विवेचन सारांश
পরম গোপনীয় জ্ঞান
অর্জুন! আমি তোমাকে অত্যন্ত গোপনীয় এবং পবিত্র জ্ঞান প্রদান করবো। এইখানে ভগবান নিজের পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে অর্জুনকে আশ্বস্ত করছেন:
তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানীত্যুপধারয় ॥৯.৬॥
এই জগতের কণায় কণায় সর্বত্র পরমাত্মার নিবাস রয়েছে এবং সমগ্র সংসারের কার্য কিভাবে পরমাত্মার ইচ্ছাতেই সাধিত হচ্ছে। পরমাত্মা বলেছেন -
আমার অধ্যক্ষতায় এই প্রকৃতির সমস্ত কার্য সম্পন্ন হয়ে ওঠে। শ্রীভগবান পুনঃ সপ্তদশ শ্লোকে বলেছেন:
আমি এই সম্পূর্ণ জগতের পিতা, মাতা, ধারণকর্তা এবং পিতামহ। আমিই সূর্যদেবের রূপে সংসারকে উষ্ণতা দিই এবং বায়ুদেবের রূপে জলকে আকর্ষণ করে এই পৃথিবীতে বৃষ্টি প্রদান করি। পরমাত্মাই সবকিছু কিন্তু মানুষ স্বার্থ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তার ভিন্ন ভিন্ন কামনা-বাসনার প্রাপ্তির জন্য ঈশ্বরের পূজা অর্চনা করে আবার সাথে সাথে সে মোক্ষলাভ করার কামনাও করে।
আমরা বিংশতম শ্লোকে পড়েছি -
তে পুণ্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকম্, অশ্নন্তি দিব্যান্ দিবি দেবভোগান্ ॥৯.২০॥
9.22
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং(য়্ঁ), য়ে জনাঃ(ফ্) পর্যুপাসতে।
তেষাং(ন্) নিত্যাভিয়ুক্তানাং(য়্ঁ), য়োগক্ষেমং(ব্ঁ) বহাম্যহম্॥9.22॥
উদাহরণস্বরূপ একটি ছোট বাচ্চার গল্প বলা হয়েছে। সেই বাচ্চাটি বাবা ভোর বেলা অফিসে যাওয়ার সময় ঘুমিয়ে থাকে আবার যখন তিনি সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন তার আগেই বাচ্চাটি ঘুমিয়ে পড়ে। বাবা তার জন্য একটা খেলনা কিনে নিয়ে আসেন কিন্তু বাচ্চাটি বলে, আমি কোনো খেলনা চাই না, আমি শুধু তোমাকে চাই বাবা। এই উদাহরণ থেকে বুঝুন যে আমাদের মনে এই রকম খেলনারূপী কিছু কিছু ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা থাকে এবং আমরা শুধুমাত্র সেই ইচ্ছা পূরণের জন্যই ভক্তি সহকারে পূজা ইত্যাদি করি, কিন্তু সেই পরমপিতা পরমাত্মার প্রাপ্তির জন্য নয়।
এখানে ভগবান অর্জুনকে বুঝিয়েছেন যে যিনি সর্বদা আমার মধ্যে লীন অর্থাৎ একান্তভাবে ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকেন (এমন নয় যে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে গেলে ভগবানকে ভুলে যান), তিনি আমার একান্ত ভক্ত।
একবার এক স্ত্রী তার স্বামীকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন, তা শুনে স্বামী বললেন যে সিনেমা হলে গাড়ি পার্কিং করতে খুব অসুবিধা হয়। তা শুনে স্ত্রী বললেন, আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করব যে সিনেমা হলে যেন পার্কিং লট খালি পাওয়া যায়। তারা সিনেমা হলে পৌঁছে পার্কিং লট খালি পেয়ে খুব খুশি হলেন কিন্তু ভগবানের কথা সেই মহিলার আর মনে রইলো না।
