विवेचन सारांश
মন ও বুদ্ধির সমর্পণের দ্বারাই ভক্তি সম্ভব

ID: 3709
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 23 সেপ্টেম্বর 2023
অধ্যায় 12: ভক্তিযোগ
1/2 (শ্লোক 1-9)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ ড: সঞ্জয় মালপাণী মহাশয়


হরি নাম সংকীর্তন, ভজন, হনুমান চালিসা পাঠ, প্রারম্ভিক প্রার্থনা ও দীপ প্রজ্জ্বলনের পর আজকের বিবেচন সত্র শুরু হয়।

এখানে আমরা সকলেই সাধক এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বোঝার চেষ্টা করছি। আমরা ম্যানেজমেন্ট এর যত বইই পড়ি না কেন, কাউন্সেলিং এবং ম্যানেজমেন্টের সেরা বই হল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। যদি আমাদের mental breakdown(মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া) হয়, তখন এর নিরাময়ের উপায় পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন বইতে পাওয়া যায়, কিন্তু আমাদের সমস্ত শাস্ত্রে এই ব্যাপারে জোর দেয় যে যেন আমাদের জীবনে কোনো বিঘ্ন না ঘটে এবং জীবন কল্যাণময় হয়ে ওঠে।

যেমন আমরা নিয়মিত গাড়ির সার্ভিসিং করি যাতে গাড়ি সচল অবস্থায় থাকে, ঠিক তেমনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমাদের এটাই শেখায় যে অর্জুনের মতো আমাদের বিভ্রান্ত হয়ে পড়া উচিত নয়, আমাদের mental breakdown হওয়া উচিত নয়। হতাশাগ্রস্থ অর্জুনকে শ্রী কৃষ্ণ গীতায় যা যা বলেছিলেন তা যদি আমরা পূর্বেই পড়ে নিই, তবে আমাদের জীবনে সেই পরিস্থিতি কখনোই আসবে না।

গীতা পরিবার আমাদের সাহায্য করে যে কিভাবে গীতায় উল্লিখিত জীবনের মূল্যবোধকে আমরা নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারি। আমরা যতবারই গীতা পড়ি, ততবারই আমরা নতুন কিছু শিখি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় সবার জন্য পথ দেখানো হয়েছে, সে খুব বুদ্ধিমানই হোক বা অল্পবুদ্ধিই হোক। গীতায় উল্লিখিত জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ এবং সাংখ্যযোগ সবই আমাদের একই গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। পৌঁছানোর পথ ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু গন্তব্য একই। কেউ হয়তো শুরু করে পূর্ব থেকে, কেউ বা পশ্চিম থেকে। ধরে নিন যে আপনার কোনো বন্ধু বা আত্মীয় গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আপনাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলো যে সে গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছে, সে নদী পার হওয়ার জন্য কোন নৌকা ব্যবহার করবে? তখন আপনার উত্তর হবে যে প্রথমে বলো যে তুমি কোথাকার গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছো? ঋষিকেশে, গঙ্গোত্রীতে, গঙ্গাসাগরে নাকি প্রয়াগরাজে। আপনার বন্ধু যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেই স্থান অনুযায়ী আপনি তাকে নৌকা সম্পর্কে বলতে পারবেন। আপনি কোন তীরে দাঁড়িয়ে আছেন তার উপর নির্ভর করে যে কি প্রকারের নৌকা আপনার প্রয়োজন?

একইভাবে, একজন সাধকের অবস্থিতি কোথায়? তার অবস্থিতি স্থির করবে যে তাকে কোন নৌকায় চড়তে হবে? ভক্তিযোগ, কর্মযোগ নাকি জ্ঞানযোগে? অতএব, যখন আমরা ভক্তিযোগের সাধনা করি, তখন আমরা এটা অনুভব করি যে ভক্তিযোগই হলো সর্বশ্রষ্ঠ। অর্জুন ভগবানকে এমনভাবে প্রশ্ন করেছিলেন যে তার সাথে সাথে আমরাও ভক্তিযোগের সারমর্ম বুঝতে পারি এবং অনুভব করি যে এটি সাধনার সবচেয়ে সহজ পথ। এর জন্য আমাদের অর্জুনকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত যে তার কারণে আমরাও আমাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রারম্ভে এর মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে অর্জুন হলেন গোবৎস অর্থাৎ বাছুরের ন্যায় এবং যিনি বেদ ও উপনিষদরূপী গাভীকে দোহন করেন তিনি হলেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। অর্জুন, যিনি এই অমৃত পান করছেন, তাকে এখানে বাছুর বলা হয়েছে। অর্জুনের কারণেই আমরা এই অমৃত প্রাপ্ত করার সুযোগ পেয়েছি।

12.1

এবং(ম্) সততয়ুক্তা য়ে, ভক্তাস্ত্বাং(ম্) পর্য়ুপাসতে য়ে চাপ্যক্ষরমব্যক্তং(ন্), তেষাং(ঙ্) কে য়োগবিত্তমাঃ।।1।।

যে সকল ভক্ত নিবিষ্ট চিত্তে নিরন্তর আপনার (সগুণ ভগবানের) উপাসনা করেন, এবং যাঁরা অবিনাশী নিরাকারের উপাসনা করেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোগী কে?

বিবেচন: অর্জুন বললেন- যারা প্রতিনিয়ত আপনার ভক্তিতে আবিষ্ট হয়ে আপনার সগুণ, সাকার রূপের আরাধনা করে এবং যারা আপনার অবিনশ্বর, নির্গুণ ও নিরাকার রূপের আরাধনা করে, এই ভক্তদের মধ্যে যোগীশ্রেষ্ঠ কে?

