের লক্ষণ কি, তা বলেছেন। এটা জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সিদ্ধপুরুষদের লক্ষণই হলো আমাদের সাধনার লক্ষ্য। সাধনার মাধ্যমে আমাদের সেই গুণগুলোই আত্মস্থ করতে হবে।

2.55

শ্রীভগবানুবাচ

প্রজহাতি য়দা কামান্, সর্বান্পার্থ মনোগতান্
আত্মন্য়েবাত্মনা তুষ্টঃ(স্), স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্য়তে॥55॥

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে অর্জুন ! যখন এই ব্যক্তি মন থেকে সমস্ত কামনা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেন এবং আত্মা দ্বারা আত্মাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, তখন তাঁকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।

বিবেচন: ভগবান বলেছেন যে ব্যক্তির মন পরমাত্মার সাথে একাত্ম হয়ে গেছে, সে তার মনের মধ্যে উদিত কামনা-বাসনা এবং ইচ্ছার সম্পূর্ণ ত্যাগ করে দেয়। তাকে আলাদা করে কোনো চেষ্টা করতে হয় না। ভগবান প্রাপ্তির কারণে তার মন সর্বদাই পরিতৃপ্ত থাকে। সে নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়। এই অবস্থা প্রাপ্ত করার জন্য একজন মানুষের উচিত তার মনকে প্রতিনিয়ত তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে নিযুক্ত রাখা। এই উদ্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হতে থাকে, যেমন একজন শিক্ষার্থীর লক্ষ্য হলো জীবনে জ্ঞান অর্জন করা, তেমনি শরীরকে সুস্থ রাখতে ব্যায়ামও করতে হয়। আমাদের স্বরূপ হলো আত্ম স্বরূপ কিন্তু যেহেতু আমরা শরীরে বাস করি, তাই শরীরকে সুস্থ রাখা প্রয়োজন এবং তার জন্য ব্যায়াম করাও আবশ্যক।

शरीरं आद्यं खलु धर्म साधनं।

আমাদের এই শরীর হলো ধর্ম পালন করার জন্য প্রদত্ত যন্ত্র। আমরা যেভাবে নিজের গাড়ির যত্ন নিই, ঠিক একইভাবে আমাদের শরীর রূপী গাড়ির যত্ন নিতে হয়।

2.56

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ(স্), সুখেষু বিগতস্পৃহঃ
বীতরাগভয়ক্রোধঃ(স্), স্থিতধীর্মুনিরুচ্য়তে॥56॥


দুঃখে অনুদ্বিগ্ন চিত্ত, সুখে স্পৃহাহীন এবং আসক্তি, ভয় এবং ক্রোধ রহিত মুনিকেই স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।

বিবেচন: ভগবান এখানে আরেকটি লক্ষণ বলেছেন যে, এমন ব্যক্তি দুঃখেও উদ্বিগ্ন হন না। প্রতিকূল পরিস্থিতি দুঃখের কারণ হয়, কিন্তু এমন ব্যক্তি দুঃখেও বিচলিত হন না। তার সুখের জন্যও কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। পরমাত্মা প্রাপ্ত করেই সে পরমানন্দ লাভ করে। যাঁর মন থেকে রাগ,আসক্তি, ভয়, ক্রোধ সমাপ্ত হয়ে গেছে, সেই স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিকে স্থিতধী বলা হয়। যিনি মনন করেন তাকে মুনি বলে। ভগবান এমন স্থিতধী মুনির লক্ষণ বললেন। যে ব্যক্তি সর্বদা ভগবানের ধ্যান, চিন্তন-মনন করে তার মনে কোন ভয় থাকে না। 

2.57



য়ঃ(স্) সর্বত্রানভিস্নেহ:(স্),তত্তত্প্রাপ্য় শুভাশুভম্
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি, তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা॥57॥

যিনি সকল বস্তু ও ব্যক্তিতে আসক্তিরহিত এবং শুভ ও অশুভ বস্তুর প্রাপ্তিতে প্রসন্ন হন না বা দ্বেষ করেন না, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।

বিবেচন: যিনি সর্বত্র সমভাব রাখেন, যিনি সকলকে সমদৃষ্টিতে দেখেন, যার সকলের প্রতি সমান স্নেহ ভাব আছে, চাঁদ যেমন সকলকে শীতল আলো দেয়, কাউকে কম নয় বা কাউকে বেশি নয়। তিনি কারুর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন না, একই প্রকারে এমন ব্যক্তি সকলকে সমানভাবে স্নেহ করেন।

