विवेचन सारांश
পরম গোপনীয় জ্ঞান

ID: 2828
बंगाली - বাংলা
রবিবার, 07 মে 2023
অধ্যায় 9: রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ
3/3 (শ্লোক 22-34)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ মাননীয় শ্রীনিবাস বর্ণেকর মহাশয়


ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, গুরুদেব এবং ভারত মাতার বন্দনার মধ্যে দিয়ে আজকের বিবেচন সত্র আরম্ভ হলো। এই অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে ভগবান বলেছেন -
ইদং তু তে গুহ্যতমং প্রবক্ষ্যাম্যনসূয়বে।

অর্জুন! আমি তোমাকে অত্যন্ত গোপনীয় এবং পবিত্র জ্ঞান প্রদান করবো। এইখানে ভগবান নিজের পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে অর্জুনকে আশ্বস্ত করছেন:
যথাকাশস্থিতো নিত্যং বায়ুঃ সর্বত্রগো মহান্।
তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানীত্যুপধারয় ॥৯.৬॥

এই জগতের কণায় কণায় সর্বত্র পরমাত্মার নিবাস রয়েছে এবং সমগ্র সংসারের কার্য কিভাবে পরমাত্মার ইচ্ছাতেই সাধিত হচ্ছে। পরমাত্মা বলেছেন -
ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্।

আমার অধ্যক্ষতায় এই প্রকৃতির সমস্ত কার্য সম্পন্ন হয়ে ওঠে। শ্রীভগবান পুনঃ সপ্তদশ শ্লোকে বলেছেন:
পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ।

আমি এই সম্পূর্ণ জগতের পিতা, মাতা, ধারণকর্তা এবং পিতামহ। আমিই সূর্যদেবের রূপে সংসারকে উষ্ণতা দিই এবং বায়ুদেবের রূপে জলকে আকর্ষণ করে এই পৃথিবীতে বৃষ্টি প্রদান করি। পরমাত্মাই সবকিছু কিন্তু মানুষ স্বার্থ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তার ভিন্ন ভিন্ন কামনা-বাসনার প্রাপ্তির জন্য ঈশ্বরের পূজা অর্চনা করে আবার সাথে সাথে সে মোক্ষলাভ করার কামনাও করে।

আমরা বিংশতম শ্লোকে পড়েছি -
ত্রৈবিদ্যা মাং সোমপাঃ পূতপাপা, যজ্ঞৈরিষ্ট্বা স্বর্গতিং প্রার্থয়ন্তে ।
তে পুণ্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকম্, অশ্নন্তি দিব্যান্ দিবি দেবভোগান্ ॥৯.২০॥

স্বর্গপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা থাকলে তাও প্রাপ্ত করা যায়, কিন্তু পুণ্য নিঃশেষ হয়ে গেলে পুনঃ মৃত্যুলোকে (ইহলোকে) ফিরে আসতে হয়। পরমাত্মা প্রাপ্তি ব্যতীত কোন ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করা যায় না। তাহলে সেই সচ্চিদানন্দ পরমাত্মাকে কীভাবে প্রাপ্ত করা যায়? পৃথিবীতে এমন কোন সুখ আছে যা প্রারম্ভ হয় কিন্তু সমাপ্ত হয় না? কেবলমাত্র সচ্চিদানন্দ সুখই কখনও সমাপ্ত হয় না, তা নিত্য হলেও চিরনবীন থাকে।

9.22

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং(য়্ঁ), য়ে জনাঃ(ফ্) পর্যুপাসতে।
তেষাং(ন্) নিত্যাভিয়ুক্তানাং(য়্ঁ), য়োগক্ষেমং(ব্ঁ) বহাম্যহম্॥9.22॥

যেসব অনন্যচিত্ত ভক্ত আমার চিন্তা করতঃ উপাসনা করে, আমাতে নিত্যযুক্ত সেই সব ভক্তের যোগক্ষেম (অপ্রাপ্ত বস্তুর প্রাপ্তি এবং প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষা) আমি বহন করি ৷

বিবেচন: অনেকে অনন্য ভাব নিয়ে আমার চিন্তন করে। এখানে অনন্য শব্দের অর্থ হল- পরমাত্মা ব্যতীত আর কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই।

উদাহরণস্বরূপ একটি ছোট বাচ্চার গল্প বলা হয়েছে। সেই বাচ্চাটি বাবা ভোর বেলা অফিসে যাওয়ার সময় ঘুমিয়ে থাকে আবার যখন তিনি সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন তার আগেই বাচ্চাটি ঘুমিয়ে পড়ে। বাবা তার জন্য একটা খেলনা কিনে নিয়ে আসেন কিন্তু বাচ্চাটি বলে, আমি কোনো খেলনা চাই না, আমি শুধু তোমাকে চাই বাবা। এই উদাহরণ থেকে বুঝুন যে আমাদের মনে এই রকম খেলনারূপী কিছু কিছু ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা থাকে এবং আমরা শুধুমাত্র সেই ইচ্ছা পূরণের জন্যই ভক্তি সহকারে পূজা ইত্যাদি করি, কিন্তু সেই পরমপিতা পরমাত্মার প্রাপ্তির জন্য নয়।

