विवेचन सारांश
ভগবানের নিজ মুখে স্বরূপ উন্মোচন

ID: 5096
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 22 জুন 2024
অধ্যায় 10: বিভূতিযোগ
1/3 (শ্লোক 1-9)
ব্যাখ্যাকার: গীতা প্রবীণ মাননীয়া রুপল শুক্লা মহাশয়া


দেবদেবীর চরণে প্রার্থনা নিবেদন, শ্রীকৃষ্ণের চরণ বন্দনা ও দীপ প্রদর্শন করে অনুষ্ঠানের সূচনা হল। বিবেচনের বক্তা গুরু বন্দনা করলেন। গীতা পঠন-পাঠনের সুযোগ লাভ কে ইহ জন্মে বা পূর্বজন্মে করা অনেক পুণ্য কর্মের পরিণাম বলে বর্ণনা করলেন। গীতার দশম অধ্যায় যা বিভূতিযোগ নামে আখ্যাত সেটির শ্লোক অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বক্তা বললেন সাধারণতঃ গীতার ছটি অধ্যায় নিয়ে এক একটি বিভাগ করা হলে প্রথম ছটি অধ্যায়কে একসাথে বলা যায় কর্মযোগ। সপ্তম অধ্যায় থেকে দ্বাদশ অধ্যায় একসাথে করে বলা যেতে পারে ভক্তিযোগ, ত্রয়োদশ অধ্যায় থেকে অষ্টাদশ অধ্যায় কে একসাথে নিয়ে বলা যেতে পারে জ্ঞানযোগ। অবশ্য বিভিন্ন অধ্যায়ে এক একটি বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। নবম অধ্যায়ের ২২ তম শ্লোকে ভগবান অর্জুনকে বলছেন তুমি যদি আমার শরণাগত হও আমি তোমার প্রাপ্ত বস্তু ও তার সংরক্ষণের ভার নিজেই বহন করব। ভগবানের প্রিয়তম শিষ্য অর্জুন তাই তার কাছেই তিনি তার স্বরূপ উন্মোচন করতে প্রস্তুত হয়েছেন। তিনি পরবর্তী শ্লোক গুলিতে বিশদভাবে তার স্বরূপ ব্যাখ্যা করছেন, বলছেন তিনি সকল সৃষ্ট বস্তুতে ওতপ্রোতভাবে কীভাবে জড়িয়ে আছেন, নিজে তিনি জগৎময় কিভাবে প্রকাশমান।

10.1

শ্রীভগবানুবাচ

ভূয় এব মহাবাহো ,শৃণু মে পরমং(ম্) বচঃ
যত্তেऽহং(ম্) প্রীয়মাণায় ,বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া॥1॥

শ্রীভগবান বললেন – হে মহাবাহো অর্জুন! আমার এই শ্রেষ্ঠ বাক্যগুলি তুমি পুনরায় শোনো, আমি তোমার হিতার্থে এগুলি জানাচ্ছি; কারণ তুমি আমার প্রতি অতিশয় শ্রদ্ধা-প্রেমসম্পন্ন ॥ ॥

এই শ্লোকে শ্রী ভগবান অর্জুনকে মহাবাহু বা মহান বীর বলে সম্বোধন করছেন, বলছেন তোমাকে আমি আগেও এই কথাগুলি বলেছি তবুও তুমি যাতে ভালোভাবে এগুলির মর্মার্থ বুঝতে পারো তাই আবারও এই কথাগুলো বলছি। বক্তা বলছেন ঠিক যেমন একজন শিক্ষক তার প্রিয় শিষ্যকে একই বক্তব্য বারবার বুঝিয়ে দেন শিষ্য চাইলে বা না বুঝে উঠলে বক্তব্যটি বারবার ব্যাখ্যা করতে বিরক্ত হন না কিম্বা রুষ্ট হন না তেমনি ভগবান একই বক্তব্য অর্জুন কে বলছেন। বলছেন তোমাকে ভালবাসি বলেই কথাগুলো আরেকবার বলছি তোমার মঙ্গল হোক এটি আমার কামনা।

10.2


ন মে বিদুঃ(স্) সুরগণাঃ(ফ্), প্রভবং(ন্) ন মহর্ষয়ঃ
অহমাদির্হি দেবানাং(ম্), মহর্ষীণাং (ঞ্) চ সর্বশঃ॥2॥

