विवेचन सारांश
প্রকৃতি এবং পুরুষের মিলনে সৃষ্ট জীবন

ID: 3707
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 23 সেপ্টেম্বর 2023
অধ্যায় 13: ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগ যোগ
3/3 (শ্লোক 20-34)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ ড: সঞ্জয় মালপাণী মহাশয়


দীপ প্রজ্জ্বলন এবং প্রারম্ভিক প্রার্থনার পরে ত্রয়োদশ অধ্যায়ের উত্তরার্ধ বিবেচন সত্র শুরু হলো। শরীর কে যিনি জানেন  যিনি অন্তঃস্হলে বসে আছেন এবং সব কিছু বুঝতে পারেন, আত্মার সেই তত্ত্ব কে ক্ষেত্রজ্ঞ নামে অভিহিত করা যায়। পুরুষ ও প্রকৃতি এই দুইয়ের মিলনে শরীর তৈরি হয়। এর মধ্যে পুরুষ হলেন পরমাত্মা এবং পরমাত্মার বীজের এক অংশ, তারও ক্ষুদ্রতম অংশ আমাদের ভিতরে প্রবিষ্ট হয়ে যায়, এবং সেটাই আত্মা নামে পরিচিত।

প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দেন যা দ্বারা এই শরীর তৈরি হয়। এই ব্যাপারে উনিশ নম্বর শ্লোকে বিস্তারিত বলা আছে। ভগবান বলেছেন এই প্রকৃতি এবং পুরুষ এই দুই-ই অনাদি। আর, রাগ, দ্বেষ ইত্যাদি বিকার ও ত্রিগুণাত্মক সকল পদার্থর ও প্রকৃতি থেকেই উৎপত্তি। যত এগোনো যাবে, তত বোঝা যাবে যে প্রকৃতির সকল বস্তুকে ত্রিগুণাত্মক পদ্ধতিতে ভাগ করা যাবে।

যেমন, শ্রদ্ধা কে ত্রিগুণাত্মক পদ্ধতিতে ভাগ করা যায় :-

(১) সাত্ত্বিক শ্রদ্ধা
(২) রাজসিক শ্রদ্ধা
(৩) তামসিক শ্রদ্ধা

একইভাবে আহার কে ও সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক আহারে ভাগ করা যায়। তিন প্রকার যজ্ঞের কথা ও বলা হয়েছে কিন্তু, এই প্রকৃতি বাস্তবে আমাদের ভিতরে কিভাবে বিরাজমান থাকে এই ব্যাপারে জানা আবশ্যক। কারণ, প্রকৃতি বিকারগস্ত। এটা খুব ভালো করে বুঝতে হবে। বিকারের তো কিছু দোষ আছে, যা ইতিমধ্যে আমাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। যেমন, পিতা-মাতার যেসব ভালো গুণ আমরা প্রাপ্ত করি, আবার তাঁদের খারাপ কিছু ও আমাদের মধ্যে এসে যায়। যদি বাবা মা দুজনেই ডায়াবেটিস এর রোগী হন তবে তাঁদের বাচ্চার ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এমনই পিতা-মাতার কিছু বিকার ও সন্তানের মধ্যে এসে যায়, কারণ, প্রকৃতিই বিকারগস্ত।

একে Transgenerational transmission বলে ( মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রভাব যা সেই গোষ্ঠীর পরবর্তী প্রজন্মের উপর পড়ে) যা এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তীতে প্রবাহিত হয়। আমরা পিছনে ফিরে দেখতে পাবো যে এখন বিজ্ঞান এটাও বলতে পারে যে এসব কিছুই DNA র খেলা। এখন আমরা ল্যাবরেটরি তে এসবের পরীক্ষা ও করাতে পারি। কোন বাচ্চার আসল জন্মদাতা কে তা পরীক্ষা দ্বারা নির্ণয় করা সম্ভব। রক্তের ও প্রয়োজন হয় না এই পরীক্ষার জন্য। চুল দিয়ে টেস্ট করেও এটা নির্ণয় করা সম্ভব কে আসল পিতা-মাতা।

এই Trans generational transmission এ পিতা-মাতার অনেক বেশি গুণ আমাদের ভিতরে প্রবেশ করে। এইভাবে পিছন দিকে যেতে যেতে একসময় বোঝা যাবে বাস্তবে প্রকৃতিই আমাদের মা। পিতা সেই তিনিই যিনি পুরুষোত্তম, এবং ওঁনার ও কিছু গুণ আমাদের মধ্যে এসেছে। প্রকৃতি আমাদের পঞ্চ মহাভূত প্রদান করেছেন। এই পঞ্চ মহাভূত দ্বারা আমাদের শরীর গঠিত। কতটা জল,কতটা পৃথিবী, কতটা অগ্নিতত্ত্ব , কতটা আকাশ আর কতটা বায়ু আছে ??

বায়ু ও এক প্রকার নয় , অনেক প্রকার।
১) প্রাণবায়ু
২) অপান বায়ু
৩) উদান বায়ু
৪) সমান বায়ু

এতো রকম বায়ু আমাদের ঋষিগণ খুঁজে পেয়েছেন। মৃত্যুর পরে আমাদের ভিতরে কিছু বায়ু নির্গত হয়। এর ফলে মৃত শরীর ফুলতে থাকে, অন্যেরা দেখে বলে... শরীর টা কত তাজা লাগছে দেখতে। ওসব কিছুই না। অন্তর্গত বায়ুতে শরীর ফুলে যায় ও চোখ মুখের শুকনো ভাব দূর করে দেয়। এইভাবে পাঁচ মহাভূত দ্বারা শরীর গঠিত এবং এর সাথে আছে কিছু সূক্ষ্ম বস্তু... যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না, যার পরিমাপ করা সম্ভব নয়, যা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাও যায় না।

অহঙ্কার - যা প্রকৃতি থেকেই প্রাপ্ত হয় এবং তা পরিমাপ করা যায় না। এটা বোঝাও দুষ্কর যে কোন ব্যক্তির মধ্যে কতটা অহঙ্কার আছে। এটা প্রয়োগশালাতে পরীক্ষা করাও যায় না। হয়তো এমন সময় আসবে যখন বাচ্চাদের অহঙ্কার মাপার যন্ত্রও আবিষ্কার হবে।