এখানে ভগবান অর্জুনকে বুঝিয়েছেন যে যিনি সর্বদা আমার মধ্যে লীন অর্থাৎ একান্তভাবে ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকেন (এমন নয় যে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে গেলে ভগবানকে ভুলে যান), তিনি আমার একান্ত ভক্ত।
 
একবার এক স্ত্রী তার স্বামীকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন, তা শুনে স্বামী বললেন যে সিনেমা হলে গাড়ি পার্কিং করতে খুব অসুবিধা হয়। তা শুনে স্ত্রী বললেন, আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করব যে সিনেমা হলে যেন পার্কিং লট খালি পাওয়া যায়। তারা সিনেমা হলে পৌঁছে পার্কিং লট খালি পেয়ে খুব খুশি হলেন কিন্তু ভগবানের কথা সেই মহিলার আর মনে রইলো না।

এই শ্লোকে 'যোগক্ষেম' শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার অর্থ - যার প্রাপ্তি হয়নি তা প্রাপ্ত করা এবং যা প্রাপ্ত হয়েছে তা সংরক্ষণ করা। লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (LIC) প্রতীক চিহ্ন (LOGO) হল - 'যোগক্ষেম বহাম্যহম'। আপনি নিয়মানুসারে প্রিমিয়াম দিতে থাকুন এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া আপনার উত্তরদায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একইভাবে, ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য কি প্রিমিয়াম দিতে হয় ? শুধুমাত্র অনন্যভাব সহ ঈশ্বরের চিন্তন ও মনন। শ্রী ভগবান বলেন, যে ভক্তগণ প্রতিনিয়ত আমার চিন্তন করেন, আমি স্বয়ং সেই ভক্তদের যোগক্ষেম বহন করি। অনেকেই সঠিক নিয়ম অনুসরণ না করেই ঈশ্বরের পূজা করে।

9.23

যেপ্যন্যদেবতা ভক্তা, যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ
তেপি মামেব কৌন্তেয়, যজন্ত্যবিধিপূর্বকম্।।23।।

হে কুন্তীনন্দন! যে কোনো ভক্ত (মানুষ) শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে অন্য দেবতাদের পূজা করলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে আমারই পূজা করেন কিন্তু তা করেন অবিধিপূর্বক অর্থাৎ দেবতাগণকে আমার থেকে পৃথক মনে করেন ৷

বিবেচন: মানুষ অন্যান্য দেবতাদেরও পূজা করে। এই দেবতাগণ সকলেই পরমাত্মার রূপ। তাহলে আলাদা আলাদা দেবতাগণের পূজা করা হয় কেন?

উদাহরণস্বরূপ, আপনার একটি প্লট আছে, তার পরিমাপ করতে হবে। তার জন্য আপনি সরকারি রাজস্ব বিভাগে যাবেন। এমনিতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার, রাজস্ব কর্মকর্তা যারা সরকারের কাজ দেখেন, তারা সবাই সরকারের বিভিন্ন রূপ। এটা সরকারের কাজ, যে বিভাগের কাজ, সেই বিভাগের কাছেই যেতে হবে।

একইভাবে, আমি যে দেবতার কৃপালাভ করতে চাই, আমি সেই দেবতার পূজা ও অর্চনা করব। আমি শুধু মা সরস্বতীর পূজা করব, অন্য আর কোনো দেবতার পূজা করব না। আমি শুধুমাত্র হনুমানজীর পূজা করব, অন্য দেবতাকে মানব না। আমি জ্ঞান প্রাপ্ত করার জন্য শুধুমাত্র গণেশ ঠাকুরেরই পূজা করব। গনেশ জীকে ভক্তরা মোদক, দূর্বা, লাল ফুল নিবেদন করে। ভগবান বলেন, এইপ্রকার পূজার মাধ্যমে এই সমস্ত মানুষ আমারই উপাসনা করে। কৃষ্ণ রূপে যিনি আবির্ভূত হয়েছেন, তিঁনিই সাক্ষাৎ পরমাত্মা। তাই গীতায় বারবার ভগবানুবাচ লেখা রয়েছে। এই গোপনীয় জ্ঞান সাধারণ মানুষ জানে না, তাই তারা অজ্ঞতাবশত ভগবানের বিভিন্ন রূপের পূজা করে এবং সেজন্যেই বিবাদের সৃষ্টি হয়। যেমন, আমাদের বাড়ির ট্যাঙ্কে যে জল আছে ,সেই একই জল পুকুরে,সরোবরে নদীতে, মেঘে, বৃষ্টির জলে, সাগরে রয়েছে। এ সমস্তই এক। 
এইভাবে, একই পরমাত্মা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাপ্ত রয়েছেন। যারা এই পরম জ্ঞানের কথা জানে না, তারাই অজ্ঞতাবশত বিভিন্ন দেবতার পূজা করে।