অর্জুনের এই প্রশ্নটি যেন ঠিক সেইরকম হল যে- কেউ যদি একজন মাকে জিজ্ঞেস করে যে তিনি নিজের বড় ছেলেকে বেশি ভালোবাসেন নাকি ছোট ছেলেকে  এবং তারপর যদি আরও বলে যে তুমি নিজের দুই সন্তানের মধ্যে একজনকে নিজের কাছে রাখো এবং অন্যজনকে আমার সাথে পাঠাও, তখন সেই পরিস্থিতিতে মা বলবেন যে বড়টি যথেষ্ট  বুদ্ধিমান, তাই  ছোটটিকে আমি আমার কাছে রাখি, কারণ খিদে পেলে ছোটটি কাঁদে এবং মশা কামড়ালে বা তার ন্যাপি ভিজে গেলেও কাঁদতে শুরু করে, কিন্তু আমি তার কান্না শুনে বুঝে নিই যে সে ক্ষুধার্ত নাকি অসুস্থ। ছোট সন্তানটি সম্পূর্ণরূপে আমার উপর নির্ভরশীল তাই একে আমি আপনার সঙ্গে পাঠাতে পারবো না।

বড় সন্তানটি হলো বুদ্ধিমান, খিদে পেলে বলতে পারে, তাই তুমি ওকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাও, কিন্তু তবুও ওকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে যেও কারণ আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। এভাবেই  মা জবাব দিলেন কারণ তারা দুজনেই তার প্রিয়। একইভাবে ঈশ্বরও উত্তর দিলেন -

12.2

শ্রী ভগবানুবাচ

ময়‍্যাবেশ্য মনো য়ে মাং(ন্), নিত্যয়ুক্তা উপাসতে
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাঃ(স্), তে মে য়ুক্ততমা মতাঃ।।2।।

শ্রীভগবান বললেন—আমাতে মন নিবিষ্ট করে নিত্য-নিরন্তর আমাতে যুক্ত হয়ে যেসব ভক্ত পরম শ্রদ্ধা সহকারে আমার (সগুণ-সাকারের) উপাসনা করেন আমার মতে তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী ।

বিবেচন: শ্রী ভগবান বললেন- যে ভক্তরা আমার প্রতি মন স্থির রেখে পরম ভক্তি- শ্রদ্ধা সহকারে আমার সগুণ সাকার রূপকে আরাধনা করেন, আমার মতে তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী।

শ্রী ভগবান বলেছেন যে প্রকৃত ভক্তরা নিত্য প্রতিদিন আমার নিকটে আসন পেতে বসে পূজা করে, তারা আমার অত্যন্ত প্রিয়। একটি ছোট শিশু যেমন সম্পূর্ণরূপে তার মায়ের উপর নির্ভরশীল, তেমনি একজন প্রকৃত ভক্ত ভগবানকেই নিজের সর্বস্ব মনে করে এবং কেবল তাঁরই ধ্যান করে। যেমন- শবরী।

শবরী নিজের বাল্যাবস্থায়ই মাতঙ্গ ঋষির আশ্রমে পৌঁছেছিলেন। এর কারণটি এখানে বিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে।  শবরীর পিতা তার বিয়ের ভোজে খাওয়ানোর জন্য কিছু ভেড়ার বাচ্চা পুষে রেখেছিলেন। একদিন শবরী যখন সেই মেষশাবকদের নিয়ে খেলা করছিলেন, তখন তার বাবা বললেন, 'যতক্ষণ ইচ্ছা খেলো, যখন তোমার বিয়ে হবে, তখন এদের কেটে রান্না করা হবে।' এ কথা শুনে শবরী বিনিদ্র অবস্থায় রাতভর জেগে রইলেন এবং ভোররাতেই বাড়ি ত্যাগ করেন। সকালে শবরী নিখোঁজ হয়েছেন শুনে তার বাবা তাকে খুঁজতে লোক পাঠান। লোকজনদের দেখে শবরী গাছে উঠে পড়লেন। তিনি সারাদিন গাছে বসে থাকতেন এবং রাতে গাছ থেকে নেমে দৌড়াতে থাকতেন। এভাবেই চলতে চলতে একদিন তিনি একটি আশ্রমের কাছে পৌঁছে গেলেন। সেখানে তিনি  সাত্ত্বিক ঋষি-মুনিদের দেখতে পেলেন। সেই আশ্রমের গুরু মাতঙ্গ ঋষি শবরীকে আশ্রমে থাকার অনুমতি দেন।

একদিন মাতঙ্গ ঋষি বললেন, আজ আমার প্রয়াণের দিন এসেছে, যদি কেউ কোন প্রশ্ন করতে চায়, সে জিজ্ঞেস করতে পারে। সকল শিষ্যরা তাকে নিজের নিজের প্রশ্ন করতে লাগলেন। শবরী তখন বয়সে খুবই ছোট ছিল, তাই গুরুজীকে কি জিজ্ঞেস করবে বুঝতে পারছিল না, তার সুযোগ এলে সে বললো, আপনি কোথায় যাচ্ছেন ? আপনি কি আর কখনোই ফিরবেন না? তবে আমাকে শুধু এটা বলে যান যে ভগবানকে কোথায় পাবো? তার সাথে কি কখনো আমার দেখা হবে?

মাতঙ্গ ঋষি বললেন, ভগবান এখানেই তোমার সাথে দেখা করতে আসবেন, তুমি তাঁর জন্য এখানেই অপেক্ষা কর এবং তারপর থেকে শবরী ভগবানের জন্য সেই আশ্রমেই অপেক্ষা করতে লাগলো। মাতঙ্গ ঋষির মৃত্যুর পর তার অন্য সব শিষ্যরা এখানে-সেখানে চলে গেলেও শবরী সেই আশ্রমেই থেকে যায়। সে প্রতিদিন ভগবানের জন্য অপেক্ষা করত এবং বলত আমার রাম নিশ্চয়ই আসবেন। সে আশ্রমের পূব দিকে ঝাড়ু দিত। একদিন তার মনে হলো ভগবান যদি পশ্চিম দিক থেকে আসেন বা দক্ষিণ দিক থেকে, বা হয়তো উত্তর দিক থেকে আসেন, তারপর থেকে সে রোজ  আশ্রমের চার দিকই পরিষ্কার করতে লাগল। শবরী প্রতিদিন নদীতে গিয়ে জল আনত আর বলতো আমার প্রভু রাম আসবেন। সে নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভগবানের নাম স্মরণ করে যেতে লাগলো। প্রত্যেকদিন সে জল এবং কুল ইত্যাদি ফল নিয়ে আসতো। ফলগুলি নষ্টহয়ে গেছে কিনা দেখার জন্য সে ফলগুলি একটু কামড়ে খেয়ে দেখে নিত। এই ভাবে ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে  শবরী বৃদ্ধ হয়ে গেল কিন্তু তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে আমার গুরুজী যখন বলেছেন যে প্রভু রাম আসবেন, তবে ভগবান অবশ্যই আসবেন। তার ভগবান রাম আসবেন এই আশায় সে রোজ ফুল নিয়ে আসত। সে রাতেও ঘুমোতো না।  তার মনে হত যে এমন যেন না হয় যে প্রভু রাম রাতে এলেন, আর আমি ঘুমিয়ে থাকলাম। এই ভেবে শবরী রাতেও ঘুমাতো না এবং তার বিশ্বাস একটুও কমলো না। এটি হলো ভক্তিযোগের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা। অবশেষে যখন প্রভু রাম এলেন তখন শবরীর চোখ থেকে অবিরত অশ্রু ঝরতে লাগল। তিনি যখন প্রভু রামের পা ধুতে জল আনতে গেলেন, তখন শ্রীরাম বললেন শবরী, তোমার কাজ তো হয়েই গেছে, তুমি নিজের চোখের জল দিয়ে আমার পা ধুয়ে দিয়েছো।