এই শ্লোকে 'যোগক্ষেম' শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার অর্থ - যার প্রাপ্তি হয়নি তা প্রাপ্ত করা এবং যা প্রাপ্ত হয়েছে তা সংরক্ষণ করা। লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (LIC) প্রতীক চিহ্ন (LOGO) হল - 'যোগক্ষেম বহাম্যহম'। আপনি নিয়মানুসারে প্রিমিয়াম দিতে থাকুন এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া আপনার উত্তরদায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একইভাবে, ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য কি প্রিমিয়াম দিতে হয় ? শুধুমাত্র অনন্যভাব সহ ঈশ্বরের চিন্তন ও মনন। শ্রী ভগবান বলেন, যে ভক্তগণ প্রতিনিয়ত আমার চিন্তন করেন, আমি স্বয়ং সেই ভক্তদের যোগক্ষেম বহন করি। অনেকেই সঠিক নিয়ম অনুসরণ না করেই ঈশ্বরের পূজা করে।
যেপ্যন্যদেবতা ভক্তা, যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ
তেপি মামেব কৌন্তেয়, যজন্ত্যবিধিপূর্বকম্।।23।।
উদাহরণস্বরূপ, আপনার একটি প্লট আছে, তার পরিমাপ করতে হবে। তার জন্য আপনি সরকারি রাজস্ব বিভাগে যাবেন। এমনিতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার, রাজস্ব কর্মকর্তা যারা সরকারের কাজ দেখেন, তারা সবাই সরকারের বিভিন্ন রূপ। এটা সরকারের কাজ, যে বিভাগের কাজ, সেই বিভাগের কাছেই যেতে হবে।
একইভাবে, আমি যে দেবতার কৃপালাভ করতে চাই, আমি সেই দেবতার পূজা ও অর্চনা করব। আমি শুধু মা সরস্বতীর পূজা করব, অন্য আর কোনো দেবতার পূজা করব না। আমি শুধুমাত্র হনুমানজীর পূজা করব, অন্য দেবতাকে মানব না। আমি জ্ঞান প্রাপ্ত করার জন্য শুধুমাত্র গণেশ ঠাকুরেরই পূজা করব। গনেশ জীকে ভক্তরা মোদক, দূর্বা, লাল ফুল নিবেদন করে। ভগবান বলেন, এইপ্রকার পূজার মাধ্যমে এই সমস্ত মানুষ আমারই উপাসনা করে। কৃষ্ণ রূপে যিনি আবির্ভূত হয়েছেন, তিঁনিই সাক্ষাৎ পরমাত্মা। তাই গীতায় বারবার ভগবানুবাচ লেখা রয়েছে। এই গোপনীয় জ্ঞান সাধারণ মানুষ জানে না, তাই তারা অজ্ঞতাবশত ভগবানের বিভিন্ন রূপের পূজা করে এবং সেজন্যেই বিবাদের সৃষ্টি হয়। যেমন, আমাদের বাড়ির ট্যাঙ্কে যে জল আছে ,সেই একই জল পুকুরে,সরোবরে নদীতে, মেঘে, বৃষ্টির জলে, সাগরে রয়েছে। এ সমস্তই এক।
এইভাবে, একই পরমাত্মা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাপ্ত রয়েছেন। যারা এই পরম জ্ঞানের কথা জানে না, তারাই অজ্ঞতাবশত বিভিন্ন দেবতার পূজা করে।
অহং(ম্) হি সর্বযজ্ঞানাং(ম্), ভোক্তা চ প্রভুরেব চ
ন তু মামভিজানন্তি, তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।24।।
যান্তি দেবব্রতা দেবান্, পিতৃ়ন্যান্তি পিতৃব্রতাঃ
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা, যান্তি মদ্যাজিনোপি মাম্।।25।।
পত্রং(ম্) পুষ্পং(ম্) ফলং(ন্) তোয়ং(য়্ঁ), য়ো মে ভক্ত্যা প্রয়চ্ছতি।
তদহং(ম্) ভক্ত্যুপহৃতম্ , অশ্নামি প্রয়তাত্মনঃ॥9.26॥
মহারাষ্ট্রে প্রদেশে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে যে ,
'मन में भाव नहीं है और बोलते हैं भगवान मिल जाएं'।
অর্থাৎ : মনের মধ্যে কোনো ভক্তি ভাব নেই আর আমরা মনে মনে আশা করি যেন ভগবানকে পেয়ে যাই