9.24

অহং(ম্) হি সর্বযজ্ঞানাং(ম্), ভোক্তা চ প্রভুরেব চ
ন তু মামভিজানন্তি, তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।24।।

কারণ আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা এবং প্রভু, কিন্তু এরা তত্ত্বগতভাবে আমাকে জানে না, তাতেই তাদের পতন হয় ৷

বিবেচন: যেমন যেখানেই বৃষ্টি হোক না কেন, সমস্ত জল অবশেষে সেই সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হয়। একইভাবে, সমস্ত প্রকার যজ্ঞই সেই একই পরমাত্মা দ্বারা প্রাপ্ত হয়। এখানে মনে কোন সংশয় যেন না থাকে যে ভগবদ্গীতা কে বলছেন? স্বয়ং পরমাত্মাই কৃষ্ণের রূপে বলছেন। ভগবানে এখানে বলেছেন যে যারা এই তত্ত্ব (ভগবানের চৈতন্যস্বরূপ) জানে না, তারা স্বর্গলোক অবধি গিয়েও পুনঃ মৃত্যুলোকে অধঃপতিত হয় ।

শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ আছে, যেমন নাক, কান, জিহ্বা, চামড়া ইত্যাদি। কিন্তু যদি গান শুনতে হয়, তবে কানের সাহায্য নিতে হবে, স্বাদ গ্রহণের জন্য জিভের, সুবাসের জন্য নাকের, অথচ শরীর কিন্তু একটাই। একইভাবে, সমস্ত প্রকার যজ্ঞই একমাত্র সেই পরমাত্মা দ্বারাই প্রাপ্ত হয়। এই কারণেই, সমস্ত প্রকারের যজ্ঞ অনুষ্ঠান বিধি অনুসারে সম্পাদন করার যথার্থ উদ্দেশ্য হলো পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করা এবং যারা পরমাত্মাকে মূল তত্ত্ব সহকারে জেনে নেবেন, তারাই তাঁকে প্রাপ্ত করবেন।

9.25

যান্তি দেবব্রতা দেবান্, পিতৃ়ন্যান্তি পিতৃব্রতাঃ
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা, যান্তি মদ্যাজিনোপি মাম্।।25।।

যারা সকামভাবে দেবতাদের পূজা করে (শরীর ত্যাগ করার পর) তারা দেবতাদের (দেবলোক) প্রাপ্ত হয়। পিতৃগণের পূজকেরা পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়। ভূত-প্রেতাদির পূজকেরা ভূত-প্রেতলোক প্রাপ্ত হয়। কিন্তু যাঁরা আমার পূজা করেন, তাঁরা আমাকেই প্ৰাপ্ত হন ৷

বিবেচন: যিনি যে দেবতার আরাধনা করবেন, তিনি সেই দেবতাকেই প্রাপ্ত করবেন। যারা দেবতার পূজা করে তারা দেবলোক প্রাপ্ত করেন, যারা পিতৃপুরুষদের পূজা করে তারা পিতৃলোক প্রাপ্ত করেন। পরমাত্মার প্রতি একান্ত ভক্তিবোধ না থাকলে তারা সেখানেই আটকে থাকবে, পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করতে পারবে না। কেউ কেউ প্রকৃতি, পঞ্চ মহাভূতের পূজা করে। কেউ কেউ ভূত প্রেত আদির পূজা করে, তারা ভূতলোক প্রাপ্ত করে এবং যারা আমাকে তত্ত্ব সহকারে জেনে নিয়ে পূজা করে, তারাই আমাকে প্রাপ্ত করে।

9.26

পত্রং(ম্) পুষ্পং(ম্) ফলং(ন্) তোয়ং(য়্ঁ), য়ো মে ভক্ত্যা প্রয়চ্ছতি।
তদহং(ম্) ভক্ত্যুপহৃতম্ , অশ্নামি প্রয়তাত্মনঃ॥9.26॥

যে ভক্ত পত্র, পুষ্প, ফল, জল ইত্যাদি (সাধ্যমত বস্তু) ভক্তিপূর্বক আমাকে সমর্পণ করে, আমাতে তল্লীন চিত্ত, সেই ভক্তের ভক্তিপূর্বক প্রদত্ত উপহার আমি গ্রহণ করি ৷

বিবেচন: শ্রী ভগবান বলেন, আমার পূজায় নিবেদন করার জন্য যদি কিছু না পাওয়া যায় তবে গাছের একটি পাতা বা ফুল বা ফলই যথেষ্ঠ এবং যদি তাও না থাকে তবে শুধু জলই আমাকে অর্পণ করো। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল 'ভক্তিপূর্বক'। ভগবান বলেছেন আমি কিছুই চাই না শুধুমাত্র ভক্তের ভাবই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মহারাষ্ট্রে প্রদেশে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে যে ,