चंद्रबिंब परिपूर्ण सर्वा प्रकाश देते समान,
ऐसे ज्यांचे अंतःकरण सर्वाठायी समभाव ।

সে ভালোও দেখে না আবার মন্দও দেখে না। তার সম বুদ্ধি আছে। শুভ হোক বা অশুভ হোক, দুটোকেই সমদৃষ্টিতে দেখেন। আমরা অশুভ কথাকে ঘৃণা করি কিন্তু এইপ্রকার ব্যক্তি, মনের মধ্যে কোনো ঘৃণাভাব পোষণ করেন না। যে ব্যক্তি সাধু, তাঁর মনে দ্বেষভাব থাকা অসম্ভব। দ্বাদশ অধ্যায়েও ভগবান একই কথা বলেছেন যে, যে ভক্ত সেই অদ্বেষ্টা অর্থাৎ দ্বেষ-শূন্য। সকল জীবের প্রতি তিনি দ্বেষ শূন্য ভাব পোষণ করেন। এমন ব্যক্তির প্রজ্ঞা, স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভগবান শ্রী রামকে মর্যাদা পুরুষোত্তম বলা হয়। ভগবান যখন মানব রূপে জন্ম নিলেন, তখন তিনি নিজেকে মর্যাদায় আবদ্ধ করলেন। তিনি তার শত্রু রাবণের প্রতিও দ্বেষভাব রাখতেন না। তাকে হত্যা করার পর, তিঁনি বিভীষণকে, তার ভ্রাতার শেষকৃত্য সম্পূর্ণ সম্মানের সাথে করতে বলেছিলেন। বিভীষণ বললেন, আমি রাবণকে আমার ভ্রাতা বলে মনে করি না। তখন প্রভু রাম বললেন, বিভীষণ ! তাকে আমার ভ্রাতা মনে করে শেষকৃত্য কর। শত্রুর প্রতিও মনের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ ছিলো না। আমাদের আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে কিভাবে কর্তব্য পালন করতে হয়, তা প্রভু রাম দেখিয়েছেন।

আমাদের দেশের সেনাবাহিনীও সৈন্যদের মৃত্যুর পর তাদের পূর্ণ যত্ন নেয়, এমনকি তারা শত্রু হলেও।

2.58

য়ঃ(স্) সর্বত্রানভিস্নেহ:(স্),তত্তত্প্রাপ্য় শুভাশুভম্ নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি, তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা॥57॥

কচ্ছপ যেমন আপন অঙ্গসমূহ সংহরণ করে নেয়, সেইরূপ যিনি ইন্দ্রিয়াদির বিষয় হতে ইন্দ্রিয়দের সর্বপ্রকারে সংহরণ করেন, তাঁকেই স্থিতপ্রজ্ঞ বলে জানবে।

বিবেচন: ভগবান আরও অনেক লক্ষণের ব্যাখ্যা করেছেন – যেমন কচ্ছপ, আসন্ন বিপদকে অনুধাবন করে তার সমস্ত অঙ্গ, মাথা, হাত-পা, ইন্দ্রিয়গুলিকে গুটিয়ে নিজের খোলসের মধ্যে নিয়ে নেয় , ঠিক একইভাবে জ্ঞানী ব্যক্তি তার ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় পাঁচটি বিষয় আছে- স্পর্শ, গন্ধ, স্বাদ, শব্দ ও রূপ। সাধারণত, একজন ব্যক্তি যখন বিষয়ের সংস্পর্শে আসে, তখন সে ইন্দ্রিয়ের অধীন হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন ডায়াবেটিস রোগী মিষ্টি দেখে নিজেকে আটকাতে পারে না। কিন্তু যিনি স্থিতপ্রজ্ঞ, তিনি যখন অনুভব করেন যে তিনি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের বশীভূত হয়ে যেতে পারেন, তখন তিনি নিজের ইচ্ছায় কচ্ছপের মতো ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছেন-

स्वेच्छेनेच आवरी तैसी इंद्रिय स्वाधीन होऊन ज्याचां इच्छेनुसार करिती वर्तन।

ইন্দ্রিয়গুলি এইপ্রকার ব্যক্তির অধীন। ইন্দ্রিয়, তার ইচ্ছা অনুসারে আচরণ করে। এমন ব্যক্তির প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত। 

2.59

বিষয়া বিনিবর্তন্তে, নিরাহারস্য় দেহিনঃ
রসবর্জং(ম্) রসো‌ऽপ্য়স্য়, পরং(ন্) দৃষ্ট্বা নিবর্ততে॥59॥

ইন্দ্রিয়াদির দ্বারা বিষয় উপভোগে অপ্রবৃত্ত ব্যক্তির বিষয়ভোগ নিবৃত্ত হলেও ইন্দ্রিয়াদির বিষয়াসক্তি নিবৃত্ত হয় না। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির আসক্তি পরমাত্মার সাক্ষাৎ লাভে সর্বতোভাবে দূর হয়।

