विवेचन सारांश
সম্পূর্ণ শরণাগতিই গীতার সারকথা
হরিনাম সংকীর্তন , প্রারম্ভিক প্রার্থনা এবং দীপ প্রজ্জ্বলনের পর এই বিবেচন সত্রের শুভারম্ভ হয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সব অধ্যায়সমূহ বারংবার শোনা এবং গীতাকে অনুসরণ করা খুব আবশ্যক। বারংবার মনন ও চিন্তনের মাধ্যমেই গীতাকে নিজের আচরণে আনা সম্ভব হয়। শ্লোকসমূহের শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার পাশাপাশি বিবেচন সত্রে এইসব শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ জানার পর নিজের আচরণে গীতাকে প্রয়োগ করা সহজ হয়। দুধের গ্লাসে শুধু চিনি দিলে দুধের মিষ্টতা বৃদ্ধি পায় না, চিনি দুধের সাথে ভালো করে মিশে যাবার পর মিষ্টতা উপলব্ধি করা যায়। ঠিক তেমনি গীতামৃতের স্বাদ তখনই প্রাপ্ত হয় যখন গীতাকে নিজের আচরণে প্রয়োগ করা হয়। গীতা কণ্ঠস্থীকরণ এবং বিবেচনসত্রে যত বেশী গীতার ভাবার্থ শোনা যায়, ততই নিজের জীবনে গীতাকে অনুসরণ করা সহজ হয়ে পড়ে এবং গীতামৃত লাভে মানব জীবন সার্থক হয়।
অষ্টাদশ অধ্যায় সম্পূর্ণ গীতার সার, তাই এই অধ্যায়ের চিন্তন খুব মনোযোগ সহকারে করা উচিত।
উপযুক্ত সাধন-সামগ্রী দ্বারা নিষ্ঠা লাভ হলে কি হয়, ভগবান পরবর্তী শ্লোকে তা প্রকাশ করেছেন।
18.54
ব্রহ্মভূতঃ(ফ্) প্রসন্নাত্মা, ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি
সমঃ(স্) সর্বেষু ভূতেষু, মদ্ভক্তিং(ম্) লভতে পরাম্॥54॥
‘ব্রহ্মভূতঃ’---যখন অন্তরে বিনাশশীল বস্তুর প্রাধান্য দূর হয় , তখন চিত্তে আসুরিক গুণসমূহ অর্থাৎ অহংকার, দর্প , ক্রোধ আদি বৃত্তি শান্ত হয় এবং পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সুখ ও ভোগবুদ্ধি দূর হলে, চিত্তে স্বাভাবিকভাবে শান্তি আসে। এইভাবে সাধক যখন অসৎ-এর ঊর্ধ্বে ওঠেন, তখন ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপযুক্ত হন। ধীরে ধীরে তাঁর ‘আমি ব্রহ্মস্বরূপ এবং ব্রহ্ম আমার স্বরূপ’ এটি অনুভব হয়। সাধকের এই অবস্থাকে ব্রহ্মভূতঃ বলা হয়েছে।
‘প্রসন্নাত্মা’--- চিত্তে যখন বস্তুলাভের কামনা উৎপন্ন হয়, তখন অন্তরে চাঞ্চল্যতা আসে। কিন্তু যখন অসৎ বস্তুর গুরুত্ব চলে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশান্তি থাকে। অপ্রসন্নতার কারণ দূর হলে আর কখনও অপ্রসন্নতা আসে না।
‘ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি’--- সাধকের যখন কোনো শোক বা চিন্তা থাকে না তখন তাঁর চিত্ত প্রসন্ন থাকে। সংসারে যত দুঃখই আসুক তবুও তিনি শোক করেন না এবং বিশেষ কোনো পরিস্থিতি, বস্তু, ব্যক্তি ইত্যাদি লাভের কোনো ইচ্ছা তাঁর জাগে না।
‘সমঃ সর্বেষু ভূতেষু’ — সাধকের মধ্যে যতক্ষণ একটুও হর্ষ-শোক, রাগ-দ্বেষ ইত্যাদি দ্বন্দ্ব থাকে, ততক্ষণ ব্যাপ্তিস্বরূপ পরমাত্মার সাথে অভিন্নতা অনুভব করা সম্ভব হয় না। কিন্তু যখন তিনি এই সমস্ত দ্বন্দ্বরহিত হন, তখন পরমাত্মার সাথে স্বয়ং অভিন্নতা অনুভব করেন। পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্নতার ভাব হলে নিজের আর কোনো ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ অহং-বোধ থাকে না। ‘আমি আছি’--এইরূপে নিজের কোনো পৃথক অস্তিত্ব না থাকায় তিনি সমস্ত প্রাণীতে সমদর্শী হন। যেমন পরমাত্মা সকল প্রাণীতে সম , ঠিক তেমনি সাধকও সমস্ত প্রাণীতে সম হয়ে থাকেন।
‘মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্’--- সমরূপ পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্নতা অনুভব হলে যখন সাধকের সমভাব হয়, তখন তাঁর প্রতিমুহূর্তে পরমাত্মার প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ও অনুরাগ জন্মায়। সেটিই পরাভক্তি।
ভক্ত্যা মামভিজানাতি, য়াবান্যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ
ততো মাং(ন্)তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা, বিশতে তদনন্তরম্ ॥55॥
ভগবান বলেছেন,”এই পরাভক্তির দ্বারা তাঁরা আমাকে স্বরূপতঃ জানতে পারেন যে আমি কে এবং আমার স্বরূপ কী ? আমাকে তত্ত্বতঃ জেনে তাঁরা আমাতে প্রবেশ করেন।”
সাগরের এক বিন্দু জল মুখে নিলেই জলের নোনতা ভাব উপলব্ধি করা যায়, আর ঐ এক বিন্দু সাগরের জলেই আমাদের অনুভূতি হয় যে সাগরের জলের স্বাদ নোনতা। ভাত রান্না করার সময় গৃহিনী আঙ্গুলে একটি ভাতের কণা টিপেই সম্পূর্ণ হাঁড়ির চাল সেদ্ধ হল কিনা বুঝতে পারে। ঠিক তেমনই গীতার সাতশো শ্লোক পঠনের পর পরমতত্ত্বের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়।
ভগবান বলেছেন যে পরমতত্ত্বের জ্ঞান প্রাপ্ত হলে ধীরে ধীরে যখন পরমতত্ত্বের প্রতি অনুরাগ জন্মায়, তখন সাধক স্বয়ং সেই পরমাত্মাতে সর্বতোভাবে সমর্পিত হন, সেই তত্ত্বে অভিন্ন হয়ে যান। তখন তাঁর আর পৃথক কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তিনি প্রেমস্বরূপ প্রেমভক্তি প্রাপ্ত হন।
‘ব্রহ্মভূত অবস্থা প্রাপ্ত হলে জাগতিক সম্বন্ধ সর্বতোরূপে পরিত্যক্ত হয়, কিন্তু ‘আমি ব্রহ্ম, আমি শান্ত,নির্বিকার’ এরূপ সূক্ষ্ম অহংভাব থেকে যায়। ভগবান বলেছেন যে পরমাত্মাতে আকৃষ্ট হলে পরাভক্তির উদয় হয় এবং এই অহংভাব দূর হয়।
