विवेचन सारांश
।। ব্রহ্ম জ্ঞানের জিজ্ঞাসা।।

ID: 4176
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 23 ডিসেম্বর 2023
অধ্যায় 8: অক্ষরব্রহ্মযোগ
1/3 (শ্লোক 1-7)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ ড: আশু গোয়েল মহাশয়


ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে প্রণাম জানিয়ে, হনুমান চালিসা পাঠ ও দীপ প্রজ্জ্বলনের সাথে আজকের বিবেচন সত্র আরম্ভ হলো।
  ভগবানের অত্যন্ত কৃপায় আমরা আমাদের জীবন সার্থক করে তুলতে, এই মানব- জীবন কে কল্যাণময় করে তোলার জন্য এই পুণ্যময় শ্রীমদভগবদগীতায় প্রবৃত্ত হতে পেরেছি। জানি না, এই পুণ্য এই জন্মের না কি পূর্ব জন্মের সুকৃতি.. যে আমরা গীতা পাঠ করা শিক্ষা শুরু করেছি ।

    অষ্টম অধ্যায় খুব জটিল অধ্যায়। বিবেচকের নিজের অনুভব এই যে --- অনেক বছর ধরে এই অধ্যায় বোঝা সম্ভব হয়নি। যখনই গীতা পাঠ করতে হতো বা তার মর্মার্থ বুঝতে গেলে কোনরকমে এই অধ্যায় টা পার করে দিতে পারলে হয়... এমন মনে হতো । যতদিন না স্বামীজী'র ব্যাখ্যা শুনেছি, ততদিন এই অধ্যায় কে দুর্বোধ্য মনে হতো। কিন্তু যখন বুঝলাম এই অধ্যায়ের গূঢ় জ্ঞান, তখন খুব আনন্দ হলো । এই অধ্যায়ের চিন্তন একটু কঠিন লাগতে পারে -- কিন্তু এর গভীর অর্থ বুঝে নিলে অত্যন্ত আনন্দ হবে ।

  সপ্তম অধ্যায়ে শ্রী ভগবান জ্ঞান বিজ্ঞানের উপদেশ আরম্ভ করেছেন এবং ত্রিশতম শ্লোকে কিছু অনন্য, নতুন শব্দ বলেছেন ----

সাধিভূতাধিদৈবং মাং সাধিযজ্ঞঞ্চ যে বিদুঃ ।
প্রয়াণকালেऽপি চ মাং তে বিদুর্যুক্তচেতসঃ ।।৭.৩০।। 

8.1

অর্জুন উবাচ

কিং(ন্) তদ্ব্রহ্ম কিমধ্য়াত্মং(ঙ্),কিং(ঙ্) কর্ম পুরুষোত্তম
অধিভূতং(ঞ্) চ কিং(ম্) প্রোক্তং(ম্), অধিদৈবং(ঙ্) কিমুচ্য়তে॥1॥

ধৃতরাষ্ট্র বললেন- হে সঞ্জয়! ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের ইচ্ছায় সমবেত আমার এবং পাণ্ডুর পুত্রগণ কি করল?

অর্জুন নিজের সন্দেহ দূর করার জন্য অধ্যায়ের প্রথম দুই শ্লোকে সাতটি প্রশ্ন করেছেন । অর্জুন বললেন - হে পুরুষোত্তম। ব্রহ্ম কি? অধ্যাত্ম কি? কর্ম কাকে বলে ? অভিভূত নামে কি বলা হয়েছে? অধিদৈবই বা কি ?

প্রশ্নগুলো এইরকম --
১) কিং(ন্) তদব্রহ্ম ? - ব্রহ্ম কি ?

২) কিমধ্যাত্ম? - অধ্যাত্ম কি ?

৩) কিং ( ঙ্) কর্ম? - কর্ম কি?

৪) কিং ( ঙ্)অধিভূত (ঞ্) চ?- অধিভূত কি?

৫) কিং(ঙ্) অধিদৈব? - অধিদৈব কে?

৬) কিং(ঙ্) অধিযজ্ঞ? - অধিযজ্ঞ কাকে বলে?

এই ছয়টি প্রশ্নের পরে দ্বিতীয় শ্লোকে অর্জুন অন্তিম প্রশ্ন করেছেন ----
৭) প্রয়াণকালে চ কথং ( ঞ্)....

8.2

অধিয়জ্ঞঃ(খ্)কথং(ঙ্)কোsত্র, দেহেs স্মিন্মধুসূদন
প্রয়াণকালে চ কথং( ঞ্),জ্ঞেয়োsসি নিয়তাত্মভিঃ॥2॥

এখানে অধিযজ্ঞ কী এবং এই দেহে কীভাবে অবস্থিত ? হে মধুসূদন ! সংযতচিত্ত ব্যক্তি মৃত্যুকালে আপনাকে কী করে জানতে পারেন ?