বিবেচন: একজন সাধারণ মানুষ ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়ে যায় অর্থাৎ সে ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলি দূরে রাখে কিন্তু সর্বক্ষণ সেই বিষয়ের চিন্তন করতে থাকে। যেমন, একাদশীর দিনে আমরা খাবার খাই না, শুধু ফলাহার করি, কিন্তু সারাক্ষণ আমরা খাবারের কথাই চিন্তন করি। মানুষের, বিষয়ের প্রতি আসক্তি, কখনো সমাপ্ত হয় না । একাদশীর দিন যদি আমরা কোনো সুস্বাদু খাবার দেখি, তখন আমরা নিজেকে বলি যে, আজ একাদশী, তাই আমি খাব না। যদিও আমরা সেই খাবার খাই না কিন্তু সেই বিষয়েই আটকে থাকি। জ্ঞানী ব্যক্তি, পরমাত্মার দর্শন প্রাপ্ত করে এই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়রস থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হন। এইপ্রকারের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ থাকে না।

এই প্রসঙ্গে একটি গল্প বলা হয়েছে : একবার একজন কীর্তনকার তার দল নিয়ে কীর্তন করতে করতে এক স্থানে পৌঁছলেন। তিনি সাথীদের জিজ্ঞাসা করলেন- আপনাদের মনে আছে গত বছরও আমরা এখানে কীর্তন করতে এসেছি? তখন তার দলের একজন সাথী বলল, হ্যাঁ মনে আছে, সেবার খুব সুস্বাদু ক্ষীর খেয়েছিলাম। তখন কীর্তনকার বললেন, তোমার কীর্তনের কথা মনে আছে নাকি এক বছর পরেও সেই ক্ষীরের কথাই মনে রেখেছো ? এভাবে সাধারণ মানুষ বিষয় নিয়ে চিন্তন করতে থাকে।

জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেছেন-

पालवी खुडावी वरचे वरी आणि उदक घालावे मुळावरी,
मग कैसा होईल नाश तरी त्या वृक्षाचा।

গাছের পাতা ছিড়ে নিলে এবং শিকড়ে জল দিতে থাকলে বৃক্ষ নষ্ট হয় না। একইভাবে বিষয়গুলোকে দূরে রেখে, সেগুলো নিয়ে বারবার ভাবলে আসক্তি দূর হতে পারে না। মানুষ, শরীরের অন্যান্য বিষয় ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু জিহ্বার স্বাদ ত্যাগ করা খুব কঠিন।

विषय अन्य शरीराचे सुटतील जिव्हेचे न सुटे।

শরীরের জন্য আহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আহারের কথা মনে এলেই আমরা খাবারের কথা ভাবতে শুরু করি। এই বিষয় নিয়ে মনুষ্যের প্রতিনিয়ত চিন্তন, ভগবানের আক্ষেপের মূল কারণ।

2.60

য়ততো হ্য়পি কৌন্তেয়, পুরুষস্য় বিপশ্চিতঃ
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি, হরন্তি প্রসভং(ম্) মনঃ॥60॥

হে অর্জুন! আসক্তি সর্বতোভাবে দূর না হলে চিত্ত আলোড়নকারী ইন্দ্রিয়সকল যত্নশীল বুদ্ধিমান ব্যক্তির মনকেও বলপূর্বক হরণ করে।

বিবেচন: ভগবান বলেছেন যে একজন সাধারণ মানুষ যত বেশি ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে বা সংযত করার প্রচেষ্টা করে, ইন্দ্রিয় ততই প্রবল হয়ে যায়, তখন তার মন একই বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত চিন্তন করতে থাকে। এমনকী, জ্ঞানী ঋষিদের মনও বিষয়ের সঙ্গে বাঁধা পড়ে থাকে। ঋষি বিশ্বামিত্র ব্রহ্মর্ষি হওয়ার জন্য অত্যন্ত কঠিন তপস্যা করছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র ঋষি বিশ্বামিত্রের তপস্যা দেখে ভীত হয়ে পড়েন এবং তখন তিঁনি স্বর্গের অপ্সরা মেনকাকে তপস্যা ভঙ্গ করতে মর্ত্যে পাঠান। অপ্সরা মেনকাকে দেখে এত বিদ্বান ঋষিরও তপস্যা ভঙ্গ হয়ে গেল। তখন ঋষি আবার বারো বছর কঠোর তপস্যা করলেন। এবার ইন্দ্র তাঁর তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য অপ্সরা রম্ভাকে পাঠালেন। রম্ভা জানতেন যে নিজের রূপ দিয়ে এবার ঋষির তপস্যা ভঙ্গ করা সহজ হবে না। তাই এবার তিনি ঋষি বিশ্বামিত্রের নিরলস সেবা করলেন এবং নিত্যকর্মের সমস্ত আয়োজন সুচারুরূপে করতে থাকলেন। একদিন হঠাৎ রম্ভা কোনো ব্যবস্থা করেননি জেনে বিশ্বামিত্র ঋষি অত্যন্ত তার ওপর অত্যন্ত ক্রোধিত হয়ে ওঠেন এবং তাঁর তপস্যা পুনরায় ভঙ্গ হয়ে যায়। এইভাবে, একবার কাম ভাব ও দ্বিতীয়বার ক্রোধ, এই দুই বিকারের ফলস্বরূপ ঋষির তপস্যা ভঙ্গ হয়। তিনি আবার তপস্যা করে ব্রহ্মর্ষি পদ লাভ করেন। এত বড় বিদ্বান ঋষিকেও ইন্দ্রিয় বিষয় বেঁধে রাখে।