আমার উৎপত্তির বিষয়টি দেবগণ বা মহর্ষিগণ কেউই জানেন না, কারণ সর্বপ্রকারেই আমি দেবতা ও মহর্ষিদের আদি কারণ ॥ ২॥

ভগবান প্রথম শ্লোকে যে 'পরম বচন' প্রিয় অর্জুনকে জানাবেন বলেছিলেন সেটিরই বিশদ ব্যাখ্যা করতে চলেছেন অধ্যায়টির দ্বিতীয় শ্লোকে। তিনি বলছেন সকল দেব দেবী এবং দেবতা শ্রেষ্ঠদের তালিকাতে যারা আছেন তাদের উৎস স্বয়ং তিনি। মহর্ষি বলে যারা শাস্ত্রে বর্ণিত তাদের ও তিনি মূল স্বরূপ। উপনিষদে আছে "অহং ব্রহ্মাস্মি" এই কথার প্রতিধ্বনি করছেন যেন তিনি এখানে। তিনিই প্রকৃতরূপে ব্রহ্ম। এই সত্য তিনি প্রকাশ করছেন।

10.3

য়ো মামজমনাদিং(ঞ্)চ , বেত্তি লোকমহেশ্বরম্
অসংমূঢ়ঃ(স্) স মর্ত্যেষু ,সর্বপাপৈঃ(ফ্) প্রমুচ্যতে॥3॥

যাঁরা আমাকে অজ, অনাদি এবং সর্বলোকের মহেশ্বর বলে জানেন অর্থাৎ দৃঢ়তার সঙ্গে (নিঃসন্দেহে) মেনে নেন, মানুষের মধ্যে তাঁরাই জ্ঞানী এবং সমস্ত পাপ হতে তাঁরা মুক্ত হন। ৩ ॥

এই শ্লোকটিতে ও ভগবান ধীরে ধীরে তার স্বরূপ উন্মোচিত করছেন। এই জগতে যারা প্রকৃত জ্ঞানী তারা জানেন যে আমার জন্ম নেই ,আদি নেই, অন্ত নেই। সেই জন্যই আমাকে অজ অর্থাৎ জন্মরহিত বলে উপলব্ধি করেন। তারা জানেন এই ব্রহ্মাণ্ডই শুধু একমাত্র ব্রহ্মাণ্ড নয় এমন অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ তার খোঁজ জানিনা কিন্তু এই সকল ব্রহ্মাণ্ডের প্রভু একমাত্র এই আমি অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ ভগবান । এই জ্ঞান লাভ করলে পাপ পুণ্য কর্মের ফলাফল সবই বিনষ্ট হয়। "পুনরপি জননং পুনরপি মরণং, পুনরপি জননী জঠরে শয়নম্" অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে সেই জ্ঞানীর মুক্তি প্রাপ্তি হয় ,তাকে আর বারবার জন্ম মৃত্যুর বাঁধনে শৃঙ্খলিত হতে হয় না। তার কাছে অন্তর আত্মা ও পরমাত্মা পৃথক হন না।

10.4

বুদ্ধির্জ্ঞানমসংমোহঃ , ক্ষমা সত্যং(ন্) দমঃ(শ্) শমঃ
সুখং(ন্) দুঃখং(ম্)ভবোऽভাবো ,ভয়ং(ঞ্) চাভয়মেব চ॥4॥

বুদ্ধি, জ্ঞান, অসম্মোহ, ক্ষমা, সত্য, দম, শম, সুখ, দুঃখ, ভব (উৎপত্তি), অভাব (লয়), ভয়, অভয়

ভগবান অর্জুনের সম্মুখে স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে আরো বললেন অর্জুন আমাদের অন্তকরণ চারটি বৃত্তি নিয়ে তৈরি হয়। মন, বুদ্ধি ,অহংকার আর চিত্ত। বুদ্ধি যেকোনো সূক্ষ্ম বিষয় কোনটি ঠিক কোনটি সঠিক নয় সেটি নির্বাচন করে দেয়। সংশয়হীন চিন্তা বা ভাবনাকে ভ্রমরহিত ঞ্জান বলা হয়। বিবেক অনুযায়ী কর্ম করাকেই বলা যেতে পারে সঠিক কর্ম। বিবেকের সাথে তাল মিলিয়ে কর্ম করলে তা জ্ঞান দিয়ে থাকে। সত্যবাদিতা বলতে ভগবান বুঝেছেন কোন বিষয় যেমনটি তার প্রকৃতি সেই ভাবেই তার বর্ণনা করতে হবে কোন কিছু বাড়তি কথা তার সম্বন্ধে না বলা বা কোন বিষয় গোপন না রাখা তাকেই সত্যবাদিতা বলা হয়। বাহ্য ইন্দ্রিয় যার দ্বারা আমরা শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ আহরণ করে থাকি সেগুলির সংযমকে বলা হয় দম। মনের শান্তি কে বলা হয়ে থাকে শম। সুখ-দুঃখ, ভয়-অভয়, ভাব (অস্তিত্ব), অভাব(অনস্তিত্ব) এই সকল বৃত্তির উৎপত্তি ও নিয়ামকও ভগবান স্বয়ং।