একইভাবে বুদ্ধি ও প্রকৃতি থেকে পাওয়া যায়। বুদ্ধি কে ও দেখা যায় না কিন্তু অঙ্কের পরীক্ষা দ্বারা বুদ্ধির পরিমাপ করা হয়। গত শতকেই এটা পরীক্ষিত যে বুদ্ধি কেবল এক প্রকারের হয় না। অনেক রকমের বুদ্ধি হয়। ইংরেজি শব্দ intelligence সেই কারণে একবচন নয়, বরং বহুবচন। আমেরিকার একজন বৈজ্ঞানিক হাওয়ার্ড গার্ডনার ১৯৮২ সালে একটা থিয়োরি দিয়েছেন যা মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্স থিয়োরি নামে খ্যাত। হাওয়ার্ড গার্ডনার একজন মনোবিজ্ঞানী।

এক্সিডেন্টে যখন কারও মাথায় আঘাত লাগে এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে যায় -- যেমন কেউ কথা বলতে ভুলে যায়, কেউ নড়াচড়া করতে পারে না, কেউ অনেক বেশি কথা বলতে থাকে, কেউ বা আগে গান গাইতো, এখন পুরো ভুলে গেছে - এইরকম রোগীদের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করতেন ডক্টর হাওয়ার্ড গার্ডনার। উনি সমস্ত রোগীর সিম্পটম ও চিকিৎসা করার পরে লিখে রাখতেন। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলেন যে মোটামুটি আট প্রকারের বুদ্ধিমত্তা হয়।
১) ভাষিক বুদ্ধিমত্তা - Linguistic intelligence
২) তার্কিক এবং গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা - ম্যাথামেটিক্যাল এন্ড এন্যালিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স।
৩) মিউজিক্যাল বুদ্ধিমত্তা
৪) সাংকেতিক ইন্টারপার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স -- পরস্পরকে পরখ করে নেওয়া। মানুষ কে জানা, যেমন হিউম্যান রিসোর্স। আমাদের সমস্ত নেতারা, যারা সমস্ত মানুষ কে বোঝেন, তারা ইন্টারপার্সোনাল ইন্টেলিজেন্ট। তাদেরকে যে খুব ভালো অঙ্ক জানতে হবে এমনটা নয়। অঙ্কে প্রচুর নম্বর পাওয়া, অথবা আই. আই. টি থেকে পাশ করা ব্যক্তি ও খুব ভালো নেতা হতে পারেন... এমন গ্যারান্টি নেই। একজন আই আই টি পাশ মুখ্যমন্ত্রী আছেন, যিনি সবসময় নিজের ডিগ্রির কথা মনে করিয়ে দেন, কিন্তু তাঁরও অনেক অনৈতিকতা বারবার দেখা যায়।

অনেক কম লেখাপড়া জানা মানুষ ও অনেক কিছু বুঝতে পারে কারণ তাদের মধ্যেও বিশেষ ধরনের বুদ্ধিমত্তা থাকে। হাজার লোকের মধ্যে পরিচিত মানুষদের নাম মনে রাখতে পারে। একবার পরিচয় হওয়ার পরে তাদের নাম ধাম, মুখ ইত্যাদি চিনতে ভুল হয় না তাদের। গণিতে ভালো না হলেও মানুষ ভালো ধ্যান করতে পারে। অনেকে খুব তাড়াতাড়ি অন্যদের সাথে মিশে যেতে পারে, ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে ও তাদের সবরকম কাজকর্ম সামলে দিতে পারে। এরকম নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ ও অনেকের মধ্যে থাকে।

কিছু মানুষ ইন্ট্রোপার্সোনাল ইন্টেলিজেন্ট হয় -- এরা নিজেদের ভিতর থাকতে চায় -- তারা কবি হতে পারে, উত্তম লেখক হতে পারে, মুনি হতে পারে -- যিনি মনন করেন। মনন শব্দ থেকে মুনি শব্দ এসেছে। যিনি মৌন হয়ে গেছেন। যার বাইরের ইন্টার‍্যাকশন বন্ধ হয়ে গেছে এবং যার ভিতরে সংবাদ শুরু হয়েছে তাকে আমরা মুনি বলি। যিনি মৌন, বাইরের ধারা যার বন্ধ হয়েছে এবং ভিতরে যার সংবাদ শুরু হয়েছে।

৫) শারীরিক বুদ্ধিমত্তা :--
 যারা খুব ভালো নাটক করতে পারে, নাচ করতে পারে -  যেমন সচিন তেন্ডুলকর অসাধারণ ব্যাটিং করেন, তার এডুকেশন নিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে না। যেমন লতা মঙ্গেশকরের পরিচয় তাঁর গানে, তাঁর পড়াশোনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কখনো।

ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স:--
  যাদের শরীরের পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে। তারা খুব গতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত থাকে।

ন্যাচারাল ইন্টেলিজেন্স:--
  এরা নৈসর্গিক প্রতিভা সম্পন্ন। এরা প্রতিটি গাছ চেনে, নাম জানে, এমনকি গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ও এদের মুখস্থ। এরা কীট পতঙ্গের হালচাল জানে। এরা জঙ্গলে, পাহাড়ে বেড়াতে ভালবাসে। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য ট্রেকিং করে। এরা হলো প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ।

ন্যাচারাল স্টিক ইন্টেলিজেন্স:- কিছু স্পেশাল ইন্টেলিজেন্ট মানুষ আছে যারা ত্রিমাত্রিক বুদ্ধিসম্পন্ন। এদের দূরত্বের পরিমাপ জ্ঞান থাকে, এরা রাস্তা মনে রাখতে পারে , দিক বুঝতে পারে এবং সঠিক অনুপাতে ছবি আঁকতে পারে খুব সহজে। ইন্টিরিয়র ডিজাইনার, প্রোডাক্ট ডিজাইনার এর উদাহরণ।