2.61

তানি সর্বাণি সংয়ম্য়, যুক্ত আসীত মত্পরঃ
বশে হি য়স্য়েন্দ্রিয়াণি, তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা॥61॥

অতএব যোগী ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে সমাহিত চিত্তে মৎপরায়ণ হয়ে অবস্থান করবেন, কারণ যাঁর ইন্দ্রিয় বশীভূত, তাঁরই বুদ্ধি স্থির হয়।

বিবেচন: সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং মনকে সংযমে রাখতে হবে। মন, বুদ্ধি, চিত্ত পরমাত্মার সাথে একাত্ম করতে হবে। এইভাবে পরমাত্মাকেই উৎস জেনে, পরমাত্মার চিন্তন দ্বারাই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করতে হবে। ভগবান এখানে বলেছেন, যে ব্যক্তি এটা করে নেয়, ইন্দ্রিয় তার নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং তার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এটি কীভাবে করা উচিত তাও ভগবান ষষ্ঠ অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করেছেন। অনেকের মনেই এই প্রশ্ন থাকে যে আমরা কীভাবে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করব? তাদের উচিত পরবর্তী দুটি শ্লোক মুখস্থ করা এবং সর্বদা তার চিন্তন-মনন করে যাওয়া।

2.62

ধ্য়ায়তো বিষয়ান্পুংসঃ(স্), সঙ্গস্তেষূপজায়তে
সঙ্গাত্সঞ্জায়তে কামঃ(খ্), কামাত্ক্রোধো‌ऽভিজায়তে॥62॥

বিষয়চিস্তা করতে করতে মানুষের ঐ বিষয়ে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি হতে কামনা উৎপন্ন হয় এবং কামনায় বাধা পড়লে ক্রোধের জন্ম হয়।

 

2.63

ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ(স্), সম্মোহাত্স্মৃতিবিভ্রমঃ
স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো, বুদ্ধিনাশাত্প্রণশ্য়তি॥63॥

ক্রোধ হতে মুঢ়ভাব উৎপন্ন হয়, মূঢ়ভাব হতে স্মৃতিভ্রংশ হয়, স্মৃতিভ্রংশে বুদ্ধি নাশ হয় এবং বুদ্ধি নাশ হলে পতন।

বিবেচন : মানুষ প্রতিনিয়ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহের চিন্তন করতে থাকে, তাই তার মন বিষয়সমূহের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। ইচ্ছা পূরণ না হলে ক্রোধ হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ বলে যে হনুমানজীর মন্দিরে এগারোবার প্রদক্ষিণ করলে মনোকামনা পূরণ হয়, তবে প্রদক্ষিণ করার সময় বানরের ধ্যান করা উচিত নয়। এই কথা শুনলেই আমাদের মনোযোগ বানরের দিকে চলে যায় এবং মন বিষয়সমূহে আটকে যায়। এইভাবে বিষয়ের সাথে যুক্ত হয়ে কামনা-বাসনা জাগ্রত হয় এবং ক্রোধও জাগ্রত হয়। এই কারণেই ইচ্ছা পূরণ হলে এবং ইচ্ছা পূরণ না হলেও ক্রোধ উৎপন্ন হয়।

যেমন, একটি ভালো মডেলের গাড়ি দেখে মনে ইচ্ছা উৎপন্ন হয় যে এইরকম গাড়ি আমারও থাকা উচিত। অনেক চেষ্টা করেও যদি গাড়ি না কেনা যায়, তখন মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আর যদি অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে একটা দামি নতুন গাড়ি কেনাও হয়, সেই গাড়িতে একটু আঁচড় লাগলেও ক্রোধ উৎপন্ন হয়, তা যদি বন্ধুর কারণে হয়,তাহলেও ক্রোধ প্রশমিত হয় না। এভাবে ইচ্ছা পূর্ণ হলে এবং ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেলেও, উভয় পরিস্থিতিতেই ক্রোধ উৎপন্ন হয়। মানুষ ক্রোধের বশে সম্মোহিত হয়ে যায়। সম্মোহনের পর মানুষ যেভাবে আচরণ করে, একজন মানুষ ক্রোধিত হলে সেরকমই আচরণ করে। যেমন তার হাতের কাছে কোনো জিনিস থাকলে, সেটা ছুড়ে ফেলে দেয়। তার স্মৃতি ভ্রম হয়। সে বুঝতে পারে না যে সে কী ধরনের অনুচিত আচরণ করছে । সে নিজেকে ভুলে যায় এবং এভাবে তার বুদ্ধি নষ্ট হয় এবং বুদ্ধির বিনাশের সাথে সাথে তার অধঃপতন হয়। এসবই বিষয়ের চিন্তনের কারণে ঘটে। 

