विवेचन सारांश
অটল ভক্তি সহকারে নিঃস্বার্থ কর্ম করাই পরমাত্মার কাছে পৌঁছনোর একমাত্র পথ

ID: 5186
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 20 জুলাই 2024
অধ্যায় 9: রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ
3/3 (শ্লোক 15-34)
ব্যাখ্যাকার: গীতা প্রবীণ মাননীয়া কবিতা বর্মা মহাশয়া


ভগবদ্-গীতার নবম অধ্যায়টি রাজবিদ্যা-রাজগুহ্য যোগ নামে পরিচিত- শ্রেষ্ট বিদ্যা এবং সর্বাধিক গোপন যোগ

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রার্থনার ও শুভ দীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে শুরু হয়ে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের তৃতীয় ও শেষ ব্যাখ্যার সভা।

সদাশিব সমারম্ভম্ শঙ্করাচার্য় মধ্যমম্
অস্মদ্ আচার্য় পর্য়ন্তম্ বন্দে গুরু পরম্পরাম্

ॐ পার্থায় প্রতিবোধিতাং(ম্) ভগবতা নারায়ণেন স্বয়ং(ম্)
ব্যাসেন​ গ্রথিতাং(ম্) পুরাণমুনিনা মধ্যেমহাভারতম্।
অদ্বৈতামৃতবার্ষিণীং(ম্) ভগবতীমষ্টাদশাধ্যায়িনী-
মম্ব​ ত্বামনুসন্দধামি ভগবদ্গীতে ভবদ্বেষিণীম্ ॥

শ্রীমদভাগবদগীতার নবম অধ্যায়টি বিশেষ, কারণ এটি এই পবিত্র গ্রন্থের আঠারোটি অধ্যায়ের মাঝখানে রয়েছে। রাজা বিদ্যা মানে রাজকীয় জ্ঞান এবং রাজা গুহ্য সবচেয়ে গোপনীয় জ্ঞানকে ইঙ্গিত করে।

গত অধিবেশনে আমরা আলোচনা করেছিলাম ভগবানের সর্বত্র বিদ্যমান রূপ সম্পর্কে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমরা মাটি দিয়ে একটি বাড়ি তৈরি করি, তাহলে আমরা বলতে পারি যে বাড়িটিও মাটি, কারণ তা মাটি দিয়ে নির্মিত। অথচ মাটি এবং মাটির বাড়ি খুবই আলাদা। একইভাবে, ভগবান ব্যাখ্যা করেছেন যে তিঁনি আমাদের এই মরণশীল সংসার আলাদা হলেও আলাদা নন কারণ তিঁনিই হলেন এই সংসার।


9.15

জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে, যজন্তো মামুপাসতে
একত্বেন পৃথক্ত্বেন, বহুধা বিশ্বতোমুখম্।।15।।

কোনো কোনো সাধক জ্ঞানযজ্ঞের সাহায্যে একইভাবে (অভেদ-ভাবে) আমার পূজা দ্বারা আমাকে উপাসনা করেন, আবার অন্য কোনো সাধক নিজেকে পৃথক বলে মনে করে আমার বিরাট রূপের বা সংসারকে আমার বিরাট রূপ মনে করে (সেবা ভাবের দ্বারা) নানা প্রকারে - আমার উপাসনা করেন ৷

 

9.16

অহং(ঙ্) ক্রতুরহং(য়্ঁ) য়জ্ঞঃ(স্), স্বধাহমহমৌষধম্।
মন্ত্রোऽহমহমেবাজ্যম্, অহমগ্নিরহং(ম্) হুতম্॥9.16॥

আমি ক্রতু, আমি যজ্ঞ, আমি স্বধা, আমি ঔষধ, মন্ত্র আমি, আমিই ঘৃত, আমি অগ্নি এবং যজ্ঞরূপ ক্রিয়াও আমি।

 

9.17

পিতাহমস্য জগতো, মাতা ধাতা পিতামহঃ
বেদ্যং(ম্) পবিত্রমোঙ্কার, ঋক্ সাম যজুরেব চ।।17।।

যা কিছু জ্ঞেয়, পবিত্র, ওঁকার, ঋক-সাম-যজুঃ বেদও আমি। এই সমগ্র জগতের পিতা, ধাতা, মাতা, পিতামহ...

ভগবান বলছেন যে তিঁনি পিতা, তিঁনি মাতা এবং তিঁনি পিতামহর রূপে পরমাত্মা।

তিনি বিশেষভাবে পিতামহর কথা উল্লেখ করে স্পষ্ট করেছেন যে, কোনও বিশেষ সত্তা থেকে তাঁর জন্ম হয়নি; তিঁনি নিজে থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। তিনিই একমাত্র এবং একক সত্তা।

তিঁনি হলেন বেদে সমস্ত জ্ঞানের উৎস। আমাদের ভারতীয় জ্ঞানের ভিত্তি এবং উৎস হল বেদ যা ভগবান বলেছেন যে আসলে তিঁনিই। তিঁনিই পরিশোধক এবং ওঙ্কার প্রণবের বিশুদ্ধ আদিম ধ্বনি। যখন আমরা পরমাত্মাকে উল্লেখ করতে চাই, তখন আমরা তাঁকে ওঁ বা প্রণব বলে উল্লেখ করি।

9.18

গতির্ভর্তা প্রভুঃ(স্) সাক্ষী, নিবাসঃ(শ্) শরণং(ম্) সুহৃৎ
প্রভবঃ(ফ্) প্রলয়ঃ(স্) স্থানং(ন্), নিধানং(ম্) বীজমব্যয়ম্।।18।।

..গতি, ভর্তা, প্রভু, সাক্ষী, নিবাস, আশ্রয়, সুহৃদ, উৎপত্তি, প্রলয়, স্থান, নিধান এবং অবিনাশী বীজও আমি ৷