অন্তিমকালে সমাহিত চিত্তে মানুষ কিভাবে আপনাকে জানতে পারবে? -- এ অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শ্রী ভগবান ছয়টি প্রশ্নের উত্তর দুটি শ্লোকে সমাপ্ত করে দিয়েছেন, কিন্তু সপ্তম প্রশ্নের উত্তর এই অধ্যায়ের বাকি অংশ জুড়ে দিয়েছেন । সপ্তম প্রশ্নের উত্তরে শ্রীভগবান সগুণ, নির্গুণ সকল প্রকার যোগের যে মার্গ -- এবং তার যে রহস্য সবই বলেছেন । প্রশ্ন শুনে ভগবান বুঝতে পেরেছেন যে অর্জুন খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছেন -- তাই ভগবান প্রসন্ন চিত্তে উত্তর দিতে লাগলেন ।

  অর্জুনের সমস্ত শঙ্কার সমাধান ভগবানের কাছে আছে। ভগবান যে সমাধান দেবেন তা দিব্য, অলৌকিক এবং কিছুটা কঠিন ও। সোজাসুজি এর অর্থ পড়ে দিলে সাধারণ মানুষের তা বোধগম্য না হতে পারে। সাধু সন্তদের কাছে না শুনলে এ বোঝা অসম্ভব।

8.3

শ্রীভগবানুবাচ

অক্ষরং(ম্) ব্রহ্ম পরমং(ম্), স্বভাবোsধ্য়াত্মমুচ্য়তে
ভূতভাবোদ্ভবকরো, বিসর্গঃ(খ্) কর্মসংজ্ঞিতঃ॥3॥

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন - পরম অক্ষর হল ‘ব্রহ্ম’। নিজ স্বরূপ অর্থাৎ জীবাত্মাকে বলা হয় ‘অধ্যাত্ম’ এবং ভূতগণের উদ্ভবকারী যে ত্যাগ তাকে বলা হয় ‘কর্ম’।

শ্রী ভগবান অর্জুনকে বলেছেন -- যিনি পরম অক্ষর -- তিনিই ব্রহ্ম। এরপর ভগবান বোঝালেন -- পরম অক্ষর যদি ব্রহ্ম হয়, তাহলে অক্ষর কি?

    শ্রী ভগবান বললেন -- ক্ষর এবং অক্ষর এই দুটি কথা আছে। ক্ষর -- মানে, যা ঘটছে বা যার নাশ আছে। পদার্থের সর্বদা ক্ষয় হতে থাকে। এবং, অক্ষর -- যা অবিনাশী, যা কখনো নষ্ট হয় না তথা কোন কালেও যার পরিবর্তন হয় না। আমাদের শরীর যেমন কখনো একরকম থাকে না। পুরুষ মানুষের তো প্রতি দুই বা তিন দিনে দাড়ি বেরিয়ে আসতে দেখা যায় -- কিন্তু, তার গ্রোথ তো প্রতিক্ষণই চলছে। শক্তিশালী ক্যামেরা দ্বারা নিরীক্ষণ করা সম্ভব। এইভাবে, সংসারে যা কিছু ঘটতে দেখা যায় তা হলো ক্ষর। এই ক্ষরের তিনটি অবস্থা -- উৎপত্তি, স্থিতি এবং লয়।

    তাহলে অক্ষর কি ? যা পূর্বে যেরকম ছিল, বর্তমানে তেমনি আছে এবং ভবিষ্যতেও এমন থাকবে --- অর্থাৎ, কালাতীত। কালের প্রভাব এর উপর পড়ে না ।

    উপনিষদের লেখকেরা কিছু উদাহরণ দিয়েছেন -- ব্রহ্মের মধ্যে ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু নেই। তাঁরা বলেছেন.. সমুদ্রের ঢেউ থেকে যদি সমুদ্র কে তুলে নেওয়া হয় তাহলে কি থাকবে? সমুদ্র বিনা তার ঢেউয়ের অস্তিত্ব নেই।
দ্বিতীয় উদাহরণ বলেছেন... গহনার থেকে যদি সোনা তুলে নেওয়া হয় তাহলে কি পড়ে থাকবে ? কিছুই থাকবে না ।
তৃতীয় উদাহরণস্বরূপ মাটির বাসনের কথা বলা হয়েছে। যদি মাটি সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে কি বাসনের অস্তিত্ব থাকবে ? কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না ।
শেষে বলেছেন -- একইভাবে যদি শরীর থেকে ব্রহ্ম কে সরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে শরীর ও অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে । মৃত শরীর পড়ে থাকবে ।

    আমরা শরীরের কত সেবা করি -- সুস্থ , সুগঠিত রাখতে বা সুন্দর দেখাতে আমরা কত টাকা খরচ করি... কিন্তু যখন শরীরের মৃত্যু হয় -- দেখতে একই লাগে, কিন্তু চেতনার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়... তখনই সেই মৃত শরীর কে অগ্নিতে দাহ করার জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যত প্রিয় ব্যক্তিই হোক না কেন -- সেই মৃত শরীর কেউই রাখতে চায় না। ( আমি -- ব্রহ্ম =০) শরীরের মূল্য ততক্ষণ, যতক্ষণ তার মধ্যে ব্রহ্মের অবস্থান। এভাবে যদি পুরো সংসার থেকে ব্রহ্ম কে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় তবে শূন্য ই শূন্য হয়ে যাবে । ব্রহ্মতে ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু নেই ।

বালকাণ্ডে গোস্বামী তুলসীদাস জী ব্রহ্মের সুন্দর বর্ণনা করেছেন --- সুন্দর এক চৌপাই তে ---

बिनु पग चले सुनइ बिनु काना। कर बिनु कर्म करइ विधि नाना।।
आनन रहित सकल रस भोगी। बिनु बानी बकता बड़ जोगी।।

तन बिनु परम नयन बिनु देखा | ग्रहइ घ्रान बिनु बास असेषा||
असि सब भाँति अलौकिक करनी | महिमा जासु जाइ नहिँ बरनी||