10.5

অহিংসা সমতা তুষ্টি:(স্) ,তপো দানং(ম্) য়শোऽয়শ:
ভবন্তি ভাবা ভূতানাং(ম্), মত্ত এব পৃথগ্বিধা:॥5॥

অহিংসা, সমতা, তুষ্টি, তপ, দান, যশ এবং অপযশ—প্রাণীদের এইপ্রকার ভিন্ন ভিন্ন (কুড়ি প্রকারের) ভাব আমার থেকেই উৎপন্ন হয়। ৫ ॥

এছাড়াও বহুবিধ গুণাবলী যা মানুষের মধ্যে প্রকটিত হয় তার সবগুলির উৎপত্তিস্থল ভগবান নিজেই। কায়মনো বাক্যে হিংসা পরিত্যাককে অহিংসা বলা হয় অর্থাৎ মনে হিংসা পোষণ না করা, বাক্যের দ্বারা কারুর প্রতি হিংসা প্রকাশ না করা, কারুর শরীরে আঘাত না করা, অন্যের প্রতি হিংসা মূলক কার্য না করা কেই অহিংসা বলা হয়ে থাকে। সুখ- দুঃখ, মান -অপমান, দন্দ্ব মূলক বিষয়ে নিরুদ্বেগ থাকাকে বলা হয় মানসিক সমতার ভাব। প্রাপ্ত বস্তুতে সন্তুষ্ট থাকাকে তুষ্টি নামক গুনে বিশেষিত করা হয়। এই গুণ গুলির সৃষ্টি ও উৎপত্তিস্থল ভগবান বলছেন তিনি নিজেই।

10.6

মহর্ষয়ঃ(স্) সপ্ত পূর্বে , চত্বারো মনবস্তথা
মদ্ভাবা মানসা জাতা , যেষাং(ম্)লোক ইমাঃ(ফ্) প্রজাঃ॥6॥

সপ্তমহর্ষি এবং তাঁদের পূর্ববর্তী চার সনকাদি এবং চতুর্দশ মনু এঁরা সকলেই আমার মন হতে উৎপন্ন এবং আমার প্রতি ভাব (শ্রদ্ধা-ভক্তি) সম্পন্ন, যাঁদের থেকে জগতের এই সমস্ত প্রজা উৎপন্ন হয়েছে৷৷ ৬ ৷৷

ভগবান আরো বললেন শাস্ত্রে কথিত সপ্ত ঋষি (ভৃগু, বশিষ্ঠ, মরীচী, ক্রতু, পুলহ, অত্রি, পুলস্ত) এবং চার কুমার (সনৎকুমার, সনক, সনন্দন ইত্যাদি), সাবর্ণী আদি চার মনু আমারই মন থেকে সৃষ্ট হয়েছিলেন। তাদের পরম জ্ঞান এবং দৈবশক্তি নিয়ে জগতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সপ্ত ঋষি সাত লোককে সাধারণত নির্দেশিত করে।

10.7

এতাং(ম্) বিভূতিং(ম্) য়োগং(ঞ্) চ, মম য়ো বেত্তি তত্ত্বতঃ
সোऽবিকম্পেন য়োগেন , য়ুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ॥7॥

যে ব্যক্তি আমার এই বিভূতি এবং যোগৈশ্বর্য তত্ত্বত জানেন অর্থাৎ দৃঢ়ভাবে মেনে নেন, তিনি অবিচলিত ভক্তিযোগে যুক্ত হন; এতে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই ॥ ৭ ॥