সমস্ত নশ্বর প্রাণীর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল পরমাত্মার মধ্যে বিলীন হয়ে তাঁর কাছে পৌঁছানো এবং তাঁর সঙ্গে এক হওয়া। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হল তাঁকে জানার মাধ্যমে এই মহাবিশ্বের সত্য এবং রহস্যগুলি জানা, কারণ তিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা।

যখনই আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়, আমাদের উচিৎ তাঁর শরণাপন্ন হওয়া, কারণ তিঁনিই হলেন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের চূড়ান্ত অভিভাবক। জাগতিক মানুষের সীমিত ক্ষমতা, কিন্তু ঈশ্বরের সীমাহীন ক্ষমতা; তিনিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।

আমরা কোনো ভালো কাজ করলে, অন্য মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পেতে পারি বা নাও পেতে পারি। কিন্তু পরমাত্মা হলেন সেই সাক্ষী যিনি আমাদের জন্ম জন্মান্তরের সমস্ত কর্ম লিপিবদ্ধ করে রাখেন।

যখন আমরা একা থাকি এবং অন্য কারও সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা করি, তখন আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ভগবান আমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। ইতিবাচক বা নেতিবাচক যাই হোক না কেন, আমাদের কর্মের আসল কর্মফল সাক্ষী দ্বারা নির্ধারণ এবং বিতরণ করা হয় কারণ তিনি আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা এবং কর্মের নীরব এবং চূড়ান্ত পর্যবেক্ষক।

ভগবান বলেছেন যে তিনি সেই চিরন্তন বীজ, যা থেকে সৃষ্টির উৎপত্তি। তাঁর না আছে সৃষ্টি বা না আছে ধ্বংস। তিঁনিই জগতের আরম্ভ ও বিলুপ্তি। মহাপ্রলযের সময় সমগ্র মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে তাঁরই মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

প্রলয়ের শেষে, ব্রাহ্মণে সঞ্চিত পূর্ববর্তী কর্ম অনুসারে আবার নতুন জীবনের সৃষ্টি হয় থাকে।

9.19

তপাম্যহমহং(ব্ঁ) বর্ষং(ন্), নিগৃহ্ণাম্যুৎসৃজামি চ।
অমৃতং(ঞ্) চৈব মৃত্যুশ্চ, সদসচ্চাহমর্জুন॥9.19॥

হে অর্জুন! (জগতের হিতার্থে) আমি সূর্যরূপে তাপিত করি, জলকে আকর্ষণ করি এবং পুনরায় সেই জলকে বৃষ্টিরূপে বর্ষণ করি। (অধিক আর কী বলব) আমিই অমৃত ও মৃত্যু এবং সৎ এবং অসৎও আমি ৷

তিঁনিই সূর্য দ্বারা প্রদত্ত তাপ আবার তিঁনিই পৃথিবীতে বর্ষণের কারণ। তিঁনি অবিনশ্বর এবং নশ্বর| তিঁনি শাশ্বত আবার তিঁনি অলীক, ক্ষণস্থায়ী।

9.20

ত্রৈবিদ্যা মাং(ম্) সোমপাঃ(ফ্) পূতপাপা,
যজ্ঞৈরিষ্ট্বা স্বর্গতিং(ম্) প্রার্থয়ন্তে
তে পুণ্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকম্,
অশ্নন্তি দিব্যান্দিবি দেবভোগান্।।20।

তিন বেদে কথিত সকাম অনুষ্ঠানকারী এবং সোমরসপানকারী যে-সব নিষ্পাপ ব্যক্তি যজ্ঞ দ্বারা (ইন্দ্রের রূপে) আমার পূজা করে স্বর্গপ্রাপ্তি কামনা করেন, তাঁরা পুণ্যফলস্বরূপ ইন্দ্রলোক লাভ করে সেখানে দেবতাদের দিব্যভোগসমূহ উপভোগ করে থাকেন ৷

এই শ্লোকে ভগবান স্বর্গলোক বা সুরেন্দ্র লোকম, সম্পর্কে সাধারণ ধারণাটি স্পষ্ট করেছেন।

যারা সমস্ত ধর্মগ্রন্থের হিতোপদেশ মেনে সৎ ও ধার্মিকভাবে জীবনযাপন করেছেন, তারা মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে প্রবেশাধিকার পান।

তদুপরি, স্বর্গলোকে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য যে পুণ্য প্রয়োজন তা সঞ্চয় করার জন্য নানাবিধ দান সহযোগে যজ্ঞ করা অবশ্যক। যারা এই ধরনের যজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, তারা আত্মশুদ্ধির চিহ্ন হিসাবে সোম রস পান করেন। তাদের দান এবং শুদ্ধি তাদের স্বর্গলোকে উত্তরণের অধিকার দেয়।

যে সব ব্যক্তি তাদের সুকর্মের ফলে স্বর্গলোকে পৌঁছেছেন, তারা স্বর্গীয় আনন্দ সীমাহীনভাবে অনুভব করতে এবং উপভোগ করতে পারেন, যা আমাদের মরণশীল দেহের সীমাবদ্ধতার কারণে পৃথিবীতে সম্ভব নয়। তারা সেখানে সেই সব ঐশ্বরিক বস্তু উপভোগ করতে পারেন যা শুধুমাত্র স্বর্গীয় দেবতাদের জন্য উপলব্ধ। গরুড় পুরাণেও এই লোকের উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে যে স্বর্গলোকে পৌঁছনো সঠিক দিকের একটি পদক্ষেপ হলেও, তা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করলে চলবে না।

9.21

তে তং(ম্) ভুক্ ত্বা স্বর্গলোকং(ব্ঁ) বিশালং(ঙ্),
ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং(ব্ঁ) বিশন্তি।
এবং(ন্) ত্রয়ীধর্মমনুপ্রপন্না,
গতাগতং(ঙ্) কামকামা লভন্তে॥9.21॥