'मन में भाव नहीं है और बोलते हैं भगवान मिल जाएं'।
অর্থাৎ : মনের মধ্যে কোনো ভক্তি ভাব নেই আর আমরা মনে মনে আশা করি যেন ভগবানকে পেয়ে যাই

মনের ভাবই হলো মুখ্য, দেখতে হবে কে কোন ভাব নিয়ে অর্পণ করেছে। মানুষ উপস্থাপনা, প্যাকেজিং কেমন তা দেখে কিন্তু মনের ভাব দেখে না, তা অগ্রাহ্য করে। শ্রীভগবান বলেছেন যে যদি কিছুই না থাকে, শুধু জলই অর্পণ কর, তবে ভক্তি সহকারে অর্পণ কর। যা আমাকে ভক্তি সহকারে অর্পিত করা হয় তা আমি প্রীতি সহকারে খেয়ে নিই (গ্রহণ করি)। একজন সন্ত ব্যাখ্যা করেছেন যে "ভগবান বলেন আমি কিছু চাই না। তিঁনি কেবলমাত্র নিমিত্ত । তাঁকে নিমিত্ত বানিয়ে কিছুই অর্পণ করে দাও। "আমাকে প্রাপ্ত করে নেওয়ার একমাত্র সাধন (উপায়) হলো একান্ত ভক্তি।" যদি তোমার কাছে ফল, ফুল, পাতা বা জল অর্পণ করারও সময় না থাকে, তবে পরের শ্লোকে ভগবান তার অন্য একটি উপায়ের কথা বলেছেন -

9.27

যৎকরোষি যদশ্নাসি, যজ্জুহোষি দদাসি যৎ
যত্তপস্যসি কৌন্তেয়, তৎকুরুষ্ব মদর্পণম্।।27।।

হে কৌন্তেয় ! তুমি যা কিছু কর, যা কিছু চাও, যা হোম কর, যা দান কর আর যে তপস্যা কর, তা সমস্তই আমাকে সমর্পণ করে দাও ৷

বিবেচন: ভগবান অত্যন্ত সরল উপায় বলেছেন। তুমি যে কাজই করো না কেন (অলস হয়ে বসে থাকবে না। যেমন- অফিসের কাজ, লেখনের কাজ, স্থাপত্যকলার কাজ, কারখানার কাজ, ডাক্তারের কাজ, বাড়িতে রান্নার কাজ ইত্যাদি, ভোজনকার্য, যজ্ঞকর্ম করা, দান করা, তপ করা, শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়াম, সূর্য নমস্কার ইত্যাদি করা), সব আমাতে অর্পিত কর।

একটি সংকল্প (মন্ত্র) আছে:

अन्न हे पूर्ण ब्रह्म, उदर भरण नोहे, जाणीजे यज्ञकर्म...

অন্ন হে পূর্ণ ব্রহ্ম, উদর ভরন নোহে, জানিজে যজ্ঞকর্ম...

অন্ন গ্রহণের পূর্বে ভগবানের নাম নিন। এই যে খাবার আপনি খাচ্ছেন তা হজম হওয়ার জন্য উদরে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়।

পঞ্চদশ অধ্যায়ের চৌদ্দতম শ্লোকে ভগবান বলেছেন:
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্॥ ১৫.১৪।


ভোজনের পাচন কার্য (হজম) কে করে ? উদরের মধ্যে যে বৈশ্বানর আছে, সে আমারই রূপ। ভোজন করার সময় মনের ভাব এমন হওয়া উচিত যে, আমি যেন সেই বৈশ্বানরকেই অন্ন অর্পণ করছি।

একটি সুপ্রসিদ্ধ কবিতা:
कर प्रणाम तेरे चरणों में,
करता हूँ अब तेरे काज,
पालन करने को आज्ञा तेरी,
नियुक्त होता हूँ मैं आज।
( আমি তোমার চরণে প্রণাম করে,
এইক্ষণ থেকে আমি তোমার কাজ করছি ,
তোমার আজ্ঞা পালন করতে,
আমি তোমার কাজে নিযুক্ত হয়েছি।)

হে ভগবান ! এসবই আপনার কাজ, আমি আপনার জন্যই শুধু এই কাজ করছি। আমাকে সচেতন করতে থাকুন। আমি শুধুমাত্র পরমাত্মার জন্য কাজ করছি, এই ধরনের ভাব যখন মনে আসবে, তখন পাপ কর্ম করা আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যাবে। পাপকর্মের বিচার-ভাবনা মনে এলে, নিজে থেকেই তা শেষ হয়ে যাবে। দিনের মধ্যে যেমন যেমন কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে, রাতে ঘুমানোর সময় ভগবানকে অবহিত করুন (বলুন) এবং শ্রীকৃষ্ণার্পণমস্তু উচ্চারণ করে দিনের সমস্ত কাজ তাঁকে অর্পণ করুন। শ্রী ভগবান বললেন, আমাকে সবকিছু অর্পণ করে দাও। আমরা যে যে যে কাজ করেছি, তা সবই আমরা অর্পণ করি এবং এভাবেই আমরা মুক্তির আনন্দ পাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ভগবানের কাজ করা আরম্ভ করি এবং তা সম্পাদন করি। সেই কর্মের কর্তা ভাবকেও অর্পিত করে দিই। হে ভগবান! আপনি যেমন বলছেন, আমি সাধ্যমত সেইমতো কাজ করে যাচ্ছি । ভগবান !, আপনার কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে, এখন আমি ঘুমাতে যাচ্ছি এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার আপনার কাজ করা শুরু করবো। এইভাবে ভগবানকে সমস্ত কার্য অর্পিত করে দিলে আমাদের মন প্রশান্তিতে ভরে উঠবে।