এমন সৌভাগ্য শুধুমাত্র শবরী পেয়েছেন আর কেবট মাঝি পেয়েছেন। কেবট মাঝি প্রভু রামের চরণ ঘষে ঘষে ধুয়েছিল। মাঝি শ্রী রামকে বলল, আপনার পায়ের স্পর্শে পাথরও নারী হয়ে যায়, তাই আমার নৌকার যদি কিছু হয়, তাহলে আমি জীবিকা নির্বাহ কিভাবে করব? এই বলে মাঝি প্রভুর পা ভালো করে ঘষে ধুয়ে দিল। লক্ষ্মণ ও মা সীতাও এটা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন কারণ এই  শ্রী রাম যিনি বরপুজোর সময় রাজা জনককে পর্যন্ত নিজের পা ধুতে দেননি, আজ একজন নৌকার মাঝি রামের পা ধুইয়ে দিচ্ছে। শবরী এবং কেবট মাঝি, দুজনেই রামের অনন্য ভক্ত ছিলেন। নদী পার হওয়ার পর প্রভু রাম যখন নৌকা থেকে নেমে আসেন, তখন তাঁর মনে হয় যে মাঝিকে কিছু পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত কিন্তু তিঁনি তখন সন্ন্যাসী, তাঁর কাছে কিছুই ছিল না। তার সেই  অবস্থা দেখে মা সীতা বুঝতে পেরে তার আংটিটি বের করে শ্রী রামকে দিলেন। শ্রী রাম কেবট মাঝিকে আংটি দিতে চাইলে সে তা নিতে অস্বীকার করে এবং বলে, ভগবান ! এ আপনি কি করছেন? হে প্রভু ! আমি গান গাইতে গাইতে নৌকায় দাঁড় বাইছিলাম। আমি দেখেছি যে মা গঙ্গাও তোমার চরণ স্পর্শ করার জন্য অনেক উঁচুতে উঠে আসছিলেন আর আমি বারবার এই প্রার্থনা করছিলাম যে মা গঙ্গা যেন আমার নৌকায় না এসে পড়েন।  এটা আমার পরম সৌভাগ্য। প্রভু, আজ আমি আপনাকে গঙ্গা পার করিয়েছি, এর জন্য আমি কোনও পারিশ্রমিক নেব না কারণ আমি একজন ব্যবসায়ী। আপনাকে গঙ্গা পার করতে সাহায্য করা আমার কাজ, আর যখন আমার সময় আসবে, তখন কিন্তু আপনি আমাকে ভবসাগর পাড়ি দিতে সাহায্য করবেন। আমিও একজন শ্রমিক, আপনিও একজন শ্রমিক এবং একজন শ্রমিক কখনো অন্য শ্রমিকের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেয় না।

12.3

য়ে ত্বক্ষরমনির্দেশ্যম্, অব্যক্তং(ম্) পর্য়ুপাসতে
সর্বত্রগমচিন্ত্যং(ঞ্) চ, কূটস্থমচলং(ন্) ধ্রুবম্।।3।।

যাঁরা সম্পূর্ণরূপে নিজ ইন্দ্রিয় বশীভূত করে অচিন্ত্য, সর্বত্র পূর্ণভাবে অবস্থিত, অনির্দেশ্য, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব,।

 

12.4

সন্নিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং(ম্), সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ
তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব, সর্বভূতহিতে রতাঃ।।4।।

অক্ষর এবং অব্যক্তের একাগ্রের সঙ্গে উপাসনা করেন, সেই প্রাণীমাত্রেরই হিতপরায়ণ এবং সর্বত্র সমবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ আমাকেই প্রাপ্ত হন।

বিবেচন: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যারা নিজের  ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে অচিন্তনীয়, সর্বব্যাপী, অনির্বচনীয়(যা বর্ণনার অতীত), অপরিবর্তনীয়, অচল, শাশ্বত এবং অব্যক্ত স্বরূপের উপাসনা করেন, যারা সর্বদা  প্রাণীমাত্রের কল্যাণে রত থাকেন এবং সমবুদ্ধিভাবাপন্ন হন, তারাও আমাকে প্রাপ্ত করেন। এই শ্লোকটি পড়ে মনটা শিহরিত হয়ে ওঠে। ভগবান যখন বলেন নিরাকারের উপাসনা করাও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই শরীরটি হলো ইন্দ্রিয়ের সমষ্টি। যিনি নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করে আমার আরাধনা করেন, তিনিও আমার প্রিয়।

অষ্টাঙ্গ যোগে আটটি অঙ্গ রয়েছে। আটটি ধাপ আছে। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান এবং সমাধি। যম এবং নিয়ম সর্বদা একসাথে চলে এবং  ইন্দ্রিয়গুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখেই আমরা এগিয়ে যাই। যা অনিশ্চিত ও অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, অকল্পনীয়, অপরিবর্তনীয়, স্থির নিশ্চিত এবং অক্ষয় অর্থাৎ যার কোনো ক্ষয় হয় না, যারা তার উপাসনা করেন, শেষ পর্যন্ত তারাই  কেবল আমাকে প্রাপ্ত করেন।

