विवेचन सारांश
ভগবানের প্রিয় ভক্তের লক্ষণ

ID: 5633
बंगाली - বাংলা
শনিবার, 28 সেপ্টেম্বর 2024
অধ্যায় 12: ভক্তিযোগ
2/2 (শ্লোক 11-20)
ব্যাখ্যাকার: গীতা বিশারদ ড: আশু গোয়েল মহাশয়


দীপ প্রজ্জ্বলন, হনুমান চালিশা পাঠ, জগদীশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ও গুরুবন্দনার পর আজকের বিবেচন সত্রের শুভারম্ভ হয়। ভগবানের কৃপাদৃষ্টি ছাড়া ভগবদ্গীতার অধ্যয়ন সম্ভব নয়। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে ঈশ্বরের কৃপাদৃষ্টি আমাদের উপর বর্ষিত হয়েছে যার ফলস্বরূপ আমরা ভগবদ্গীতার অধ্যয়ন, চিন্তন এবং জীবনে গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। হয়তো এটা আমাদের পূর্বজন্মের পুণ্যফল অথবা আমাদের পূর্বপুরুষদের সৎকর্মের ফল কিম্বা সাধু মহাত্মাদের আশীর্বাদ যার ফলস্বরূপ আমরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অধ্যয়ন ও চিন্তন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

আমাদের এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে অধ্যয়ন হেতু আমরা গীতা-গ্রন্থকে বেছে নিইনি। আমরা অতি সৌভাগ্যবান যে এই অমৃতময় গ্রন্থ পঠন, মনন ও চিন্তনের জন্য আমাদের বেছে নেওয়া হয়েছে। মানব জীবনকে সফল ও সার্থক করার জন্য এবং মনুষ্যজন্মের পরম লক্ষ্য অর্থাৎ পরমাত্মার সাথে একাত্মা হওয়ার জন্য শুদ্ধ উচ্চারণের সাথে ভগবদ্গীতার অধ্যয়নে আমরা ব্রতী হয়েছি। গীতা অধ্যয়নের এই আকাঙ্ক্ষা নিশ্চয়ই ঈশ্বরের অপরিসীম কৃপায় আমাদের হৃদয়ে জাগরিত হয়েছে।

ভগবদ্গীতা বিশ্বের একমাত্র গ্রন্থ যেটি কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণীর ভাণ্ডার। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের একমাত্র পথ-প্রদর্শক এই ভগবদ্গীতা। ভগবদ্গীতা বিশ্বের একমাত্র গ্রন্থ যাঁর জয়ন্তী উদযাপিত হয়(মোক্ষদা একাদশী)। এবার এগারো ডিসেম্বর গীতা জয়ন্তী উৎসব পালন করা হবে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা কোন মূল গ্রন্থ নয়। এটি মহাভারতের একটি অংশ। মহাভারত মহর্ষি বেদব্যাস রচিত এক লক্ষ শ্লোকের বিশ্বের বৃহত্তম গ্রন্থ। মহাভারতে আঠারটি পর্ব রয়েছে। তার মধ্যে ভীষ্মপর্বের পঁচিশতম অধ্যায় থেকে বিয়াল্লিশতম অধ্যায় পর্যন্ত আঠারোটি অধ্যায়কে ভগবদ্গীতা বলা হয়। এই আঠারোটি অধ্যায়ে সাতশত শ্লোক আছে। প্রথম শ্লোকটি ধৃতরাষ্ট্র বলেছেন, সঞ্জয় একচল্লিশটি শ্লোক বলেছেন, চুরাশিটি শ্লোক অর্জুন বলেছেন এবং পাঁচশ চুয়াত্তরটি শ্লোক শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে।

