विवेचन सारांश
সন্ন্যাস এবং ত্যাগ
প্রার্থনা, দীপ প্রজ্জ্বলন, হনুমান চালিসা পাঠ ও গুরু-বন্দনার পর আজকের বিবেচনা সত্রের শুভারম্ভ হয়।
বিগত প্রায় এক বছর আগে জ্ঞানসাগরে ভগবদ্গীতারূপী নৌকায় চড়ে যে যাত্রা আমাদের শুরু হয়েছিল, সেই চারধাম যাত্রার অন্তিম পর্যায়ে আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। অষ্টাদশ অধ্যায় গীতার অন্তিম অধ্যায় যার পঠন ও চিন্তন শুরু হয়েছে। প্রথম স্তর থেকে চতুর্থ স্তরের এই চারধাম যাত্রায় আধ্যাত্মিক জীবনের অনেক সুন্দর সুন্দর দৃশ্য অবলোকন করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। চারধাম যাত্রার এই অন্তিম সময়ে লক্ষ্যপ্রাপ্তির আনন্দে মন একদিকে যেমন খুশিতে ভরে উঠেছে, ঠিক তেমনি যাত্রাপথের আনন্দ হারাবার কথা ভেবে পাশাপাশি মন হয়তো বিষাদগ্রস্থও হয়ে উঠেছে ।
এই জড় জগতে সবকিছুই একদিন শুরু হয় এবং একদিন শেষ হয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে ভগবান বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে বলেছিলেন:
জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ।
তস্মাদপরিহার্যেऽর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ।।২.২৭।।
জীবনের আরম্ভকে জন্ম এবং শেষ কে মৃত্যু বলা হয়। যে জন্মে, তার মৃত্যু নিশ্চিত এবং যার মরণ হয়, তার জন্ম নিশ্চিত। ভগবদ্গীতা মৃত্যুর জন্য শোক করার শিক্ষা দেয় না। গীতা অধ্যয়নের শেষ পর্যায়ে আমরা এসেছি, তার জন্য দুঃখ কেন? চারধাম যাত্রায় আমরা যে গীতামৃত আস্বাদন করেছি, সেই অমৃতরূপী উপদেশ শিরোধার্য্য করে আমরা শান্ত চিত্তে জীবনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।
ভগবদ্গীতায় অষ্টাঙ্গযোগের বিশদ ব্যাখ্যা আছে তাই গীতাকে যোগশাস্ত্রও বলা হয়। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে পুষ্পিকাতে ‘যোগশাস্ত্র’ শব্দটির উল্লেখ আছে:
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে।
অষ্টাঙ্গযোগের প্রথম পাঁচটি অর্থাৎ যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহারকে বহিরাঙ্গযোগ এবং ধ্যান, ধারণা ও সমাধিকে অন্তরঙ্গ যোগ বলা হয়। গীতায় অধিকতর শ্লোকে অন্তরঙ্গযোগের বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
সংসারের সবকিছু একদিন সৃষ্টি হয় এবং কালের আবর্তনে একদিন তার বিনাশ হয়। আমাদের শরীর ঠিক তেমনি। জীবের এই নশ্বর দেহ একদিন জন্ম নেয় এবং একদিন তার মৃত্যু হয়। কিন্তু জীবের শরীরে অন্তরাত্মা অবিনশ্বর, তার মৃত্যু হয় না। পরিধেয় বস্ত্র মলিন হলে আমরা যেমন সেটি পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র ধারণ করি, ঠিক তেমনি জীবাত্মা (জীবের শরীরে অবস্থান করে, তাই আত্মাকে জীবাত্মা বলা হয়েছে) জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে। নতুন বস্ত্র পরিধান করে মনে যেমন আনন্দ হয়, তেমনি মৃত্যু হলে আত্মা শুধু জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে এবং এই সত্যকে স্বীকার করে মৃত্যুর জন্য শোক না করার উপদেশ গীতায় ভগবান উল্লেখ করেছেন।
প্রবাদ আছে যে আঠারো অধ্যায়ের গীতার অধ্যয়ন আঠারোবার করতে হয়। তাই এই শেষ স্তর শেষ করে আবার প্রথম স্তরে যুক্ত হয়ে যান। অধ্যয়নের এই আবর্তনে নিজেকে যুক্ত রাখার চেষ্টা আমাদের সবারই করা উচিত। প্রত্যহ শয্যাত্যাগের পর ভগবানকে ধন্যবাদ ও প্রণাম করে দৈনন্দিন জীবন শুরু করার অভ্যাস করা আবশ্যক। শ্রদ্ধেয় গোবিন্দদেব গিরিজী মহারাজ বলেছেন:
গীতা পড়ুন, পড়ান, নিজের জীবনে আনুন।
সতেরটি অধ্যায় শেষ করার পর গীতাকে আমাদের জীবনে কী আনতে পেরেছি? এই প্রশ্নটি সবাই নিজেকে করতে হবে। জীবনে চলার পথে নিরাশা এলে আমরা কী নিজেকে সামলাতে পেরেছি? দুঃখ হলে সেটা কাটিয়ে উঠার ক্ষমতা কী আমাদের আছে? ক্রোধকে দমন করার শক্তি আমরা কী অর্জন করতে পেরেছি?