  সেই ব্রহ্মের কর্ম সর্বপ্রকারেই অলৌকিক। ব্রহ্ম পা ছাড়াই চলেন, কান ছাড়াই শোনেন, হাত ছাড়াই নানাবিধ কার্য করেন, জিভ ছাড়া সমস্ত আস্বাদন করেন এবং কথা না বলেও অনন্য বক্তা। সুতরাং, ব্রহ্মের কর্ম সর্বভাবেই অলৌকিক -- যার মহিমা অবর্ণনীয়। এ হলো বিভাবনা অলংকার( বিভাবনা মানে বিশেষ কল্পনা) যেখানে কোন কারণ ছাড়াই কার্য সম্পূর্ণ হয়ে যায়। ( সামান্য কোন কার্যের জন্যও যেখানে কারণ অনিবার্য।) ব্রহ্মের চিন্তন করাতে কার্য ও কারণ এক হয়ে যায়। বিনা কারণে কার্য সম্পন্ন হয় এটা প্রমাণ করা অসম্ভব। তিন লোক মিলেও এটা প্রমাণ করা যাবে না -- কারণ, "অক্ষর " কে কখনও প্রমাণ করা যায় না। এ অচিন্ত্য তথা অপ্রমেয়।

    আমাদের বুদ্ধি জড় । জড় দিয়ে চেতনের অধ্যয়ন, চিন্তন করা বা তাকে জানা সম্ভব নয়। আমরা তো সেই অনন্ত গ্যালাক্সির সম্পর্কে শুনেছি বা পড়েছি। যতটাই বলা হোক না কেন, যতটা জানি বলে মনে করি না কেন, তা সীমিত। যত বেশি বুদ্ধির মানুষই হোক বা যত চেষ্টাই করুক -- অনন্তের বর্ণনা করতে পারবে না। কারণ হলো সীমিত বুদ্ধি। আমাদের বুদ্ধি জড়তত্ত্ব দ্বারা নির্মিত। জড়তত্ত্ব দিয়ে চেতন তত্ত্বের সীমাহীনতা বোঝা অসম্ভব। অসীমতা কে কল্পনা করা যায়, কিন্তু দেখা যায় না -- ইন্দ্রিয় দ্বারা তা বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়াতীত। বুদ্ধি দ্বারাও তা বোঝা যায় না। মন, বুদ্ধি , চিত্তের বাইরে গিয়ে পরমাত্মা তত্ত্বের অনুভূতি ও সিদ্ধি লাভ করতে যোগীরাই পারেন ।

    ভগবান বলেছেন -- এই ব্রহ্মই পরম অক্ষর। এর বিনাশ নেই ।

স্বভাবোऽধ্যাত্মমুচ্যতে: আপন স্বরূপ, অর্থাৎ জীবাত্মা কে অধ্যাত্ম নামে পরিচিত করা হয়। প্রকৃতির যে পরা ভাব তাহাই অধ্যাত্ম। ব্রহ্মর স্বতন্ত্র ভাব হলো জীব। প্রকৃতির দুটি ভাগ -- পরা ও অপরা। যা আমরা দেখতে পাই, জানতে ও কল্পনা করতে পারি তা হলো *অপরা- যেমন - শরীর। কিন্তু, আত্মাকে দেখা যায় না -- তাই তা পরা। যেমন, আমরা টিউব লাইটের আলো দেখি, কিন্তু এর ভিতরে প্রবাহিত বিদ্যুৎ দেখতে পাই না। সেরকমই শরীর কে দেখি, আত্মাকে দেখা যায় না । শরীর জড় এবং আত্মা চেতন।

    স্বভাব -- অর্থাৎ 'স্ব' এর ভাব। মানে, সবকিছুতে আমি থাকা । আবার, সবকিছু তে আমি থাকা egoistic হতে পারে। small 'i' -- ego বোঝায় । আমাদের সূক্ষ্ম শরীর মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহম এই চার নিয়ে তৈরি। এখানে যে অহম তা ego র অহম নয়। দুই অহমে তফাৎ আছে। একটা small i এবং অন্যটা capital I -- যার অর্থ " আমি আছি " -- অর্থাৎ, জীব ভাবের অস্তিত্ব।

  আমরা আমাদের এই শরীর কে ই ' আমি ' ভাবি। কিন্তু এই শরীর সর্বদাই বদলাতে থাকে। পঞ্চাশ বছর পরে যদি ছোটবেলার ছবি দেখি তাহলে হয়তো চেনা ও কঠিন হবে নিজেকে। কারণ, আমি তো সেই একই আছি, কিন্তু শরীর বদলে গেছে অথচ সেই বালকের মধ্যের আমি আর এই বৃদ্ধ বয়সের আমি একই।

    এখানে অধ্যাত্ম শব্দ আসে অধি+ আত্ম থেকে , অর্থাৎ, আত্মতত্ত্বের উপরে যে আচ্ছাদন পড়েছে তা সরিয়ে দিয়ে আত্মতত্ত্ব জ্ঞান প্রাপ্ত করা, নিজেকে জানাই হলো অধ্যাত্ম।

ভূতভাবোদ্ভবকরো : ভূত ভাবের জন্ম দেয় যে অনুভূতি -- তা ত্যাগ করাই হলো কর্ম। যখন সমষ্টি ভাব কে ব্রহ্ম ত্যাগ করে -- সংসার উৎপন্ন হয় । ব্যষ্টি থেকে যখন জীব নিজের ভাব ত্যাগ করে , তখন কর্মের উৎপত্তি হয়।