সর্বভূতানাম্  (অর্থাৎ সকল জীব-জন্তু) আমাদের শাস্ত্রে সকল প্রাণীকেই পূজনীয় বলে মনে করা হয়। নাগ পঞ্চমীর দিনে সাপের পূজা করা হয় এবং গোবৎস দ্বাদশী বা নন্দিনী ব্রত পালন করা হয় যেদিন গরুর বাছুরের পূজা করা হয়। আমাদের সংস্কৃতিতে প্রত্যেকটি জীবকেই পূজনীয় মনে করা হয়। প্রতিদিন গরুর পূজা করার কথা বলা হয়েছে, গাছের পূজা করারও বিধান আছে। তুলসীর পুজো, অশোক গাছের পুজো, অক্ষয় নবমীতে আমলকি গাছের পুজো, নিত্য পিপল গাছের পুজো, বট সাবিত্রীর দিনে বটগাছের পুজো করতে বলা হয়েছে। এমনকি, আমরা গোবর্ধন পর্বতের পূজা করি, সমুদ্র পূজা করি এবং জলের পূজাও করি। ছট পুজোর দিনে সূর্যের পূজা করা হয়। পঞ্চভূতের পূজা করার বিধিও আছে। আমাদের শাস্ত্রে চরাচর সৃষ্টি পূজনীয়।

আমাদের এটা শেখানো হয়েছে যে আমরা যেন সকল জীবকে সমদৃষ্টি নিয়ে দেখি। আমরা প্রতিদিন পিঁপড়েকেও আটা বা শস্য দিই এবং হাতিদের খাবারেরও জোগাড় করে দিই। পিঁপড়ে ছোট প্রাণী বলে তাকে পিষে মেরে দাও, আর হাতি বড় বলে তাকে সম্মান করতে হবে, এই রকম শিক্ষা আমাদের দেওয়া হয়নি। কুকুরকে রুটি এবং কাককে খাবার দিতেও শেখানো হয়। ভগবান বলেছেন যে, যারা সমস্ত জীবের উপাসনা করে এবং ভালবাসে, পরোক্ষভাবে তারা আমারই পূজা করে।

12.5

ক্লেশোধিকতরস্তেষাম্, অব্যক্তাসক্তচেতসাম্
অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং(ন্), দেহবদ্ভিরবাপ্যতে।।5।।

অব্যক্তে (নির্গুণ ব্রহ্মে) আসক্তচিত্ত সেই সাধকদের (নিজ নিজ সাধনে) অধিক ক্লেশ হয়ে থাকে, কারণ দেহধারী ব্যক্তিদের অব্যক্তের প্রাপ্তি কষ্টে লাভ হয়।

 বিবেচন: ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন যে সমস্ত সাধকেরা অব্যক্তের প্রতি আসক্তচিত্ত হয়, তাদের সাধনার পথ বেশি কষ্টকর হয়; কারণ দেহধারীদের (মানুষ) জন্য ভগবানের অব্যক্ত রূপ উপলব্ধি করা কষ্টসাধ্য। যে ব্যক্তি ভগবানকে অব্যক্ত, নিরাকার রূপের পূজা করে তাকে জ্ঞান যোগী বলা হয়, কিন্তু জ্ঞান যোগ পালন করা অত্যন্ত কঠিন।

আমরা ছোটবেলা থেকেই সবকিছুর ব্যক্ত রূপ দেখতে অভস্ত্য। আয়নায় নিজেকে দেখি এবং নিজেকে প্রতিফলন দেখতে পাই । মাকে নিজের সামনে দেখতে পাই। আমি কাঁদলে মা আমাকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে। মায়ের স্তন্যপান আমার ক্ষুধা নিবারণ করে। আজ পর্যন্ত আমি সবকিছুই দেখছি, স্পষ্টরূপে দেখতে পাচ্ছি, তাহলে আজ হঠাৎ অব্যক্ত বা  নিরাকার রূপকে কি করে উপলব্ধি করতে পারবো ? আমি শুধু সবার সাকার(যা চোখে দেখা যায়) রূপ দেখেছি। নির্গুণ, নিরাকার রূপ বোঝা খুবই কঠিন, তাই এই  পদ্ধতি খুব বলে কঠিন মনে হয়। 

अब सौंप दिया इस जीवन का, सब भार तुम्हारे हाथों में,
है जीत तुम्हारे हाथों में और हार तुम्हारे हाथों में।
অর্থাৎ : এই জীবনের পুরো ভার তোমার হাতে তুলে দিলাম, জয় -পরাজয়, সবই এখন তোমার হাতে।

যে এই ভাব নিয়ে ভগবানের ভক্তি করে, সে ভবসাগর অতিক্রম করে নেয়। ভক্তির জন্য সমর্পণ ভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ সমর্পণ ভাব অদৃশ্য ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাও প্রকট হয়নি। অর্জুন নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের কাছে সমর্পণ না করা পর্যন্ত ভগবান অর্জুনকে কোনো উপদেশ প্রদান করেননি।

অর্জুন ভগবানকে বললেন যে আপনি শুধুমাত্র আমার রথের সারথি নন, আপনি আমার জীবনেরও সারথি। যুদ্ধ যখন শুরু হতে চলেছে, তখন অর্জুন ও দুর্যোধন দুজনেই সাহায্যের জন্য শ্রীকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। দুর্যোধন ভগবানের মাথার দিকে বসলেন এবং অর্জুন পায়ের দিকে বসলেন। শ্রী কৃষ্ণ তখন ঘুমাচ্ছিলেন। যখন তিনি ঘুম থেকে উঠলেন, তিনি প্রথমে অর্জুনকে দেখতে পেলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কি চাও ? অর্জুন বললেন- প্রভু! আমি শুধু তোমাকেই চাই আর অন্যদিকে দুর্যোধন তাঁর অক্ষৌহিনী বাহিনী চাইলেন। ভগবান বললেন, অর্জুন! আমি তোমার সঙ্গে যাব কিন্তু নিরস্ত্র, আমি যুদ্ধ করব না, তা সত্ত্বেও অর্জুন শ্রী কৃষ্ণকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