প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মিকা। প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনে মানুষের সৃষ্টি। প্রকৃতির গুণসমূহ মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মীয়-পরিজনদের দেখে অর্জুনের মনও বিষাদগ্রস্থ হয়েছিল এবং সেইজন্যই ভগবদ্গীতা রচিত হয়েছিল এবং আজ সেই অমূল্য গ্রন্থ অধ্যয়ন করার সুযোগ আমরা পেয়েছি। অর্জুনের কাছে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ।
গোয়ালা দুধ দোহনের আগে বাছুরটিকে গরুর কাছে নিয়ে আসে ও দুধ খেতে দেয়। বাছুরটি দুধ খাওয়া শুরু করার অল্প পরেই গোয়ালা বাছুরটিকে সরিয়ে দিয়ে দুধ দোহন করে। ভগবদ্গীতার প্রারম্ভে গীতা-মাহাত্ম্যে উল্লেখিত আছে:
সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ।
পার্থো বৎসঃ সুধীরভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ।।
এখানে উপনিষদসমূহকে গাভীর সাথে এবং উপনিষদের সার কে দুধের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এই দোহন ক্রিয়ার গোয়ালা স্বয়ং গোপালনন্দন অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ এবং বাছুর হলেন অর্জুন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনরূপী বাছুরকে এই দুগ্ধামৃত পান করিয়ে দোহন করেছেন এবং সেই অমৃত সেবন করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে।
প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে অর্জুন মোহগ্রস্থ হয়েছিলেন এবং নিরাশ ও দুঃখী হয়ে রণক্ষেত্র ত্যাগ করার ইচ্ছা ভগবানের নিকট প্রকাশ করেছিলেন।
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ, ন চ রাজ্যং সুখানি চ।
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ, কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা।।১.৩২।।
অর্জুন এটাও ভেবেছিলেন যে আত্মীয়-পরিজনদের হত্যা করার পাপ গ্রহণ করার চেয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করা শ্রেয়। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তিনি ভগবানের শরণাপন্ন হয়ে জ্ঞানভিক্ষা চাইলে ভগবান অর্জুনকে জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। শরণাগতি বিনা শ্রদ্ধার ভাব হৃদয়ে জাগৃত হয় না এবং সেই ভাব প্রস্ফুটিত না হলে ভগবদ্গীতাকে নিজের জীবনে গ্রহণ করা অসম্ভব হয় পড়ে ।
সতেরো অধ্যায়ে ত্রিবিধ শ্রদ্ধার কথা ভগবান বলেছেন। অষ্টাদশ অধ্যায়ের নাম মোক্ষসন্ন্যাস যোগ। অর্জুন ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন যে ত্যাগ ও সন্ন্যাসের মাঝে কী পার্থক্য?