মনের ভাবই হলো মুখ্য, দেখতে হবে কে কোন ভাব নিয়ে অর্পণ করেছে। মানুষ উপস্থাপনা, প্যাকেজিং কেমন তা দেখে কিন্তু মনের ভাব দেখে না, তা অগ্রাহ্য করে। শ্রীভগবান বলেছেন যে যদি কিছুই না থাকে, শুধু জলই অর্পণ কর, তবে ভক্তি সহকারে অর্পণ কর। যা আমাকে ভক্তি সহকারে অর্পিত করা হয় তা আমি প্রীতি সহকারে খেয়ে নিই (গ্রহণ করি)। একজন সন্ত ব্যাখ্যা করেছেন যে "ভগবান বলেন আমি কিছু চাই না। তিঁনি কেবলমাত্র নিমিত্ত । তাঁকে নিমিত্ত বানিয়ে কিছুই অর্পণ করে দাও। "আমাকে প্রাপ্ত করে নেওয়ার একমাত্র সাধন (উপায়) হলো একান্ত ভক্তি।" যদি তোমার কাছে ফল, ফুল, পাতা বা জল অর্পণ করারও সময় না থাকে, তবে পরের শ্লোকে ভগবান তার অন্য একটি উপায়ের কথা বলেছেন -
যৎকরোষি যদশ্নাসি, যজ্জুহোষি দদাসি যৎ
যত্তপস্যসি কৌন্তেয়, তৎকুরুষ্ব মদর্পণম্।।27।।
একটি সংকল্প (মন্ত্র) আছে:
अन्न हे पूर्ण ब्रह्म, उदर भरण नोहे, जाणीजे यज्ञकर्म...
অন্ন হে পূর্ণ ব্রহ্ম, উদর ভরন নোহে, জানিজে যজ্ঞকর্ম...
অন্ন গ্রহণের পূর্বে ভগবানের নাম নিন। এই যে খাবার আপনি খাচ্ছেন তা হজম হওয়ার জন্য উদরে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়।
পঞ্চদশ অধ্যায়ের চৌদ্দতম শ্লোকে ভগবান বলেছেন:
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্॥ ১৫.১৪।
ভোজনের পাচন কার্য (হজম) কে করে ? উদরের মধ্যে যে বৈশ্বানর আছে, সে আমারই রূপ। ভোজন করার সময় মনের ভাব এমন হওয়া উচিত যে, আমি যেন সেই বৈশ্বানরকেই অন্ন অর্পণ করছি।
একটি সুপ্রসিদ্ধ কবিতা:
( আমি তোমার চরণে প্রণাম করে,
তোমার আজ্ঞা পালন করতে,
আমি তোমার কাজে নিযুক্ত হয়েছি।)
হে ভগবান ! এসবই আপনার কাজ, আমি আপনার জন্যই শুধু এই কাজ করছি। আমাকে সচেতন করতে থাকুন। আমি শুধুমাত্র পরমাত্মার জন্য কাজ করছি, এই ধরনের ভাব যখন মনে আসবে, তখন পাপ কর্ম করা আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যাবে। পাপকর্মের বিচার-ভাবনা মনে এলে, নিজে থেকেই তা শেষ হয়ে যাবে। দিনের মধ্যে যেমন যেমন কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে, রাতে ঘুমানোর সময় ভগবানকে অবহিত করুন (বলুন) এবং শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু উচ্চারণ করে দিনের সমস্ত কাজ তাঁকে অর্পণ করুন। শ্রী ভগবান বললেন, আমাকে সবকিছু অর্পণ করে দাও। আমরা যে যে যে কাজ করেছি, তা সবই আমরা অর্পণ করি এবং এভাবেই আমরা মুক্তির আনন্দ পাই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ভগবানের কাজ করা আরম্ভ করি এবং তা সম্পাদন করি। সেই কর্মের কর্তা ভাবকেও অর্পিত করে দিই। হে ভগবান! আপনি যেমন বলছেন, আমি সাধ্যমত সেইমতো কাজ করে যাচ্ছি । ভগবান !, আপনার কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে, এখন আমি ঘুমাতে যাচ্ছি এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার আপনার কাজ করা শুরু করবো। এইভাবে ভগবানকে সমস্ত কার্য অর্পিত করে দিলে আমাদের মন প্রশান্তিতে ভরে উঠবে।