    সৈন্য বাহিনীর প্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধে যে সৈনিকরা যুদ্ধ করছে -- তাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, যে তোমরা কেন এসব করছ -- নিশ্চিতভাবে তারা বলবে যে আমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এখন লক্ষ্য করার বিষয় হলো যে.. যখন রাষ্ট্রপতি পুতিনের মনে এসেছে ইউক্রেনের উপর হামলা করবো -- তা কিন্তু একটা অনুভূতিই, কর্ম নয়। তিনি মিটিং ডেকে নিজের অনুভূতি জেনারেল কম্যান্ডারকে উৎসর্গ করে দিলেন..৷ জেনারেল কম্যান্ডাররা নিজের অধীনের আধিকারিকদের সেই অনুভূতি উৎসর্গ করলেন --- ততক্ষণ কিন্তু হামলা হয় নি। তারা শুধু নিজেদের ভাবনা ত্যাগ বা উৎসর্গ করেছেন -- এইভাবে বইতে বইতে ব্যাটেলিয়ন কম্যান্ডার অবধি খবর পৌঁছে গেল এবং তারা সৈনিকদের সামনে এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন। উপর থেকে আদেশ এলো যে রাতের মধ্যেই ইউক্রেনে আক্রমণ করতে হবে । কম্যান্ডার রা নিজেদের অভিব্যক্তির ত্যাগ সৈন্য বাহিনীকে দিলেন এবং সেই রাতেই ইউক্রেনে আক্রমণ হলো -- তখনই তা কর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যে কোন কর্মের সৃষ্টি মনের ভিতরে উৎপাদিত অনুভূতির ত্যাগেই হয়।

  আমার মনে জিলিপি খাওয়ার ইচ্ছা হলো, কিন্তু আনলাম না বা খেলাম না... তাহলে কোন কর্ম হলো না । যদি সেই ইচ্ছা ত্যাগ করে অন্যের উপর দিই এবং এনে দিতে বলি তাহলে কর্মের সৃষ্টি হলো । অর্থাৎ, মনের ভাবে নয়, সেই ভাব ত্যাগ করলে কর্ম হয়।

8.4

অধিভূতং(ঙ্) ক্ষরো ভাবঃ(ফ্), পুরুষশ্চাধিদৈবতম্
অধিয়জ্ঞোsহমেবাত্র, দেহে দেহভৃতাং(ম্) বর॥4॥

হে নরশ্রেষ্ঠ অর্জুন! ক্ষর ভাব অর্থাৎ নশ্বর পদার্থকেই অধিভূত বলা হয়, পুরুষ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মাই অধিদৈব এবং এই দেহে অন্তর্যামীরূপে আমিই অধিযজ্ঞ।

শ্রী ভগবান বলেছেন -- উৎপাদিত ও বিনাশশীল সকল পদার্থ অধিভূত।

গোস্বামী জী বলেছেন ---

    गो गोचर जहँ लगि मन जाई। सो सब माया जानेहु भाई॥

 গো, গোচর অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদি যতদূর যেতে পারে বা, কল্পনা করতে পারে --- সে সবই মায়া । সেই সব জীব, সবই ভূত ।
 শ্রীভগবান বলেছেন -- যা উৎপন্ন হয়, আবার বিলীন ও হয় -- সে সবই অধিভূত । অপরা প্রকৃতির যা কিছু -- সবই অধিভূত ।
 
 অর্জুন আরও জিজ্ঞাসা করেছিলেন -- অধিদৈব কি ? ভগবান বললেন -- সকল ইন্দ্রিয়ের যে আলাদা আলাদা দেবদেবী আছেন -- তা হলো অধিদৈব। যেমন - চোখের দেবতা হলেন সূর্য ।
 নাকের দেবী হলেন পৃথিবী। হাতের দেবতা হলেন ইন্দ্র। আমরা হাত দ্বারা যেসব কাজ করি -- তার শক্তি পাই ইন্দ্রদেবের থেকে । পায়ের দেবতা হলেন বিষ্ণু। পা দ্বারা যেখানে যাই, তা শ্রী বিষ্ণুর শক্তিতে । এই কারণেই আমাদের দেশের রীতি পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করা । এই প্রণাম আবেগে নয় -- নারায়ণ কে প্রণাম করা হয়, কারণ তিনি পায়ের দেবতা।নারায়ণের আশীর্বাদ গ্রহণ করে সেই শক্তি মস্তকে ছোঁয়াই। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এই রীতি ।

 পূজনীয় স্বামীজি বলেছেন -- গীতা হলো theoretical science এবং রামায়ণ applied science.. যা কিছু শ্রীভগবান গীতায় বলেছেন, তা রাম জী রূপে মানসে বলেছেন। গীতার বাণী রামজীর জীবনে পাওয়া যায়।

  চৌপাই...