18.1
অর্জুন উবাচ
সন্ন্যাসস্য মহাবাহো, তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্
ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ, পৃথক্কেশিনিষূদন॥1॥
সন্ন্যাস ও ত্যাগের ধাত্বর্থ একই। উভয়ের অর্থ পরিত্যাগ করা, কিন্তু ‘সন্ন্যাস’ শব্দের একটি বিশেষ অর্থ এই যে, সর্বকর্ম ত্যাগ করে চতুর্থ আশ্রম অবলম্বন করা। এই চতুরাশ্রম অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ, বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাস শাস্ত্রবিহিত। সন্ন্যাস অবলম্বন ব্যতীত মোক্ষলাভ হয় না, এই মতও সুপ্রচলিত। অর্জুন ভেবেছিলেন যে ভগবান শেষে সর্বকর্ম ত্যাগের কথা অবশ্যই বলবেন। কিন্তু তিনি কর্মত্যাগের উপদেশ দেন নি। ভগবান এই কথাও বলেছিলেন যে, যিনি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেন তিনিই নিত্যসন্ন্যাসী। সেই জন্যই অর্জুন এখানে প্রশ্ন করেছেন যে সন্ন্যাস ও ত্যাগ এই শব্দদ্বয়কে ভগবান কি অর্থে ব্যবহার করেছেন? এদের মধ্যে অর্থগত পার্থক্য কী ?
দ্বিতীয় অধ্যায়েও অর্জুন এই প্রশ্ন করেছিলেন কিন্তু সেইসময় ও এইসময়ে অর্জুনের মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জুন সম্পূর্ণরূপে মোহগ্রস্থ ছিলেন, কিন্তু অষ্টাদশ অধ্যায় পৌঁছুতে-পৌঁছুতে অর্জুনের মন পুরোপুরি সন্তুলিত। প্রথমে অর্জুন মোহগ্রস্থ অবস্থায় ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে সন্ন্যাস নেবার কথা ভেবেছিলেন। প্রাণত্যাগ ও ধন-সম্পত্তি ত্যাগকে রাজসিক ত্যাগ বলা হয়। আলস্যতার বশবর্তী হয়ে কিছু ত্যাগ করাকে তামসিক ত্যাগ বলা হয়। কেউ কেউ তামসিক ত্যাগও করে।
সন্ন্যাস ও ত্যাগের পার্থক্য কী — অর্জুনের এই প্রশ্ন এবং ভগবানের দ্বারা এর উত্তর, দুটোই অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ। এই আলোচনার প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে পুরুষার্থ চার প্রকার:
ধর্ম
অর্থ
কাম
মোক্ষ
এই চার শ্রেণীর মাঝে অর্থার্জন সহজ ও নিকৃষ্টতম পুরুষার্থ। আমরা যতই ধন উপার্জন করি না কেন, কিছুই আমরা পরলোকে নিয়ে যেতে পারি না। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে আছে যে ধর্ম, অর্থ এবং কাম— এই তিন পুরুষার্থ ত্রিবর্গ নামে পরিচিত। এই ত্রিবর্গ জীবনের গার্হস্থ-আশ্রমের লক্ষ্য কিন্ত মোক্ষ সারাজীবনের লক্ষ্য।
শাস্ত্রে মানব-জীবনকে ১০০ বছর কল্পনা করে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে যাকে চতুরাশ্রম বলা হয়:
ব্রহ্মচর্য্য
গার্হস্থ
বানপ্রস্থ
সন্ন্যাস
জীবনের প্রথম ২০ বা ২৫ বছর ব্রহ্মচর্য্যের অন্তর্গত। সম্পূর্ণ কামনা-বাসনাশূন্য হয়ে শাস্ত্রজ্ঞান, ধর্মীয় অনুশাসন, সদাচার, সঠিক জীবন পদ্ধতি, কর্তব্যবোধ, ধ্যান, যোগসাধনা ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা ব্রহ্মচর্য আশ্রমের ধর্ম।
পরবর্তী ২৫ বছর গার্হস্থ আশ্রমের অন্তর্গত। অর্থ উপার্জন, সন্তান পরিজনদের লালন পালন, দান-ধ্যান, সমাজ কল্যাণ ইত্যাদি কর্তব্য কর্ম সম্পাদন হল গার্হস্থ জীবনের লক্ষ্য।