শুভাশুভফলৈরেবং(ম্), মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈঃ
সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা, বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।।28।।
সমোহং(ম্) সর্বভূতেষু , ন মে দ্বেষ্যোস্তি ন প্রিয়ঃ
যে ভজন্তি তু মাং(ম্) ভক্ত্যা , ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্।।29।।
অপি চেৎসুদুরাচারো , ভজতে মামনন্যভাক্
সাধুরেব স মন্তব্যঃ(স্), সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ।।30।।
ক্ষিপ্রং(ম্) ভবতি ধর্মাত্মা , শশ্বচ্ছান্তিং(ন্) নিগচ্ছতি
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি , ন মে ভক্তঃ(ফ্) প্রণশ্যতি।।31।।
বিবেচন: ভগবান বলেন, হে অর্জুন! আমার কাছে সকলেই সমান, কিন্তু যে অতিশয় পাপী ও দুরাচারী, সেই ব্যক্তিও যদি অনন্য ভাব নিয়ে আমার শরণে আসে, প্রায়শ্চিত্ত করে, তবে সেই ব্যক্তিও শীঘ্রই সাধু মহাত্মায় পরিণত হয়ে যান। তিনি দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে যান যে ভগবান যেমন বলবেন, আমি ঠিক তাই করবো। তার হৃদয়ে ভগবানকে প্রাপ্ত করার প্রবল ইচ্ছাশক্তি জেগে ওঠে, তখন সে ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে।
যেমন, আমরা যখন ডাক্তারের কাছে যাই, OPD তে লাইনে দাড়াই, কিন্তু জরুরী অবস্থা (emergency) হলে ডাক্তার সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করেন। नदी का मूल और ऋषि का कुल नहीं देखा जाता। অর্থাৎ : নদীর উৎপত্তিস্থল ও ঋষির বংশ দেখা হয় না। উৎপত্তিস্থলে নদী খুব সরু থাকে কিন্তু প্রবাহিত হতে হতে এটি খুব চওড়া হয়ে যায়। একইভাবে ঋষির কুল ও বংশ দেখা উচিত নয়, কারণ সন্ন্যাস নেওয়ার সময় পূর্বজীবনের নাম, ঠিকানা, বংশ সমাপ্ত হয়ে যায় এবং একটি নতুন নাম দেওয়া হয়। রত্নাকর দস্যু রামের নাম জপ করতে করতে মহর্ষি বাল্মীকি হয়েছিলেন। ভগবানের নাম স্মরণ করলে যে যত বড় পাপীই হোক না কেন, সে একজন ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে। ষষ্ঠ অধ্যায়ের, শ্লোক নং ৪৫ অনুসারে:
প্রযত্নাদ্ যতমানস্তু যোগী সংশুদ্ধকিল্বিষঃ ৷
অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততো যাতি পরাং গতিম্ ॥৬.৪৫॥
একজন যোগী বহু জন্মের চেষ্টায় মোক্ষ লাভ করেন এবং একইপ্রকারে সপ্তম অধ্যায়ের, শ্লোক নং ১৯ অনুসারে
বহূনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মাং প্রপদ্যতে।
জ্ঞানযোগের মাধ্যমে বহু জন্মের পরেও সিদ্ধিপ্রাপ্ত করা যায়, কিন্তু যে পাপী আমার শরণে আসে সে তৎক্ষণাৎ শান্তি লাভ করে। সে জন্য ভগবান দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, আমার ভক্ত কখনও আমার কাছ থেকে দূরে যেতে পারে না। একজন সাধক বলতেন, "जो विभक्त न हो वही भक्त" অর্থাৎ "যে বিভক্ত হয় না সেই হলো ভক্ত"। এর তাৎপর্য হলো যে ভগবান থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, তাকেই ভক্ত বলে। যার অন্তঃকরণে ভক্তির প্রাবল্য দেখা যায়। ভক্তি প্রাপ্ত হলে পরমাত্মার প্রাপ্তি অবশ্যই হয়ে যাবে।