একবার ভগবান তাঁর এক পরম ভক্তকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বললেন, ”তোমার অতীতের জীবন-যাত্রা আজ তোমাকে দেখাবো, আমাকে অনুসরণ কর।” এই বলে ভগবান চলতে শুরু করলেন এবং সে ভক্তও তাঁর সাথে চলতে শুরু করলেন। সমুদ্র তীরে নরম বালির উপর দিয়ে যখন দুজনে হাঁটছিলেন তখন ভগবান ভক্তকে বললেন,” এই যে দুটো পদচিহ্ন সেটি তোমার। চলার পথে তুমি সর্বদা আমার চিন্তন করছিলে, তাই আমি তোমার হাত ধরে তোমার সাথে সাথে যাচ্ছিলাম। তোমার পদচিহ্নের পাশে আরও যে দুটো পদচহ্ন দেখতে পারছো, সেটি আমার।” ভক্ত বলল, ”প্রভু, আমি জানি যে আমার প্রতি আপনার অসীম কৃপা।” কিছুটা এগিয়ে যাবার পর কণ্টকময় রাস্তা শুরু হয়। ভক্ত লক্ষ্য করলো যে কণ্টকময় রাস্তা শুরু হবার পর থেকে কেবল দুটো পদচিহ্ন দেখা যাচ্ছে। জীবনের কঠিন সময় ভগবান ত্যাগ করেছেন এই ভেবে ভক্তজন খুব দুঃখ পেয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে ভগবান বললেন, “এই কণ্টকময় রাস্তা শুরু হবার সাথে সাথে তোমাকে আমি কোলে তুলে নিয়েছি। এই পদচিহ্নদ্বয় তোমার নয়, সেটি আমার।”
ভগবান সবসময় আমাদের রক্ষা করেন। কিন্তু এটি উপলব্ধি করার জন্য চাই অসীম ভক্তি ও অটুট শ্রদ্ধা। ভগবান বলেছেন যে পরাভক্তির দ্বারা সাধক পরমাত্মার সমগ্ররূপ জানতে পারেন। পরাভক্তি জন্মালে ভগবানের প্রকৃত সমগ্র স্বরূপ সাধক উপলব্ধি করেন এবং তন্ময়ত্ব প্রাপ্ত হন। একেই বলা হয় মনুষ্যজন্মের সার্থকতা।
সর্বকর্মাণ্যপি সদা, কুর্বাণো মদ্ ব্যপাশ্রয়:
মত্প্রসাদাদবাপ্নোতি, শাশ্বতং(ম্) পদমব্যয়ম্॥56॥
ভগবান বলেছেন — যে সাধক সম্পূর্ণরূপে ভগবানের আশ্রয়ে থাকেন, নিজেকে পৃথক বলে মনে করেন না, কোনো কিছুই নিজের বলে মনে করেন না, সেই ভক্তের নিজের উদ্ধারের জন্য কিছুই করতে হয় না; ভগবান তাঁকে উদ্ধার করেন, তাঁর অপূর্ণতা পূর্ণ করে দেন ।
প্রিয় ভক্তের লক্ষণ উল্লেখ করে দ্বাদশ অধ্যায়ে ভগবান বলেছিলেন:
অনপেক্ষঃ শুচীর্দক্ষ উদাসীনো গতব্য়থঃ।
সর্বারম্ভপরিত্যাগী য়ো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।১২.১৬।।
অর্থাৎ যিনি সর্ববিষয়ে নিস্পৃহ, শৌচসম্পন্ন , কর্তব্য-কর্মে অনলস, পক্ষপাতশূন্য , যাঁকে কোনোকিছুই মনঃপীড়া দিতে পারে না এবং ফল কামনা করে যিনি কোন কাজ আরম্ভ করেন না, সেইরূপ ব্যক্ত ভগবানের অতি প্রিয়।
প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে অর্জুন আত্মীয়-পরিজনদের সাথে যুদ্ধ করে রাজ্য লাভ করার চেয়ে সন্ন্যাস নেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ।
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা।।১.৩২।।
অর্জুন মোহগ্রস্থ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করার কথা ভেবেছিলেন কিন্তু ভগবান অর্জুনকে ক্ষত্রিয় ধর্মের কথা স্মরণ করিয়ে অধর্মের বিনাশ হেতু অস্ত্রধারণের উপদেশ দিয়েছিলেন।
যদিও সমস্ত জীবের প্রতি ভগবানের কৃপা সদাসর্বদা থাকে, তা স্বত্বেও মানুষ যতক্ষণ এই বিনাশশীল জগতের আশ্রয় গ্রহণ করে ভগবানের প্রতি বিমুখ হয়ে থাকে, ততক্ষণ ভগবদকৃপা তার প্রতি ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু মানুষ যখন অন্যান্য আশ্রয় ত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করে, তখন তার ভগবদকৃপা অনুভব হয়।
‘অবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম”---শাশ্বত অর্থ হল সর্বোৎকৃষ্ট । মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল জন্ম-মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তিলাভ করে পরমপদ প্রাপ্ত করা। সেই পরমপদকে ভক্তিমার্গে পরমধাম, গোলক, বৈকুণ্ঠধাম ইত্যাদি এবং জ্ঞানমার্গে মোক্ষ, স্বরুপস্থিতি ,মুক্তি ইত্যাদি বলা হয়। ভগবান বলেছেন– যে ভক্ত সম্পূর্ণরূপে তাঁর আশ্রয় নেন, সেই ভক্তের ভগবানের কৃপায় সেই শাশ্বত অর্থাৎ পরমপদ প্রাপ্ত হয়। অবিনাশী পদের প্রাপ্তি নিজের কর্মের দ্বারা, পুরুষার্থ দ্বারা বা সাধনার দ্বারা প্রাপ্ত লাভ করা যায় না। শুধুমাত্র ভগবদকৃপাতেই সম্ভব।
চেতসা সর্বকর্মাণি, ময়ি সন্ন্যস্য মত্পরঃ
বুদ্ধিয়োগমুপাশ্রিত্য, মচ্চিত্তঃ(স্) সততং(ম্) ভব॥57॥
এই শ্লোকে ভগবান অর্জুনকে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়ে বলছেন—”মনে মনে সমস্ত কর্ম আমাকে অর্পণ করে, মৎপরায়ণ হয়ে, সমবুদ্ধি অবলম্বন করে নিরন্তর আমাতে নিবিষ্টচিত্ত হও ।”
এই শ্লোকে ভগবান চারটি বিষয় বলেছেন—
‘চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সন্ন্যস্য’ — শরীর, ইন্দ্রিয়, মন ইত্যাদির দ্বারা যে সমস্ত শাস্ত্রবিহিত ক্রিয়া সংঘটিত হয়, তা সমস্তই ভগবানের ইচ্ছাতেই হয়। মানুষ অহংবশতঃ সেগুলো নিজের বলে মনে করে। সেই ক্রিয়াগুলোতে যে একাত্মভাব থাকে, তা ভগবানে সমর্পন করে দিতে হয়।
‘মৎপরঃ’ – সম্পূর্ণরূপে নিজেকে ভগবানের শ্রীচরণে সমর্পন করা। ভগবানই পরম আশ্রয়, তিনি ছাড়া আর কিছুই নেই, কিছু করারও নেই, পাওয়ারও নেই, কিছু নেওয়ারও নেই— এইরূপ অনন্যভাব হওয়াকেই বলা হয় ভগবদ্পরায়ণ হওয়া।