আমাদের অনেকেরই হয়ত মনে হয় যে গীতার শুদ্ধ উচ্চারণের সাথে সাথে শ্লোকের অর্থ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াটি হলে ভাল। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি সময় সাপেক্ষ। উপরন্তু এটাও আমাদের জানা দরকার যে গীতার শ্লোকসমূহের গূঢ় অর্থ বারংবার আলোচনা করার পরেও হৃদয়ঙ্গম করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু গীতার শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ জেনে শুদ্ধ উচ্চারণে পঠন বা শ্রবণ করলেও মানুষের জীবনে বিশেষ পরিবর্তন হয়, মনের চঞ্চলতা হ্রাস পায় এবং সাত্ত্বিক গুণসমূহের বিকাশ হয়। অর্থাৎ মন্ত্রের ন্যায় এই প্রক্রিয়ার ফল প্রাপ্ত হয়। তাই গীতাকে মন্ত্রময়ী বলা হয়।

পরম পূজ্য গোবিন্দদেব গিরিজী মহারাজ বলেন —

“গীতা পড়ুন,পড়ান এবং জীবনে প্রয়োগ করুন।”

এই অধ্যায়ের প্রথম দশটি শ্লোকের বিশ্লেষণ পূর্বার্ধের বিবেচনা সত্রে করা হয়েছিল। অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে অর্জুন জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে সগুণ-সাকার ভগবানের উপাসক এবং নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্মের উপাসকের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠযোগী ? অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান বলেছিলেন যে সগুণ-সাকার ভগবানের উপাসকই শ্রেষ্ঠ যোগী। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে এরূপ ভক্তদের তিনি মৃত্যুরূপ সংসার-সাগর থেকে শীঘ্রই উদ্ধার করেন। অর্জুনকে এরূপ শ্রেষ্ঠ যোগী হওয়ার জন্য ভগবান নানাবিধ সাধন প্রণালী জানিয়েছেন। ভগবান অষ্টম শ্লোকে মন-বুদ্ধি তাঁকে অর্পণ করা, নবম শ্লোকে অভ্যাসযোগ এবং দশম শ্লোকে কেবলমাত্র তাঁর জন্য কর্মপরায়ণ হওয়াকে ঈশ্বর প্রাপ্তির পৃথক পৃথক সাধন প্রণালী বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী শ্লোকে ভগবান অন্য একটি সাধন মার্গের উল্লেখ করে বলেছেন —


12.11

অথৈতদপ্যশক্তোসি, কর্তুং(ম্) মদ্যোগমাশ্রিতঃ
সর্বকর্মফলত্যাগং(ন্), ততঃ(খ) কুরু য়তাত্মবান্।।11।।

যদি তুমি আমার যোগের (সমত্বের) আশ্রিত থেকে এইগুলিও (পূর্বশ্লোকে কথিত সাধনগুলি) করতে অসমর্থ হও তাহলে মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করে সমস্ত কর্মফলের ইচ্ছা ত্যাগ কর।

ভগবান বলেছেন যে অর্জুন যদি তাঁর প্রতি মন-বুদ্ধি সমর্পণ করতে অসমর্থ হন তাহলে অভ্যাসযোগের দ্বারা ভগবানে স্থিতি লাভ করার চেষ্টাও একপ্রকার সাধন। অভ্যাসযোগেও যদি অসমর্থ হন তাহলে দশম শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে একমাত্র ভগবদপ্রাপ্তির জন্য ভক্তি-উৎপাদক শাস্ত্রোক্ত কর্মাদি (যথা – শ্রবণ, কীর্তন, শাস্ত্রাদি পাঠ , পূজার্চনা) করলেও সিদ্ধি লাভ হবে। এই শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে অর্জুন যদি উপরিউক্ত যে কোন সাধন প্রণালীতে অসমর্থ হন, তাহলে মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করে কর্মের ফলত্যাগরূপ সাধনা করলেও ঈশ্বর লাভ করা সম্ভব হবে।

দশম শ্লোকে ভগবান তাঁর উদ্দেশ্যে সমস্ত কর্ম অর্পণ করে তাঁকে প্রাপ্ত করার কথা বলেছেন অর্থাৎ ভগবানের জন্য সমস্ত কর্ম করায় ভক্তির প্রাধান্যতা থাকে। তাই সেটি ‘ভক্তিযোগ’। এই শ্লোকে সর্বকর্মফলত্যাগে শুধুমাত্র ফলত্যাগের প্রাধান্য থাকায় এটিকে ‘কর্মযোগ’ বলা হয়। অর্থাৎ দুটিই স্বত্রন্ত্র সাধন।