এভাবেই এই থিয়োরির মধ্যে সমস্ত ধরনের মানুষ এসে যায়। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তে আসা গেছে যে, যদি অ্যাক্সিডেন্টে কারও ভাষিক ইন্টেলিজেন্সে চোট লাগে তো ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে বাচিক ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

এই সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ। কালই তৃতীয় লেভেল আরম্ভ হলো -- এক বাচ্চা বলছিল যে সে জার্মানিতে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন -- এ তো আশ্চর্যের ব্যাপার। তোমার দাঁত আপনা থেকেই ঠিক হয়ে গেল কি করে ?? তার দাঁত বাইরে বেরিয়ে ছিল। দাঁতে ব্রিসলস লাগানো ছিল। সেই দাঁত নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। বাচ্চাটি বলেছে যে ভগবদ্গীতার শ্লোক বারবার উচ্চারণে এটা সম্ভব হয়েছে।

এই যে বুদ্ধিমত্তা, -- এ হলো সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা। এ দেখা যায় না, কিন্তু হয়ে যায়। এই বুদ্ধিও প্রকৃতিদত্ত। প্রকৃতি থেকেই প্রাপ্ত হয়। মনের কথাই বা কে জানে, মন ও তো দেখা যায় না। এরকম ব্যাধি প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত।

এই প্রকারে পাঁচ মহাপুরুষ, অহংকার, বুদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয় ( চোখ, কান,নাক,জিভ,ত্বক), পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়, মন -- সবই প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত হয়। আবার জ্ঞানেন্দ্রিয়ের পাঁচটি বিষয় ( দেখা, শোনা, শোঁকা, চাখা ও স্পর্শ করা) এসবও প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত। পাঁচ মহাভূত এবং অহংকার ও বুদ্ধি মিলিয়ে সাত হলো। এরপর পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পাঁচ কর্মেন্দ্রিয় মিলিয়ে সতেরো, এর সাথে মন মিলে আঠারো এবং পাঁচটি বিষয় মিলিয়ে মোট তেইশ। অনেক বড়ো বিস্তার এর।

এই সবই প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত। পুরুষ তো অবিকারী, গুণাতীত। যেমন, জলের কোন রঙ নেই, তেমন আত্মার কোন আকার নেই, কোন রঙ নেই, রসও নেই, গন্ধও নেই এবং শেষ যে তেইশটা বিষয় প্রকৃতি থেকে পাওয়া যায়। যখন পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন হয় তখন জীবের জন্ম হয় -- ব্যক্তি জন্ম হয় -- শুধু তাই নয় -- কীট- পতঙ্গ -হাতি এবং সকল প্রকার জীবের জন্ম হয়।

13.20

কার্য়করণকর্তৃত্বে, হেতুঃ(ফ্) প্রকৃতিরুচ্য়তে
পুরুষঃ(স্) সুখদুঃখানাং(ম্),ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্য়তে॥20॥

জীবাত্মার ভোগান্তি কেন হয়-- এই ব্যাপারে কি বলা হয়েছে ? খুবই মজার কথা যে, যখনই এই সমস্ত কথা বোধগম্য হবে, তখনই আমাদের সকল সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে।

13.21

পুরুষঃ(ফ্) প্রকৃতিস্থো হি, ভুঙ্ ক্তে প্রকৃতিজান্গুণান্
কারণং(ঙ্) গুণসঙ্গো‌ऽস্য়, সদসদ্য়োনিজন্মসু॥21॥

একটা উদাহরণ দিয়ে এটা বোঝানো যায়।
একজন শেঠজি খুব দামী ও বড়ো একখানা গাড়ি কিনেছেন। কিন্তু নিজে সেই গাড়ি চালাতে পারেন না, সেজন্য ড্রাইভার ও রেখেছেন। ড্রাইভার গাড়ি চালায়, শেঠ পিছনে আরামে বসে থাকেন। এমন ভাবে আত্মা ও গাড়ি -রূপী শরীরের ভিতরে বসে আছেন। শরীর প্রকৃতি দ্বারা তৈরি, প্রকৃতির শরনে আত্মা গিয়ে বসেছেন।
প্রকৃতি দ্বারা প্রাপ্ত এই ত্রিগুণাত্মক শরীর যা কিছু করবে তার ফল এই আত্মা ভোগ করবে। যেমন ড্রাইভারের ভালো বা খারাপ ড্রাইভিং এর ফলভোগ করতে হবে পিছনে বসে থাকা শেঠজি কে। যদি ড্রাইভার ঠিকঠাক গাড়ি চালায় তাহলে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, কিন্তু যদি ড্রাইভার কোথাও ধাক্কা লাগায় কিংবা অ্যাক্সিডেন্ট করে বসে তাহলে গাড়ির ক্ষতি হবে, এমনকি পিছনে বসে থাকা ব্যক্তির হাত পা ও ভেঙে যেতে পারে। এই ব্যাপারে শেঠজির দোষ না থাকলেও ভুগতে হবে তাঁকে।
এইভাবে আত্মা-- যিনি শরীরের ভিতরে বসে আছেন এবং শরীরের জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়, শরীরস্থিত মন- বুদ্ধি ও অহংকার, প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত পাঁচ বিষয় -- এসব দ্বারা ভালো কিছু করলে -- ভালো ফলও ওই আত্মা প্রাপ্ত করবেন কিন্তু আমার হাতে যদি পাপকার্য করা হয় তো তার ফলও সেই আত্মার প্রাপ্তি। যখন শরীর ত্যাগের সময় আসবে, সেই ক্ষণে মন- বুদ্ধি -অহংকার বিমুক্ত হয় না, আত্মার সাথে যুক্ত হয়ে বাইরে আসবে কারণ, এগুলো অতি সূক্ষ্ম। পঞ্চভূত তো জ্বলে শেষ হয়ে যায়।
  কোন শরীর কে দাফন করা হয়, কাউকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, কাউকে বা জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পঞ্চ মহাভূত শরীর তো বিলীন হয়ে গেল কিন্তু, মন বুদ্ধি, অহংকার এদের সাথে আত্মার প্রগাঢ় মৈত্রী হয়ে যাওয়ায় এগুলো আত্মার সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। এতো বছর ধরে শরীরে থাকার অভ্যাস হয়ে যায় আত্মার এবং তখনও আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে মন বুদ্ধি ও অহংকার। কিন্তু শরীর মুক্ত আত্মাকে এখন ভালো বা খারাপ কর্মফল ভোগ করতে হবে এবং তা প্রাপ্ত করার জন্য আত্মাকে স্বর্গে বা নরকে যেতে হবে। সেখানে সময় শেষ হলে আবার পৃথিবীতে আসতে হবে। পরের জন্মের জন্য শরীর খোঁজে মন,বুদ্ধি, অহংকার সমৃদ্ধ সূক্ষ্ম শরীর। এমন শরীরে সে আসতে চায় যাতে তার অতৃপ্ত ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। এটা প্রকৃতি প্রদত্ত শরীর। প্রকৃতিতে স্থিত পুরুষ প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন ত্রিগুণাত্মক পদার্থ দ্বারা ভোগে এবং এই গুণের কারণেই জীবাত্মা ভালো অথবা খারাপ যোনি প্রাপ্ত হয়।
কি ধরনের যোনি প্রাপ্ত হবে তা নির্ভর করে এই জন্মে আমরা কি প্রকার কর্ম করছি -- তার উপর। এজন্য কর্মের মহত্ত্ব প্রচুর। আমরা সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক কি ধরনের কর্ম করে চলেছি -- তা দ্বারা পরবর্তী যোনি নির্ধারিত হবে।