9.28

শুভাশুভফলৈরেবং(ম্), মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈঃ
সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা, বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।।28।।

এইভাবে আমাকে সর্বকর্ম সমর্পণ করলে, কর্মবন্ধন থেকে এবং শুভ (বিহিত) ও অশুভ (নিষিদ্ধ) সমস্ত কর্মের ফল থেকে তুমি মুক্ত হবে। এইভাবে নিজেকে-সহ সবকিছু আমাকে অর্পণ করে, সমস্ত কিছু থেকে মুক্ত হয়ে তুমি আমাকেই প্রাপ্ত হবে ৷

বিবেচন: পরমাত্মা প্রাপ্তির মাধ্যমে আমাদের সমস্ত শুভ-অশুভ কর্মও পরমাত্মায় অর্পিত হয়ে যায়। ভগবান বলেন, হে অর্জুন! এইপ্রকারে তুমি কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। এই শ্লোকে ভগবানকে অর্পণ করার কথা বলা হচ্ছে, কোথাও যেতে বলা হচ্ছে না। নিজের মনে এই ভাব রাখতে হবে এবং আপনি বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন। যখন আমরা অর্পণ করি, তখন আমরা ভালো কাজের দিকে মনোযোগ দিই এবং সেই কাজের জন্য নিজেকে কৃতিত্ব দিতে শুরু করি এবং যখন আমরা কোনো ভুল করে ফেলি, তখন আমরা ভগবানের কাছে অনুযোগ করি, হে ঈশ্বর কেন এই কাজটি আমাকে দিয়ে করালেন। সৎকর্ম করে পুণ্য সঞ্চয় করতে থাকলে সৎকর্মের ভোগের জন্য আবার জন্ম নিয়ে আসতে হবে এবং পাপের জন্যও আসতে হবে, কিন্তু নিজের কর্ম ভগবানের কাছে অর্পণ করে দিলে বন্ধনমুক্ত হয়ে যাবে। এই হলো সন্ন্যাসযোগ। এর জন্য অন্যত্র কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ন্যাস অর্থাৎ ত্যাগ এবং সন্ন্যাস অর্থাৎ সম্যক ত্যাগ (সম্পূর্ণ ত্যাগ)। কর্ম অর্পণ করে দেওয়ার অর্থ ত্যাগ করা। ত্যাগের ভাব নিয়ে পরমাত্মাকে কর্ম অর্পণ করলে তা সন্ন্যাসযোগে পরিণত হয়। এর তাৎপর্য হলো যে পরমাত্মা আমাকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি তাঁকেই অর্পণ করছি। ভগবান বলেছেন, সেই ভক্ত মুক্ত হয়ে আমাকেই প্রাপ্ত করবেন।

9.29

সমোহং(ম্) সর্বভূতেষু , ন মে দ্বেষ্যোস্তি ন প্রিয়ঃ
যে ভজন্তি তু মাং(ম্) ভক্ত্যা , ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্।।29।।

সকল প্রাণীতেই আমি সমান। তাদের মধ্যে কেউ আমার অপ্রিয়ও নয়, আবার কেউ আমার প্রিয়ও নয়। কিন্তু যাঁরা ভক্তিপূর্বক আমার ভজনা করেন, তাঁরা আমাতে এবং আমি তাঁদের মধ্যে অবস্থান করি ৷

বিবেচন: শ্রীভগবান বলেন আমি সবার জন্য এক সমান, কারো প্রতি আমার মনে কোনো দ্বেষ ভাব নেই। কেউ আমার ঘনিষ্ঠ বা নিকট নয় কিন্তু যে ভক্তি সহকারে আমার চিন্তন করে, আমার ভজনা করে, নিজের সমস্ত কর্ম আমাকে অর্পণ করে, আমি তার হৃদয়ে নিবাস করি। শ্রীভগবান বলেন যারা এই তথ্য বুঝেছেন, তারা আমার হৃদয়ে নিবাস করেন। একজন মায়ের কাছে সব সন্তানই সমান, কিন্তু যে সন্তান মায়ের কথা শোনে, সেই সন্তান মায়ের কাছে বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে। একইভাবে যে ব্যক্তি অফিসে নিজের কর্মকর্তার কথা মেনে কাজ করে, সে তার ঘনিষ্ঠজন হয়ে ওঠে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই রাজবিদ্যারাজগুহ্য যোগ হল সবচেয়ে সরল উপায়। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য আগুন আছে, কিন্তু যে মানুষটি দূরে দাঁড়িয়ে আছে, সে কীভাবে আগুনের উষ্ণতা পাবে? আমরা যদি ভগবানের দিকে দশ কদম এগিয়ে যাই, তখন ভগবান আমাদের দিকে নিজেই কুড়িটি পদক্ষেপ এগিয়ে আসেন। শ্রী ভগবান বললেন সমস্ত কাজ আমার জন্য কর, আমাকে অর্পণ কর।