इन्द्रीं द्वार झरोखा नाना। तहँ-तहँ सुर बैठे करि थाना।।
आवत देखहिं बिषय बयारी। ते हठि देही कपाट उघारी।।  

ভাবার্থ :-  ইন্দ্রিয়ের দ্বার হৃদয়রূপী ঘরের অনেক জানালা। এখানে - সেখানে দেবতারা অবস্থান করেন। যখন বিষয়রূপী হাওয়া বয় -- তখনই তারা হাট করে দরজা খুলে দেন। এখানে ইন্দ্রিয়াদির দেবতারা দ্বারে বসে আছেন -- মানে, সেই সেই ইন্দ্রিয়ের উপর তাঁদেরই অধিকার । পরে শ্রীভগবান বলেছেন --- এদের ও প্রভু আমি ই।

শ্রীভগবান বলেছেন -- আমি অর্থাৎ, পরমাত্মা। এখানে ভগবান 'মাম্' বলেছেন। বিষ্ণু হোক, শিব হোক , গনেশ বা নবগ্রহ -- সকল ইষ্টদেবতা ই হলেন অধিযজ্ঞ( যজ্ঞের প্রভু)

পরের শ্লোকে শ্রী ভগবান অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন... অর্জুন কে বলেছেন --- এই শ্লোক টি খুব মন দিয়ে জানলে গীতার সাথে প্রেম হয়ে যাবে এবং গীতার বাণী জীবনে গ্রহণ করার প্রেরণা পাবে ।

8.5

অন্তকালে চ মামেব, স্মরন্মুক্ত্বা কলেবরম্
য়ঃ(ফ্) প্রয়াতি স মদ্ভাবং(ম্), য়াতি নাস্ত্য়ত্র সংশয়ঃ॥5॥

যে ব্যক্তি অন্তকালেও আমাকে স্মরণ করতে করতে দেহ পরিত্যাগ করেন, তিনি আমাকেই প্রাপ্ত হন–এতে কোনো সন্দেহ নেই।

দ্বিতীয় শ্লোকে অর্জুন শেষ প্রশ্ন করেছেন -- অন্তিমকালে আপনি কি প্রকারে স্মরণে আসেন ? ভগবান এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন --- অন্তকালে যে আমার চিন্তা করতে করতে চলে যায় -- সে আমার শাশ্বত ধাম প্রাপ্ত করে।

 "অন্তকালে চ মামেব, স্মরণমুক্ত্বা কলেবরম্" এই কলেবর অর্থাৎ শরীর ত্যাগ করার সময় যে আমায় (ভগবান) স্মরণ করে, সে আমাকে প্রাপ্ত করে । (He comes to me)

  আমরা পুরনো ঘর দেখেছি -- যা মেরামতির অভাবে একদিকে ঝুঁকে যায়। অভিজ্ঞ লোকজন বলেন -- সারিয়ে নাও, নয়তো দেওয়াল ধসে পড়বে। একবার বেঁকে গেলে তা যে ধসে যাবে এটা নিশ্চিত। কিন্তু, এরকম হয় না যে দেওয়াল পূর্ব দিকে হেলে গেছে তা পশ্চিম দিকে ধসে পড়লো । যে দিকে ঝুঁকবে, সে দিকেই পড়বে । অন্তকালেও মানুষের ধেয়ান যেদিকে বেশি থাকবে -- পরবর্তী যোনি প্রাপ্তি সেই অনুসারে হবে ।

  কিছু মানুষ হয়তো ভাববে -- এ তো খুব সহজ ব্যাপার । জীবন ভ'র ইচ্ছেমত রঙ্গ- তামাশা করে নিই এবং অন্তিম সময়ে ঈশ্বরের ভজনা করে নিলেই হবে । কিন্তু, ভগবান বলেছেন -- এমনটা হওয়ার নয়। কেন নয়? এর উত্তর পরের শ্লোকে দিয়েছেন তিনি ----

8.6

য়ং(ম্) য়ং(ম্) বাপি স্মরন্ভাবং(ন্), ত্য়জত্য়ন্তে কলেবরম্
তং(নি) তমেবৈতি কৌন্তেয়, সদা তদ্ভাবভাবিতঃ॥6॥

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন! মানুষ মৃত্যুকালে যে যে ভাব স্মরণ করতে করতে দেহত্যাগ করেন, তিনি সেই (অন্তিম) ভাবে সদা ভাবিত হওয়ায় ওইরূপ গতি প্রাপ্ত হন  অর্থাৎ সে সেই যোনিতে জন্ম নেন৷

হে কৌন্তেয়... মানুষ অন্তকালে যে যে ভাবের স্মরণ করতে করতে শরীর ত্যাগ করে -- সেই সেই ভাবের যোনিতে জন্ম নেয় ।

অন্তকালে ভগবানের ভজনা করলে ভগবান কে পাওয়া যাবে না কেন তাহলে ? কারণ, মানুষ সারাজীবন যে চিন্তায় ব্যাপৃত থাকে, শেষ সময়ে ও সেই চিন্তার বাইরে আসতে পারে না। সেই চিন্তা করতে করতেই জীবন ত্যাগ করে ।

সদা তদ্ভাবভাবিতঃ -- নিরন্তর ভগবদ চিন্তাই অন্তকালীন ভাবের আধার হতে পারে ।

গুরু নানক জী'র শিষ্য বিরোচন জী'র গাথা এক সুন্দর ভজন -

                                                 



য়ং য়ং বাপি স্মরণভাবং -- শ্রী ভগবান বলেছেন -- যার যেমন ভাব থাকে, অন্তকালে তার তেমন মুক্তিই মেলে । যাঁর রূপ স্মরণ করতে করতে প্রাণীগণ চলে যায় -- সে তাকেই প্রাপ্ত করে, এতে কোন সন্দেহ নেই । আমরা যতই চাই না কেন অন্তিমকালে আমাদের ভাব সদ্ভাবে বদলে যাক, কিন্তু তা সম্ভব নয়... সারাজীবন আমরা যে ভাব বয়ে চলি, তাতেই আমরা আসক্ত হয়ে থাকি। জীবনে যার যেমন আসক্তি থাকে -- প্রপার্টির, স্ত্রী -পুত্র - কন্যার বা ব্যবসার -- অন্তিম সময়েও তার মনে এসবের চিন্তাই থাকে ।