পরের শ্লোকে ভগবান বলেছেন ------

13.22

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ,ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ
পরমাত্মেতি চাপ্য়ুক্তো, দেহে‌ऽস্মিন্পুরুষঃ(ফ্) পরঃ॥22॥

আত্মা বাস্তবে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম স্বরূপ ই। তিনি ব্রহ্ম, তিনি মহেশ আবার সেই তিনিই বিষ্ণু। আত্মার এই স্বরূপ বুঝতে হয় ধ্যানের মাধ্যমে। এবং এই স্বরূপ বুঝতে পারাই হলো এই নশ্বর জীবনের সার্থকতা। আমাদের মনীষিগণ বারবার নিজেকে এই প্রশ্ন করেছেন --- কোহম, কোহম, কোহম --- আমি কে?
আর এভাবে সাধনার স্তর যত উঁচুতে উঠবে... আস্তে আস্তে উত্তর আসবে --- সোহম, সোহম, সোহম। আমি -ই সেই, আমিই সেই। সেই ভর্তা এবং ভোক্তা উভয়ই মহেশ্বর, তিনিই বিষ্ণু, তিনিই ব্রহ্ম। ব্রহ্মাস্মি তে যে অনুভূতি হয়, তা এমনি এমনি আসে না। অনেক সাধনার প্রয়োজন। সাধনায় নিজেকে প্রজ্জ্বলিত করতে হয়, অবশেষে এই অনুভূতি আসবে - "অহম্ ব্রহ্মাস্মি"। কিছু জ্ঞানী নিজের জ্ঞানে এতোই মগ্ন যে তামসিক হয়েও নিজেকে বলেন-- অহম্ ব্রহ্মাস্মি। যখনই কারো এই অনুভব আসতে শুরু হবে, তখনই তার অন্তরে সমর্পণের ভাব তীব্র হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি কেউ বুকের ছাতি ফুলিয়ে প্রচার করতে বেরয়, এবং অন্যের থেকে বাহবা নিয়ে নিজের অহংকার কে সন্তুষ্ট করে ... সেটা ঠিক নয়... এরকম ধোঁকা দেওয়া গুরুর সংখ্যা ও কম নেই।

বাস্তবে যিনি ব্রহ্মা কে জেনেছেন, যিনি নিজের অন্তরস্থিত বিষ্ণুকে জেনেছেন, মহেশ্বরের স্বরূপ যিনি বুঝেছেন -- তিনি কি এমন করতে পারেন ? তিনি তখন একান্তে থাকতে চাইবেন। আত্মাকে আরও বিশুদ্ধ করার সাধনা করবেন, সেবায়েত হয়ে যাবেন।

সর্ব ভূত হিতে রতাঃ
এরকমই তার স্বভাব হয়ে যাবে। কারো জন্য তার অপেক্ষা নেই -- যে প্রকার মানুষ নিজের বাহবা তে লেগে থাকে, সে কিভাবে " অহম্ ব্রহ্মাস্মি" কে জানবে ??

13.23

য় এবং(ম্)বেত্তি পুরুষং(ম্),প্রকৃতিং(ঞ্) চ গুণৈঃ(স্) সহ
সর্বথা বর্তমানো‌ऽপি, ন স ভূয়ো‌ऽভিজায়তে॥23॥

মন, বুদ্ধি ও অহংকার নিয়ে সূক্ষ্ম শরীর। যার এই সূক্ষ্ম শরীর পরমাত্মাতে বিলীন হয়ে যায়, তার আত্মাও বিমুক্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই সে সর্বদার জন্য পরমাত্মার চরণে নিজের ঠাঁই করে নেয়।
এই যে মুক্তি --- সনাতন ধর্ম এর খোঁজই সবসময় করেছে। এই মুক্তি কিভাবে সম্ভব? কিভাবে তা প্রাপ্ত হবে? কিভাবে সাধনা করলে এই মুক্তি আসবে? আমাদের মুনি,ঋষি গণ সাধনার অনেক পথ খুঁজেছেন। এই পথে চলতে চলতে কেউ ভক্তির পথে গেছেন, কেউ জ্ঞানযোগ বেছে নিয়েছেন, কেউ কর্মযোগের পথ ধরেছেন আবার কেউ ধ্যান কে শ্রেয় মনে করেছেন।

13.24

ধ্য়ানেনাত্মনি পশ্য়ন্তি,কেচিদাত্মানমাত্মনা
অন্য়ে সাঙ্খ্য়েন য়োগেন, কর্ময়োগেন চাপরে॥24॥