তাঁরা সেই বিশাল স্বর্গসুখ ভোগ করে পুণ্যক্ষয় হলে মৃত্যুলোকে ফিরে আসেন। এইভাবে তিন বেদে কথিত সকাম ধর্মের আশ্রয় গ্রহণকারী কামনার বশবর্তী ব্যক্তিরা জন্ম-মৃত্যু প্রাপ্ত হন ৷

একজন ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় যে ভাল এবং মহৎ কর্ম সম্পাদন করেন, তা তাকে পুণ্যার্জন এবং স্বর্গলোকে যাওয়ার অধিকার অর্জন করতে সাহায্য করে।

কিন্তু, এই অর্জিত পুণ্য অপার এবং অশেষ নয়। তাই মানুষের এই ধরনের পুণ্য ব্যয় করার ক্ষমতাও সীমিত। এর দরুণ স্বর্গলোকে বাস করার সময় সীমাও নির্দিষ্ট । মানুষ সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য থাকেন, যা নির্ভর করে তার অর্জিত পুণ্য বা সৎকর্মের পরিমাণের উপর।

স্বর্গলোকের সমস্ত ঐশ্বরিক বস্তু উপভোগ করার পর, তার পুণ্যের ঘোরা নিঃশেষ হয়ে গেলে তাকে আবার এই মর্তলোকে ফিরে আসতে হয়। কেউ স্বর্গলোকে ততক্ষণ পর্যন্ত থাকতে পারে যতক্ষণ তার অর্জিত পুণ্যকর্ম অবশিষ্ট আছে। যখন সে মর্তলোকে ফিরে আসেন, তখন তাকে আবার সমস্ত পার্থিব সমস্যা, দুঃখ, জাগতিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়।

অতএব, ঈশ্বর বলেছেন যে স্বর্গলোক পৌঁছানো আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় কারণ স্বর্গলোকেও আমাদের অবস্থান ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং, একজন ব্যক্তি জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের চক্রে আবদ্ধ থাকবেন।

অষ্টম অধ্যায়ের ষোড়শতম শ্লোকে ভগবান বলেছেন,

আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোऽর্জুন।
মামুপেত্যে তু কৌন্তেয়, পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে॥16॥ 

এই জাগতিক সৃষ্টির সর্বোচ্চ স্থান অর্থাৎ ব্রহ্মলোকেও, মানুষ জন্ম ও পুনর্জন্মের কালচক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ব্রহ্মলোক থেকে মোক্ষ লাভ করার সম্ভাবনা থাকলেও, তা স্বর্গলোক থেকে নেই। একমাত্র ঈশ্বরের আশ্রয়ই পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

স্বর্গলোকের ভগবদ্গীতার জ্ঞানের মতো ব্রহ্ম বিদ্যা অর্জন করা যায় না। সেই জ্ঞান অর্জনের জন্য, মানুষকে মর্তলোকে ফিরে আসতে এবং মানব দেহের রূপ নিতে হয়। এই কারণেই অনেক সময় বলা হয় যে মানব দেহ দেবতার দেহের চেয়ে উৎকৃষ্ট, কারণ দেবতার দেহের মাধ্যমে মোক্ষ লাভের জন্য প্রয়োজনীয় পুণ্য, সৎকর্ম বা ব্রহ্ম বিদ্যা অর্জন করা যায় না। 

যদিও, ব্রহ্মলোকে হিরণ্যগর্ভর, যিনি ব্রহ্মলোকের বাসিন্দা, মাধ্যমে এই পুণ্য অর্জন করা যেতে পারে। কিন্তু ব্রহ্মলোক পৌঁছনো খুব কঠিন যার জন্য অনেক চেষ্টা এবং সাধনার প্রয়োজন।

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, যখন আমরা কোনও বিলাসবহুল হোটেলে থাকতে যাই। হোটেলে প্রবেশ মাত্র আমাদের ক্রেডিট কার্ড বা নগদে কিছু পরিমাণ অর্থ জমা করতে হয়। তার পরিবর্তে হোটেল আমাদের সেখানকার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা এবং বিলাসিতা উপভোগ করার অনুমতি প্রদান করে। কিন্তু আমাদের সেখানে থাকার এবং সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করার অনুমতি থাকে তখন পর্যন্ত, যতক্ষণ আমাদের প্রদত্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকে। যেই মুহূর্তে তা শেষ হয় যায়, আমাদের তখন হোটেলের ঘর খালি করতে হয়। একইভাবে স্বর্গলোকের সম্পদ এবং সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করতে, আমাদের সৎকর্ম সংগ্রহ করতে হবে। এবং, সেই সৎকর্মগুলি শেষ হয়ে গেলে, আমাদের আবার এই ধরাধামে ফিরে আসতে হবে।

তাই, আসল মোক্ষ লাভ করতে হলে আমাদের নিজেকে ভগবানের চরণে উৎসর্গ করে, তাঁর সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে | তাহলেই.এই জন্ম-মৃত্যুর কালচক্র থেকে পাওয়া যাবে মুক্তি।

9.22

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং(য়্ঁ), য়ে জনাঃ(ফ্) পর্যুপাসতে।
তেষাং(ন্) নিত্যাভিয়ুক্তানাং(য়্ঁ), য়োগক্ষেমং(ব্ঁ) বহাম্যহম্॥9.22॥

যেসব অনন্যচিত্ত ভক্ত আমার চিন্তা করতঃ উপাসনা করে, আমাতে নিত্যযুক্ত সেই সব ভক্তের যোগক্ষেম (অপ্রাপ্ত বস্তুর প্রাপ্তি এবং প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষা) আমি বহন করি ৷

ভগবদ্গীতার এটি একটি অত্যন্ত বিখ্যাত শ্লোক। এটি ভারতের বৃহত্তম বীমা সংস্থার ট্যাগলাইনও বটে।

আধ্যাত্মিক ও শারীরিক জীবনে সফল হতে হলে মানুষকে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করতে হবে। 