যখন যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছিলো এবং চারদিক থেকে শঙ্খনাদ হচ্ছিলো, তখন যুধিষ্ঠির তার রথ থেকে নেমে খালি পায়ে কৌরবদের সেনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তাকে এইভাবে খালি পায়ে কৌরবদের দিকে যেতে দেখে সবাই ভেবে নিয়েছিল যে তিনি আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন এবং পাণ্ডবরা তাদের পরাজয় মেনে নিয়েছেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির ভীষ্ম পিতামহের রথের সামনে গিয়ে  দাঁড়িয়ে তাকে প্রণাম করে বললেন যে আপনি আমাদের অগ্রজ। আর কোন কাজ শুরু করার আগে গুরুজনদের প্রণাম করা আবশ্যক। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।  পিতামহ ভীষ্মের জন্য অত্যন্ত জটিল এবং দুরূহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সন্তানতুল্য যুধিষ্টির তার কাছে আশীর্বাদ চাইছেন এবং এমতাবস্থায় তিনি হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন  –বিজয়ী ভব! অর্থাৎ তোমার জয় হোক! এবং ঠিক সেই মুহূর্তে পাণ্ডবদের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো। কৌরবসেনার সেনাপতি পাণ্ডবদের আশীর্বাদ করছিলেন যে তারা যেন এই যুদ্ধে বিজয়ী হন।

আমরা দেখেছি যে ঝুঁকতে পারার মধ্যে শক্তি আছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বড়দের প্রণাম করার রীতি রয়েছে। যিনি নত হন, তিনিই জয়ী হন। যেমন ধরুন, শাশুড়ি এবং পুত্রবধূর মধ্যে ঝগড়া হয়েছে, কিন্তু পুত্রবধূ যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে শাশুড়িকে প্রণাম করে, তবে পুত্রবধূকে আশীর্বাদ করতেই হবে এবং সেইসূত্রে তাদের মধ্যে সমস্ত মনোমালিন্য শেষ হবে। এইভাবে নতমস্তক হয়ে প্রণাম ও ভক্তির দ্বারাই ভগবানকে প্রাপ্ত করা যায়, অধিক জ্ঞানপ্রাপ্ত করে নয়।

12.6

য়ে তু সর্বাণি কর্মাণি, ময়ি সন্ন্যস্য মত্পরাঃ
অনন্যেনৈব য়োগেন, মাং(ন্) ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।6।।

কিন্তু যাঁরা সমস্ত কর্ম আমাতে অর্পণ করে, মৎ-পরায়ণ হয়ে অনন্যভাবে আমারই ধ্যান বা উপাসনা করেন।

বিবেচন: ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন যে যারা আমার কাছে নিজের কর্ম অর্পণ করে এবং আমার প্রতি ভক্তিতে লীন হয়ে একাগ্রচিত্তে যোগের মাধ্যমে আমার ধ্যান করে এবং পূজা করে তারাই শ্রেষ্ঠ।

এখানে সবচেয়ে সহজ উপায় বলা হয়েছে যা হলো নিজের সমস্ত কর্ম ভগবানের কাছে অর্পণ করে দেওয়া। যেমন ধরুন আমি রান্না করছি, তাহলে আমার মনের ভাব এমন হওয়া উচিত যে আমি যা রান্না করছি তা ভগবানের জন্যই করছি। এটি ভগবানের নৈবেদ্য তৈরি হচ্ছে। ভগবানকে নৈবেদ্য অর্পণ করে, আমি এটি প্রসাদ হিসাবে সকলের মধ্যে বিতরণ করব। আমি এটা সকলের জন্যই তৈরি করছি। আমার রান্নাঘর সবার জন্য এবং সবার আগে ভগবানের জন্য। গরুর জন্য একটি রুটি, কুকুরের জন্য একটি, কাকের জন্য একটি এবং  যদি কেউ ভিক্ষা চাইতে আসে তার জন্য একটি। একজন গৃহিণী যদি মনে এই ভাব নিয়ে রুটি তৈরি করেন তবে তার রান্না করা খাবার অমৃততুল্য হয়। 

একইভাবে, ঘর ঝাড়ু দেওয়ার সময় এই ভাব মনে রাখা উচিত যে এই বাড়িটি হলো ভগবানের মন্দির এবং আমি সেই মন্দির পরিষ্কার করছি। একজন দোকানদার যদি তার দোকানে বসে মনে করে যে প্রতিটি গ্রাহক হলো ভগবানের রূপ এবং হাসিমুখে সবাইকে স্বাগত জানায়, তবে তার দোকান চালানোও মন্দিরে ভক্তি করার সমতুল্য হয়ে যায়।

এখানে ভগবান একটি অতি আশ্চর্য কথা বলেছেন যে- সর্বত্র তুমিই আছ, সমগ্র জগৎ তোমার মধ্যেই রয়েছে। আজ থেকে  আমার পদচারণা যদি ভগবানকে প্রদক্ষিণ করার সমান হয়ে যায় তবে এটাই আমার ভক্তি।

12.7

তেষামহং(ম্) সমুদ্ধর্তা, মৃত্যুসংসারসাগরাত্
ভবামি নচিরাত্পার্থ, ময়‍্যাবেশিতচেতসাম্।।7।।

হে পার্থ ! আমাতে সমর্পিত চিত্ত সেই ভক্তদের আমি মৃত্যুরূপ সংসার-সমুদ্র থেকে শীঘ্রই উদ্ধার করে থাকি।

বিবেচন: ভগবান বলেন হে পার্থ!  সেই সমস্ত ভক্ত আমাতে আবিষ্টচিত্ত, আমার ধ্যানে মগ্ন, মৃত্যুরূপী সংসার -সমুদ্র থেকে আমি শীঘ্রই তাদের উদ্ধার করি। আমরা যদি আমাদের জীবনরূপী নৌকা ঈশ্বরের হাতে তুলে দিই, তবে নিশ্চিত আমাদের উদ্ধার হবেই, কিন্তু তার জন্য আমাদের সম্পূর্ণরূপে ভগবানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে।

12.8

ময়‍্যেব মন আধত্স্ব, ময়ি বুদ্ধিং(ন্) নিবেশয়
নিবসিষ্যসি ময়‍্যেব, অত ঊর্ধ্বং(ন্) ন সংশয়ঃ।।8।।

তুমি আমাতে মন নিবিষ্ট কর এবং আমাতেই বুদ্ধি নিয়োগ কর ; তাহলে তুমি আমাতেই বাস করবে (স্থিতিলাভ করবে) এতে কোনো সন্দেহ নেই ।

বিবেচন: ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন যে আমার মধ্যে তোমার মনকে স্থাপন কর এবং আমার মধ্যে তোমার বুদ্ধি নিবিষ্ট(একাগ্রমনে মগ্ন) কর; এরপর তুমি শুধুমাত্র আমাতেই নিবাস করবে, তাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। তুমি নিজের বুদ্ধি আমাতে অর্পণ করে দাও। তুমি যেমন তোমার সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রাখো এবং সেখান থেকে সুদ আদায় করো, তেমনি তোমার বুদ্ধি আমার মধ্যে স্থাপিত করো। তোমার মন আমার কাছে সমর্পণ কর এবং আমার মধ্যে নিজের বুদ্ধি নিবিষ্ট কর।