‘বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য’--- সুখে-দুঃখে, অনুকূল-প্রতিকূলতায়, লাভ-ক্ষতিতে অর্থাৎ সর্বপ্রকার পরিস্থিতিতে একইভাবে বিদ্যমান। নিজেতে নিজে স্থিত হলে সুখ-দুঃখ ইত্যাদিতে সমত্ববোধ আসে। এই সমত্ববোধই ভগবানের আরাধনা। তাই ভগবান এখানে বুদ্ধিযোগ বা সমত্ববোধের আশ্রয় গ্রহণ করার কথা বলেছেন। গীতায় ভগবান যে যোগ বলেছেন, তাকে কখনো বুদ্ধিযোগ আবার কখনো কেবল যোগ শব্দদ্বারাই প্রকাশ করা হয়েছে।এই স্থলে বুদ্ধি অর্থ শুদ্ধ সাম্য -বুদ্ধি। ইহাই কর্মযোগের মূল, কর্ম করার সময় বুদ্ধিকে স্থির, সম ও শুদ্ধ রাখাই সেই যোগ বা কৌশল যাতে কর্মের বন্ধন হয় না, সে কর্ম যাই হোক না কেন।
‘মচ্চিত্তঃ সততং ভব’ — যিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের পাদপদ্মে সমর্পণ করেন, তাঁর চিত্তও সদাই ভগবানের শ্রীচরণে সমর্পিত হয়। তখন তাঁর উপর ভগবানের যে স্বাভাবিক অধিকার তা প্রকটিত হয় এবং তাঁর চিত্তে ভগবান স্বয়ং বিরাজ করেন।
যার সাথে সাক্ষাৎ হোক না কেন, মনে এই ভাব থাকতে হবে যে ঈশ্বরের সাথে দেখা হয়েছে। সব কাজকে পূজা জ্ঞানে সম্পন্ন করতে হবে। সারাদিনের সমস্ত কর্ম সম্পন্ন হবার পর রাত্রে সমস্ত কর্ম ঈশ্বরকে অর্পণ করতে হবে।
মচ্চিত্তঃ(স্) সর্বদুর্গাণি, মত্প্রসাদাত্তরিষ্যসি
অথ চেত্ত্বমহঙ্কারান্ ,ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ ক্ষ্যসি॥58॥
ভগবান অর্জুনকে বলছেন— “আমাতে চিত্ত রাখলে আমার কৃপায় সমস্ত সঙ্কট অর্থাৎ কর্মের শুভাশুভ ফল অতিক্রম করবে, কিন্তু যদি অহংকারবশত আমার কথা না শোনো তাহলে বিনাশ প্রাপ্ত হবে।”
ভগবান এখানে দুটি মার্গের উল্লেখ করে উভয়ের পরিণামও জানিয়েছেন। সুতরাং উত্তম পথই বেছে নেওয়াই সবার পক্ষে হিতকর। ভক্তের একমাত্র কাজ হল মন ও বুদ্ধিকে স্থির, পবিত্র, সম ও শুদ্ধ রেখে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের শরণাগত হওয়া। এই পথে চলেই তুলসীদাসজী, মীরাবাঈ, ভক্ত কবীর, সাধক তুকারাম, জ্ঞানেশ্বর মহারাজ আদি ভক্তগণের ঈশ্বর-প্রাপ্তি হয়েছিল।
মা যেমন সন্তানকে জীবনে চলার পথে সদাই উত্তম মার্গের উপদেশ দেন এবং সন্তান নির্দ্বিধায় তা মেনে নেয়, ঠিক তেমনি সাধু-মহাপুরুষদের নির্দেশিত সাধন-মার্গ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
ভগবদ্ভক্ত যখন সমত্ববোধে নিজের সমস্ত কর্ম এবং নিজেকে ভগবানের চরণে সমর্পণ করেন তখন ভগবান ভক্তের উপর বিশেষ কৃপা করে তাঁর সাধন-পথের সমস্ত বাধা-বিঘ্ন দূর করেন। প্রকৃতপক্ষে মানুষের উপর ভগবানের কৃপা সদাই থাকে, কিন্তু ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করলে তবেই ভক্ত সেই কৃপা বিশেষভাবে অনুভব করেন।
যদহঙ্কারমাশ্রিত্য, ন য়োৎস্য ইতি মন্যসে
মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে, প্রকৃতিস্ত্বাং(ন্) নিয়োক্ষ্যতি॥59॥
পূর্ববর্তী শ্লোকে ভগবান বলেছিলেন যে অহংকারের বশবর্তী হয়ে কোনো কর্ম করলে তার পরিণাম ভালো হয় না। অহংকারের বশবর্তী হয়ে অর্জুন বলেছিলেন যে তিনি যুদ্ধ করবেন না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভগবান এই শ্লোকে অর্জুনকে বলছেন— “ অহংকারপরবশ হয়ে এই যে মনে করছো যে তুমি যুদ্ধ করবে না, তোমার এই সঙ্কল্প মিথ্যা , কারণ তোমার ক্ষত্রিয়-স্বভাবই তোমাকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করবে।”
মানুষের প্রকৃতি অর্থাৎ স্বভাব থেকেই অহংকার উৎপন্ন হয়। আর এই অহংকারই মানুষকে এই মান্যতা দেয় যে “আমি শরীর”। প্রকৃতির দ্বারা বশীভূত মানুষ কখনও ক্রিয়ারহিত হতে পারে না কারণ প্রকৃতি সর্বদা ক্রিয়াশীল ও পরিবর্তনশীল। প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করলে কর্ম না করে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু যিনি প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে ভগবানের শরণাগত হয়েছেন তাকে কর্ম করতে বাধ্য হতে হয় না।
ভগবান বুঝতে পেরেছিলেন যে যদিও অর্জুন দ্বিতীয় অধ্যায়ে তাঁর শরণাপন্ন হয়ে উপদেশ ভিক্ষা চেয়েছিলেন কিন্তু অর্জুন প্রকৃতপক্ষে অহংকারের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করবেন না বলেছিলেন। প্রকৃত শরণাগত ব্যক্তি “আমি এটা করবো, ওটা করবোনা” বলে না। ভগবানের শরণাগত হলে ভগবান যেমন করাবেন তেমনই করতে হবে। তাই ভগবান এই শ্লোকে বলেছেন যে অর্জুন ক্ষত্রিয় এবং এই প্রকৃতিই তাঁকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি জানতেন যে অর্জুন সম্পূর্ণরূপে তাঁর শরণাগত না হয়ে অহংকারের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। কর্তব্য-কর্মে(যুদ্ধে) ভগবানের শরণাগত হয়ে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী নিয়োজিত হওয়া আর ত্রিগুণময়ী প্রকৃতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে নিযুক্ত হওয়ার মধ্যে বিশাল পার্থক্য। অর্জুন যদি ভগবানের কথা না শোনেন তাহলে তাঁর ক্ষত্রিয়-স্বভাব তাঁকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং অর্জুন কর্ম-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাবে। আর যদি ভগবানের শরণাগত হয়ে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী অর্জুন কর্তব্য-কর্ম করেন তাহলে তার দায়িত্ব ভগবানের এবং সেই ক্ষেত্রে অর্জুন মুক্ত হয়ে যাবেন।
স্বভাবজেন কৌন্তেয়, নিবদ্ধঃ(স্) স্বেন কর্মণা
কর্তুং(ন্) নেচ্ছসি য়ন্মোহাত্ ,করিষ্যস্যবশোऽপি তত্ ॥60॥