প্রধান ভাবে অনন্যচিত্তে পরমাত্মার সাথে মিলনের উপর মনোনিবেশ এবং তাঁর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। 

উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি কোনও পরীক্ষায় ভালো ভাবে উত্তীর্ণ হতে চাই, তাহলে আমাদের সম্পূর্ণভাবে সেই পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করতে হবে। একইভাবে, আমাদের প্রতিদিনের নিত্যনৈমিত্তিক সাংসারিক ঘটনার দ্বারা বিভ্রান্ত না হয় ঈশ্বরের প্রার্থনা এবং চিন্তনে মগ্ন থাকতে হবে।

গীতা পরিবারে, আমরা একে অপরকে 'জয় শ্রী কৃষ্ণ' বলে অভিবাদন জানাই কারণ এটি করার মাধ্যমে আমরা ক্রমাগত পরমাত্মাকে স্মরণে করি। হরি ওম বলার অর্থও একই। এটি করার মাধ্যমে, ভগবান সর্বদা আমাদের চিন্তাভাবনা থাকেন।

আমরা যাই করি না কেন, আমাদের তাঁর সঙ্গে মিলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে মনোনিবেশ করতে হবে।

যখন আমরা ভাগবদ্গীতা শেখা শুরু করি, তখন আমরা প্রায় সবাই গীতাব্রতী হওয়ার লক্ষ্য রাখি। কিন্তু কখনও কখনও, মাঝপথে, যেমন ধরুন লেভেল-২ শেষ করার পরে কিছু পারিবারিক ঘটনার দরুণ আমরা সাময়িকভাবে এই শিক্ষা প্রচেষ্টা বন্ধ করতে বাধ্য হই। সব ঠিক হয়ে গেলে আমরা পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা করি, কিন্তু কোনও না কোনও কারণ বসত আমরা সেটি বারবার পিছিয়ে দি । এটা করলে চলবে না, আমাদের দৃঢ় সংকল্প রাখতে হবে। সেটি থাকলে আমরা আমাদের গীতাব্রতী যাত্রা নিশ্চিত ভাবে সম্পন্ন করতে
পারবো। একইভাবে আমাদের পরমাত্মার শ্রী চরণে পৌঁছনোর জন্য আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতি অবিচল মনোযোগ দিতে হবে।

যখন কেউ অটল সংকল্পের সাথে ঈশ্বরের সন্ধানে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে নিমজ্জিত করেন, তখন ভগবান যোগ-ক্ষেমা অর্থাৎ সমৃদ্ধির ছত্রছায়ায় নিয়ে আসেন। তাদের যা অভাব তা তিঁনি পূর্ণ করেন এবং যে সম্পদ সেই ভক্তের কাছে আছে, তা সংরক্ষণ করেন। এইভাবে, তিঁনি তাঁর অটল ভক্তের কল্যাণ নিশ্চিত করেন।

9.23

যেপ্যন্যদেবতা ভক্তা, যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ
তেপি মামেব কৌন্তেয়, যজন্ত্যবিধিপূর্বকম্।।23।।

হে কুন্তীনন্দন! যে কোনো ভক্ত (মানুষ) শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে অন্য দেবতাদের পূজা করলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে আমারই পূজা করেন কিন্তু তা করেন অবিধিপূর্বক অর্থাৎ দেবতাগণকে আমার থেকে পৃথক মনে করেন ৷

নানাবিধ আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য মানুষ বিশ্বাস ও উদ্দীপনার সঙ্গে বিভিন্ন ঐশ্বরিক দেবতার পূজা করে থাকেন। প্রতি দেবতার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা থাকে এবং তাঁরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন।

কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে, সব দেবতাকে পূজা করে মানুষ পরোক্ষভাবে পরমাত্মাকেই অর্চনা নিবেদন করছে কারণ তিঁনি সর্বব্যাপী এবং সর্বোচ্চ সত্তা।

 উদাহরণস্বরূপ, মন্ত্রিসভার বিভিন্ন মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের নেওয়া যেতে পারে। যদিও প্রতিটি মন্ত্রী তাদের নিজ নিজ দপ্তরের কর্তাব্যক্তি এবং সেই দপ্তরের ওপর তাদের পুরো ক্ষমতা আছে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীই সে যার সব দপ্তরের ওপর সামগ্রিক কর্তৃত্ব আছে।

আরেকটি উদাহরণ হলো যখন আমরা আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বাজারে যাই। আমরা হয়তো একটি দোকান থেকে দুধ কিনি, আর একটি থেকে সব্জি কিনি এবং হয়তো শেষে মুদিখানা থেকে চাল-ডাল কিনি। কিন্তু যদি আমরা কোনও একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে যাই, যেখানে এক ছাদের নিচে সবকিছু পাওয়া যায়, তাহলে আমরা সব জিনিস এক জায়গায় পেয়ে যাব।

পরমাত্মা হলেন সেই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মতো, বা প্রধানমন্ত্রীর মতো যিনি আমাদের সবার সব ইচ্ছে পূরণ করার ক্ষমতা রাখেন। যারা এটি বোঝেন তারা একাধিক দেবতার পরিবর্তে স্বয়ং পরমাত্মার উপাসনার পথ বেছে নেন।

9.24

অহং(ম্) হি সর্বযজ্ঞানাং(ম্), ভোক্তা চ প্রভুরেব চ
ন তু মামভিজানন্তি, তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।24।।

কারণ আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা এবং প্রভু, কিন্তু এরা তত্ত্বগতভাবে আমাকে জানে না, তাতেই তাদের পতন হয় ৷

আমাদের সম্পাদিত সমস্ত যজ্ঞ আসলে পরমাত্মার কাছেই অর্পিত হয় কারণ তিঁনি হলেন বিশ্বের আসল এবং চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক।