সমাজে, সংসারে যত বিতর্ক ও বিবাদ হয়, সেটাও বিষয়ের চিন্তনের কারণেই ঘটে। তাই যখনই মন ক্রোধিত হয়ে ওঠে, একটু থেমে চিন্তা করে দেখা উচিত যে আমার এই ক্রোধ -ভাব কি কোনো ইচ্ছার কারণে উৎপন্ন হয়েছে।

2.64



রাগদ্বেষাবয়ুক্তৈস্তু , বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্
আত্মবশ্য়ৈর্বিধেয়াত্মা,প্রসাদমধিগচ্ছতি॥64॥

কিন্তু যিনি অন্তঃকরণকে বশীভূত করেছেন, তিনি অনুরাগ ও বিদ্বেষবর্জিত বশীভূত ইন্দ্রিয়াদি সহযোগে বিষয়সমূহে বিচরণ করেও অন্তঃকরণের প্রসন্নতা লাভ করেন।

বিবেচন : বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয় সর্বদা সংশ্লিষ্ট থাকবে এবং আমাদের এই বিষয়ের সাথেই থাকতে হয়। আমরা খাওয়া,পান, দেখা, শোনা এইসব বিষয় ছেড়ে দিতে পারি না। এসবের পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি বিদেহী আত্মা, অর্থাৎ যে নিজের মন, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, যে আসক্তি ও ঘৃণা উভয় থেকে মুক্ত, তার অন্তঃকরণ শুদ্ধ ও পবিত্র হয়। সে প্রসাদ প্রাপ্ত করে, তার আনন্দপ্রাপ্তি হয়।

2.65

প্রসাদে সর্বদুঃখানাং(ম্ ),হানিরস্য়োপজায়তে
প্রসন্নচেতসো হ্য়াশু, বুদ্ধিঃ(ফ্)পর্য়বতিষ্ঠতে॥65॥

অন্তঃকরণের প্রসন্নতার ফলে তাঁর সমস্ত দুঃখ নাশ হয় এবং সেই প্রসন্নচিত্ত কর্মযোগীর বুদ্ধি অচিরে সর্বদিক হতে নিবৃত্ত হয়ে পরমাত্মাতে স্থির হয়।

বিবেচন: প্রসাদ অর্থাৎ হৃদয় থেকে প্রাপ্ত হওয়া প্রসন্নতা। যে এই প্রসাদ প্রাপ্ত করে, তার সমস্ত দুঃখ নাশ হয়। দুঃখ বা সুখের প্রতি তার কোনো আসক্তি বা ঘৃণা নেই। সে প্রসন্নচিত্ত হয়ে যায়, , একাগ্রচিত্ত হয়, যার ফলে তার বুদ্ধি স্থির হয়ে যায়। জ্ঞানেশ্বর মহারাজ প্রসন্নতার সুন্দর বর্ণনা করেছেন :

अमृताचा निर्झर प्रसवते ज्याचे जठर क्षुधा तृष्णेची पीडा फार त्यास नाही कदापि।

যার পেটে অমৃতধারা প্রবাহিত হচ্ছে , সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় পীড়িত হয় না। একইভাবে, যিনি পরমাত্মার আশীর্বাদরূপী প্রসাদ প্রাপ্ত করেছেন, যার অন্তঃকরণ পরমাত্মার সাথে একরূপ হয়ে গেছে, যিনি আনন্দমগ্ন হয়ে গেছেন, তাকে বিষয় কোনো কষ্ট দিতে পারে না।

हृदय ज्याचे प्रसन्न त्यासी दुःख होईल कोठून,
बुद्धी परमात्मरूपी जडुन सहज त्याची राहते ।

অর্থাৎ যার হৃদয় প্রসন্নতায় পূর্ণ হয়ে আছে, তিনি কিভাবে দু: খিত হতে পারেন ? যিনি পরমাত্মার সাথে যুক্ত তার বুদ্ধি স্থির হয়ে যায়। তিনি প্রতিনিয়ত পরমাত্মার সাথে একাত্ম থাকেন।

2.66


নাস্তি বুদ্ধিরয়ুক্তস্য়, ন চায়ুক্তস্য় ভাবনা
ন চাভাবয়তঃ(শ্) শান্তি:(র্), অশান্তস্য় কুতঃ(স্) সুখম্॥66॥

যার মন এবং ইন্দ্রিয় নিজের বশে নেই, তার নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি হয় না এবং সেই অযুক্ত ব্যক্তির অন্তঃকরণে ভগবৎ চিন্তা জাগে না। আত্মচিন্তা বর্জিত মানুষের শান্তি অসম্ভব আর শান্তিরহিত মানুষের সুখ কোথায় ?