ভগবান পুনরায় বলছেন যে অর্জুন যদিও নিজের স্বভাবজ কর্মের দ্বারা আবদ্ধ থেকেও মোহবশতঃ যুদ্ধ করতে চাইছিলেন না, কিন্তু ক্ষত্রিয়-প্রকৃতিবশতঃ তাঁকে এই যুদ্ধ করতেই হবে। প্রত্যেক জীবই পূর্বজন্ম-স্বভাবানুসারে স্বীয়-স্বীয় কর্মে আবদ্ধ থাকে। শাস্ত্রে স্বভাব অনুসারেই কর্তব্য-কর্ম করার নির্দেশ আছে। অর্জুন ক্ষত্রিয় এবং স্বভাবজ কর্ম অনুযায়ী অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই ক্ষত্রিয় ধর্ম। শাস্ত্রনির্দেশে সেই কর্মে যদি কিছু দোষও দেখা যায়, তাহলেও সেই দোষ পাপজনক হয় না।
জীব স্বয়ং পরমাত্মার অংশ এবং স্বভাব প্রকৃতির অংশ। স্বয়ং স্বতঃসিদ্ধ এবং স্বভাব নিজের সৃষ্ট। স্বয়ং চেতন আর স্বভাব জড়— তা সত্ত্বেও জীব কিভাবে স্বভাবের বশীভূত হয়, ভগবান পরবর্তী শ্লোকে সেটি বলেছেন।
ঈশ্বরঃ(স্) সর্বভূতানাং(ম্),হৃদ্দেশেऽর্জুন তিষ্ঠতি
ভ্রাময়ন্সর্বভূতানি, য়ন্ত্রারূঢানি মায়য়া॥61॥
ভগবান বলছেন যে ঈশ্বর সমস্ত প্রাণীর হৃদয়ে অধিঠিত থাকেন এবং নিজ মায়া দ্বারা শরীররূপী যন্ত্রে আরূঢ় হয়ে থাকা সমস্ত প্রাণীকে (তাদের স্বভাব অনুসারে) চালিত করেন। শরীররূপী যন্ত্রে আরূঢ় থাকা প্রাণী অর্থাৎ যে সকল ব্যক্তি শরীরকে ‘আমি’ ও ‘আমার বলে মনে করে। ভগবান বলেছেন যে মানুষ যতক্ষণ শরীররূপী যন্ত্রের সঙ্গে ‘আমি’ ও ‘আমার’ সম্বন্ধ রাখে, ততক্ষণ ঈশ্বর সেই ব্যক্তির স্বভাব অনুসারে তাকে চালিত করেন এবং সেই ব্যক্তি জন্ম-মৃত্যরূপ চক্রে আবর্তিত হতে থাকে। শরীররূপী যন্ত্রে আরূঢ় হয়ে থাকা মানুষ স্বভাব বা প্রকৃতির বশীভূত হয়। কিন্তু শরীর হতে সর্বতোভাবে সম্পর্ক ছিন্ন হলে যখন স্বভাব রাগ-দ্বেষবর্জিত হয়, তখন প্রকৃতির বশ্যতা থাকে না। প্রকৃতির অর্থাৎ স্বভাবের বশীভূত না হওয়ায় ঈশ্বরের মায়া তাকে সঞ্চালিত করে না।
তমেব শরণং(ঙ্) গচ্ছ, সর্বভাবেন ভারত
তত্প্রসাদাত্পরাং(ম্) শান্তিং(ম্),স্থানং(ম্) প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্॥62॥
ভগবান অর্জুনকে বলেছেন— যে সর্বব্যাপী ঈশ্বর সকলের হৃদয়ে বিরাজমান এবং সকলের সঞ্চালক, অর্জুন যেন তাঁর শরণাগত হন। তাঁর কৃপায় অর্জুন পরম শান্তি ও অবিনাশী পরমপদ লাভ করতে সক্ষম হবেন। তাৎপর্য্য হল যে জাগতিক উৎপত্তি-বিনাশশীল পদার্থ, বস্তু, ব্যক্তি, ঘটনা, পরিস্থিতি ইত্যাদি কোনো কিছুর আশ্রয় না নিয়ে শুধু অবিনাশী পরমাত্মার আশ্রয়ই গ্রহণ করা কর্তব্য। ভক্তিমার্গে বলা হয় যে পরমাত্মার অংশ জীবাত্মারূপে সবার হৃদয়ে অধিঠিত থেকে মায়া দ্বারা যন্ত্ররূঢ় পুতুলের ন্যায় সবাইকে চালান। সুতরাং সর্বতোভাবে তাঁর শরণাপন্ন হলে তাঁর প্রসাদে জীবের মুক্তিলাভ সম্ভব হয়। মনে রাখা প্রয়োজন যে আত্মচেষ্টা ব্যতীত ভগবৎকৃপা প্রাপ্ত হয় না। অর্জুনের হৃদয় অশান্ত ছিল, তাই ভগবান অর্জুনকে এখানে বলেছেন যে ঈশ্বরের শরণাগত হলে অর্জুন পরম শান্তি ও পরমপদ উভয়ই প্রাপ্ত হবেন। অশান্ত হৃদয়ে যে কোনো নির্ণয় সঠিক হয় না। তাই ভগবান অর্জুনকে পরম শান্তি প্রাপ্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং(ঙ্), গুহ্যাদ্ গুহ্যতরং (ম্) ময়া
বিমৃশ্যৈতদশেষেণ, য়থেচ্ছসি তথা কুরু॥63॥
আগের শ্লোকে ভগবান অর্জুনকে অন্তর্যামী ঈশ্বরের শরণাগত হওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। একথা শুনেও যখন অর্জুন কিছুই বললেন না তখন ভগবান অর্জুনকে স্বাধীনতা প্রদান করে বলেছেন যে এতক্ষণ তিনি অর্জুনের কাছে গুহ্য হতে গুহ্যতর (শরণাগতিরুপ) তত্ত্বজ্ঞান ব্যাখ্যা করেছেন। এইসব অর্জুন যেন বিশদভাবে চিন্তা করে তাঁর স্বৈচ্ছানুরূপ কর্ম করেন। ভগবানের মুখে এই কথা শুনে অর্জুন হয়তো ভেবেছিলেন যে ভগবান দায়িত্ব ত্যাগ করতে চাইছেন, তাই পরবর্তী দুটি শ্লোকে ভগবান তাঁর প্রিয় সখা অর্জুনকে আশ্বস্ত করেছেন।
সর্বগুহ্যতমং(ম্) ভূয়ঃ(শ্), শৃণু মে পরমং(ম্) বচঃ
ইষ্টোऽসি মে দৃঢমিতি, ততো বক্ষ্যামি তে হিতম্॥64॥
ভগবান বলেছেন, ”এবার তুমি সর্বাপেক্ষা গুহ্যতম বাক্য আমার কাছে আবার শোনো। তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় , তাই এই কল্যাণের কথা আমি তোমাকে বলছি।”
ভগবদ্গীতায় ভগবান গুহ্য, গুহ্যতর, গুহ্যতম শব্দসমূহ আগে ব্যবহার করেছেন কিন্তু ‘সর্বগুহ্যতম’ শব্দটি আগে তিনি ব্যবহার করেন নি। ভগবান যদিও সব কথা অর্জুনকে বলেছিলেন কিন্তু অর্জুনের মন অশান্ত থাকার জন্য তিনি হয়তো সেগুলো লক্ষ্য করেন নি। তাই তিনি এবার ‘সর্বগুহ্যতম’ অর্থাৎ সর্বাপেক্ষা গোপনীয় কথাটি অর্জুনকে আবার শুনতে বলেছেন। বিয়ের পর যখনই মেয়েরা বাপের বাড়ী থেকে শ্বশুরবাড়ী যায়, মা প্রতিবার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কানে-কানে সংস্কারের অতি গূঢ় দু-একটি কথা মেয়েকে স্মরণ করিয়ে দেন। অর্জুন ভগবানের অতি প্রিয় সখা ও ভক্ত। যদিও সতেরো অধ্যায় অবধি ভগবান অর্জুনকে অনেক উপদেশ দিয়েছেন কিন্তু এখানে অর্জুনকে তিনি আবার তাঁর হৃদয়ের অত্যন্ত গোপনীয় এবং শ্রেষ্ঠ কথা বলতে চেয়েছেন।
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো, মদ্যাজী মাং(ন্) নমস্কুরু
মামেবৈষ্যসি সত্যং(ন্) তে, প্রতিজানে প্রিয়োऽসি মে॥65॥
ভগবান অর্জুনকে বলেছেন,”তুমি আমার ভক্ত হও , আমাতে চিত্ত প্রদান কর, আমাকে পূজা কর এবং আমাকে নমস্কার কর। এরূপ করলে তুমি আমাকেই পাবে— আমি তোমার কাছে সত্য প্রতিজ্ঞা করে এই কথা বলছি কারণ তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়।”