মাং(ম্) হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য , যেপি স্যুঃ(ফ্) পাপযোনয়ঃ
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাঃ(স্) , তেপি যান্তি পরাং(ঙ) গতিম্।।32।।
1. গবেষণা ও উন্নয়ন
2. প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ
3. আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ
4. শ্রম বিভাগ
উল্লিখিত শ্রেণীগুলো আসলে চারটি বর্ণেরই প্রতিনিধিত্ব করছে।
নারী হোক, বৈশ্য হোক, শূদ্র হোক বা পাপ যোনির হোক, সকলেই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করে নিতে পারে। অতিশয় দুরাচারী লোকও পরম গতি প্রাপ্ত করতে পারে। এর জন্য একান্ত নিষ্ঠা ও অনন্যভাব যুক্ত ভক্তি থাকা আবশ্যক। প্রতিটি কর্ম ভগবানকে অর্পণ করে দিতে হবে। যেমন- যদি আমাকে রুটি বানাতে হয়, সেই রুটি ভগবানের জন্যই বানাবো এবং পরিবারের সদস্যগণ ভগবানেরই রূপ, তাই তাদের জন্যও আমি রুটি তৈরি করব। ভগবানের জন্য কোনো কাজ করলে, আমাদের সেই কাজ আপনা আপনিই ভাল লাগতে শুরু করে। ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ কেন এত বিখ্যাত হয়েছিলেন ? কারণ তিনি মনে মনে বিশ্বাস করতেন, এই রাজ্য আমার নয়, এই রাজ্য হলো শ্রী প্রভুর। এই মনোভাব নিয়ে যে কাজই করা হোক না কেন, তাতে শুধু শ্রী (বিজয়) প্রাপ্ত হয়।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম ॥১৮.৭৮॥
যেখানে যোগেশ্বর কৃষ্ণ এবং ধনুর্ধারী পার্থ আছেন যিনি পরমাত্মার কার্য করার জন্য প্রতিনিয়ত উন্মুখ, সেখানে বিজয় প্রাপ্ত হয়।
কিং(ম্) পুনর্ব্রাহ্মণাঃ(ফ্) পুণ্যা , ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা
অনিত্যমসুখং(ম্) লোকম্, ইমং(ম্) প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।।33।।
বিবেচন: এবার আসি ব্রাহ্মণদের কথায়, ব্রাহ্মণরা তো এমনিতেই পূণ্যবান। তথাপি, বৈশ্য, স্ত্রী এবং শূদ্রাদি পুরুষদের যে পথের কথা বলা হয়েছে সেই পথে ওদেরকেও যেতে হবে । রাজর্ষি, মহর্ষি রা সুকর্ম করে আমাকেই লাভ করেন । হে অর্জুন ..এই শরীর অনিত্য, ইহার ক্ষয় অবশ্যম্ভাবী । এ শাশ্বত নয়। একমাত্র পরমাত্মা শাশ্বত । সেই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করার জন্য তাঁর ভজনা কর। ভজনা এর উৎপত্তি "ভজ" ধাতু থেকে । যার অর্থ হলো "সেবা"। এই সেবার বিষয়ে আমরা ১২ তম অধ্যায়ে পেয়েছি " সর্ব ভূত হিতে রতাঃ।"
আমার ভজনা কর... এর তাৎপর্য হলো সকলের কল্যাণ হেতু কার্য করা। এর অর্থ হলো ভক্তিভাব নিয়ে কাজ করা । এই মনোভাব নিয়ে কাজ কর যে আমি সেবা করার একটা সুযোগ পেয়েছি। স্বামী বিবেকানন্দর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে :
"আমি সেই পরমাত্মার সেবা করি যাঁকে অজ্ঞানীরা মানুষ বলে।"
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো , মদ্যাজী মাং(ন্) নমস্কুরু