বিবেচন: মানুষ কখন সুখ প্রাপ্ত করে ? প্রথমে কি সুখ প্রাপ্ত হয়, না শান্তি ? প্রথমে শান্তি প্রাপ্ত হলে তবেই সে সুখ অনুভব করতে পারে। মনে শান্তি না থাকলে মানুষ সুখ উপভোগ করতে পারে না। যে ব্যক্তির মনে পরমাত্মার সাথে যুক্ত হওয়ার চিন্তা কখনোই আসেনি  সেই ব্যক্তির বুদ্ধি বা ভাবনা, কোনোটাই  নেই। তর্ক করা বুদ্ধির কাজ। ভাবনা মনের মধ্যে জাগ্রত হয়। যদি পরমাত্মাকে জানার বুদ্ধি  না থাকে  এবং পরমাত্মার প্রতি প্রেমের ভাবনা না থাকে, তাহলে শান্তি পাওয়া যায় না এবং শান্তি না থাকলে সুখের অনুভব করা যায় না। অনেক সময় বড় বড় বাড়ি, সুন্দর গাড়ী, আরামদায়ক বিছানা থাকার পরও সুখের অনুভব হয় না। এসি চালু থাকলেও ঘুম আসে না। এর কারণ হলো অশান্তি।

न चाभावयतःशांतिः, अशांतस्य कुत सुखं

যার মনে পরমাত্মার প্রতি প্রেমভাব নেই, সে কিভাবে শান্তি পাবে?

2.67

ইন্দ্রিয়াণাং(ম্) হি চরতাং(য়্ঁ), য়ন্মনো‌ऽনুবিধীয়তে।
তদস্য় হরতি প্রজ্ঞাং(ম্), বায়ুর্নাবমিবাম্ভসি॥2.67॥

কারণ জলের মধ্যে বিচরণশীল নৌকাকে যেমন বায়ু বিচলিত করে, তেমনি বিষয়ভোগে বিচরণকারী ইন্দ্রিয় সমূহের মধ্যে মন যেটিতে আকৃষ্ট হয় সেই ইন্দ্রিয়টিই অযুক্ত পুরুষের বুদ্ধি হরণ করে।

বিবেচন : শ্রীভগবান পুনরায় স্থির প্রজ্ঞার বিষয়ে জ্ঞান প্রদান করলেন -যেমন জলের উপর ভাসমান নৌকাকে প্রবল বাতাস যে কোন দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, একইভাবে আমাদের মন যে কোন বিষয়ের চিন্তনে ভেসে যায়। আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ বিষয়ের মধ্যে বিচরণ করতে থাকে। আমরা বিষয়কে ছাড়তে পারি না, পরিত্যাগও করতে পারি না। খাবার, জল সবই প্রয়োজনীয়, আমরা সেগুলো ত্যাগ করতে পারি না। কিন্তু মন যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তন শুরু করে, তখন ব্যক্তির প্রজ্ঞাকে হরণ করে নেয়। তার প্রজ্ঞা স্থির হতে পারে না।

2.68



তস্মাদ্য়স্য় মহাবাহো, নিগৃহীতানি সর্বশঃ
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্য়:(স্), তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা॥68॥

সেইজন্য হে মহাবাহো ! যাঁর ইন্দ্রিয়গুলি ইন্দ্রিয়াদির বিষয় হতে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত হয়েছে, তাঁরই প্রজ্ঞা স্থির হয়েছে বলে জানবে।

বিবেচন : ভগবান এখানে বলছেন, অর্জুন ! যে ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়কে, মনকে এবিং বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, সেই ব্যক্তির প্রজ্ঞা স্থির।

2.69

য়া নিশা সর্বভূতানাং(ন্),তস্য়াং( ঞ্)জাগর্তি সংয়মী
য়স্য়াং(ঞ্) জাগ্রতি ভূতানি, সা নিশা পশ্য়তো মুনেঃ॥69॥

সমস্ত প্রাণীর পক্ষে যা রাত্রির সমান, নিত্য জ্ঞানস্বরূপ পরমানন্দে স্থিতপ্রজ্ঞ যোগী তাতে জাগ্রত থাকেন এবং বিনাশশীল জাগতিক সুখ প্রাপ্তির আশায় সমস্ত প্রাণী যাতে জাগরিত থাকে, পরমাত্ম-তত্ত্বজ্ঞানী মুনির কাছে তা রাত্রির সমান।

বিবেচন : এখানে ভগবান একজনজ্ঞানী ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করে বলেছেন যে, একজন সাধারণ মানুষের জন্য যা রাত্রি, একজন বিদ্বান মানুষের জন্য তা হলো জাগরণ। তার মানে এই নয় যে, সাধারণ মানুষ রাতে ঘুমালেই জ্ঞানী মানুষ জেগে ওঠে, এমনটা হলে সব প্রহরীই জ্ঞানী হতো। এর অর্থ এই যে, জ্ঞানী ব্যক্তি সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহশূন্য থাকেন, যেই বিষয়ের চিন্তন করে সাধারণ মানুষ জাগ্রত থাকে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি সর্বদা ভগবানের চিন্তনে জাগ্রত থাকেন। 