জীবমাত্রেই ভগবানের অত্যন্ত প্রিয়। জীবই শুধু ভগবানের থেকে বিমুখ হয়ে প্রতিমুহূর্তে বিনাশের পথে যাওয়া এই জগৎ-সংসার (ধন-সম্পত্তি, আত্মীয়-স্বজন,শরীর-ইন্দ্রিয়াদি, মন-বুদ্ধি) ইত্যাদিকে নিজের বলে মনে করে। জীব নিজেই এই জগৎ-সংসারের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। সংসার পরিবর্তনশীল, অনিত্য কিন্তু জীব (জীবাত্মা যা পরমাত্মার অংশ) নিত্য, অপরিবর্তনশীল। তাই এই মেনে নেওয়া সম্পর্কই অনর্থের কারণ। এই সম্বন্ধ মানা বা না মানাতে সকলেই স্বাধীন। অতএব এই মেনে নেওয়া সম্পর্ক পরিত্যাগ করে যাঁর সঙ্গে আমাদের প্রকৃত ও নিত্য সম্পর্ক আছে সেই ভগবানের শরণাগত হওয়ার উপদেশ অর্জুনকে ভগবান দিচ্ছেন।
সর্বধর্মান্পরিত্যজ্য, মামেকং(ম্) শরণং(ম্) ব্রজ
অহং(ন্) ত্বাং(ম্) সর্বপাপেভ্যো, মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥66॥
পূর্বোক্ত দুটি শ্লোকে অর্জুনকে আশ্বাস প্রদান করে ভগবান এখন তাঁর উপদেশের অত্যন্ত সার কথাটি অর্জুনকে জানাচ্ছেন— “ হে অর্জুন, সমস্ত ধর্মের আশ্রয় পরিত্যাগ করে তুমি কেবলমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করবো, তুমি শোক করো না।”
এখানে ধর্ম অর্থ হিন্দুধর্ম, মুসলিমধর্ম, খ্রিস্টানধর্ম ইত্যাদি নয়। গীতানুসারে ‘ধর্ম শব্দের অর্থ কর্তব্য-কর্ম’। সম্পূর্ণ ধর্ম ত্যাগের প্রকৃত অর্থ কি? গীতা অনুসারে সম্পূর্ণ ধর্ম বা কর্ম ভগবানে সমর্পণ করা হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ভগবান সকল ধর্মের আশ্রয়– ধর্ম নিরূপণের বিচার পরিত্যাগ করে অর্থাৎ কী করতে হবে, কী করতে হবে না — এসব কথা বাদ দিয়ে কেবল তাঁর শরণাগত হতে বলেছেন। ধর্মের আশ্রয় গ্রহণকারীগণ বারংবার জন্ম-মৃত্যু প্রাপ্ত হতে থাকেন, তাই ধর্মের আশ্রয় ছেড়ে ভগবানের শরণাগত হলে তখন নিজ ধর্ম নিরূপণের প্রয়োজন থাকে না। ভগবান স্বয়ং ভক্তের ধর্মের নিরূপণ করেন।
‘মামেকং শরণং ব্রজ’ কথাটির তাৎপর্য হলো— সবার সঙ্গে প্রেম, প্রীতি, সম্মান, সদ্ব্যবহার ইত্যাদির সম্পর্ক থাকলেও, তা যেন বহিরঙ্গেই থাকে, অন্তরে কারো জন্য যেন মমত্ব-বন্ধন না থাকে, কারোর প্রত্যাশা যেন না থাকে, আশ্রয় যেন শুধু ভগবানেরই থাকে।
গীতার সারকথা হল এই শরণাগতি। এই শরণাগতিতেই গীতার উপদেশ পূর্ণতা লাভ করে।
ইদং(ন্) তে নাতপস্কায়,নাভক্তায় কদাচন
ন চাশুশ্রূষবে বাচ্যং(ন্), ন চ মাং(ম্) য়োऽভ্যসূয়তি॥67॥
ভগবান গীতার সারকথা পূর্বশ্লোকে অর্জুনকে এবং পরোক্ষভাবে সবাইকে অবগত করাবার পর বলছেন— ”এই সর্বগুহ্যতম সারকথা অতপস্বীকে বলবে না,অভক্তকে কখনো বলবে না; যে ব্যক্তি শুনতে আগ্রহী নয় এবং যে ব্যক্তি আমার প্রতি দোষদৃষ্টিসম্পন্ন তাকেও বলবে না।”
শ্রদ্ধারূপী জল সেচন না করলে ভক্তিবীজ অঙ্কুরিত হয় না, তাই ভগবান শ্রদ্ধাহীন,অসহিষ্ণু ব্যক্তিদের এই সারকথা বলতে নিষেধ করেছেন। পরবর্তী শ্লোকসমূহে ভগবান গীতার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন।
য় ইমং(ম্) পরমং(ঙ্) গুহ্যং(ম্), মদ্ভক্তেষ্বভিধাস্যতি
ভক্তিং(ম্) ময়ি পরাং(ঙ্) কৃত্বা, মামেবৈষ্যত্যসংশয়:॥68॥
ভগবান বলেছেন যে তাঁকে পরাভক্তি করে যিনি এই পরম গুহ্যশাস্ত্র (গীতাগ্রন্থ) তাঁর ভক্তদের কাছে ব্যাখ্যা করবেন, সেই ব্যক্তি তাঁকে লাভ করবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অর্থ, মান-সন্মান, যশ আদির জন্য নয় বরং ভগবানের প্রতি যাতে ভক্তির উদ্রেক হয়, ভগবদ-ভাবের মনন হয়,ভক্তিভাবের প্রচার-প্রসার হয়, আলোচনা হয়, শুনে লোকের দুঃখ, জ্বালা, শোকদি দূর হয়, সকলের কল্যাণ হয়— এই উদ্দেশ্য নিয়ে গীতাগ্রন্থের ব্যাখ্যা মানে ভগবানের প্রতি ভক্তি জ্ঞাপন করা এবং তাকেই বলা হয়েছে পরাভক্তি।
যে ব্যক্তির ভগবান এবং তাঁর বচনে পূজ্যভাব থাকে,সন্মানভাবে থাকে, শ্রদ্ধা-বিশ্বাস থাকে এবং শোনার আগ্রহ থাকে, তিনিই ভক্ত। ভগবান বলেছেন যিনি এরূপ ভক্তকে গীতাগ্রন্থের ব্যাখ্যা করবেন , তিনি ভগবানকেই প্রাপ্ত হবেন।
ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু, কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ
ভবিতা ন চ মে তস্মাদ্ ,অন্যঃ(ফ্) প্রিয়তরো ভুবি॥69॥
ভগবান আরও বলেছেন যে সেই ব্যক্তি যিনি গীতাগ্রন্থ ভক্তদের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন, মনুষ্যমধ্যে তাঁর সমান অধিক প্রিয় কার্যকরী আর কেউ নেই এবং এই পৃথিবীতে সেই ব্যক্তির থেকে প্রিয় তাঁর আর কেউ হবেও না । এর তাৎপর্য হল যে গীতা প্রচার করায় সেই ব্যক্তির নিজের কোনো স্বার্থ থাকে না, মান-মর্যাদা,সন্মান-শ্রদ্ধা ইত্যাদির কোন আকাঙ্ক্ষা থাকে না; শুধুমাত্র ভগবদপ্রীত্যার্থে গীতার ভাব প্রচার করেন।তাই তিনি ভগবানের অত্যন্ত প্রিয় কর্মকারী।
অধ্যেষ্যতে চ য় ইমং(ন্),ধর্ম্যং(ম্) সংবাদমাবয়ো:
জ্ঞানয়জ্ঞেন তেনাহম্, ইষ্ট:(স্) স্যামিতি মে মতিঃ॥70॥
যে ব্যক্তির গীতা প্রচার করার কোন যোগ্যতা নেই, তার কি করা উচিত? ভগবান তাই বলছেন– “যে ব্যক্তি আমাদের উভয়ের এই ধর্মসংবাদ (গীতাশাস্ত্র ) অধ্যয়ন করেন, তার দ্বারা আমি জ্ঞানযজ্ঞের সাহায্যে পূজিত হলাম— আমি তাই মনে করবো।”