ভগবান বলেছেন যখন তুমি একাগ্রচিত্তে তোমার মন ও বুদ্ধি আমাকে অর্পণ করবে, তখন আমি তোমার মধ্যেই নিবাস করব। মন মেনে নেয় যে ইনিই ভগবান, কিন্তু বুদ্ধি বারংবার প্রশ্ন করে, পাথরের মূর্তিতেও কি কখনও ভগবান থাকে? আমাদের এই দেশ, এখানকার ঐতিহ্যই এমন যে আমরা পাথরের মধ্যেও ভগবানকে খুঁজে পাই। তাই আজ আমরা গণেশ উৎসব পালন করছি। আমরা ভগবান গণেশের মূর্তি নিয়ে আসি এবং তারপরে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে এতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং চেতনা জাগ্রত হয়। 

অনেক মানুষ আছেন যারা মন্দিরের বাইরে থেকেই দুহাত জোড় করে ভগবানকে প্রণাম করে বলেন, আজকে মন্দিরের ভেতরে আসার সময় নেই হে ভগবান! আমাকে ক্ষমা করে দিও। ভগবান ভক্তের ভাবের জন্য উন্মুখ থাকেন। আপনি মন্দিরে ভগবানের প্রতি সমর্পণ ভাব নিয়ে যান এবং নিজেকে ভগবানের কাছে অর্পণ করুন। আমরা একটি মুহূর্তের জন্যও একাগ্রচিত্ত যদি ভগবানের সাথে যুক্ত হয়ে যাই, তবে সেটাই যথেষ্ট। ধরুন কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পূজা করছেন কিন্তু তার মধ্যেই বারবার মোবাইল ফোনে কথা বলছেন, তাহলে তার সেই পূজা বৃথা যাবে। তারা ভগবানের আরাধনা করছে, আবার মোবাইলেও কথা বলছে, তাহলে আর কিসের জন্য এই পূজা করা? মন ও বুদ্ধি সম্পূর্ণরূপে ভগবানে সমর্পিত না করলে সমস্ত পূজা নিষ্ফল হয়। যখন মনে কোনো সংশয় থাকে না, মন, বুদ্ধি উভয়ই ভক্তি ও শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ থাকে, পূজা তখনই সার্থক হয়। অনেক সময় এমনও হয় যে মন নিজেকে অর্পণ করে দিলেও বুদ্ধি কিন্তু তা করে না। 

একবার শরানন্দ জী মহারাজ তার শিষ্যদের সাথে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অন্ধ ছিলেন, দেখতে পেতেন না। হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটি গাছের নিচে থামলেন এবং একটি পাথর তুলে নিয়ে হাত দিয়ে আদর করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি সেখান থেকে উঠে পড়লেন এবং পাথরটিকে বললেন, কাল আবার আসব। পরের দিন আবার তিনি গিয়ে শিষ্যদের সাথে একই গাছের নিচে বসলেন এবং আবার সেই একই পাথর হাতে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগলেন। এটা দেখে একজন শিষ্য খুব অবাক হলেন এবং ভাবলেন এটা কিভাবে সম্ভব? গুরুজী তো দেখতেই পান না, তাহলে তিনি কীভাবে চিনে এখান অবধি চলে এলেন?  নিশ্চয়ই তিনি পদক্ষেপ গুনে গুনে এতখানি পথ এসেছেন, আর সেইজন্যই তিনি প্রত্যেকদিন এসে ঠিক একই পাথর তুলে নেন। পরেরদিন যখন আবার শরণানন্দজী পাথরটিকে বললেন যে আমি কাল আসব, আমার জন্য অপেক্ষা কর। এবং তারপর তিনি পাথরটিকে সেই স্থানে রেখে চলে গেলেন, তখন সেই শিষ্যটি পাথরটি তুলে নিয়ে পঞ্চাশ হাত দূরে নিয়ে আর একটি গাছের নিচে ফেলে দিয়ে মনে মনে বললো, দেখা যাক, আগামীকাল কি হয়। কাল যখন গুরুজী এখানে আসবেন, তিনি এই পাথরটি এখানে আর পাবেন না।

পরের দিন আবার শরণানন্দ মহারাজ শিষ্যদের সাথে বেরোলেন। তিনি আগের গাছটির কাছে এসে, সেখান থেকে আরো পঞ্চাশ পা হেঁটে অন্য গাছটির নীচে গিয়ে সেই পাথরটি তুলে নিয়ে তার গায়ে হাত রেখে বললেন, আরে! এখানে কিভাবে এলে, তোমার কি পা গজিয়ে গেছে ? এই দেখে সেই শিষ্যটি চমকে উঠলো। সে গুরুর কাছে নতমস্তক হয়ে তাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো এবং বললো, গুরুজী, এই পাথরটা আমিই এখানে এনে রেখেছিলাম, কিন্তু দয়া করে আমাকে বলুন, এ কেমন করে সম্ভব হলো ।

এই শুনে শরণানন্দ মহারাজ বললেন, প্রতিটি পাথরে প্রাণ আছে, প্রত্যেকেরই মধ্যেই চেতনা আছে। তুমি যদি অন্তর থেকে ডাকো, তবে সেই চেতনা জাগ্রত হয়ে যায়, তাই পাথর দিয়ে মূর্তি তৈরি করা হয় এবং ভক্তের চেতনা তার মধ্যে গেলেই সেই মূর্তি জাগ্রত হয় এবং তাতে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।
আমাদের এখানে বিট্ঠলপুরে(মহারাষ্ট্র প্রদেশের একটি স্থান) বিট্ঠল(ভগবান বিষ্ণুর অবতার) ভগবানের শোভাযাত্রার সাথে সাথে অনেক মানুষ পায়ে হেঁটে যায় এবং বিট্ঠলপুরে পৌঁছে তাদের চোখের জল দিয়ে বিট্ঠল ভগবানের চরণ সিক্ত করে। তাহলে ভাবুন সেই বিট্ঠল ভগবানের চরণে কত চেতনা জাগ্রত হয়। এভাবেই, মন ও বুদ্ধি এক হয়ে গেলে এমন ঘটনা  ঘটিত হয়।