গার্হস্থ জীবনের পরবর্তী ২৫ বছর বানপ্রস্থ আশ্রম। গার্হস্থবিষয়ক কর্তব্য সমাপনের পর বনে প্রস্থান করে ঈশ্বরচিন্তা করার নাম বানপ্রস্থ।
বানপ্রস্থ আশ্রমের পর সন্ন্যাস-আশ্রম যেথায় একমাত্র লক্ষ্য মোক্ষলাভ। সর্বস্ব ত্যাগ করে নির্লিপ্ত হয়ে আধ্যাত্মিক সাধনায় জীবন অতিবাহিত করাই জীবনের অন্তিম লক্ষ্য। শুধু গেরুয়া বসন ধারণ করাকে সন্ন্যাস বলে না। আসক্তি বর্জিত, ইন্দ্রিয়সংযমী, অনহংবাদী, পরাত্মতত্ত্বে একীভূত, সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে নির্বিকার ইত্যাদি গুণসম্পন্ন মানুষই প্রকৃত সন্ন্যাসী।
সন্ন্যাস ধর্মে অহং অর্থাৎ ‘আমি, আমার' ভাব ত্যাগের সাথে সাথে অহংকার, ধন-সম্পত্তি, সংসারের মোহ, কর্মফলের আসক্তি ইত্যাদি সব কিছু ত্যাগ করতে হয়। সন্ন্যাস গ্রহণ করার পূর্বে আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিত সবার কাছে জ্ঞান-অজ্ঞান বশতঃ নিজের সমস্ত ভুল-কার্য ও অন্যায়ের জন্য করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার পর গৃহত্যাগ করার কথা শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে। গৃহত্যাগের পর গুরুর তত্ত্বাবধানে নদীতীরে বসে জীবিত অবস্থায় সন্ন্যাসী নিজের শ্রাদ্ধ নিজে সম্পন্ন করেন। ভারতবর্ষে পিতৃপক্ষে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল-তর্পন করা হয়। শ্রাদ্ধ আদি কাজ মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে করা হয়, কিন্তু সন্ন্যাস গ্রহণ করা ব্যক্তির জীবিত অবস্থায় শ্রাদ্ধ-তর্পণাদি কর্ম সম্পন্ন করার কথা শাস্ত্রে বলা হয়েছে।
জীবিত অবস্থায় নিজের শ্রাদ্ধ আদি কর্ম করার অন্তর্নিহিত অর্থ হল স্বীয় অন্তরের 'আমি'-ভাবকে অর্থাৎ 'অহং'- ভাবকে মৃত হিসেবে স্বীকার করা। আমি-তুমি এই দ্বৈত ভাব থাকলে পরমাত্মার সাথে একাত্ম হবার সাধনা খুব কঠিন হয়ে উঠে। সন্ন্যাস ধর্মের একমাত্র লক্ষ্য মোক্ষলাভ অর্থাৎ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হওয়া। অন্তরে অদ্বৈতভাব জাগৃত হলে এই প্রাপ্তির পথ সুগম হয়।
ভগবদ্গীতার শুরুতে অর্জুনের কেবল ‘আমি-আমার’ ভাব ছিল। অর্জুন ভাবছিলেন,” আমার গুরু, আমার পিতামহ, আমার আত্মীয়-পরিজনকে হত্যা করলে আমি পাপী হব ইত্যাদি।” কিছু অধ্যায়ের পর ভগবানের উপদেশ শোনার পর ‘আমি আর তুমি’ এই ভাব অর্জুনের মনে জাগরিত হয়েছে যাকে বলা হয় দ্বৈত ভাব। আঠারো অধ্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অর্জুনের আমিত্ব ভাব প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ।
আত্মতত্ত্বের জ্ঞান প্রাপ্ত হলে ধীরে ধীরে এই আমি আর তুমির ব্যবধান থাকে না। এটা সত্যি যে আমি-ভাব ত্যাগ করা অত্যন্ত কঠিন। ভক্তবৃন্দকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন,”ভালো “আমি” থাকলে দোষ নেই–যেমন তুমি মা আমি তোমার সন্তান; তুমি প্রভু আমি দাস ; আমি নর তুমি নারায়ণ। যে আমি-ভাবে মনে অহংকার ভাব উৎপন্ন হয় সেই ‘আমি’ ত্যাগ করতে হয়।”
তুঝমে মুঝ মে বস ভেদ য়ুহী
মৈ নর অউর তু নারায়ণ হৈ।
প্রভু শ্রীরামচন্দ্র মহাবীর হনুমানজীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,”হনুমান তুমি আমায় কিভাবে দেখ ?”