যদি একজন মানুষের জিহ্বা না থাকে, সে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও, তার সামনে রাখা সমস্ত সুস্বাদু খাবার উপভোগ করতে পারবেন না। আমাদের দেহটি ঈশ্বর প্রদত্ত, মূল্যবান এবং টাকা দিয়ে কেনা যায় না। শুধুমাত্র বস্তুগত জিনিসই কেনা যায় এবং উপভোগ করা যায়।

আমাদের কর্মের ফল পরমাত্মার ইচ্ছা অনুযায়ী তিঁনি স্বয়ং আমাদের দান করেন। ঠিক যেমন মা তার ছেলেকে একটি বিষাক্ত গাছ স্পর্শ করতে দেন না, ঠিক তেমনই ভগবান তাঁর ভক্তদের এই বিষাক্ত জগতের সমস্ত দুর্দশা, দুঃখকষ্ট এবং মৃত্যুর চক্রে বার বার আসতে দিতে চান না। যারা এই সত্যটি উপলব্ধি করে না তাদের বার বার জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের কালচক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

কোনো এক লেখক বলেছেন যে, 'ভগবান একজন ঈর্ষান্বিত প্রেমিকের মতো'। আসলে কিন্তু তিঁনি একজন প্রেমিকের মতো নন, বরং একজন প্রতিরক্ষাপরায়ণ মায়ের মতো, যিনি তাঁর ভক্তদের ক্ষতি হতে দেখতে চান না।

ধরা যাক দুজন সহপাঠী একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। যে ব্যক্তি অন্তরাত্মার সাথে সংযুক্ত নন, সে কেবল সেই সমস্যা নিয়ে ব্যথিত থাকে। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি তার
সমস্যা ভগবানের উপর ছেড়ে দেন, সে তার অন্তরাত্মার সঙ্গে যুক্ত। পরমাত্মা বলেছেন যে, সমস্যা মানবজীবনে সবসময়ই আসবে, এবং তখন ভগবানের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগের মাধ্যমে মানুষ সেই সমস্যার মোকাবিলা করার শক্তি এবং উপায়ে পাবেন।

পরম পূজনীয় স্বামীজী একজন সিদ্ধ পুরুষ, যিনি পরমাত্মার সঙ্গে ঐশ্বরিক সংযোগ অনুভব করেছেন। তিনি গীতা পরিবার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ ভগবদ্গীতা শিখতে পারেন। এটি করার মাধ্যমে, আরও বেশি সংখ্যক মানুষ পরমাত্মার সাথে সংযুক্ত হবার পথ খুঁজে পাবেন।

তাই ভক্তের উচিত যোগেশ্বরের শরণাপন্ন হয়ে, অটুট ভক্তি সহকারে তাঁরই কাছে আত্মনিবেদন করা।

9.25

যান্তি দেবব্রতা দেবান্, পিতৃ়ন্যান্তি পিতৃব্রতাঃ
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা, যান্তি মদ্যাজিনোপি মাম্।।25।।

যারা সকামভাবে দেবতাদের পূজা করে (শরীর ত্যাগ করার পর) তারা দেবতাদের (দেবলোক) প্রাপ্ত হয়। পিতৃগণের পূজকেরা পিতৃলোক প্রাপ্ত হয়। ভূত-প্রেতাদির পূজকেরা ভূত-প্রেতলোক প্রাপ্ত হয়। কিন্তু যাঁরা আমার পূজা করেন, তাঁরা আমাকেই প্ৰাপ্ত হন ৷

এই শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে, যারা দেবতাদের উপাসনা করেন তারা দেবতাদের কাছে যান। পিতৃ বা পূর্বপুরুষদের উপাসকরা পূর্বপুরুষদের কাছে যান। যারা ভূত ও প্রেতাত্মার পূজা করেন তারা প্রেতাত্মার কাছে পৌঁছন। যাঁরা শ্রীভগবানকে নিঃশর্ত ভাবে ভালবাসেন ও পূজা করেন, তারা তাঁর শ্রীচরণে আশ্রয় পান।

এটি জীবনের নিয়ম যে আমাদের তেমনই ভাবে চলি, আমাদের মন যেমন চিন্তা করে। চিন্তাভাবনা এবং আবেগ আমাদের কৃত কর্মের উপর এক বিরাট প্রভাব ফেলে। আমাদের অভিজ্ঞতা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভাল, খারাপ বা নিরপেক্ষ প্রভাব ফেলে।

আমাদের সকলেরই বিভিন্ন রঙের পোশাক পরে থাকি। কোনো একটি রঙ ছাড়া পোশাক হওয়া অসম্ভব। আমাদের পছন্দের রঙ আমাদের কিছু মানসিকতাকে নির্দেশ করে। যেমন কারুর হয়তো সাদা রঙ পছন্দ, কারণ সে মনে করে সাদা রঙ শান্তির প্রতীক।

আমাদের মন সেই পোশাকের মতো, এটি শূন্য এবং চিন্তাহীন থাকতে পারে না। এমনকি আমরা যদি আমাদের মন থেকে কিছু চিন্তাভাবনা সরিয়ে ফেলি, তখন আমাদের মন অন্য কোনো চিন্তাভাবনাকে উপলব্ধি করবে। তাই আমাদের উচিৎ মনকে সর্বদা ইতিবাচক এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনায় ভরিয়ে রাখা। চিন্তাভাবনা আমাদের মনে অনুভূতি তৈরি করে যার ফলস্বরূপ কর্ম হয়। আমাদের মন ভাল এবং খারাপ চিন্তাভাবনা তৈরি করে। খারাপ চিন্তাভাবনা অপসারণ করে, ইতিবাচক চিন্তাভাবনাকে স্বাগত জানানো আমাদের পরম কর্তব্য।

9.26

পত্রং(ম্) পুষ্পং(ম্) ফলং(ন্) তোয়ং(য়্ঁ), য়ো মে ভক্ত্যা প্রয়চ্ছতি।
তদহং(ম্) ভক্ত্যুপহৃতম্ , অশ্নামি প্রয়তাত্মনঃ॥9.26॥