  এক ধনবান ব্যক্তির স্ত্রী মৃত্যুশয্যাতেও ছটফট করছিলেন । স্বামী জিজ্ঞাসা করলেন -- তোমার যদি কোনো ইচ্ছা থাকে তাহলে বল... আমি তা দেওয়ার চেষ্টা করবো । স্ত্রী বললেন -- তুমি পারবে না । স্বামীর পীড়াপীড়িতে স্ত্রী বললেন --- আমার আলমারিতে দশহাজার শাড়ী আছে । ছেলের বউ তো বিদেশে থাকে । সে তো শাড়ী পরবে না। অগত্যা এই শাড়ী গুলো আমার দেবরানীর ভোগে ই লাগবে । এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না । আমি শান্তি পাবো না ।

    একবার এক বৃদ্ধ অন্তিম শয্যায় কিছু বলতে চাইছিলেন -- কিন্তু পারছিলেন না। ছেলেরা ভাবলো নিশ্চয়ই বাবা কোন প্রপার্টির কথা বা ফিক্সড ডিপোজিট এর কথা বলবেন । তারা দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের হাতে পায়ে ধরলো, যাতে বাবা আর একবার কথা বলতে পারেন সেই ব্যবস্থা করে দেন। ডাক্তার বললেন একটা খুব দামী ইঞ্জেকশন আছে সেটা দিলে উনি কিছুটা শক্তি পাবেন । ছেলেরা তাতেই রাজি হয়ে গেল । ইঞ্জেকশন দেওয়া হলো । কিছুটা শক্তি সঞ্চারিত হলো বৃদ্ধের মধ্যে । তিনি ছেলেদের বললেন --- তোমরা সবাই এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছ? বাইরে গিয়ে দেখো গোরুতে তো ঝাড়ু টা পুরো খেয়ে ফেলল... এবং তারপর ই তিনি মারা গেলেন ।

  এর দ্বারা আমরা বুঝতে পারছি যে অন্তিমকালে হঠাৎ করে মনের ভাবের বদল হয় না। কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে রামচন্দ্র বালি কে বধ করার পরে বালির মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়ে বসে রইলেন। বালি রামচন্দ্র কে বললেন -- ভগবান, আপনি এটা ঠিক করেন নি ।
হে গোঁসাই ! আমি শত্রু আর সুগ্রীব ভালবাসার লোক ! কোন দোষে আমাকে বধ করলেন ?
রামচন্দ্র: ছোট ভাইয়ের স্ত্রী, পুত্রবধূ, ভগিনী এবং কন্যা -- এরা চারজনই সমান । এদের উপরে কুদৃষ্টি দেয় যে সে পাপী , অত্যাচারী । তাদের বধ করা উচিৎ ।
বালি: হে রাম! আপনি কিন্তু চাতুরীতে আমাকে হারাতে পারবেন না । হে প্রভু ! অন্তিমকালে আপনার শরণ নিয়েছি, আমি এখনো কি করে পাপী রয়েছি ?

  ভগবান দ্বিধান্বিত । বালি যদি পাপ থাকে তাহলে আমি ভগবান কিভাবে ?

  মুনিগন জন্মে জন্মে বহুপ্রকারে সাধনা করেন। তবুও মৃত্যুকালে তাঁদের মুখ থেকে রামনাম নিঃসৃত হয় না। যাঁর নামের শক্তিতে কাশীতে শংকর ভগবান সবাইকে সমানরূপে অবিনাশীনি মুক্তি দেন। বালি বললেন -- আমার প্রাণ চাই না। স্বয়ং প্রভু রামচন্দ্র আমার সামনে রয়েছেন। এমন অদ্ভুত সংযোগ কার হয়? আপনাকে দেখতে দেখতে আমার প্রাণ শেষ হবে, কার জীবন এভাবে ধন্য হয়? আমার জীবনের মোহ নেই । আমাকে আপনার ধামে স্থান দিন প্রভু। রামচন্দ্র অতি প্রসন্ন হলেন । শত্রু হিসাবে বালি কে সংহার করলেন আবার বালির ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে মোক্ষ প্রদান করলেন । সারাজীবন যদি দেওয়াল সংসারের দিকে ঝুঁকে থাকে , অন্তিম সময়ে কি করে ঈশ্বরের নাম স্মরণে আসবে ? তাই , সারাজীবন দেওয়াল টা ভগবানের দিকেই ঝুঁকিয়ে রাখতে হবে।

    এজন্যই স্বামীজি বলেন -- " গীতা পড়ুন, পড়ান, জীবনে আনুন। গীতা পরিবার দ্বারা এই দীর্ঘ প্রয়াস আপনাদের গীতা স্মরণ করায়, যাতে যে কোন শারীরিক পরিস্থিতিতেও গীতা জি আপনার সাথে থাকেন । মোক্ষদা একাদশীতে গীতা জয়ন্তী উপলক্ষ্যে গীতা পরিবারের প্রচুর ভাই-বোন মিলে দুই দিন ধরে নিরন্তর পরায়ণ করেছেন। আপনারা ও এইভাবে যুক্ত হয়ে থাকুন যাতে ভগবানের দিকে আপনার দেওয়াল ঝুঁকে থাকে ।

  শ্রী ভগবান অর্জুন কে বলেছেন -- মানুষ যে অবস্থায় থাকে, সেই অবস্থাই প্রাপ্ত হয় । পরের শ্লোকে শ্রী ভগবান বলেছেন -----