যজ্ঞ দুপ্রকারের হয়— জ্ঞানযজ্ঞ এবং দ্রব্যযজ্ঞ। যে যজ্ঞ পদার্থাদি এবং ক্রিয়াদির প্রাধান্যে করা হয়, তাকে বলা হয় দ্রব্যযজ্ঞ ; আর ব্যাকুলতার জন্য,নিজ প্রয়োজনীয় বাস্তবিকতা জানার জন্য যে প্রশ্ন করা হয়, বিজ্ঞ পন্ডিতগণ তার সমাধান করেন, তার উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয়, চিন্তা অনুসারে নিজ বাস্তবিক স্থিতি অনুভব করা হয় এবং প্রকৃত তত্ত্ব জেনে জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ হওয়া যায়, একেই বলা হয় জ্ঞানযজ্ঞ। এখানে ভগবান অর্জুনকে বলেছেন,”তোমার-আমার সংবাদ অর্থাৎ কথোপকথন যদি কেউ পাঠ করে তাহলে আমি তার দ্বারা জ্ঞানযজ্ঞের সাহায্যে পূজিত হবো। এর কারণ হল এই যে যখন কোন ভক্তকে যদি কেউ ভগবানের কথা শোনায়, তাহলে ভক্ত অত্যন্ত প্রসন্ন হন; তেমনই যদি কেউ গীতাপাঠ করেন বা অভ্যাস করেন তাহলে ভগবান অতি প্রসন্ন হন আর সেই পাঠ , অভ্যাস ইত্যাদিকে জ্ঞানযজ্ঞ মনে করে তার দ্বারা তিনি পূজিত হন। কারণ পাঠ ,অভ্যাস ইত্যাদি যিনি করেন, তাঁর হৃদয়ে তাঁর ভাব অনুসারে ভগবানের নিত্যজ্ঞান বিশেষভাবে স্ফূরিত হতে থাকে।
শ্রদ্ধাবাননসূয়শ্চ, শৃণুয়াদপি য়ো নরঃ
সোऽপি মুক্তঃ(শ্) শুভাঁল্লোকান্ প্রাপ্নুয়াত্পুণ্যকর্মণাম্॥71॥
যে ব্যক্তি গীতার প্রচার এবং অধ্যয়ন উভয়ই করতে অসক্ষম, সে কি করবে? এই শ্লোকে ভগবান তারই উপায় উল্লেখ করে বলছেন—”যিনি শ্রদ্ধাবান ও দোষবর্জিত হয়ে এই গীতাগ্রন্থ শ্রবণও করেন, তিনি সম্পূর্ণ পাপবিমুক্ত হয়ে পুণ্যবান ব্যক্তিদের প্রাপ্য শুভলোক প্রাপ্ত হন।”
গীতার কথাকে যেমন শ্রবণ করবে, তাকে প্রত্যক্ষ্যের চেয়েও বেশি বাস্তব মনে করে পূজ্যভাবে সেইরূপ যে মান্য করে, তাকে বলা হয় 'শ্রদ্ধাবান' এবং সেই বিষয়ে যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করে না ,তাকে বলা হয় ‘অনসূয়’ অর্থাৎ পাপবর্জিত। ভগবান বলেছেন যে এরূপ শ্রদ্ধাযুক্ত এবং দোষদৃষ্টিবর্জিত ব্যক্তি যদি শুধুমাত্র গীতা শ্রবণ করেন, তাহলেও তিনি সর্বপাপ থেকে মুক্ত হয়ে পুণ্যার্থীদের শুভলোক প্রাপ্ত হন।
কচ্চিদেতচ্ছ্রুতং (ম্) পার্থ, ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা
কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ(ফ্), প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়॥72॥
আগের শ্লোকে গীতা শ্রবণের মাহাত্ম্য জানিয়ে ভগবান সকলের কাছে ভগবদ্গীতা শ্রবণের মাহাত্ম্য প্রকট করার উদ্দেশ্যে অর্জুনকে প্রশ্ন করেছেন— “হে পৃথানন্দন! তুমি একাগ্রচিত্তে এটি শ্রবণ করেছো তো ? এবং হে ধনঞ্জয়! তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ নাশ হয়েছে তো?”
গীতার প্রচার বা অধ্যয়ন নিয়ে অর্জুনের কিছু করার ছিল না কারণ অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে মোহগ্রস্থ হয়েছিলেন। তাই পূর্ববর্তী শ্লোকে ভগবান বলেছিলেন যে যিনি শ্রদ্ধাবান ও দোষবর্জিত হয়ে এই গীতাগ্রন্থ শ্রবণও করেন, তিনি সম্পূর্ণ পাপবিমুক্ত হবেন। এই কথা অর্জুন একাগ্রচিত্তে শুনেছেন কিনা সেটি জানার জন্য তিনি অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করেছেন কারণ ভগবান জানতেন গীতা একাগ্রচিত্তে শ্রবণ করলে মোহ নাশ হয়। তাই অর্জুন যদি একাগ্রচিত্তে ভগবানের উপদেশ শ্রবণ করেছেন তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর মোহ নাশ হয়েছে।
অর্জুন উবাচ
নষ্টো মোহঃ(স্) স্মৃতির্লব্ধা, ত্বত্প্রসাদান্ময়াচ্যুত
স্থিতোऽস্মি গতসন্দেহঃ(খ্),করিষ্যে বচনং(ন্) তব॥73॥
ভগবানের প্রশ্নের উত্তরে অর্জুন বললেন—” হে অচ্যুত! আপনার কৃপায় আমার মোহ দূরীভূত হয়েছে এবং আমি আমার স্মৃতি ফিরে পেয়েছি। আমি নিঃসংশয় হয়ে স্থির হয়েছি। এখন আপনার নির্দেশ পালন করবো।”
ভগবানকে অর্জুন এখানে ‘অচ্যুত’ নামে সম্বোধন করেছেন। জীব চ্যুত হয়ে যায় অর্থাৎ স্বরূপ থেকে বিমুখ হয়ে থাকে ও পতনের দিকে অগ্রসর হয়; কিন্তু ভগবান কখনও চ্যুত হন না।তিনি সর্বদা একরস হয়ে থাকেন। সেইজন্য অর্জুন ভগবানকে এই নামে সম্বোধন করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জুন ‘শিষ্যস্তেহহং সাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম’(২.৭) কথাটি বলে ভগবানের শরণাগতি স্বীকার করেছিলেন। এই শ্লোকে সেই শরণাগতির পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। অর্জুন এখন তাঁর মনের লাগামও ভগবানের হাতে সমর্পন করে দিয়েছেন।
অব সৌপ দিয়ে ইস জীবন কা
সব ভার তুম্হারে হাথো মে
হেই জীত তুম্হারে হাথো মে,
ঔর হার তুম্হারে হাথো মে।
অর্থাৎ অর্জুন তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ ভার ভগবানের হাতে অর্পণ করেছেন। তাই যুদ্ধে হার ও জীত –দুটোই ভগবানের হাতে। অর্জুন ভগবানকে বলছেন যে ভগবান যা নির্দেশ দেবেন তিনি তাই মেনে নেবেন।
এগার অধ্যায়ের শুরুতে অর্জুন বলেছিলেন —’মোহোऽয়ং বিগতো মম’ অর্থাৎ ‘আমার মোহ দূর হয়েছে’। কিন্তু ভগবানের বিরাটরূপ দর্শন করে অর্জুনের হৃদয়ে যখন চাঞ্চ্যলের সৃষ্টি হয়, তখন ভগবান বলেছিলেন –’মা তে ব্যাথ্যা মা চ বিমূঢ়ভাবঃ’ অর্থাৎ ‘তুমি ব্যথিত ও মোহগ্রস্থ হয়ো না।’ তার মানে এই যে সর্বজ্ঞ ভগবান জানতেন যে সেইসময় অর্জুনের মোহ দূর হয় নি। এখন এইস্থানে ভগবানের প্রশ্নের উত্তরে অর্জুন বলেছেন যে তাঁর মোহো নাশ হয়েছে এবং তিনি স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন– ‘নষ্টো মোহ স্মৃতির্লব্ধা’।