2.70

আপূর্য়মাণমচলপ্রতিষ্ঠং(ম্),
সমুদ্রমাপঃ(ফ্) প্রবিশন্তি য়দ্বত্
তদ্বত্কামা য়ং(ম্) প্রবিশন্তি সর্বে,
স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী॥70॥

যেমন বিভিন্ন নদীর জল পরিপূর্ণ অচল, স্থির সমুদ্রে এসে তাকে বিচলিত না করেই বিলীন হয়ে যায় তেমনই সমস্ত বিষয়ভোগও যাঁর মধ্যে কোনো বিকার উৎপন্ন না করে বিলীন হয়, তিনিই পরমশান্তি লাভ করেন, কিন্তু যিনি ভোগ্যপদার্থ কামনা করেন, তাঁর পক্ষে শান্তিলাভ অসম্ভব।

বিবেচন: সমুদ্র তার নিজের জায়গায় স্থির থাকে। কত নদী এসে সাগরে মিশেছে। নদীতে বন্যা হলে তাদের জলের স্তর বাড়লেও সমুদ্রে তার কোনো প্রভাবই পড়ে না। নদীর বন্যায়, সমুদ্রের প্রকৃতিতে বা তার স্তরে কোনো প্রভাব পড়ে না, সে তার স্থান ছেড়ে কোথাও যায় না, নিজের স্থানে অবিচল থাকে। একইভাবে, একজন জ্ঞানী মানুষকে বাহ্যিক বিষয়, ইচ্ছা, বাসনা প্রভাবিত করে না। তার সমস্ত ইচ্ছা তার মধ্যেই প্রবিষ্ট হয়ে যায়। একজন জ্ঞানী মানুষ সাগরের মতই স্থির থাকে। সে কখনো বিচলিত হয় না। এমন ব্যক্তি শান্তি প্রাপ্ত করতে পারে। যে ব্যক্তি কামনা-বাসনার চিন্তায় মনকে নিবিষ্ট রাখে, সে কখনো শান্তি পায় না। তাই সে কখনো প্রসন্নচিত্ত হতে পারে না।

জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেন- নদীতে বন্যা এলেও সমুদ্রের ওপর তার কোনো প্রভাব হয় না এবং নদী শুকিয়ে গেলেও সমুদ্রের জল শুকিয়ে যায় না।

মহান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন যখন নোবেল পুরস্কার পান, তার কিছুদিন পর সোসাইটি থেকে ওনার কাছে ফোন এলো যে তিনি উপহার হিসাবে প্রাপ্ত চেকটি জমা করেননি। আইনস্টাইন সেই চেকটি কোনো একটি বইয়ের মধ্যে রেখে সে চেকের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি তার উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি, তিনি বিভ্রান্ত হননি, তিনি তার কাজ, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেই নিবিষ্ট ছিলেন। এইপ্রকার জ্ঞানী ব্যক্তিরা কখনোই অস্থির বা বিচলিত হন না।

2.71

বিহায় কামান্য়ঃ(স্) সর্বান্ , পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ(স্), স শান্তিমধিগচ্ছতি॥71॥

যিনি সমস্ত কামনা পরিত্যাগ করে মমত্বশূন্য ও অহং বর্জিত এবং নিস্পৃহ হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই পরম শান্তি লাভ করেন অর্থাৎ তাঁর ঈশ্বর লাভ হয়েছে।

বিবেচন : যে ব্যক্তি স্থিতপ্রজ্ঞ, সে সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগ করে, তার মধ্যে 'আমার-তোমার' এই বোধ নেই। সকলেই তার কাছে সমান।

अयं निज: परोवेत्ति गणना लघु चेतसाम्।
उदारचरितानां तु वसुधैव कुटुंबकम्।

এটি আমার, ওটা তোমার, এই প্রকার মনের ভাব হলো ক্ষুদ্র মনের পরিচয়। কিন্তু উদার মনের মানুষের কাছে পুরো পৃথিবীটাই একটি পরিবার। জ্ঞানেশ্বর মহারাজ বলেন- '

'हे विश्वची माझे घर ऐसी मती जयाची स्थिर।

আপন -পর, এই ভাব যেন কারুর না থাকে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তির এইপ্রকার নির্মোহ ভাব থাকে, সমগ্র জগৎই তাহার গৃহের ন্যায়। একজন সাধারণ মানুষের 'আমি' ভাবের অহংকার থাকে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তির সেই অহংকার সমাপ্ত হয়ে যায়। একমাত্র তিনিই শান্তি প্রাপ্ত করতে পারেন।

2.72

এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ(ফ্)পার্থ, নৈনাং(ম্) প্রাপ্য় বিমুহ্য়তি
স্থিত্বাস্য়ামন্তকালে‌ऽপি, ব্রহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি॥72॥

হে অর্জুন! এ হল ব্রহ্মপ্রাপ্ত পুরুষের স্থিতি, এই স্থিতি লাভের পর তিনি আর কখনও মোহগ্রস্ত হন না। অন্তিম সময়েও যিনি এই ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ করেন তিনি ব্রহ্মানন্দ লাভ করেন।