8.7

তস্মাত্সর্বেষু কালেষু , মামনুস্মর য়ুধ্য় চ |
ময়্য়র্পিতমনোবুদ্ধি:(র্), মামেবৈষ্য়স্য়সংশয়ম্॥7॥

অতএব তুমি সকল সময় আমাকে স্মরণ কর আর যুদ্ধও কর। আমাতে মন ও বুদ্ধি সমর্পণ করলে তুমি নিঃসন্দেহে আমাকেই লাভ করবে।

এই শ্লোক টির বাণী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

"মামনুস্মর যুধ্য চ"
        ভগবান বলেছেন -- প্রত্যেক কালে, প্রতি মুহূর্তে আমাকে স্মরণ কর' -- অর্থাৎ, আপন কর্তব্য পালন কর'। এখানে যুদ্ধ অর্থ রণাঙ্গনে যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি বা কঠিন পরিস্থিতিতে ও আমাকে স্মরণ কর'। সকল কাজের মধ্যে, কর্তব্য পালনের সময়ও ঈশ্বর কে স্মরণ কর' ।

"তস্মাৎসর্বেষু কালেষু, মামনুস্মর যুধ্য চ"
        যুদ্ধের সময়েও আমাকে এক মুহূর্তের জন্য ও ভুলে যেও না । রান্না করার সময়, ঘর পরিষ্কার করার সময়, ব্যবসা করার সময় কিংবা সেবাকার্য করার সময় --- সর্বদা যা করছ -- তা আমার জন্য করছ এই ভাব নিয়ে কর'।

  ভগবান বলেছেন -- যে এভাবে কার্য করে সে আমাকে প্রাপ্ত করে । ভগবানের প্রতি অবিচল বিশ্বাস -- এ অতি গুরুত্বপূর্ণ ।

    এই বিশ্বাস নিয়ে একটা সুন্দর গল্প আছে । একবার ভগবান শিব ও মা পার্বতী উপর থেকে কুম্ভ মেলা দেখছিলেন । পার্বতী বললেন -- ভগবান! আপনার কি অদ্ভুত ব্যবস্থা ... কুম্ভে এসে পবিত্র নদী তে স্নান করলেই সমস্ত পাপ ধুয়ে যায় । এখানে তো লক্ষ লক্ষ মানুষ স্নান করছে -- ওরা সকলেই তাহলে পাপ বিমুক্ত হবে । শিব ঠাকুর বললেন -- এমনটা হয় না । পার্বতী বললেন -- আপনি তো সংশয় তৈরি করে দিলেন প্রভু ... তাহলে সত্য টা কি ? শিব বললেন --- মুক্তি সত্যিই হবে, যদি কেউ বিশ্বাসের সাথে স্নান করে তবেই । দেবীর সংশয় দূর হলো না । বোঝানোর জন্য শিব মায়া দ্বারা একটা গর্ত তৈরি করে নিজে কুষ্ঠরোগী হয়ে সেই গর্তে পড়ে রইলেন। দেবীকে এক সুন্দরী রমনী হয়ে গর্তের পাশে বসে সেখান দিয়ে যাওয়া সমস্ত মানুষ কে চিৎকার করে ডাকতে বললেন এই বলে -- আমার স্বামী গর্তে পড়ে গেছে, কেউ একে তুলে দাও -- কিন্তু, যদি কারও বিন্দুমাত্র পাপ থাকে সে যদি তোলে তাহলে তার কুষ্ঠ হয়ে যাবে । সারাদিন ধরে দেবী লক্ষ মানুষ কে এই অনুরোধ করলেন -- কিন্তু, কেউই এগিয়ে এলো না। সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ এক যুবক কুম্ভে স্নান করে দৌড়ে এসে সেই গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লো । দেবী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন -- তোমার ভয় করছে না যুবক ? যুবক টি উত্তর দিল... আমি সকাল থেকে আপনার ডাক শুনছি। আমি তো কুম্ভ স্নান করে এসেছি -- তাই আমার মধ্যে কোন পাপ অবশিষ্ট নেই । আমি স্নান করে দৌড়ে এসেছি, যাতে আমায় নতুন কোন পাপ স্পর্শ না করে । তৎক্ষনাৎ শিব ভগবান প্রকটিত হলেন এবং দেবীকে বললেন --- দেখেছ দেবী? জানে সবাই, কিন্তু বিশ্বাস করে না। আমরা বিবেচন তো সবাই শুনি, কিন্তু আমাদের মন অন্য কিছুতে পড়ে থাকে । বিশ্বাসের সাথে ভগবানে মন রাখো -- তোমার দেওয়ালও সেদিকে ঝুঁকে থাকবে ।

এরপরে সংকীর্তনের সাথে আজকের বিবেচন সত্র সমাপ্ত হবে ।

:: প্রশ্নোত্তর পর্ব ::

প্রশ্নকর্তা : ললিতা দিদি
প্রশ্ন : গীতার কোন কোন অধ্যায় পাঠ করা উচিৎ ? কারও মৃত্যুর পরে কোন অধ্যায় পড়তে হয়? ধ্যান কিভাবে করতে হয় ?
উত্তর : এমনিতে তো পুরো গীতাই পড়তে হয়। যদি মন না লাগে তবে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোন অধ্যায় পড়া উচিত। মৃত্যুর পরে পঞ্চদশ অধ্যায় পড়ার প্রচলন সর্বাধিক। আর, ধ্যানের জন্য ষষ্ঠ অধ্যায়ের বিবেচন শুনতে হবে আবার । সেখানে ধ্যানের বিস্তারিত বলা হয়েছে ।