হনুমানজী উত্তর দিয়েছিলেন,”হে প্রভু, যখন “আমি” বলে আমার বোধ থাকে, তখন দেখি; তুমি পূর্ণ ,আমি অংশ; তুমি প্রভু, আমি দাস। কিন্তু হে রাম! যখন তত্ত্বজ্ঞান হয়, তখন দেখি তুমিই আমি, আমিই তুমি।”
সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করলে অগ্নি ত্যাগ করার কথা শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে। সন্ন্যাসীকে ভিক্ষান্নেই জীবন ধারণ করতে হয়। ধনবান ব্যক্তি যে সদাই ভিক্ষা দিয়েছেন, তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর বাড়ী বাড়ী ভিক্ষা চেয়ে জীবিকা নির্বাহ করলে মনের অহঙ্কার সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ হয়ে যায়।
একবার ভগবান বুদ্ধ এক বাড়িতে ভিক্ষা চাইলে গেলে এক বৃদ্ধা এসে বললেন, ”আমার ইচ্ছা আপনাকে অনেক কিছু দিই, কিন্তু দেবার মতো কিছুই আমার কাছে নেই।” ভগবান বুদ্ধ বললেন,”মাতা, তুমি উঠানের কিছু মাটি আমার ভিক্ষার ঝুলিতে দিয়ে দাও।” বৃদ্ধা বললেন,”মাটি দিলে আপনার ঝুলির সমস্ত ভিক্ষা সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাবে।" ভগবান হেসে বললেন,” একদিন উপবাসে থাকলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু তোমার দেবার অভ্যাসটি যেন নষ্ট হয়ে না যায়।”
দান করার অভ্যাস থাকলে কখনো কখনো অন্তরে অহং-ভাব জাগৃত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করলে গৃহস্থের ঘরে ঘরে গিয়ে ভিক্ষা চাইতে হয় এবং এই ভিক্ষা-বৃত্তি মনের অহংকারকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয় । চতুরাশ্রমের এই সন্ন্যাস-আশ্রম পরমাত্মা প্রাপ্তির পথ সুগম করে।
অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান সন্ন্যাস ও ত্যাগের বিষয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন।
শ্রীভগবানুবাচ
কাম্যানাং(ঙ্) কর্মণাং(ন্) ন্যাসং(ম্), সন্ন্যাসং(ঙ্) কবয়ো বিদুঃ
সর্বকর্মফলত্যাগং(ম্) প্রাহুস্ত্যাগং(ম্) বিচক্ষণাঃ॥2॥
“কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ” - অনেক পণ্ডিতগণ বলে থাকেন যে কাম্য-কর্মের ত্যাগকেই বলা হয় সন্ন্যাস অর্থাৎ ইষ্ট-প্রাপ্তি এবং অনিষ্ট নিবৃত্তির জন্য যে কর্ম করা হয়, তা পরিত্যাগ করাকেই বলা হয় সন্ন্যাস।
“সর্বকর্মফলত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ” - কোন কোন পণ্ডিত বলেন যে সম্পূর্ণ কর্মের ফলের ইচ্ছা ত্যাগ করাকেই বলা হয় ত্যাগ অর্থাৎ ফলের আকাঙ্ক্ষা না করে কর্তব্য কর্ম করে যাওয়াকে বলা হয় ত্যাগ। সুতরাং যিনি ফলের আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেছেন তিনি কর্ম করলেও প্রকৃতপক্ষে সন্ন্যাসী।
পণ্ডিতগণের ভিন্ন ভিন্ন মত ব্যক্ত করার ব্যাপারে ভগবান আরও বলেছেন -
ত্যাজ্যং(ন্) দোষবদিত্যেকে, কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ
য়জ্ঞদানতপঃকর্ম, ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে॥3॥
ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ – কোন কোন পণ্ডিত বলেন যে কর্মমাত্রই দোষযুক্ত, অতএব ত্যাজ্য। উদাহরণস্বরূপ: —