যে ভক্ত পত্র, পুষ্প, ফল, জল ইত্যাদি (সাধ্যমত বস্তু) ভক্তিপূর্বক আমাকে সমর্পণ করে, আমাতে তল্লীন চিত্ত, সেই ভক্তের ভক্তিপূর্বক প্রদত্ত উপহার আমি গ্রহণ করি ৷

এই শ্লোক এই প্রশ্নটি উত্থাপন করে যে পরমাত্মার উপাসনা করা খুব কঠিন কিনা। উত্তরটি হল ভগবানকে খুশি করা খুব সহজ। তাঁকে যা কিছু ভালবাসা এবং ভক্তির সাথে উৎসর্গ করা হয়, তা সে সাধারণ ফুল, পাতা ফল বা জল (সাধারণ জিনিস যা আমরা আমাদের নিত্তনৈমিত্তিক পুজোর সময় ভগবানকে উৎসর্গ করে থাকি) হোক না কেন, তিঁনি ভক্তদের দ্বারা উৎসর্গীকৃত সেই জিনিসটি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন।

তিঁনি তাঁর ভক্তের কাছ থেকে শুধু অটুট ভক্তি এবং শুদ্ধ অভিপ্রায় আশা করেন। তিঁনি নৈবিদ্য প্রদানের কর্মপ্রক্রিয়া থেকে পবিত্র অভিপ্রায়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

9.27

যৎকরোষি যদশ্নাসি, যজ্জুহোষি দদাসি যৎ
যত্তপস্যসি কৌন্তেয়, তৎকুরুষ্ব মদর্পণম্।।27।।

হে কৌন্তেয় ! তুমি যা কিছু কর, যা কিছু চাও, যা হোম কর, যা দান কর আর যে তপস্যা কর, তা সমস্তই আমাকে সমর্পণ করে দাও ৷

ভগবান এখন কর্ম যোগ ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। তিনি বলেন যে, যদি কেউ কোনও মন্দিরে যাওয়ার জন্য বা কোনও আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদনের জন্য সময় দিতে অক্ষম হন, তবে তারা কর্মযোগের পথ অনুসরণ করতে পারেন, যেখানে তারা তাদের সমস্ত ভাল বা খারাপ কর্ম তাঁকে উৎসর্গ করতে পারেন।

প্রভু বলেছেন, আমরা যা কিছু কিছু করে থাকি, যেমন খাওয়া, ঘুমোনো, দেওয়া বা কোনও তপস্যাই করি , তা যেন তাঁকে উৎসর্গ হিসাবে করি। শুভ বা অশুভ, ভালো-মন্দ সবকিছুই তাঁর চরণকমলে উৎসর্গ করতে হবে।

কোনো প্রত্যাশা না রেখে সমস্ত কর্ম পরমাত্মাকে উৎসর্গ করার অভিপ্রায় নিয়ে করলেই পরমাত্মা খুশি হয়ে তা গ্রহণ করবেন।

9.28

শুভাশুভফলৈরেবং(ম্), মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈঃ
সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা, বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।।28।।

এইভাবে আমাকে সর্বকর্ম সমর্পণ করলে, কর্মবন্ধন থেকে এবং শুভ (বিহিত) ও অশুভ (নিষিদ্ধ) সমস্ত কর্মের ফল থেকে তুমি মুক্ত হবে। এইভাবে নিজেকে-সহ সবকিছু আমাকে অর্পণ করে, সমস্ত কিছু থেকে মুক্ত হয়ে তুমি আমাকেই প্রাপ্ত হবে ৷

মানুষের তার প্রতিটি কর্ম প্রভুকে উৎসর্গ করা উচিত। কৃত কর্মের থেকে কোন প্রত্যাশা বা তার প্রতি কোনো আসক্তি থাকা উচিত নয়। এই ভাবে কর্ম করলে, মানুষ তার সমস্ত ক্রিয়া এবং সেই ক্রিয়ার পরিণতি থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, কারণ সে যা করেছে তা সে প্রভুকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। ভগবান তাঁর সমস্ত কর্মের সাক্ষী, এবং তিঁনিই কর্ম এবং ফলাফলের দায়িত্ব নেবেন।

এইভাবে, মানুষ গৃহে থেকেও সন্ন্যাস যোগী হতে পারে এবং তখন সে আর তার কৃত কর্মের ফলে আবদ্ধ থাকবে না| এটাই তাকে মোক্ষের অর্থাৎ মুক্তির পথে নিয়ে যাবে।

9.29

সমোহং(ম্) সর্বভূতেষু , ন মে দ্বেষ্যোস্তি ন প্রিয়ঃ
যে ভজন্তি তু মাং(ম্) ভক্ত্যা , ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্।।29।।

সকল প্রাণীতেই আমি সমান। তাদের মধ্যে কেউ আমার অপ্রিয়ও নয়, আবার কেউ আমার প্রিয়ও নয়। কিন্তু যাঁরা ভক্তিপূর্বক আমার ভজনা করেন, তাঁরা আমাতে এবং আমি তাঁদের মধ্যে অবস্থান করি ৷

এই শ্লোকে প্রশ্ন ওঠে যে যদি সবাই তাদের প্রতিটি কর্ম ভগবানকে উৎসর্গ করে তা হলে সেই কর্মের ফল কে ভোগ করবেন, কে লাভবান হবেন?