ধ্যানযোগ, ভক্তিযোগ ও বলা হয়। ভক্তি দ্বারাই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়। কিছু মানুষ ধ্যানযোগের অভ্যাস করেছেন এবং এই পথকেই উত্তমরূপে জেনেছেন। পুরুষ তত্ত্বই চরাচরে সৃষ্টি রূপে ব্যাপৃত রয়েছে এবং এই সৃষ্টিই তাঁদের কাছে ভগবান স্বরূপ।
তাঁরা নির্গুণ - নিরাকারের উপাসনা করেন, ভক্তিযোগীরা সগুণ ও সাকারের উপাসনা করেন। তাতেই মন সমর্পণ করে দেন, ধ্যানমগ্ন থাকেন। কিছু মানুষ আবার জ্ঞানযোগের মাধ্যমে নিজের পথে চলেন। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় - সাংখ্যযোগ ( যাকে জ্ঞানযোগ ও বলা হয়) , তৃতীয় অধ্যায় হলো কর্মযোগ এবং দ্বাদশ অধ্যায় হলো ভক্তিযোগ।

এই তিন পথের উচ্চতম চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য আলাদা আলাদা পথ আছে। তিন রাস্তা ধরেই সেই উচ্চতায় যাওয়া যায়। আমার জন্য সঠিক পথ কোনটা তা আমাকেই খুঁজে নিতে হবে এবং এই কাজে আমার গুরুদেব আমাকে সাহায্য করতে পারেন। তিনি সবই জানেন। আপনার লক্ষ্য কোনদিকে হওয়া উচিত তা তিনি বলে দিতে পারবেন। গুরুদেবের সান্নিধ্যে আশ্চর্যজনক অনেক কিছু লাভ করা যায়।
আমাকে এক পথের সন্ধান দিলেন, হয়তো অন্যজনকে অন্য কোন পথের কথা বললেন। আমি হয়তো চূড়ার পূর্ব দিকে রয়েছি, চূড়ায় ওঠার জন্য হয়তো আমাকে পশ্চিম দিকে আসতে হতে পারে আবার এর উল্টো টা ও হতে পারে। পরস্পর বিরোধী লক্ষ্য থাকলেও চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।
শিখর তো নির্দিষ্ট, কিন্তু আমরা কোথায় আছি তার উপর পথ নির্ভর করে। জ্ঞানপথ না ভক্তিপথ... তা চিনতে গুরু সাহায্য করেন। যখন আপনি সঠিক গুরুর খোঁজ পাবেন তখন আপনি পথের ব্যাপারে ও নিশ্চিন্ত হতে পারেন। এইসব যোগ দ্বারা ( জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম ও ধ্যান) সেই পরমাত্মার স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ভগবদ্গীতা যোগ শেখায়।

গীতায় তো সব রাস্তার কথাই বলা আছে। গীতা হলো মা। মা যেমন তার তিনটি বাচ্চার জন্য আলাদা করে ভাবেন। সবচেয়ে ছোট বাচ্চাকে নিজের দুধ খাওয়ান, তার উপরের বাচ্চা কে সেরেল্যাক বা খিচুড়ি খাওয়ান আবার বড়ো বাচ্চাটির জন্য রুটি সব্জি রাখেন। মা সব বাচ্চার সঠিক পুষ্টি কিসে হয় তার খেয়াল রাখেন, খাদ্য দেন। গীতাও এমনই মা -- যিনি তাঁর সমস্ত সন্তানের উপযুক্ত যোগের কথা বলে দিয়েছেন। এর থেকে নিজের রাস্তা নিজেকে খুঁজে নিতে হবে।

13.25

অন্য়ে ত্বেবমজানন্তঃ(শ্), শ্রুত্বান্য়েভ্য় উপাসতে
তে‌ऽপি চাতিতরন্ত্য়েব, মৃত্যুং(ম্) শ্রুতিপরায়ণাঃ॥25॥

গ্রামে যখন ভাগবত সপ্তাহ চলতো কিংবা শ্রাবণ মাসের মেলায় পুরাণ ইত্যাদি কথা হতো, ঘরের মায়েরা সেখানে গিয়ে সেসব শুনতো এবং তাদের মনে সেসব গাঁথা হয়ে থাকতো.. এবং তা জীবনে অনুসরণ করতো। যেসব মায়েরা বেশি পড়াশোনা করেনি, গীতার শ্লোক পড়তে পারতো না -- তারা অন্যকিছু না ভেবে ভক্তিযোগের পথেই চলা শুরু করতো। নিত্য উপাসনা করতো নিদ্রায়, জাগরণে। ক্রমশ তাদের মধ্যে সন্তুষ্টির ভাব দেখা দিতে লাগলো। তারা গরীব ছিল... অনেক কিছু তাদের ছিল না, কিন্তু তাদের মনে খুশীর অন্তও ছিল না।
এরকমই অনেক অদ্ভুত যোগী হয়তো আমাদের আশেপাশেই আছেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা তাদের চিনতে পারি না। এমন যোগীর সামনে নতমস্তক হতে হয় এবং তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে হয়... গুরু হিসাবে এদের পেলে জীবন ধন্য হবে। তাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়... এরূপ কিভাবে প্রাপ্ত করলেন... তারা হয়তো উত্তর দিতে পারবে না। কারণ, শব্দ দিয়ে তা প্রকাশ করা সহজ নয়। নিজের গুরু দ্বারা, ছোট ছোট সাধন দ্বারা এই ভবসাগর পার করা যায়।
শবরীর কাছে একটাই শব্দ ছিল --- প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা। সারাজীবন প্রভু রামের জন্য প্রতীক্ষা করেছেন। রাত-দিন ঘুমাতেন না, জেগে থাকতেন, কি জানি -- কখন রাম এসে যাবেন! এই প্রতীক্ষাতেই এতো উঁচুতে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। সহজ ভাবে ধ্যান তো আপনিই তাঁর জীবনে এসেছে। অশিক্ষিত শবরী কেবলমাত্র একটি শব্দ 'প্রতীক্ষা'  দ্বারা ভবসাগর পার করেছেন। প্রভু রামচন্দ্রের কাছে শবরী নবধা-ভক্তি শিখতে চেয়েছেন। ভগবান রাম শবরীকে নবধা ভক্তির উপদেশ দিলেন। শোনা মাত্রই শবরীর শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে ব্রহ্ম তত্ত্বে লীন হয়ে গেল।