চাষ-বাস করার সময় মাটিতে থাকা পোকা-মাকড় কৃষকের হাতে মারা যায়, তাই চাষ-বাসের প্রক্রিয়াটি দোষযুক্ত।
রান্না করার সময় আগুনে অনেক অদৃশ্য কীট ভস্মীভূত হয়, তাই এই কাজটি দোষযুক্ত। ইত্যাদি
এখানে সমস্ত কর্ম দোষণীয় বলে ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু জীবন-নির্বাহের জন্য সম্পূর্ণ কর্ম পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়।
“যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে”--- কোন কোনো পণ্ডিত বলেন যে সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করলেও যজ্ঞ , দান , তপস্যা আদি কর্ম কখনও ত্যাগ করা উচিত নয়।
দানের বিষয়ে একটি সুন্দর গল্প আছে–
এক ভিখারী রোজ সকালে মন্দিরের সামনে বসে ভিক্ষা করতো। রোজ মন্দির যাবার সময় নিজের ঝোলার মধ্যে এক মুঠো চাল ঢেলে নিত কারণ ওর ধারণা ছিল এরকম করলে সে ঝোলা ভরে ভিক্ষা পাবে। একদিন ভোরে ভিখারী স্বপ্ন দেখলো যে রাজা ওকে প্রচুর দান দিয়েছে। মনের আনন্দে প্রতিদিনের মতো ঝুলিতে এক মুঠ চাল নিয়ে সকালবেলায় সে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথে মন্দিরের দিক থেকে একটি রথ আসতে দেখা গেলো। ভোরের স্বপ্নের কথা ভেবে এবং রথকে এগিয়ে আসতে দেখে অত্যন্ত খুশী মনে সে দাঁড়িয়ে রইলো। রথটি সামনে এসে থেমে গেল এবং রাজা করজোড়ে নেমে আসে বললেন, “হে মহাত্মা, আজ ভোরে আমি স্বপ্নাদেশ পেয়েছি যে মন্দিরের পূর্বদিকে প্রথম যে ব্যক্তির সাক্ষাৎ হবে তার থেকে ভিক্ষা নিলে বৃষ্টি হবে, অন্যথা রাজ্যে খরা নেমে আসবে। তাই অনুগ্রহ করে আমায় ভিক্ষা দিন।” রাজার কথায় ভিখারী অবাক ও দুঃখিত হলো। কিন্তু রাজাকে না বলার মত সাহস ওর ছিল না। তাই ঝুলিতে হাত দিয়ে একমুঠো চাল উঠিয়ে নিলো। হঠাৎ তার মনে হলো এই এক মুঠো চাল নিয়ে রাজার কি আর ভালো হবে, তাই দান যদি দিতেই হয় তাহলে এক চিমটি দান করাই ঠিক হবে। এক চিমটিতে যে দুটি দানা উঠলো তাই সে রাজাকে দিল। রাজাও হাতজোড় করে ওই দান নিয়ে চলে গেলেন। ভিখারী ভগ্ন হৃদয়ে মন্দিরে পৌঁছায়। সেইদিন সোমবার ছিল এবং সে ঝুলিভর্তি ভিক্ষা পেলো। ঘরে আসার পর পত্নী ভিক্ষায় পাওয়া সামগ্রী আলাদা করার সময় একটি সোনার চাল পেল। পতিকে এই কথা বলার পর দুজনেই আরো সোনার চাল পাওয়ার আশায় ভালো করে চাল খুঁজতে লাগল । খুঁজতে খুঁজতে আরো একটি সোনার চাল পাওয়া যায়। তখন তারা দুজনে আশান্বিত হয়ে আরও খুঁজতে থাকে কিন্তু আর একটিও সোনার চাল পাওয়া গেল না। তখন ওই ভিখাররী বুঝতে পারে যে দুটো চাল রাজাকে ভিক্ষা দিয়েছিল, ভগবান সেই দুটো দানাই সোনা করে ফেরত দিয়েছেন। এতে ভিখারীর খুব অনুশোচনা হয়েছিল।