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবম্ , আত্মানং(ম্) মৎপরায়ণঃ।।34।।
বিবেচন: ভগবান বলেন, হে অর্জুন! তুমি তোমার মন আমাতে নিবেশ কর। নিজের মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত কর। তুমি আমার জন্য কর্ম কর। যে কার্যই কর, তা যেন কেবলমাত্র আমার জন্য কর। তুমি আমার শরণে এসো, তাহলে তুমি আমাকেই প্রাপ্ত করে নিতে পারবে এবং তুমি আমার কাছেই আসবে।
ভক্তিও চার প্রকারের হয় :
১) সালোক্য: সর্বত্র পরমাত্মার দর্শন
২) সামীপ্য: পরমাত্মার সেবা হেতু নৈকট্য।
৩) সারুপ্য (অনুরূপ): পরমাত্মার সাথে একরূপতা
৪) সাযুজ্য: ভগবান ও ভক্তের একত্ব এবং মুক্তি লাভ করা,
তুমি আমাকেই প্রাপ্ত করে নেবে। এভাবেই তুমি আমার সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। ভগবানের অতিরিক্ত আর কিছুর প্রয়োজন নেই। এটাই ভগবানের প্রতি ভক্তি। গীতার মধ্যর্বর্তী অধ্যায়ের এই অন্তিম শ্লোকটি শেষ অধ্যায়েও রয়েছে, কিন্তু একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তনের সাথে -
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু ।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে ॥১৮.৬৫॥
ভগবদ্ভক্তিই (ভগবানের প্রতি ভক্তি) আমার প্রাপ্য হওয়া উচিত। শুধু এর জন্য কার্য করা উচিত। ভক্তিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ। কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগ ভক্তিতে বিলীন হয়ে যায়। এইভাবে এই অধ্যায়ে শ্রীভগবান পরম গোপনীয় জ্ঞানের কথা বলেছেন এবং এই জ্ঞান প্রাপ্তির সাধন (উপায়) রাজবিদ্যারও বর্ণন করেছেন। গীতা পরিবারে যোগ দিয়ে আমাদেরও ভগবানের প্রচার কার্য করা উচিত। আপনি যখন এই কার্যে যোগদান করবেন, তখন দেখতে পাবেন যে আপনি কতটা আনন্দ পাচ্ছেন।
প্রশ্নোত্তর পর্ব
প্রশ্নকর্তা:সুধাকর ভাইয়া
প্রশ্ন: আমি যা দেখি, তাই আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি। এই যে সংসার আমরা দেখছি, এই সংসার কি সত্য?
উত্তর: সত্য কী? সত্যের ব্যাখ্যা হলো যে, যা স্থান ও কালের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না; সেটাই হলো সত্য। এখন এই সংসারের দিকে মনোযোগ দিন। সবকিছু পরিবর্তিত হচ্ছে. পৃথিবী ঘুরছে। আমাদের শরীরের কোষ, মাংসপেশীর পরিবর্তন হয়, নতুন আসে। এই সব পরিবর্তন প্রতিনিয়ত হয়ে যাচ্ছে। কেউ ঠিকই বলেছেন: You can't wash your hands in the same river again আমাদের চারপাশে এ সবকিছুই বদলে যায়। যা অপরিবর্তনীয়, যা কাল ও স্থানে পরিবর্তিত হয় না, তিনিই পরমাত্মা। সত্য-অসত্য, সব পরমাত্মার মধ্যেই ব্যাপ্ত রয়েছে। তিনি অব্যয়, অবিনশ্বর। তিনি সবকিছুতেই বিরাজমান আছেন। শুধু তাঁকেই খুঁজে যেতে হবে।
প্রশ্নকর্তা: বিদুলা দিদি
প্রশ্ন: যজ্জুহোষির অর্থ কী?
উত্তর: যখন যজ্ঞ করবে, আগুনে আহুতি দেবে বা নিজের কর্তব্য কর্মের যজ্ঞ করবে, সমস্তই আমাকে অর্পণ কর।
আজকের বিবেচন সত্রটি শ্রী গুরুদেবের চরণ কমলে সমর্পিত করে সমাপ্ত হলো।