13.26

য়াবত্সঞ্জায়তে কিঞ্চিত্, সত্ত্বং(ম্) স্থাবরজঙ্গমম্
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংয়োগাৎ,তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ॥26॥

ক্ষেত্র অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত শরীর এবং ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ পুরুষ তত্ত্ব.. যা হলো পরমাত্মা।

13.27

সমং(ম্) সর্বেষু ভূতেষু, তিষ্ঠন্তং(ম্) পরমেশ্বরম্
বিনশ্য়ত্স্ববিনশ্য়ন্তং(ম্), য়ঃ(ফ্) পশ্য়তি স পশ্য়তি॥27॥

আমরা এদিক ওদিক সর্বদিকে তাকিয়ে দেখি। কিন্তু যা আমাদের দেখা উচিত তা আমরা দেখিনা। দ্রষ্টা কে আমরা ভিতর থেকে জাগিয়ে তুলি না। আমরা সবকিছু লৌকিক দৃষ্টিতে দেখি, আমাদের অলৌকিক দৃষ্টি খোলা নয়। যার মনে উচ্চ-নীচ ভেদ আসে না -- সমভাবে থাকে --
অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী ।।১২.১৩।।

অদ্বেষ্টার ভাব অভ্যাস করতে হবে, কাউকে দ্বেষ না করা, সকল প্রাণীর প্রতি সমভাব রাখা -- তা সে টিকটিকিই হোক না কেন -- তারও তো বাঁচার অধিকার আছে।

মৈত্রী ও করুণার ভাব যার মনে আসে, কোন নীচ ব্যক্তিকে দেখেও তার ঘৃণা বোধ হওয়া উচিত নয়। সেই ব্যক্তির জন্যও মনে করুণার ভাব রাখতে হয়। তাকে সাহায্য করা উচিৎ। কোন পাগল কে রাস্তায় দেখেও তার প্রতি প্রেমের ভাব রাখা উচিৎ। এটা যত বাইরে আসবে, ভিতরের দিকেও তত বেশি প্রবাহিত হবে। আমাদের ভিতরে লুকানো সাগর আছে আর তা জলতত্ত্বের প্রতীক। এই সাগরের জল প্রবহনেও অনেকের সঙ্কোচ, সহজে তা ভাগ করতে চায় না অনেকেই। হাসি নেই মুখে, সারাজীবন অহংকার - পূর্ণ হয়ে থাকে। এরকম মানুষ কিভাবে সেই স্তরে পৌঁছাতে পারে ??

13.28

সমং পশ্য়ন্হি সর্বত্র, সমবস্থিতমীশ্বরম্
ন হিনস্ত্য়াত্মনাত্মানং(ন্), ততো য়াতি পরাং(ঙ্) গতিম্॥28॥

যে সমতার ভাব রাখে না, সে নিজেকে নষ্ট করছে। যে সমান ভাবে সবাইকে দেখে, সে নিজেকে সন্তুষ্ট রাখে। নষ্ট করা বা সন্তুষ্ট করা -- এ তো নিজের উপর নির্ভর করে। যদি কাম,ক্রোধ, লোভ, মোহ,এবং মাৎসর্য্য কে সাথে নিয়ে কেউ চলে তাহলে সে নিজেকেই নষ্ট করবে। যখনই এই সবকিছু বিনষ্ট করে দিয়ে, প্রেমের গঙ্গা প্রবাহ বইয়ে দিয়ে সকলের প্রতি সমান ভাব নিয়ে চলা যায় -- তখন মান হোক বা
অপমান, জয় বা পরাজয়, লাভ বা ক্ষতি, সুখ বা দুঃখ সব সমান হয়ে যায়।

সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ ।।১২.১৮।।
তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ ।
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্ মে প্রিয়ো নরঃ ।।১২.১৯।।

সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি ।।১২.৩৮।।

ভগবান এইসব শ্লোক এর আগেও অর্জুন কে বুঝিয়েছেন। শীত হোক বা উষ্ণ -- পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমার যেন মন বিচলিত না হয়। মন অটল থাকলে পরিস্থিতি আমার জন্য সঠিক হয়ে যাবে। কখনো কখনো এসিতে থেকেও ঘুম আসে না, আবার খোলা আকাশের নিচে গরমেও গভীর ঘুম এসে যায়। গরমেও লোকে আনন্দে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। ঘুম তো ভিতর থেকে আসে আর হাওয়া বাইরে থেকে। বাইরের বস্তুতে পার্থক্য করা উচিৎ নয় - এই ভাব যার মনে জেগেছে, তার সমত্বের সৌভাগ্য হয়েছে।

13.29

প্রকৃত্য়ৈব চ কর্মাণি, ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ
য়ঃ(ফ্) পশ্য়তি তথাত্মানম্,অকর্তারং(ম্) স পশ্য়তি॥29॥