ভগবান বলেছেন যে কিছু পণ্ডিতগণ বিশ্বাস করেন যে কর্মের মধ্যে দোষ রয়েছে, আবার কেউ কেউ বলেন যে কর্মে দোষ নেই কিন্তু কর্মফলের প্রতি আসক্তি এবং তার চিন্তন করা দোষের। আমরা যখন কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কর্ম করি তখন পুণ্যকর্ম বা পাপকর্মের ফল ভোগ করার জন্য জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ি। এই জন্যই এক শ্রেণীর পণ্ডিতগণ কর্ম ত্যাগ করার কথা বলেছেন। যদি কর্মত্যাগ হয় তাহলে ফলপ্রাপ্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। “ন রহেগি বাঁশ, ন বজেগী বাঁসুরী।” আমরা যা কিছু কর্ম করি না কেন, সেটি দোষযুক্ত হতে পারে কিন্তু পণ্ডিতদের মতে যজ্ঞ , দান ও তপস্যারূপ কর্মগুলি ত্যাগ করা কখনও উচিত নয়।
নিশ্চয়ং(ম্) শৃণু মে তত্র, ত্যাগে ভরতসত্তম
ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র, ত্রিবিধঃ(স্) সংপ্রকীর্তিতঃ॥4॥
অর্জুন জানতে চেয়েছিলেন যে সন্ন্যাস ও ত্যাগের পার্থক্য কী ? দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্লোকে ভগবান এই বিষয়ে বিভিন্ন পণ্ডিতগণের মতামত উপস্থাপন করার পর নিজের মত জানাবার জন্য অর্জুনকে বললেন,”হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন! সন্ন্যাস ও ত্যাগ– এই দুটির মধ্যে প্রথমে ত্যাগের বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত শোনো; হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! ত্যাগ তিন প্রকার বলে কথিত আছে।”
ভগবান এখানে নিজের মতকে “নিশ্চয়” অর্থাৎ সিদ্ধান্তরূপে ঘোষণা করেছেন।
ফলাকাঙ্ক্ষা এবং কর্মের আসক্তি বর্জন করা সকল সন্ন্যাসীর পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই ভগবান এখানে সর্বপ্রথমেই ত্যাগ-এর বর্ণনা আরম্ভ করেছেন।
ভগবান বলেছেন যে ত্যাগ তিন প্রকার:
সাত্ত্বিক ত্যাগ
রাজসিক ত্যাগ
তামসিক ত্যাগ
প্রকৃতপক্ষে ভগবানের সিদ্ধান্ত অনুসারে সাত্ত্বিক ত্যাগই প্রকৃত ত্যাগ। কিন্তু তার সাথে রাজসিক এবং তামসিক ত্যাগেরও বর্ণনা করার তাৎপর্য হলো এই যে এগুলো ছাড়া ভগবানের অভীষ্ট সাত্ত্বিক ত্যাগের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয় না। পরীক্ষা বা তুলনা দ্বারা কোনো বস্তুর শ্রেষ্টত্ব নির্ধারণ করতে হলে অপর বস্তুকে সামনে রাখতে হয়। ত্রিবিধ ত্যাগের কথা বলার আর একটি তাৎপর্য হল এই যে, সাধক যেন সাত্ত্বিক ত্যাগের আদর্শ গ্রহণ করেন এবং রাজসিক ও তামসিক ত্যাগ যেন বর্জন করেন।
কোন কিছু জানাকে বলা হয় জ্ঞান এবং সেটিকে অনুভব করাকে বলা হয় বিজ্ঞান। জগৎ ভগবান হতেই সৃষ্ট এবং তাঁতেই বিলীন হয়– এটি মেনে নেওয়াকে বলা হয় জ্ঞান। ভগবান ছাড়া আর কিছুই নেই, সবই তিনি, ভগবান স্বয়ং সবকিছু হয়ে আছেন – এটি অনুভব করাকে বলা হয় বিজ্ঞান। জ্ঞান অপরিবর্তনশীল।মহর্ষি বেদব্যাসজী প্রায় সোয়া পাঁচ হাজার বছর আগে মহাভারত রচনা করেছিলেন যার একটি অংশ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। গীতায় ভগবান অর্জুনকে যে জ্ঞান প্রদান করেছিলেন তা এখনও যথার্থভাবে সত্য এবং জীবনে গ্রহণ করার যোগ্য।
আজকের বিবেচন সত্র এখানেই সমাপ্ত হয় এবং তদ্পশ্চাৎ প্রশ্নোত্তর পর্ব আরম্ভ হয়:
::প্রশ্নোত্তর পর্ব::
প্রশ্ন কর্ত্রী: মেঘনা দিদি
প্রশ্ন: দশদিন ব্যাপী গণেশ উৎসবে আরতি করার সময় ‘সুখহর্তা দুঃখহর্তার' মাঝে কিছু শব্দ কিছু লোক বলে আবার কেউ কেউ বলে না। এরকম কেন ?