আমার, এই বিভূতি যারা জানেন তারা আমার সাথে অবি কম্প যোগের দ্বারা যুক্ত হন। অবিকম্প যোগের অর্থ হলো যে যোগ দ্বারা যোগী সকল সময়ে আমার কথা আমার বিভূতি স্মরণ করে থাকেন । সেই যোগযুক্ত ব্যক্তি কখনো চঞ্চল মন হন না। তিনি নিশ্চল ভক্তি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।

10.8

অহং(ম্) সর্বস্য প্রভবো , মত্তঃ(স্) সর্বং(ম্) প্রবর্ততে
ইতি মত্বা ভজন্তে মাং(ম্), বুধা ভাবসমন্বিতাঃ॥8॥

আমি জগতমাত্রেরই প্রভব (মূলকারণ), আমা হতেই এই জগৎ-সংসার প্রবৃত্ত হচ্ছে অর্থাৎ প্রবর্তিত হচ্ছে– বুদ্ধিমান ভক্তগণ আমাকে এইরূপ জেনে শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে আমাকেই ভজনা করে থাকে সর্বভাবে আমারই শরণ গ্রহণ করে॥ ৮ ॥

ভগবান নিজ মুখে স্বরূপ বর্ণনা করে বলছেন, আমি জগৎ সৃষ্টির কারণ অর্থাৎ সকল বিষয় বস্তু তথা প্রাণী অপ্রাণীর উৎস স্বরূপ। জ্ঞানী ব্যক্তি এই সত্য উপলব্ধি করেন। সর্বদা প্রেম পূর্ণ হৃদয়ে তারাআমার ভজনা করেন। 
আমার প্রকাশ যে সকল সৃষ্টিতে সেই কথাটি তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। শ্রদ্ধা সহকারে তাই তারা সর্বদা আমাকেই পূজা করে থাকেন।

10.9

মচ্চিত্তা মদ্গতপ্রাণা , বোধয়ন্তঃ(ফ্) পরস্পরম্
কথয়ন্তশ্চ মাং(ন্) নিত্যং(ন্), তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ॥9॥

মদ্‌গতচিত্ত, মদ্‌গতপ্রাণ ভক্তগণ নিজেদের মধ্যে আমার গুণ, প্রভাব আলোচনা করে এতেই সর্বদা সন্তুষ্ট থাকেন এবং আমার সঙ্গে প্রেমবন্ধনে যুক্ত হয়ে থাকেন৷৷ ৯ ৷৷

এই সকল ভক্তরা অনন্যমনা হয়ে আমারি চিন্তা করেন। আমারি শরণাগত থাকেন। সর্বদাই আমার আলোচনা, আমারই বিভূতির স্মরণ করে থাকেন। মনে মনে আমারই কথা চিন্তা করার কারণে তারা সকল সময় প্রসন্ন হৃদয়ে থাকেন এবং জগৎ মাঝে মহানন্দে বিচরণ করেন। এই প্রসঙ্গে বক্তা বললেন আমরা পরস্পরের সাথে যখন ভগবান সম্বন্ধে, তার নানান বিভূতি সম্বন্ধে আলোচনা করি তখন আমরা কিন্তু তারই চরণে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকি। সেটি আমাদের পূজা, আমরা আনন্দে যখন থাকি তখনও সেটিকে ভগবানের পূজা বলেই মনে করতে হবে। গীতার আলোচনা পঠন পাঠন এক পক্ষে ভগবত পূজার অন্তর্গত। শুধু মাত্র মন্দিরের বিগ্রহ সামনে রেখে মন্ত্র উচ্চারণ করলেই পূজা হয় না, ভগবানের গুণগান করাও পূজা। গীতা অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে ভগবানের সম্বন্ধে আলোচনা করার মাধ্যমে আমাদের পূজা নিবেদিত হল ভগবানের শ্রীচরণে।
:: প্রশ্নোত্তর ::
প্রশ্ন: ভগবান বলছেন তার সকল কিছুই ভালো তাহলে খারাপ ঘটনা উৎপন্ন হয় কেন? 
উত্তর: খারাপ না থাকলে ভালোর অস্তিত্ব বোঝা যাবে কি করে। অন্ধকার আছে তাই আলোর কথা মনে আসে। আলোর জন্য ছুটে যেতে চাই। জীবনে দুয়ের প্রয়োজন আছে।

এর পর হরিনামের সাথে এই সত্রের সমাপ্তি হয়।