এর উত্তরে প্রভু বলেছেন যে, তিঁনি কাউকে ঘৃণা করেন না। তিঁনি কারুর প্রতি পক্ষপাতিত্বও করেন না। তিনি প্রত্যেকের সাথে সমান আচরণ করেন এবং যে পূর্ণ ও অটল ভক্তির সঙ্গে তাঁর কাছে তাদের সমস্ত কর্ম ও চিন্তাভাবনা সমর্পন করেন, তিঁনি তাদের যত্ন নেন। তাঁর উপদিষ্ট পথে যারা চলেন, তারা তাঁর মধ্যে বিরাজমান এবং তিঁনি সেই সৎ ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান। তখন তিঁনি এবং তাঁর ভক্ত একাত্ম হয় যান। । এখানে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল পরমাত্মার প্রতি অটল ভক্তি ও আন্তরিকতার বোধ

9.30

অপি চেৎসুদুরাচারো , ভজতে মামনন্যভাক্
সাধুরেব স মন্তব্যঃ(স্), সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ।।30।।

যদি অত্যন্ত দুরাচারী কোনো ব্যক্তিও অনন্য ভক্ত হয়ে আমার ভজনা করে, তাহলে তাকে সাধু বলেই মনে করবে। কারণ সে খুব ভালোভাবেই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

এই শ্লোকে, ভগবান বলেছেন যে পাপীদের মধ্যে নিকৃষ্টতমও সাধু হতে পারে এবং তাঁর কাছে পৌঁছতে পারে যদি সে অনন্যচিত্তে পরমাত্মার উপাসনা করে।

9.31

ক্ষিপ্রং(ম্) ভবতি ধর্মাত্মা , শশ্বচ্ছান্তিং(ন্) নিগচ্ছতি
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি , ন মে ভক্তঃ(ফ্) প্রণশ্যতি।।31।।

সেই ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ ধর্মাত্মা হয়ে যান এবং চির-শান্তি লাভ করেন। হে কৌন্তেয় ! জেনো যে, আমার ভক্তের কখনই বিনাশ (পতন) হয় না ৷

একজন পাপীও পরমাত্মার তপস্যা ও উপাসনার মাধ্যমে ধর্মাত্মায় পরিণত হতে পারে এবং অনন্ত শান্তির অধিকারী হতে পারে। একবার কেউ নিঃশর্তভাবে পরমাত্মার শরণে আসলে, ভগবান তাঁর সেই ভক্তের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজে তুলে নেন এবং তাঁর সেই ভক্তর অবিনশ্বরতা নিশ্চিত করেন।

9.32

মাং(ম্) হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য , যেপি স্যুঃ(ফ্) পাপযোনয়ঃ
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাঃ(স্) , তেপি যান্তি পরাং(ঙ) গতিম্।।32।।

হে পৃথানন্দন ! যারা পাপযোনিসম্ভূত অথবা স্ত্রীজাতি, বৈশ্য ও শূদ্র, তারাও সর্বতোভাবে আমার শরণ গ্রহণ করে নিঃসন্দেহে পরমগতি প্রাপ্ত হয় ৷

পরমাত্মা সকলের প্রতি নিরপেক্ষ। তিনি লিঙ্গ, বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করেন না। ভগবানের আশ্রয়ে এসে তাঁর ভক্ত হয়ে গেলে, একজন সর্বদা তাঁর দ্বারা সু রক্ষিত থাকবেন এবং তাঁর সাথে এক হওয়ার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করবেন।

এই শ্লোকের সামাজিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব অসীম| এটা সত্যি যে মহাভারতের সময়ে, জাতি ও লিঙ্গ বৈষম্য ছিল। তাই, এই শ্লোকের দ্বারা ভগবান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে
জগতের সমস্ত সৃষ্টি তার দৃষ্টিতে সমান।

ঈশ্বর স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ভগবদ্গীতার তাঁর প্রদত্ত সর্বোচ্চ জ্ঞান এবং পরমাত্মার প্রতি ভক্তির অধিকার শুধুমাত্র নির্বাচিত কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তা লিঙ্গ, বর্ণ বা ধর্ম নির্বিশেষে সর্বজনীন।

9.33

কিং(ম্) পুনর্ব্রাহ্মণাঃ(ফ্) পুণ্যা , ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা
অনিত্যমসুখং(ম্) লোকম্, ইমং(ম্) প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।।33।।

পবিত্র আচরণকারী ব্রাহ্মণ এবং ঋষিকল্প ক্ষত্রিয় ভগবানের ভক্ত হলে পরমগতি প্রাপ্ত হবেন, তাতে আর বলার কী আছে ? অতএব তুমি এই অনিত্য ও সুখশূন্য দেহ লাভ করে আমাকে ভজনা কর ৷

ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়, যাদের শৈশব থেকেই বেদের জ্ঞানে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তারা সহজে ঈশ্বরের চরণ সহজে লাভ করতে পারেন।

যদি কোনও পাপী ভক্তির পথ অনুসরণ করে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারে, তবে সেই ভক্তরা যারা আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড় হয়েছেন তারা সহজেই তাঁর কাছে পৌঁছতে পারেন।

9.34

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো , মদ্যাজী মাং(ন্) নমস্কুরু
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবম্ , আত্মানং(ম্) মৎপরায়ণঃ।।34।।

তুমি আমার ভক্ত হও, মদ্‌গতচিত্ত হও, আমার পূজনকারী হও এবং আমাকে নমস্কার কর। এইভাবে আমার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলে, মৎপরায়ণ হলে তুমি আমাকেই লাভ করবে ৷

ভগবান গীতার নবম অধ্যায় শেষ করেছেন সকলকে একটি গূঢ় উপদেশ প্রদান করে| তিঁনি মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন যে তারা যেন তাদের মনকে ঈশ্বরের প্রতি স্থির রেখে, শুধুমাত্র তাঁরই চিন্তন করে। ভগবান প্রতিশ্রুতি দেন যে মানুষ যদি তাঁর প্রতি অবিচল ভক্তিতে নিযুক্ত হয়ে, তারা অবশ্যই ঈশ্বর লাভ করতে সক্ষম হবে।

বিবচনের পরে, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ভগবান শ্রী কৃষ্ণের চরণকমলে প্রার্থনা ও বিবেচনটি নিবেদন এবং হনুমান চালিশা জপের মাধ্যমে সভা সমাপ্ত হয়।