উত্তর: আরতি ভাব-প্রধান। সমর্থ রাম দাস স্বামী এই আরতি রচনা করেছিলেন। আরতি হল সেটি যা সমর্পিত-ভাবের সাথে গাওয়া হয়। এতে শব্দের প্রাধান্যতা কম, ভাবের প্রাধান্যতা বেশী। কিছু শব্দ পরে যুক্ত করা হয়েছে যা মূল আরতিতে নেই।
প্রশ্নকর্তা: সুরেন্দ্র নাথ দাদা
প্রশ্ন: আঠারোটি অধ্যায় পাঠ করার সময় কেন এটা মনে হয়েছে যে শ্লোকসমূহের লয় আলাদা-আলাদা?
উত্তর: গীতায় দুটি ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে– অনুষ্টুপ ছন্দ এবং ত্রিষ্টুপ ছন্দ । যার জন্য লয়ের ভিন্নতা বোধ হয়। মনের অবস্থাও ও ভাবের কারণেও কখন কখন এই ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তাই শান্তমনে ও ভক্তিভাব নিয়ে গীতা পাঠ করলে কণ্ঠে এক আলাদা শক্তির অনুভূতি হয় এবং তখন লয়ের চলনে ভিন্নতা বোধ হয় না।
প্রশ্ন: একাদশ অধ্যায়ে ভগবান বলেছেন যে তাঁর বিশ্বরূপের দর্শন বেদ, যজ্ঞ, দান, তপস্যা আদি কোনো ক্রিয়ার দ্বারা সম্ভব নয়। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কিরূপে ভগবানের দর্শন করতে পারি ?
উত্তর: একাদশ অধ্যায়ে ভগবান তাঁর বিশ্বরূপ দর্শনের কথা বলেছেন যা দেবতাদেরও দুর্লভ। ভগবানের রূপ অনন্ত। বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন সময়ে তিনি প্রকট হয়েছেন। ভগবানের অস্তিত্ব উপলব্ধি করার জন্য চাই গভীর শ্রদ্ধা এবং অটুট বিশ্বাস। গভীর শ্রদ্ধা ও অটল বিশ্বাসের জোরে গৌতম বুদ্ধ নিজের ভিতরে পরমাত্মার প্রকাশ উপলব্ধি করেছিলেন; ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের অগাধ ভক্তি ও গভীর শ্রদ্ধায় সন্তুষ্ট হয়ে দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের মা ভবতারিণী চিন্ময়ীরূপে ঠাকুরকে দর্শন দিয়েছিলেন।
প্রশ্নকর্ত্রী: কমলেশ দাদা
প্রশ্ন: গীতায় পরমাত্মা প্রাপ্তির জন্য কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ আদি বিভিন্ন মার্গের উল্লেখ আছে। এইসবের চিন্তন,মনন করার সময় উদ্বিগ্নতা যদি আসে তাহলে তা কিভাবে দূর করা যায়?
উত্তর: পরমাত্মার প্রাপ্তিই একমাত্র লক্ষ্য। যদিও গীতায় ভিন্ন ভিন্ন মার্গের উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু গন্তব্যস্থল একটি অর্থাৎ পরমাত্মা-প্রাপ্তি। একটি বৃত্তের সাথে যদি তুলনা করা যায় তাহলে বৃত্তের কেন্দ্র বিন্দু হল পরমাত্মা। বৃত্তের পরিধিতে আমাদের অবস্থান।বৃত্তের ব্যাসার্ধগুলো পরমব্রহ্মে পৌঁছাবার এক একটি রাস্তা। প্রতিটি রাস্তা ভিন্ন ভিন্ন যদিও কিন্তু গন্তব্যস্থল সবার এক। যে মার্গেই সাধনা করা যাক না কেন, গন্তব্যস্থল যত কাছে আসবে ততই সাধনমার্গগুলোর দূরত্ব কমে যায়। মীরাবাঈ যেমন সংগীতের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছেছিলেন ঠিক তেমনি গৌতম বুদ্ধ ধ্যানের মাধ্যমে পরমব্রহ্মকে লাভ করেছিলেন।