অসৎ সংসারকে গুরুত্ব এবং অস্তিত্ব প্রদান করলে পরমাত্মতত্ত্বে বিস্মৃতি অর্থাৎ ভ্রম আসে। অনাদিকাল থেকে এই বিস্মৃতি বিত্তমান। কিন্তু এর অন্ত হওয়া সম্ভব। যখন এর অন্ত হয় এবং নিজ স্বরূপে স্মৃতি জাগৃতি হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘স্মৃতির্লব্ধা’ অর্থ্যাৎ অসতের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় যে স্মৃতি সুষুপ্ত ছিল তা জাগ্রত হয়ে যায়।
অধর্মের নাশ করে ধর্মস্থাপনের জন্য এই ভারতভূমিতে অবতাররূপে ভগবান বারংবার প্রকট হয়েছেন এবং পরমতত্ত্বজ্ঞান বার-বার প্রদান করেছেন। চতুর্থ অধ্যায়ে ভগবান স্বয়ং বলেছেন:
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম
বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেSব্রবীত্||৪.১।।
এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ ।।৪.২।।
অর্থ হল যে ভগবান এই অবিনাশী যোগ সূর্যকে বলেছিলেন, সূর্য তাঁর পুত্র মনুকে এবং মনু তাঁর পুত্র ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন। এইরূপে পরম্পরাপ্রাপ্ত এই যোগ রাজর্ষিগণের প্রাপ্ত হয়েছিল।কিন্তু দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়ায় মনুষ্যলোকে এই যোগ লুপ্তপ্রায় হয়েছে। ভগবানের মুখনিঃসৃত এই অভিব্যক্তি এটাই ইঙ্গিত করে যে তিনি পূর্বেও প্রকট হয়েছেন।
সঞ্জয় উবাচ
ইত্যহং(ম্) বাসুদেবস্য, পার্থস্য চ মহাত্মনঃ
সংবাদমিমমশ্রৌষম্ ,অদ্ভুতং(ম্) রোমহর্ষণম্॥74॥
প্রথম অধ্যায়ের কুড়িতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদরূপে গীতা আরম্ভ হয়েছিল। এই শ্লোকে সঞ্জয় তার সমাপ্তি জানিয়ে এই পরম মূল্যবান সংবাদের মহিমা ব্যক্ত করা শুরু করে বলছেন– “এইরূপে আমি ভগবান বাসুদেব ও মহাত্মা অর্জুনের এই রোমাঞ্চকর অদ্ভুত কথোপকথন শ্রবণ করেছি।”
অর্জুনকে ‘মহাত্মনঃ’ বিশেষণে ভূষিত করার অর্থ হল যে অর্জুন অতি বিশিষ্ট এক পুরুষ, স্বয়ং ভগবান যুদ্ধক্ষেত্রে যার নির্দেশ পালন করেছিলেন।
গীতায় ‘মহাত্মা’ শব্দটি ভক্তদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে সঞ্জয় অর্জুনকে মহাত্মা বলেছেন কারণ তিনি অর্জুনকে ভগবানের পরম ভক্ত বলেই জেনেছিলেন। ভগবানও অর্জুনকে তাঁর ভক্ত বলেছেন ।।৪.৩।।
সত্যিকার সাধক পারমার্থিক পথে যাঁর দ্বারা লাভবান হন, তাঁর প্রতি সদাই কৃতজ্ঞ থাকেন। তাই সঞ্জয়ও পরবর্তী তিনটি শ্লোকে শ্রীব্যাদব্যাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
ব্যাসপ্রসাদাচ্ছ্রুতবান্, এতদ্ গুহ্যমহং(ম্) পরম্
য়োগং(ম্) য়োগেশ্বরাত্কৃষ্ণাত্, সাক্ষাত্কথয়তঃ(স্) স্বয়ম্॥75॥
সঞ্জয় বলেছেন– ”শ্রীব্যাদব্যসের কৃপায় দিব্যদৃষ্টি লাভ করে আমি স্বয়ং এই পরম গুহ্য যোগের কথা সাক্ষাৎ যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শ্রবণ করেছি।”
অর্জুন ভগবানের কৃপায় দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন আর সঞ্জয় দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছিলেন মহর্ষি ব্যাসদেবের কৃপায়। সঞ্জয়ের হর্ষোৎফুল্ল হওয়ার কারণ এই যে তিনি গীতার উপদেশ পরম্পরায় শোনেন নি, সমস্ত যোগের মহেশ্বর সাক্ষাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শ্রবণ করেছেন।
রাজন্সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য, সংবাদমিমমদ্ভুতম্
কেশবার্জুনয়ো:(ফ্) পুণ্যং(ম্), হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ॥76॥
সঞ্জয় মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন–” হে রাজন ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের এই পবিত্র ও অদ্ভুত কথোপকথন স্মরণ করে আমি বারংবার হর্ষান্বিত হয়ে উঠছি।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুনের কথোপকথনে যে তত্ত্ব রয়েছে তা পূর্বে কোনো গ্রন্থ বা মহাপুরুষের বাণী থেকে শোনা যায়নি। ভগবান ও তাঁর ভক্তের এ এক অত্যন্ত বৈশিষ্টপূর্ণ সংবাদ। এই কথোপকথনে যুদ্ধের মতো ভীষণ কর্মের দ্বারাও কল্যাণ লাভের কথা বলা হয়েছে। সঞ্জয়ের আনন্দিত হওয়ার কারণ ছিল এই যে, এই বিশিষ্ট ও অলৌকিক আলোচনা এটিই শিক্ষা দেয় যে মানুষমাত্রেই সব পরিস্থিতিতে নিজের উদ্ধার করা সম্ভব। এইরূপ উৎকট অভিলাষসম্পন্ন অর্জুন এবং অলৌকিক অটল যোগেস্থিত ভগবানের কথোপকথনের মহিমা বর্ণনা করাতে কেউই সক্ষম নয়। শুধু কথোপকথনেই যদি এই বৈশিষ্টতা থাকে, তাহলে সেই অনুযায়ী আচার-আচরণ করার মাহাত্ম্যের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শ্রদ্ধেয় গোবিন্দদেব গিরিজী মহারাজ তাই বলেছেন,”গীতা পড়ুন, পড়ান এবং নিজের আচরণে আনুন।”
তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য,রূপমত্যদ্ভুতং(ম্) হরেঃ
বিস্ময়ো মে মহান্ রাজন্ , হৃষ্যামি চ পুনঃ(ফ্) পুনঃ॥77॥
সঞ্জয় বলছেন “ হে রাজন! ভগবান শ্রীহরির সেই অতি অদ্ভুত বিরাটরূপ বারংবার স্মরণ করে আমার অত্যন্ত আশ্চর্য বোধ হচ্ছে এবং আমি বারংবার হর্ষান্বিত হয়ে উঠছি।”