9.30

অপি চেৎসুদুরাচারো , ভজতে মামনন্যভাক্
সাধুরেব স মন্তব্যঃ(স্), সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ।।30।।

যদি অত্যন্ত দুরাচারী কোনো ব্যক্তিও অনন্য ভক্ত হয়ে আমার ভজনা করে, তাহলে তাকে সাধু বলেই মনে করবে। কারণ সে খুব ভালোভাবেই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

9.31

ক্ষিপ্রং(ম্) ভবতি ধর্মাত্মা , শশ্বচ্ছান্তিং(ন্) নিগচ্ছতি
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি , ন মে ভক্তঃ(ফ্) প্রণশ্যতি।।31।।

সেই ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ ধর্মাত্মা হয়ে যান এবং চির-শান্তি লাভ করেন। হে কৌন্তেয় ! জেনো যে, আমার ভক্তের কখনই বিনাশ (পতন) হয় না ৷

বিবেচন: ভগবান বলেন, হে অর্জুন! আমার কাছে সকলেই সমান, কিন্তু যে অতিশয় পাপী ও দুরাচারী, সেই ব্যক্তিও যদি অনন্য ভাব নিয়ে আমার শরণে আসে, প্রায়শ্চিত্ত করে, তবে সেই ব্যক্তিও শীঘ্রই সাধু মহাত্মায় পরিণত হয়ে যান। তিনি দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়ে যান যে ভগবান যেমন বলবেন, আমি ঠিক তাই করবো। তার হৃদয়ে ভগবানকে প্রাপ্ত করার প্রবল ইচ্ছাশক্তি জেগে ওঠে, তখন সে ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে।

যেমন, আমরা যখন ডাক্তারের কাছে যাই, OPD তে লাইনে দাড়াই, কিন্তু জরুরী অবস্থা (emergency) হলে ডাক্তার সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করেন। नदी का मूल और ऋषि का कुल नहीं देखा जाता। অর্থাৎ : নদীর উৎপত্তিস্থল ও ঋষির বংশ দেখা হয় না। উৎপত্তিস্থলে নদী খুব সরু থাকে কিন্তু প্রবাহিত হতে হতে এটি খুব চওড়া হয়ে যায়। একইভাবে ঋষির কুল ও বংশ দেখা উচিত নয়, কারণ সন্ন্যাস নেওয়ার সময় পূর্বজীবনের নাম, ঠিকানা, বংশ সমাপ্ত হয়ে যায় এবং একটি নতুন নাম দেওয়া হয়। রত্নাকর দস্যু রামের নাম জপ করতে করতে মহর্ষি বাল্মীকি হয়েছিলেন। ভগবানের নাম স্মরণ করলে যে যত বড় পাপীই হোক না কেন, সে একজন ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে। ষষ্ঠ অধ্যায়ের, শ্লোক নং ৪৫ অনুসারে:

প্রযত্নাদ্ যতমানস্তু যোগী সংশুদ্ধকিল্বিষঃ ৷
অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততো যাতি পরাং গতিম্ ॥৬.৪৫॥

একজন যোগী বহু জন্মের চেষ্টায় মোক্ষ লাভ করেন এবং একইপ্রকারে সপ্তম অধ্যায়ের, শ্লোক নং ১৯ অনুসারে

বহূনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মাং প্রপদ্যতে।

 জ্ঞানযোগের মাধ্যমে বহু জন্মের পরেও সিদ্ধিপ্রাপ্ত করা যায়, কিন্তু যে পাপী আমার শরণে আসে সে তৎক্ষণাৎ শান্তি লাভ করে। সে জন্য ভগবান দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, আমার ভক্ত কখনও আমার কাছ থেকে দূরে যেতে পারে না। একজন সাধক বলতেন, "जो विभक्त न हो वही भक्त"  অর্থাৎ "যে বিভক্ত হয় না সেই হলো ভক্ত"। এর তাৎপর্য হলো যে ভগবান থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, তাকেই ভক্ত বলে। যার অন্তঃকরণে ভক্তির প্রাবল্য দেখা যায়। ভক্তি প্রাপ্ত হলে পরমাত্মার প্রাপ্তি অবশ্যই হয়ে যাবে।