কখনো কখনো মনে প্রশ্ন আসে যে, ভগবানই তো আমাদের বুদ্ধি দিয়েছেন এবং ভগবানই তা খারাপ কাজে লাগিয়েছেন। আমি তো কিছু করিনি, যা করার ভগবান করেছেন। কিন্তু ভগবান তো অন্তরাত্মায় বসে আছেন। এসব কাজ প্রকৃতি দ্বারা হয়। আমাদের বুদ্ধি ও প্রকৃতি দিয়েছে। খারাপ কাজ করার পরে যদি মনে বিকার আসে এবং যে বিচার আসে তা আসলে বুদ্ধি দ্বারাই আসে ... নিজের বুদ্ধিতে ভুল কাজ করা হয়েছে -- নিজের কাজের দায় নিজেরই ... যখন এই ব্যাপার টা বুঝতে পারে -- সেই কর্ম তখন কর্তা থেকে অকর্তা হয়ে যায়।
একটা কার্যের ক্রিয়া তিনপ্রকার হয় -- কর্ম, অকর্ম ও বিকর্ম। কর্ম - যেটা করতেই হয়। মানুষ কর্ম ছাড়া থাকতে পারে না। মানব জীবনে কর্ম তো করতেই হয় -- মানুষ যে শ্বাস নেয়, সেটা ও একটা কর্ম।
যখন মনের মধ্যে কর্মের ভাব বদলে যায় তো কর্ম তখন অকর্মে বদলে যায়। কোন গৃহিণী যখন রান্না করে, তখন যদি শুধু পরিবারের জন্য রান্না করছি এটা ভাবে, তাহলে সেটা ক্ষুদ্র পরিসরে স্বার্থপর ভাবনা -- 'আমি এবং আমার ' এই ভাব ভরা কর্ম করছে সে। কিন্তু, রান্না করার সময় যদি তার মনে এই বিচার আসে যে ভগবানের জন্য ভোগ তৈরি করছি, এবং রান্না হয়ে গেলে ভগবান কে নিবেদন করে সকলকে প্রসাদ ভাগ করে দেবো -- তখন সেই কর্ম অকর্মে পরিণত হয়। তার তৈরি খাবার থেকে কুকুর, গরু, কাক ও ভাগ পাবে... এই ভাব নিয়ে যখন রান্না করবে তখনও কর্ম বদলে যাবে অকর্মে। বুদ্ধি দিয়ে করা কাজ মনে আনন্দ দেয়, কিন্তু মন ও বুদ্ধি মিলে যখন কোন কর্ম করা হয়, তখন তা অকর্ম হতে শুরু করে।
যখন কেউ খারাপ কাজ করে তখন তা বিকর্ম হয়ে যায়। বিকর্মে মনের কথা মেনে কর্ম করা হয় এবং বুদ্ধিকে পিছনে রাখা হয়, কারণ, বুদ্ধি ওই কাজে বাধা দেয় মনকে।
বুদ্ধি অনুসারে মন দিয়ে করা কাজ হলো কর্ম। মন তাতে খুশি থাকুক বা না থাকুক, কর্ম করতেই হয়। কিন্তু, মন যখন প্রসন্নতার সাথে বুদ্ধির পিছনে চলে যে কাজ করে তা অকর্ম হয়ে যায়। মন যদি বুদ্ধির বিপক্ষে গিয়ে নিজের মর্জিতে কাজ করে তাহলে তা বিকর্ম হয়ে যায়।
ভগবান বলেন, যখন সমত্ব ভাব মনে আসবে, তো আপনিই অকর্তা হওয়ার শুরু হয়ে যাবে।

13.30

য়দা ভূতপৃথগ্ভাবম্, একস্থমনুপশ্য়তি
তত এব চ বিস্তারং(ম্), ব্রহ্ম সম্পদ্য়তে তদা॥30॥

পুরুষ এবং প্রকৃতি'র, ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞ'র জ্ঞান যার হয়েছে... তিনি ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত করার দিকে অগ্রসর হয়েছেন।

13.31

অনাদিত্বান্নির্গুণত্বাত্ ,পরমাত্মায়মব্যয়ঃ
শরীরস্থো‌ऽপি কৌন্তেয়, ন করোতি ন লিপ্য়তে॥31॥

যখন ড্রাইভার গাড়ি চালায়, পিছনে বসে থাকা শেঠজি 'র আর কিছু করার থাকে না। উনি ব্রেক অবধি চাপতে পারবেন না। উনি অকর্তা... পিছনে পিছনে ওনাকে চলতে হবে।

13.32

য়থা সর্বগতং(ম্) সৌক্ষ্ম্য়াদ্,আকাশং(ন্) নোপলিপ্য়তে
সর্বত্রাবস্থিতো দেহে, তথাত্মা নোপলিপ্য়তে॥32॥

যখন ঘড়ার মধ্যে জল রাখা হয়, তখন জল ঘড়ার আকার ধারণ করে। যদি ঘড়া ফুটো হয়ে যায় এবং জল বেরিয়ে যায়, তখন আর জলের কোন আকার থাকে না, তা নিরাকার হয়ে যায় --- কিন্তু যতক্ষণ ঘড়ার মধ্যে ছিল, ততক্ষণ তার আকার ছিল।
একইভাবে, খালি ঘটের মধ্যে আকাশ রয়েছে মনে হয়। কিন্তু, ঘটের আকাশ এবং বাইরের আকাশে কোন প্রভেদ নেই। সেরকম আমাদের ভিতরের আত্মা ও পরমাত্মা একই --- এটা বুঝতে হবে।

13.33

য়থা প্রকাশয়ত্য়েকঃ(খ্),কৃত্স্নং(ম্),লোকমিমং(ম্) রবিঃ
ক্ষেত্রং(ঙ্) ক্ষেত্রী তথা কৃত্স্নং(ম্),প্রকাশয়তি ভারত॥33॥

চাঁদে চৌদ্দ দিন রাত্রি থাকে -- এটা চন্দ্রযান পাঠানোর পরে জানা গেছে। আগে মনে হতো এইদিকে দিন আর উল্টো দিকে রাত... যেমন পৃথিবীতে হয়, তেমনই চাঁদেও হবে। কিন্তু ওখানকার নিয়ম আলাদা --- মঙ্গলেও নিশ্চয় অন্যরকম নিয়ম হবে , প্লুটোয় আবার আলাদা নিয়ম হবে। কিন্তু, আলো প্রদানকারী সূর্য তো একই। তেমনই পরমাত্মার অতি ক্ষুদ্র অংশ সমগ্র ক্ষেত্রজ্ঞ কে প্রকাশ করে। কিন্তু সুইচ তো অন্ করতে হবে, না হলে কি করে আলো দেখা যাবে?? ভগবদ্গীতা বোঝা এবং তাকে জীবনে নিয়ে আসা হলো এই সুইচ অন্ করার বিদ্যা। আর এটা করলে পুরো আলোকময় হয়ে উঠবে।

13.34

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবম্, অন্তরং(ঞ্) জ্ঞানচক্ষুষা
ভূতপ্রকৃতিমোক্ষং(ঞ্) চ, য়ে বিদুর্য়ান্তি তে পরম্॥34॥