সঞ্জয় ইতিপূর্বে তাঁর শাস্ত্রজ্ঞান দ্বারা ভগবান সম্পর্কে জেনেছিলেন, তারপর ভগবান ও অর্জুনের অত্যদ্ভুত কথোপকথন শ্রবণ করেছিলেন এবং ভগবানের অতি বিচিত্র বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন। তাৎপর্য হলো যে, শাস্ত্রের থেকেও শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথন অত্যন্ত বিশিষ্ট এবং কথোপকথনের থেকেও বিরাটরূপ আরো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। তাই সঞ্জয় এই কথোপকথনকে অদ্ভুত বা বৈশিষ্টপূর্ণ বলেছেন—’সংবাদমিমমদ্ভুতং’ (১৮.৭৬) এবং এখানে বিরাটরূপকে অত্যন্ত অদ্ভুত বলেছেন ‘রূপমত্যদ্ভুতম’।
য়ত্র য়োগেশ্বরঃ(খ্) কৃষ্ণো, য়ত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতি:(র্), ধ্রুবানীতির্মতির্মম॥78॥
ভগবদ্গীতার অন্তিম শ্লোকে সঞ্জয় নিজের অভিমত প্রকাশ করে বলছেন—” যেখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং গান্ডীব ধনুর্ধারী অর্জুন আছেন; সেখানেই শ্রী, বিজয়, বিভূতি ও অচল নীতি বিদ্যমান–-এটি হল আমার অভিমত।”
পরোক্ষভাবে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন যে পাণ্ডবদের সাথে যেহেতু সমস্ত যোগের মহেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আছেন এবং সাথে ভগবানের প্রিয় সখা ও ভক্ত গাণ্ডীবধারী অর্জুন আছেন, তাই এই যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় সুনিশ্চিত অর্থাৎ কৌরবদের হার অবশ্যম্ভাবী।
গীতার প্রারম্ভেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর পুত্রগণ এবং পাণ্ডপুত্রদের কথা জানতে চেয়েছিলেন।
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুয়ুৎসবঃ
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ।।১.১।।
গীতার অন্তিম শ্লোকে সঞ্জয় সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম।।১৮.৭৮।।
ধর্ম শব্দ দিয়ে গীতার শুভারম্ভ এবং মম হচ্ছে গীতার অন্তিম শব্দ। এর মাঝে ভগবান সাতশো শ্লোক বলেছেন যেগুলো ধর্মময়।অর্জুন,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং সঞ্জয়ের এই বিলক্ষণ সংবাদের এখানেই সমাপ্তি। আমাদের হৃদয়ে এই ধর্মময় উপদেশাবলী দীপাবলীর দীপের ন্যায় সদাই প্রজ্জ্বলিত হয়ে থাকুক, এই শুভকামনা নিয়ে গীতার অন্তিম অধ্যায়ের অন্তিম বিবেচন সত্র সম্পন্ন হল। শ্রীহরির চরণে সমস্ত কিছু অর্পণ করার পর আজকের প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়।
::প্রশ্নোত্তর সত্র::
প্রশ্নকর্তা : উমেশ দাদা
প্রশ্ন: (১) গীতার আঠারোটি অধ্যায় কণ্ঠস্থীকরণের পর আমাদের জীবনে আমরা কি শিক্ষা প্রাপ্ত করতে পারি?
উত্তর: ভগবদ্গীতা পরাক্রমের গ্রন্থ। গীতায় কর্মযোগের সাথে সাথে ভক্তির উপদেশ দিয়েছে। যম, নিয়ম, প্রাণায়ামের নিত্য অভ্যাস করা উচিত। গীতা পথ ও পারায়ণের যে নিয়ম আছে তা শ্রদ্ধা সহকারে পালন করা উচিত। ঘড়ির কাঁটার মত আমাদের জীবন অবিরাম চলছে। একটি কথা খেয়াল রাখতে হবে যে ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস যেন সর্বদা অটুট থাকে। নিরন্তর গীতা পাঠে মনের সরলতা বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত গীতা পাঠ করলে অজান্তেই আমাদের আচরণে তার প্রভাব পড়ে এবং আমাদের জীবন পূর্ণত্ব লাভ করে। ইহলোক এবং পরলোকে পুণ্য প্রদান করার গ্রন্থ এই ভগবদ্গীতা।
প্রশ্ন: (২) গীতা কণ্ঠস্থিকরণের সহজ উপায় কী ?
উত্তর: সঙ্কল্প দৃঢ় হলে এক-দুই বছরে সম্পূর্ণ গীতা কণ্ঠস্থীকরণ হয়ে যায়। গীতা পাঠের সাথে সাথে শোনারও অনেক মাহাত্ম্য আছে। শ্রদ্ধেয়া সুবর্ণা কাকীজীর অডিওর সাহায্য নিতে পারেন। একই সাথে নিজের কণ্ঠে গীতাপাঠের অডিও বানিয়ে শুনলেও অনেক লাভ হয়। দৃঢ়-নিশ্চয়তাই মূল মন্ত্র।
প্রশ্নকর্তা: নানকচাঁদ গর্গ দাদা।
প্রশ্ন: অষ্টাদশ অধ্যায়ে অর্জুন বলেছেন যে ভগবানের কৃপায় তাঁর মোহ দূরীভূত হয়েছে এবং তিনি স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন।।১৮.৭৩।। কিন্তু পুত্র অভিমন্যুর বীরগতি প্রাপ্ত হবার পর তিনি তাহলে কেন মোহগ্রস্থ হয়েছিলেন?
উত্তর: অর্জুনের সেটি ক্ষণিকের আবেগ ছিল। কোনো ঘরে কারও প্রিয়জনের বিয়োগে কেউ কেউ দীর্ঘ সময় শোকাচ্ছন্ন থাকে।কিন্তু তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি অতিশীঘ্রই শোকমুক্ত হন কারণ তিনি জানেন যে আত্মা অবিনশ্বর। অর্জুন পরমজ্ঞানী ছিলেন তাই ক্ষনিকের সেই আবেগ কাটিয়ে পুনরায় যুদ্ধ করেছিলেন।
প্রশ্নকর্ত্রী: উষা দিদি
প্রশ্ন: ধ্যান করার সময় মনের চঞ্চলতা রোধ করার উপায় কি?
উত্তর: অভ্যাসের দ্বারাই মনের একাগ্রতা আসে। ভগবানও স্বীকার করেছেন যে কলিযুগে মানুষের মন অত্যন্ত চঞ্চল এবং এটি দূর করার একমাত্র সাধন নিয়মিত অভ্যাস।
প্রশ্নকর্ত্রী: নমিতা দিদি।
প্রশ্ন: গুরু দ্রোণাচার্য গুরুদক্ষিণা হিসাবে একলব্যের থেকে কেন তাঁর আঙ্গুল চেয়েছিলেন?
উত্তর: এই কথাটি সত্যি নয় কারণ মূল মহাভারতে একলব্যের থেকে আঙ্গুল চাইবার কোনো প্রসঙ্গ নেই। এটি উল্লেখ আছে যে দ্রোণাচার্য একলব্যের থেকে গুরুদক্ষিণা হিসাবে এই বচন চেয়েছিলেন যে তাঁর শিষ্যদের অর্থাৎ কৌরব ও পাণ্ডবদের পক্ষে বা বিপক্ষে একলব্য কোনোদিন অস্ত্র ধারণ করবেন না। একলব্যের মত একজন নিপুণ ধনুর্ধারীর কাছে এটি নিজের আঙ্গুল হারাবার সমতুল্য হয়ত ছিল এবং সেজন্য ধীরে ধীরে এটি প্রচলিত হয়েছে যে গুরুদক্ষিণা হিসেবে দ্রোণাচার্য একলব্যের আঙ্গুল চেয়েছিলেন।