:: প্রশ্নোত্তর ::

মলয় মহাশয়
প্রশ্ন: বত্রিশতম শ্লোকে কেন মহিলাদের বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বৈশ্য ও শূদ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে? পুরুষদের কেন নয়?
উত্তর: এর কারণ হল, যখন মহাভারত ঘটেছিল, তখন পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে বৈষম্য ছিল। মহিলাদের বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যাতে এটি ধরে নেওয়া না যায় যে ভগবদ্গীতা তাদের জন্য নয় এবং এই পবিত্র গ্রন্থ পড়ার তাদের অধিকার নেই। এই শ্লোকটি খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রত্যেকেরই ভগবদ্গীতার পড়ার সমান অধিকার রয়েছে।

মুরলী মহাশয়
প্রশ্ন: সমস্ত জীবন্ত প্রাণীর আত্মা রয়েছে। কীভাবে মানুষ ছাড়া অন্য জীব পরিত্রাণ লাভ করে? যদি কোনও মানুষ তার কর্মের কারণে মাছি হয়ে যায়, তবে সে কীভাবে এবং কতদিন পরে ভগবানের কাছে যেতে পারবে?উত্তর: পরম পূজনীয় স্বামীজীর অভিমত হল, আবার মানুষের জন্মের জন্য সমস্ত জীবনরূপের সমস্ত চক্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সব আমাদের কর্ম বা কর্মের উপর
নির্ভর করে। কর্ম যদি ভালো হয়, তা হলে আরও দ্রুত উচ্চতর যোনি অর্জন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: বলা হয় যে, আমাদের সমস্ত কর্ম ভগবানের কাছে সমর্পণ করা উচিত এবং এভাবে আমরা সেই কর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত হই। যদি তা-ই হয়, তা হলে যে কেউ যে কোনও কিছু করতে পারে এবং ভগবানের কাছে সমর্পন করতে পারে এবং তা থেকে মুক্তি পেতে পারে। কথাটা কি ঠিক?
উত্তর: সেটা কর্ম সম্পাদন করার সময় ব্যক্তির উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। আমরা আমাদের কাজটি করার পরে তা ভগবানকে উৎসর্গ করতে পারি না। পাপ বলে মনে হতে পারে এমন কোনও কাজ যদি সঠিক উদ্দেশ্য নিয়ে বা নিজের কর্তব্যের অংশ হিসাবে করা হয়, তবে তা পাপ হিসাবে বিবেচিত হবে না। আপাতদৃষ্টিতে ভালো দেখায় এমন কোনও কর্ম যদি ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়, তবে তা অবশ্যই পাপ হিসাবে বিবেচিত হবে। সুতরাং, সবটাই নির্ভর করে যে উদ্দেশ্য নিয়ে কর্ম সম্পাদন করা হয়েছে তার উপর।

শালিনী মিশ্র মহাশয়া
প্রশ্ন: তিরিশতম শ্লোকে বলা হয়েছে যে দুরাচারী বা অধার্মিক ব্যক্তিও পরিত্রাণ পান যদি তিনি সর্বান্তঃকরণে ভগবানের উপাসনা করেন। সেক্ষেত্রে, সত্যিই কি কোনও ভাল
কর্ম বা খারাপ কর্মর মধ্যে পার্থক্য আছে ?
উত্তর: কে দুরাচারী নয়? আমরা কি সত্যি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দুরাচারী নই? শুধু এই কারণে যে আমরা হয়তো সমাজে কল্যাণকারী কাজ করছি বা ভগবদ্গীতা পড়ছি, আমাদেরকে শুদ্ধ এবং ভাল করে তোলে না। এই শ্লোকে ভগবান যা বলেছেন তা হল, যদি কোনও ব্যক্তি কিছু অন্যায় করে এবং তার ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনা করে এবং তপস্যা করে, তবে তাকে সেই খারাপ কাজ থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।

অহল্যার গল্পটি এমনই একটি উদাহরণ। তিনি যে তপস্যা করেছিলেন তার কারণে, তিনি তাঁর স্বামীর অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এবং আজ তাঁকে দেবী হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

সত্যনারায়ণ সেট্টি মহাশয়
প্রশ্ন: আমরা যখন হনুমানজী বা অন্য কোনও দেবতার প্রার্থনা এবং পূজা করি, তখন কি তাঁরা মোক্ষ লাভের দিকে পরিচালিত করে না। ভগবান বিষ্ণুর প্রতি ভক্তিই কি মোক্ষ লাভের একমাত্র পথ?
উত্তর: এটি ভগবান বিষ্ণু সম্পর্কে নয়। যখন আমরা আসক্তি থেকে মুক্তি লাভ করি তখন আমাদের মন শুদ্ধ হয়। তখন আমরা ভগবান বিষ্ণুর, যিনি আসলে পরমাত্মার সাকার বা প্রকাশিত রূপ, অতিক্রম করে তাঁর নিরাকর বা অপ্রকাশিত রূপের কাছে পৌঁছতে পারি। যে কোনও দেবতা বা বিষ্ণুর উপাসনা হল পরমাত্মার শরণে পৌঁছোবার দিকে একটি পদক্ষেপ মাত্র।

প্রশ্ন: ধ্যান করার সময় বিচলিত না হয়ে ভগবানের চিন্তায় অটল থাকার জন্য আমরা কি করতে পারি?
উত্তর: এটি কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে আসে। যখন মন বিচরণ করে, তখন ভগবানে মনোনিবেশ করার জন্য আমাদের তাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফিরিয়ে আনতে হবে। এটি সহজ নয় তবে সময় এবং অনুশীলনের সাথে সাথে মনকে বিচলিত হতে না দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ অর্জন করতে সক্ষম হয়।

ॐ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং(য়্ঁ)
য়োগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে রাজবিদ্যারাজগুহ্যয়োগো নাম নবমোऽধ্যায়॥