পরমাত্মার বিরাট স্বরূপ কে, প্রকৃতি এবং পুরুষ তত্ত্বের গুণ যতক্ষণ না বোঝা যাবে... পরম ব্রহ্ম - প্রাপ্তি মার্গ সহজ হবে না। ত্রয়োদশ অধ্যায়ে শ্রী ভগবান অতি সুন্দর শাস্ত্র বুঝিয়েছেন।

:: প্রশ্নোত্তর পর্ব ::

প্রশ্নকর্তা :- শশি পুরোহিত দিদি
প্রশ্ন :- মহিলাদের কি গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা উচিৎ ??
উত্তর :- প্রকৃতিই মহিলা ও পুরুষ আলাদা করেছে। মহিলাদের মন কোমল হয়, সেজন্য কিছু কিছু দেবতাদের পূজা, জপ ইত্যাদি করায় নিষেধ আছে, যাতে তাদের কোমল মনে কোন প্রভাব না পড়ে। এজন্য মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র, গায়ত্রী মন্ত্র ইত্যাদির জপ তখন করতে বলা হয়, যখন সহ্য করতে পারবে।

প্রশ্নকর্তা :- বসন্ত মিশ্রা ভাইয়া
প্রশ্ন :- যদি তত্ত্বের জ্ঞান হয়, তাহলে আমরা পরম ব্রহ্ম কে প্রাপ্ত করতে পারবো -- এর মানে কি ?
উত্তর :- বিশ্লেষণ করার জন্যই জ্ঞান আর যার বিশ্লেষণ করা হয়, তাই তত্ত্ব। যতক্ষণ না আমাদের বুদ্ধি নিশ্চয়াত্মক হবে, ততক্ষণ আমরা তত্ত্ব কে জানতে পারবো না। বুদ্ধি যখন নিশ্চিতরূপে মানতে পারবে তবেই আমরা তার প্রয়োগ করতে পারবো। যেভাবে আমরা বাচ্চাদের প্রথমে বিজ্ঞান বোঝাই, যে এটা এই কারণে হয়, তবেই বাচ্চারা মেনে নেয়। যদি তাদের বলি, আমি বড়ো, তাই আমি বলছি সেটাই ঠিক, তাহলে সে মানবে না।


প্রশ্নকর্তা :- সুধাকর মিশ্র ভাইয়া
প্রশ্ন :- সূক্ষ্ম শরীর ও কারণ শরীর বুঝিয়ে বলুন।
উত্তর :- আমাদের শরীর পাঁচ প্রকার কোষ দ্বারা নির্মিত --

১) অন্নময় কোষ
২) বিজ্ঞানময় কোষ
৩) জ্ঞানময় কোষ
৪) মনোময় কোষ
৫) আনন্দময় কোষ

যা আমরা দেখতে পাই, তা স্থূল শরীর, আর যা আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু তার উপস্থিতি বুঝতে পারি তা হলো সূক্ষ্ম শরীর। মন, বুদ্ধি, অহংকার এগুলো সূক্ষ্ম শরীরের অংশ। আত্মাও সূক্ষ্ম শরীরে ব্যাপ্ত কিন্তু তা নির্লিপ্ত। আয়ুর্বেদে শরীর শাস্ত্রে কারক শরীর, কারণ শরীর ও সূক্ষ্ম শরীরের সুন্দর ব্যাখ্যা দেওয়া আছে।

প্রশ্নকর্তা :- হনুমান প্রসাদ বাগড়িয়া ভাইয়া
প্রশ্ন :- ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞ বুঝিয়ে দিন
উত্তর :- ক্ষেত্র অর্থাৎ শরীর। শরীর প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে, যাতে পুরুষের ও অংশ আছে। পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহংকার ইত্যাদি তেইশ প্রকার বিষয় সম্মিলিত প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত শরীর।
ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ এই স্থূল শরীর কে চালনাকারী চেতনা। যে মূহুর্তে এই চেতনা নির্গত হয়ে যায় তখনই শরীর ঠান্ডা হতে শুরু করে। চোখ দিয়ে আমরা দেখি, কিন্তু সেই দৃশ্যকে বিশ্লেষণ করে যে সেই হলো ক্ষেত্রজ্ঞ।

প্রশ্নকর্তা :- পুখরাজ কছাবা ভাইয়া
প্রশ্ন :-সমষ্টি আর ব্যক্তি প্রকৃতি তে অহংকার কিরকম হয়??
উত্তর :- উভয়ের মধ্যেই অহংকার ব্যপ্ত হতে পারে। যখন অহংকার ব্যক্তিগত হয় তো ব্যক্তি প্রকৃতি তে হয় এবং যখন অহংকার সমগ্র তে ব্যপ্ত হয় তো তা সমষ্টি প্রকৃতি তে হয়।

প্রশ্নকর্তা :- ডা: উত্তমা মিশ্রা দিদি
প্রশ্ন :- আত্মজ্ঞান ও তত্ত্বজ্ঞান কি??
উত্তর :- যখন জ্ঞান কে তত্ত্বত: নিজের অনুভব দ্বারা প্রাপ্ত করা যায়, সেই আত্মজ্ঞান কে তত্ত্বজ্ঞান বলা হয়।

প্রশ্নকর্তা :- ডা: জয়া দিদি
প্রশ্ন :- যা সত্য, তা দেখা যায় না আর যা দেখা যায় তা সত্য নয়... এই ভ্রম কিভাবে দূর হবে ? অলৌকিক দৃষ্টি কিভাবে খোলে ?
উত্তর :- যদি কোনো ব্যক্তি আমার সাথে দেখা করতে আসে এবং বলে যে বাইরে কুকুর বসে আছে। কিন্তু আমি তাকে বললাম যে যে বাইরে কুকুর নেই। অর্থাৎ আমার ক্ষমতা নেই যে আমি তাকে দেখতে পাবো। সেইপ্রকার যা আমি দেখছি না তা অসত্য, এটা ঠিক নয়, ব্যাপার হলো যে অদৃশ্য সত্য দেখার ক্ষমতা আমার নেই।


ওঁ তৎসৎ নাম উচ্চারণপূর্বক ব্রহ্মবিদ্যা ও যোগশাস্ত্রময় ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায় পূর্ণ হলো।