9.32

মাং(ম্) হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য , যেপি স্যুঃ(ফ্) পাপযোনয়ঃ
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাঃ(স্) , তেপি যান্তি পরাং(ঙ) গতিম্।।32।।

হে পৃথানন্দন ! যারা পাপযোনিসম্ভূত অথবা স্ত্রীজাতি, বৈশ্য ও শূদ্র, তারাও সর্বতোভাবে আমার শরণ গ্রহণ করে নিঃসন্দেহে পরমগতি প্রাপ্ত হয় ৷

বিবেচন: এ শ্লোকটি নিয়েও মানুষের মনে প্রচুর সংশয় আছে। একজন স্ত্রী আবেগপ্রবণ প্রকৃতির হয় এবং সে নিজের পরিবারের সাথে নিবিড় ভাবে যুক্ত থাকে, সে কি পরমগতি প্রাপ্ত করতে পারবে ? যে বৈশ্য, সে নিজের ব্যবসায় নিয়োজিত থাকে এবং লাভ-লোকসানের কথাই তার মুখ্য ভাবনার বিষয় । অন্যদিকে শূদ্ররা খুব পরিশ্রম করে, সেবার কাজ করে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই হলো চারটি বর্ণের নাম, সেই অনুযায়ী তারা চার প্রকারের কাজ করে। যে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধানত চারটি শাখা হয়:

1. গবেষণা ও উন্নয়ন
2. প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ
3. আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ
4. শ্রম বিভাগ

উল্লিখিত শ্রেণীগুলো আসলে চারটি বর্ণেরই প্রতিনিধিত্ব করছে।

নারী হোক, বৈশ্য হোক, শূদ্র হোক বা পাপ যোনির হোক, সকলেই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করে নিতে পারে। অতিশয় দুরাচারী লোকও পরম গতি প্রাপ্ত করতে পারে। এর জন্য একান্ত নিষ্ঠা ও অনন্যভাব যুক্ত ভক্তি থাকা আবশ্যক। প্রতিটি কর্ম ভগবানকে অর্পণ করে দিতে হবে। যেমন- যদি আমাকে রুটি বানাতে হয়, সেই রুটি ভগবানের জন্যই বানাবো এবং পরিবারের সদস্যগণ ভগবানেরই রূপ, তাই তাদের জন্যও আমি রুটি তৈরি করব। ভগবানের জন্য কোনো কাজ করলে, আমাদের সেই কাজ আপনা আপনিই ভাল লাগতে শুরু করে। ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ কেন এত বিখ্যাত হয়েছিলেন ? কারণ তিনি মনে মনে বিশ্বাস করতেন, এই রাজ্য আমার নয়, এই রাজ্য হলো শ্রী প্রভুর। এই মনোভাব নিয়ে যে কাজই করা হোক না কেন, তাতে শুধু শ্রী (বিজয়) প্রাপ্ত হয়।
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম ॥১৮.৭৮॥

যেখানে যোগেশ্বর কৃষ্ণ এবং ধনুর্ধারী পার্থ আছেন যিনি পরমাত্মার কার্য করার জন্য প্রতিনিয়ত উন্মুখ, সেখানে বিজয় প্রাপ্ত হয়।

9.33

কিং(ম্) পুনর্ব্রাহ্মণাঃ(ফ্) পুণ্যা , ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা
অনিত্যমসুখং(ম্) লোকম্, ইমং(ম্) প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।।33।।

পবিত্র আচরণকারী ব্রাহ্মণ এবং ঋষিকল্প ক্ষত্রিয় ভগবানের ভক্ত হলে পরমগতি প্রাপ্ত হবেন, তাতে আর বলার কী আছে ? অতএব তুমি এই অনিত্য ও সুখশূন্য দেহ লাভ করে আমাকে ভজনা কর ৷

বিবেচন: এবার আসি ব্রাহ্মণদের কথায়, ব্রাহ্মণরা তো এমনিতেই পূণ্যবান। তথাপি, বৈশ্য, স্ত্রী এবং শূদ্রাদি পুরুষদের যে পথের কথা বলা হয়েছে সেই পথে ওদেরকেও যেতে হবে । রাজর্ষি, মহর্ষি রা সুকর্ম করে আমাকেই লাভ করেন । হে অর্জুন ..এই শরীর অনিত্য, ইহার ক্ষয় অবশ্যম্ভাবী । এ শাশ্বত নয়। একমাত্র পরমাত্মা শাশ্বত । সেই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করার জন্য তাঁর ভজনা  কর। ভজনা  এর উৎপত্তি "ভজ" ধাতু থেকে । যার অর্থ হলো "সেবা"। এই সেবার বিষয়ে আমরা ১২ তম অধ্যায়ে পেয়েছি " সর্ব ভূত হিতে রতাঃ।"

আমার ভজনা কর... এর তাৎপর্য হলো সকলের কল্যাণ হেতু কার্য করা। এর অর্থ হলো ভক্তিভাব নিয়ে কাজ করা । এই মনোভাব নিয়ে কাজ কর যে আমি সেবা করার একটা সুযোগ পেয়েছি। স্বামী বিবেকানন্দর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে :

"আমি সেই পরমাত্মার সেবা করি যাঁকে অজ্ঞানীরা মানুষ বলে।"

9.34

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো , মদ্যাজী মাং(ন্) নমস্কুরু
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবম্ , আত্মানং(ম্) মৎপরায়ণঃ।।34।।

তুমি আমার ভক্ত হও, মদ্‌গতচিত্ত হও, আমার পূজনকারী হও এবং আমাকে নমস্কার কর। এইভাবে আমার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলে, মৎপরায়ণ হলে তুমি আমাকেই লাভ করবে ৷

বিবেচন: ভগবান বলেন, হে অর্জুন! তুমি তোমার মন আমাতে নিবেশ কর। নিজের মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত কর। তুমি আমার জন্য কর্ম কর। যে কার্যই কর, তা যেন কেবলমাত্র আমার জন্য কর। তুমি আমার শরণে এসো, তাহলে তুমি আমাকেই প্রাপ্ত করে নিতে পারবে এবং তুমি আমার কাছেই আসবে।

ভক্তিও চার প্রকারের হয় :

১) সালোক্য: সর্বত্র পরমাত্মার দর্শন 
২) সামীপ্য: পরমাত্মার সেবা হেতু নৈকট্য।
৩) সারুপ্য (অনুরূপ): পরমাত্মার সাথে একরূপতা
৪) সাযুজ্য: ভগবান ও ভক্তের একত্ব এবং মুক্তি লাভ করা,

তুমি আমাকেই প্রাপ্ত করে নেবে। এভাবেই তুমি আমার সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। ভগবানের অতিরিক্ত আর কিছুর প্রয়োজন নেই। এটাই ভগবানের প্রতি ভক্তি। গীতার মধ্যর্বর্তী অধ্যায়ের এই অন্তিম শ্লোকটি শেষ অধ্যায়েও রয়েছে, কিন্তু একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তনের সাথে -

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু ।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে ॥১৮.৬৫॥

ভগবদ্ভক্তিই (ভগবানের প্রতি ভক্তি) আমার প্রাপ্য হওয়া উচিত। শুধু এর জন্য কার্য করা উচিত। ভক্তিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ। কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগ ভক্তিতে বিলীন হয়ে যায়। এইভাবে এই অধ্যায়ে শ্রীভগবান পরম গোপনীয় জ্ঞানের কথা বলেছেন এবং এই জ্ঞান প্রাপ্তির সাধন (উপায়) রাজবিদ্যারও বর্ণন করেছেন। গীতা পরিবারে যোগ দিয়ে আমাদেরও ভগবানের প্রচার কার্য করা উচিত। আপনি যখন এই কার্যে যোগদান করবেন, তখন দেখতে পাবেন যে আপনি কতটা আনন্দ পাচ্ছেন।

প্রশ্নোত্তর  পর্ব


প্রশ্নকর্তা:
সুধাকর ভাইয়া 
প্রশ্ন: আমি যা দেখি, তাই আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি। এই যে সংসার আমরা দেখছি, এই সংসার কি সত্য?
উত্তর: সত্য কী? সত্যের ব্যাখ্যা হলো যে, যা স্থান ও কালের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না; সেটাই হলো সত্য। এখন এই সংসারের দিকে মনোযোগ দিন। সবকিছু পরিবর্তিত হচ্ছে. পৃথিবী ঘুরছে। আমাদের শরীরের কোষ, মাংসপেশীর পরিবর্তন হয়, নতুন আসে। এই সব পরিবর্তন প্রতিনিয়ত হয়ে যাচ্ছে। কেউ ঠিকই বলেছেন: You can't wash your hands in the same river again আমাদের চারপাশে এ সবকিছুই বদলে যায়। যা অপরিবর্তনীয়, যা কাল ও স্থানে পরিবর্তিত হয় না, তিনিই পরমাত্মা। সত্য-অসত্য, সব পরমাত্মার মধ্যেই ব্যাপ্ত রয়েছে। তিনি অব্যয়, অবিনশ্বর। তিনি সবকিছুতেই বিরাজমান আছেন। শুধু তাঁকেই খুঁজে যেতে হবে।

প্রশ্নকর্তা: বিদুলা দিদি

প্রশ্ন: যজ্জুহোষির অর্থ কী?
উত্তর: যখন যজ্ঞ করবে, আগুনে আহুতি দেবে বা নিজের কর্তব্য কর্মের যজ্ঞ করবে, সমস্তই আমাকে অর্পণ কর।

আজকের বিবেচন সত্রটি শ্রী গুরুদেবের চরণ কমলে সমর্পিত করে সমাপ্ত হলো।


ॐ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং(য়্ঁ)
য়োগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে রাজবিদ্যারাজগুহ্যয়োগো নাম নবমোऽধ্যায়॥