এখন ভগবান বহিরঙ্গ থেকে অন্তরঙ্গের দিকে যাওয়ার কথা বলছেন। যম এবং নিয়ম হলো রেলিংয়ের মতো, তারা সর্বদা একসাথেই চলবে। আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহার হলো বাহ্যিক। ধারণা, ধ্যান ও সমাধি হলো অভ্যন্তরীণ। ভগবান এদের মধ্যে সমত্ব আনার কথা বলেছেন। যার সাথেই তোমার দেখা হবে, তাকেই ভগবানের রূপ মনে কর এবং তোমার বুদ্ধি ও জ্ঞান ভগবানকে অর্পণ করে দাও। এটাও যদি কঠিন বলে মনে হয়, তবে পরবর্তী শ্লোকে এর সমাধানের উপায়ও বলা হয়েছে।

12.9

অথ চিত্তং(ম্) সমাধাতুং(ন্), ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্
অভ্যাসয়োগেন ততো, মামিচ্ছাপ্তুং(ন্) ধনঞ্জয়।।9।।

যদি তুমি আমাতে চিত্ত অচলভাবে স্থির (অর্পণ) করতে সক্ষম না হও, তাহলে হে ধনঞ্জয় ! অভ্যাসযোগের সাহায্যে তুমি আমাকে পাবার চেষ্টা কর।

বিবেচন: ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলেন, তুমি যদি  তোমার মনকে আমার মধ্যে স্থির করতে অসমর্থ হও, তবে হে ধনঞ্জয়! অভ্যাস যোগের মাধ্যমে তুমি আমাকে প্রাপ্ত করে নাও।

গীতা পাঠ করা এক ব্যাপার আর তা আপনার জীবনে গ্রহণ করে নিজের আচরণে আনা একটি ভিন্ন ব্যাপার। স্বামীজী বলেন – গীতা পড়ুন, শেখান এবং জীবনে আনুন (প্রয়োগ করুন)। অভ্যাস  এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমে গীতা জীকে আপনার জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।
স্বাধ্যায় শব্দের অর্থ : অধ্যয়ন এবং অনুশীলন মানে চেষ্টা করা, প্রয়াস করা। আপনি যখন ভগবানের কাছে গিয়ে বসেন, যদি পাঁচ মিনিটের জন্যও বসেন, আপনার মন এবং বুদ্ধি উভয়ই ভগবানের  কাছে অর্পণ করুন। ভগবান বলেছেন যে যদি পাঁচ মিনিটও বসা সম্ভব না হয় তবে মাত্র এক মিনিটের জন্যও হলেও বসো, কিন্তু সেই সময়টুকু তোমার সম্পূর্ণ মনোযোগ আমার প্রতি নিবদ্ধ কর। যে মুহূর্তে তোমার সমস্ত মনোযোগ আমার দিকে নিবদ্ধ হবে, তোমার অহংকার সমাপ্ত হয়ে যাবে এবং তখন শুধু আমি, একমাত্র আমিই থাকব, তখন তুমি ভগবানকে প্রাপ্ত করবে। এইভাবে, তুমি  এক মিনিট সময় আমার কাছে নিজেকে সমর্পিত কর, যেন হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার ভাব থাকে, চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়, প্রতিটি রোম প্রস্ফুটিত হয়ে যায়। ভগবানকে কোন ফল-ফুল নিবেদন করা হয়েছে, তার হিসাব আবশ্যক নয়, তবে মনে যেন সমর্পিত ভাব থাকে। ভগবান ভক্তিভাবের অনুরাগী। ভগবান!  যখন তুমি আমার সামনে থাকো, আমি তোমার ভাবে বিভোর(আত্মহারা) হয়ে যাই। আমি শুধু তোমার, এই অনুভূতি যখন তোমার মনে আসবে তখন তুমি আমাকে প্রাপ্ত করে নেবে। যে মুহুর্তে তোমার মধ্যে এই অনুভূতি  আসবে, আমি তোমার ভিতরে প্রবিষ্ট হয়ে যাবো।

প্রথমে শুধু তুমিই ছিলে, তারপর তুমি আর আমি হলাম আর এখন তোমার অন্তঃকরণে শুধুমাত্র আমিই থাকবো। এই ঘটনা ঘটবে, অবশ্যই ঘটবে, তুমি শুধু ভক্তিভরে আমার ভজনা করে যাও।

ভগবান বলেন হে অর্জুন! শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে স্মরণ করে সকলেই আমাকে প্রাপ্ত করে নিতে পারে।

একবার  গৌতম বুদ্ধকে তাঁর এক শিষ্য বললেন যে প্রভু! মোক্ষ লাভ যদি এতই সহজ হয় তবে তা সবাই কেন প্রাপ্ত করতে পারে না ? তখন ভগবান গৌতম বুদ্ধ তাকে বললেন,  আজ তুমি অন্তত দশ জনের কাছে ভিক্ষা চাইতে যাও এবং সবাইকে তাদের ইচ্ছার কথা জিজ্ঞেস কর। শিষ্যটিভিক্ষা চাইতে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করল তাদের কি ইচ্ছা ? তখন কেউ বলল টাকা চাই, কেউ বললো ছেলে চাই। কেউ বললো আমার মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। কেউ বললো, আমার দোকান ভালো চলছে না, আমি চাই আমার দোকান ভালোভাবে চলুক। কেউ বললো আমি চাকরি পাচ্ছি না, চাকরি চাই। কেউ বললো বিয়ের জন্য পাত্রী চাই।  এভাবে ভিক্ষুক দশটি বাড়িতে গেলেন এবং দশ প্রকারের ইচ্ছার কথা জানতে পারলেন।

গৌতম বুদ্ধ তার শিষ্যকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- এবার বলো, কার কি ইচ্ছা আছে ? কেউ কি মোক্ষলাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে ?

শিষ্য বললেন যে একজন ব্যক্তিও মোক্ষ লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। কেউ রোগ সারাতে চায়, কেউ ব্যবসাপত্র চালাতে চায়, কেউ পত্নী চাইছে, কেউ বা চাকরি চায়। এইভাবে সকলেই মনের  ইচ্ছা প্রকাশ করেছে কিন্তু কেউ মোক্ষলাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। তাই যখন কারোর ইচ্ছাই নেই তখন মোক্ষলাভ কী করে হবে ? যে কোনো ঘটনাই প্রথমে মনের মধ্যে ঘটে তারপর সেই ইচ্ছা বাইরে প্রকাশ পায়। কেউ যদি আমাকে প্রাপ্ত করার ইচ্ছা না করে, তবে সে আমাকে কিভাবে প্রাপ্ত করতে পারবে ?