বিবেচন: শ্রীভগবান বলেছেন, যিনি এই ধরনের ব্রাহ্মী স্থিতি প্রাপ্ত করে নেন, তার আর পতন হয় না। তিনি মোহগ্রস্থ হন না, পুনঃ অজ্ঞানতায় আবদ্ধ হন না। 

যে পরমাত্মার সাথে একরূপ হয়ে গেছে তার পুনরায় পতন হয় না। তার প্রজ্ঞা স্থির হয়ে গেছে। জীবনের অন্তিম সময়েও সে বিচলিত হয় না। এই স্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রাপ্ত করা যেতে পারে।

গলবানে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমাদের যোদ্ধা সৈন্যরা বিচলিত হননি। আমাদের মনে রাখা উচিত যে এটি একজন জ্ঞানী মানুষ প্রাপ্ত করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষও তার কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে এই অবস্থা প্রাপ্ত করতে পারে। ভগবান লাভের আনন্দ, পরব্রহ্ম প্রাপ্তির আনন্দ শেষ মুহুর্তেও তার সাথে থাকে।

এভাবে এই বিবেচন সত্রের আনন্দ সকলেই প্রাপ্ত করলেন।

এর পর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব।

প্রশ্নকর্তা- বজরং জী 

প্রশ্ন- একজন মানুষ ভালো হতে চায়, কিন্তু তার মন বারংবার তাকে বিপথে নিয়ে যায়। এটি যাতে না ঘটে তার জন্য কী করা উচিত?

উত্তর: অর্জুনও একই প্রশ্ন করেছিলেন যে তার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে, তখন ভগবান অর্জুনকে চতুর্দশ অধ্যায়ে যে সত্ত্ব, রজ, তম গুণের কথা বলেছেন, তার মধ্যে কোন গুণটি মানুষের প্রকৃতিতে প্রাধান্য পাচ্ছে, তা দেখা উচিত। কামনা-বাসনা থেকে মুক্তি পাওয়াই হলো এর একমাত্র সমাধান। ভগবান এখানে আত্মসংযম যোগের কথা বলেছেন।

প্রশ্নকর্তা- সুষমা জী 

প্রশ্ন- মৃত্যুর পর মানুষ অন্য দেহ ধারণ করে, তাহলে তার শ্রাদ্ধ করা হয় কেন? যদি পুত্ররা তা না করে তবে এর দোষ কি পুত্রদের হয়?

উত্তর: পিতৃপুরুষদের সদ্গতি করার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের, যা পিতৃর নতুন দেহ ধারণ করা পর্যন্ত্য থাকে। তাই তাদের শান্তির জন্য এইটা এক প্রকারের প্রার্থনা। ভগবদ্গীতা শিক্ষা দেয় যে আমাদের কর্তব্য পালন করে যেতে হবে, কর্তব্য থেকে পলায়ন করা উচিত নয়। যা আমার কর্তব্য, তা করেই যেতে হবে। পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হয়েছে কি না, এ আমাদের অজানা, তাই আমাদের কর্তব্যচ্যুত হওয়া উচিত নয়।

প্রশ্নকর্তা- বিজয় জী 

প্রশ্ন- গীতার এই উপদেশ প্রদান সময় কি যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল?

উত্তর: এর মধ্যে একটি বিরতি আছে যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন ভগবান রথকে দুই সৈন্যের মধ্যে দাঁড় করিয়ে ছিলেন, তখন শুধু শঙ্খনাদ করা হয়েছিল, যুদ্ধ তখনও আরম্ভ হয়নি। তখন সেখানে ভগবানের উপদেশ অর্জুনের সাথে সাথে সঞ্জয় এবং মহর্ষি বেদব্যাস শুনেছিলেন এবং মহর্ষি বেদব্যাস এটি কাব্যের আকারে সংকলিত করেছিলেন। যুদ্ধ প্রাতঃকালে আরম্ভ হয়ে সন্ধ্যাকালে সমাপ্ত হয়ে যেত। উপদেশ প্রদানের সময় যুদ্ধ শুরু হয়নি, শুধু শঙ্খনাদ করা হয়েছিল।

ওঁম তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং(ম) যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন সংবাদে সাংখ্যযোগো নাম দ্বিতীয়োऽধ্যায়ঃ॥

এইপ্রকার ওঁম তৎ সত্ - ভগবানের এই নাম উচ্চারণের মাধ্যমে ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রময় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষদরূপ শ্রীকৃষ্ণার্জুন সংবাদের 'সাংখ্যযোগ' নামক দ্বিতীয় অধ্যায় সম্পন্ন হলো।

ॐ তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্য়ায়াং(য়্ঁ)
য়োগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদেসাঙ্খ্য়য়োগো নাম দ্বিতীয়ো‌ऽধ্য়ায়ঃ॥२॥