প্রশ্নকর্তা - রঞ্জনা পাণ্ডে
প্রশ্ন : ত্রিরত্নিয় গীতায় কি আছে ? রবিবারে কি তুলসীগাছে জল দেওয়া যায় ?
উত্তর : ত্রিরত্নিয় গীতায় গীতা, শ্রী বিষ্ণু সহস্রনাম ও রামরক্ষা স্তোত্র এই তিন রত্ন ছাড়াও প্রাতঃস্মরণীয় শ্লোক এবং আরও অনেক আকর্ষণ আছে ।
 
রবিবারে তুলসীগাছ স্পর্শ করতে নেই বা ছিঁড়তে নেই । কিন্তু গাছে জল দেওয়া যায় ।

প্রশ্নকর্তা - সমিতা দিদি
প্রশ্ন : এই অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকের চতুর্থ চরণে "কর্ম" এর অর্থ বুঝিয়ে বলুন ।
উত্তর : কোন কর্মের জন্য ভাব উৎপন্ন হওয়া কর্ম নয়। কিন্তু সেই ভাব, বিচারের ত্যাগ করাতে তা কর্মে পরিণত হয় । যেমন - জিলিপি খাওয়ার মন হলে সেটা কর্ম নয়। উঠে গিয়ে জিলিপি নিয়ে এলে সেটা কর্ম হয়ে যায় । ভাব ত্যাগ করার জন্য আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিই। ইন্দ্রিয়ের প্রয়োগে যখন সেই বিচার ত্যাগ করা হয়, তখন তা কর্ম হয়ে যায় ।

প্রশ্নকর্তা - সমিতা দিদি
প্রশ্ন : মৃত্যুর পরে আমাদের প্রিয়জনেরা নতুন শরীর ধারণ করে ... তাহলে কি তাদের শ্রাদ্ধ করা উচিৎ ?
উত্তর : মৃত্যুর পরে ও এই শরীরের কারণে তাদের সাথে আমাদের সম্বন্ধ রয়ে যায় । এইজন্য তাদের উদ্দেশ্যে করা শ্রাদ্ধ আমাদের জন্য তাদের আশীর্বাদ স্বরূপ হয়ে যায় এবং কখনো তাদের পরবর্তী যোনি প্রাপ্তি সুগম হয়ে যায় ।

প্রশ্নকর্তা - জবকা শিবা রামদাস দাদা
প্রশ্ন : আমরা শ্রীকৃষ্ণ কে পূর্ণ ভগবান বলে মানি । রামচন্দ্র ও কি পূর্ণ ভগবান ?
উত্তর : হ্যাঁ । অবশ্যই। দশ অবতারের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ ও রামচন্দ্র কে পূর্ণ অবতার মান্য করা হয় । বাকিরা অংশাবতার। পরম ব্রহ্ম হিসাবে শ্রীকৃষ্ণ ও রামচন্দ্র কে পূজা করা হয় ।

প্রশ্নকর্তা - সমিতা গোখলে 
প্রশ্ন : কোন কর্ম সম্বন্ধে ভাবা ও কি একটা কর্ম ?
উত্তর : কেবল ভাবনা তে ই কর্ম হয় না... যতক্ষণ না তার পরিনাম সামনে আসে । যেমন কোন অনুপ্রেরণা থেকে স্পৃহা, স্পৃহা থেকে বিচার এবং বিচার থেকে কর্মে পরিণত হয় । এইজন্য অনুপ্রেরণা বা স্পৃহার স্তরেই আমরা যে কোন অনিচ্ছুক কাজ থেকে সরে আসতে পারি।

প্রশ্নকর্তা -- ঊর্মিলা দিদি
প্রশ্ন : গীতা র দ্বাদশ ও পঞ্চদশ অধ্যায় সবচেয়ে সহজ , তাহলে এগুলো কেন প্রথমে আসে না ?
উত্তর : এটা বুঝতে হবে যে গীতা একটি কথোপকথন যা ভগবান বেদব্যাস পরে আঠারো অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। গীতার প্রারম্ভে অর্জুনের বিষন্নতা এসেছে এবং তা প্রথম অধ্যায় হয়েছে। এমন তো নয় যে ভগবান আগে উপদেশ দিয়েছেন তারপর অর্জুন বিষাদগ্রস্ত হয়েছেন।

প্রশ্নকর্তা : রাজেন্দ্র সিংহ দাদা
প্রশ্ন :
তপস্বিভ্যোઽধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যোઽপি মতোઽধিকঃ ।
কর্মিভ্যশ্চাধিকো যোগী তস্মাদ্ যোগী ভবার্জুন ।।৬.৪৬।।
এই শ্লোকের চতুর্থ চরণে ভগবান অর্জুন কে কি বলতে চেয়েছেন ?
উত্তর : এখানে শ্রীভগবান নিষ্কাম কর্ম সম্বন্ধে বলেছেন। নিষ্কাম কর্মযোগীর কোন কর্তা ভাব থাকে না এবং ফলের আকাঙ্খা ও তিনি ত্যাগ করেন। এরূপ যোগীর বিশ্বাস যে কর্মফলে আমার অধিকার নেই, তাহলে আমার আর চিন্তা কিসের । এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন কে এইরকম কর্মযোগী হতে বলেছেন ।

আলোচনার পর হনুমান চালিসা পাঠ করে সত্র সম্পূর্ণ হলো।