অতএব হে ধনঞ্জয়! প্রথমে তুমি আমাকে নিজের অন্তঃকরণে স্থাপিত করার ইচ্ছা কর। যদি  আমাকে প্রাপ্ত করতে চাও, তবে আমাকে প্রাপ্ত করার ইচ্ছা কর। প্রাপ্ত করার ইচ্ছার অনুশীলন কর এবং যদি এটিও করা সম্ভব নয় তাহলে তুমি আরও শোনো।
আগামী বিবেচন সত্রে পরবর্তী শ্লোকগুলি ব্যাখ্যা করা হবে। 

এরপর এই অত্যন্ত সুন্দর বিবেচন সত্র সমাপ্ত হয় এবং শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব।

|| প্রশ্নোত্তর পর্ব ||

প্রশ্নকর্তা:
সৃষ্টি তিওয়ারি জী 
প্রশ্ন- এই অধ্যায়ের নবম শ্লোকে ধনঞ্জয় ও ততো, এই দুইয়ের অর্থ কী?
উত্তর - এখানে ধনঞ্জয় অর্থাৎ যিনি বিজয় প্রাপ্ত করেন। অর্জুন যখন তার নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বহু রাজ্যের ওপর বিজয়প্রাপ্ত করে প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জন করেন, তখন তাকে ধনঞ্জয় নামে সম্বোধিত করা হয়েছিল। 'ততো' শব্দের অর্থ - যদি তুমি এই কার্যটি করতে না পারো, তাহলে তুমি এটা করো। ততো মানে THAN, ভগবান বলেছেন হে ধনঞ্জয়! তুমি অভ্যাস যোগের দ্বারা আমাকে প্রাপ্ত কর।

প্রশ্নকর্তাঃ প্রহ্লাদ সিং জী 
প্রশ্ন - ভগবানের ভক্তি বা সেবা করার সময় যদি আমাদের পরিবারের সদস্যরা বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
উত্তর: সবার আগে আমাদের নিজ-নিজ কর্তব্য পালন করা উচিত। গীতা পরিবার সর্বপ্রথম কর্মযোগের কথাই বলে। আমাদের নিজের কর্তব্যের পালন করার সাথে সাথে অন্যান্য কাজের জন্যও সময় বের করা উচিত। 
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরো বলেছেন-
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি

হে অর্জুন, তুমি ক্ষত্রিয়, তাই তুমি নিজের কর্তব্য করে যাও। নিজের কর্ম ত্যাগ করবে না। নিজের উদ্ধারের জন্য কর্ম করে যেতে হবে। কেউ তাতে বাধা সৃষ্টি করলে তা সঙ্গত নয়, নিজের কর্তব্য পালন করে কর্ম সম্পাদন করা উচিত।

প্রশ্নকর্তা: বজরং জী 
প্রশ্ন- কিছু লোক নিরাকার ঈশ্বরের পূজা করে। যেমন- মুসলিম। তারা এক কেই পূজা করে, তাহলে এটা কী?
উত্তর - কিছু লোক শুধুমাত্র একটি শক্তির উপাসনা করে, তারা সেই শক্তির একটি নাম দেয়। যারা সগুণের পূজা করে তারা অবশেষে নির্গুণ ভগবানের দিকেই অগ্রসর হয় এবং যারা নির্গুণ ঈশ্বরের পূজা করে তারাও শেষ পর্যন্ত সগুণের দিকে আসে। এর প্রধান উদাহরণ হলো গণেশ উৎসব। যে গণেশকে আমরা এত পূজা করি, অবশেষে আমরা তাঁকেই বিসর্জন দিয়ে দিই। 

প্রশ্নকর্তাঃ উমরানী জী 
প্রশ্ন- যম-নিয়ম কি? 
উত্তর - পাঁচটি যম আছে, পাঁচটি নিয়মও আছে। মহর্ষি পতঞ্জলি এই সব আমাদের সামনে সুব্যবস্থিত আকারে উপস্থাপন করেছেন। জীবনে এগুলো আমাদের মেনে চলা উচিত।

প্রশ্নকর্তা: কৈলাশ কুমার খারে জী 
প্রশ্ন- আমরা কীভাবে আমাদের মন ও বুদ্ধিকে ঈশ্বরের প্রতি নিবদ্ধ করব? এই জন্য সহজতম উপায় কি?
উত্তর - যখন আমাদের মন এবং বুদ্ধি উভয়ই একসাথে কাজ করবে তখন নিশ্চিত আমরা খ্যাতি-যশ প্রাপ্ত করব। সবার আগে আমাদের সোজা হয়ে বসতে হবে। মনের অস্থিরতা ত্যাগ করে সোজা হয়ে বসুন এবং আপনার মন ও বুদ্ধিকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করুন। বাচ্চারাও পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় যদি এটি অনুশীলন করতে পারে, তবে তারা অবশ্যই ভাল নম্বর পাবে। 

প্রশ্নকর্তা: গিরিজা যোশী জী 
প্রশ্ন - আমাদের দৈনন্দিন কাজে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে কীভাবে গ্রহণ করবো ?
উত্তর: দৈনন্দিন জীবনে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে গ্রহণ করতে হলে এর জন্য প্রয়োজন হলো অনুশীলন। যেমন যেমন আপনি এটি পড়বেন, সেই পড়ার সাথে সাথে প্রতিটি সূত্র বুঝতে পারবেন এবং আপনি উপকৃত হবেন। ক্রোধ, লোভ এবং আসক্তির মতো খারাপ প্রবৃত্তিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় ধীরে ধীরে আয়ত্তে এসে যাবে।

প্রশ্নকর্তা: স্মিতা মূর্তি জী 
প্রশ্ন: এই আলোচনা একবারে বোঝা কঠিন। কিভাবে আমরা এটা বারবার পড়তে বা শুনতে পারি?
উত্তর - গীতা প্রেস গোরখপুরের অর্থ বিবেচনের বই পড়তে পারেন। আপনি চাইলে ইউটিউব লিঙ্কের মাধ্যমেও শুনতে পারেন।