এইরূপ বিবিধ সাধন-প্রণালীর উল্লেখ করে পরবর্তী শ্লোকে সর্বকর্মফলত্যাগরূপ সাধনের শ্রেষ্ঠতা জানিয়েছেন।

12.12

শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্, জ্ঞানাদ্ধ্যানং(ব্ঁ) বিশিষ্যতে।
ধ্যানাত্কর্মফলত্যাগঃ(স্),ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্।।12.12।।

অভ্যাসের থেকে শাস্ত্রজ্ঞান শ্রেষ্ঠ, শাস্ত্রজ্ঞান থেকে ধ্যান শ্রেষ্ঠ, ধ্যানের থেকে সমস্ত কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কারণ কর্মফল ত্যাগের সাহায্যে অচিরাৎ পরম শান্তি লাভ হয়।

বিবিধ সাধন প্রণালী উল্লেখ করার পর পরিশেষে ভগবান বললেন যে অভ্যাস অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেয় , জ্ঞান অপেক্ষা ধ্যান উত্তম এবং ধ্যান অপেক্ষা কর্মফলত্যাগ অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মযোগ শ্রেষ্ঠ।

পূর্ববর্তী চারটি শ্লোকে ভগবান চারপ্রকার সাধনের কথা বলেছেন — সমর্পণ, অভ্যাসযোগ, ভগবদকর্ম , কর্মফলত্যাগ। আপাতদৃষ্টিতে এটা মনে হতে পারে যে প্রথম সাধনটির থেকে পরবর্তী সাধনটি অপেক্ষাকৃত গৌণ এবং সর্বশেষ বর্ণিত কর্মফলত্যাগরূপ সাধন সর্বাপেক্ষা নিন্মমানের কারণ প্রথম তিনটি সাধন-এ ভগবদরূপ ফলের উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু কর্মফলত্যাগরূপ সাধনের ফল হিসেবে ভগদপ্রাপ্তির কথা বলা হয় নি। প্রকৃতপক্ষে সেটি নয়। উপরিউক্ত চারটি সাধনার দ্বারাই ভগবদপ্রাপ্তি সম্ভব। সাধকদের রুচি, বিশ্বাস এবং যোগ্যতা পৃথক হওয়ার  জন্যই ভগবান পৃথক পৃথক সাধনার কথা জানিয়েছেন।

'শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্' --- কোন  একটি বিষয়ে স্থিতি (স্থিরতা) লাভ করার জন্য বারংবার চেষ্টা করাকে বলা হয় 'অভ্যাস'। এই অভ্যাসগুলো জড়ের অর্থাৎ শরীর, ইন্দ্রিয়,মন ও বুদ্ধির আশ্রয় নিয়েই করা হয়। জড়ের থেকে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলেই যোগ হয়, কিন্তু যদি উপাস্য-তত্ত্ব বিষয়ে কোন জ্ঞান না থাকে তাহলে এই প্রাণায়মাদি বা নাম-জপাদি অভ্যাসে আধ্যাত্মিক উন্নতি কিছুই হয় না কারণ শাস্ত্রজ্ঞান না থাকায় জড়ত্বের সাথে সম্পর্ক থেকেই যায়। তাই ভগবান বলেছেন যে, না জেনে বা না বুঝে অভ্যাস করা অপেক্ষা বোঝা ভাল অর্থাৎ অভ্যাস অপেক্ষা অধ্যাত্মতত্ত্ব বা উপাস্যের গুণকর্মাদি শ্রবণরূপ জ্ঞানালোচনা শ্রেয়।

‘জ্ঞানাদ্ধ্যানম্ বিশিষ্যতে’ – এখানে ‘ধ্যান’ শব্দটি শুধুমাত্র মনের একাগ্রতারূপ ক্রিয়ার বাচক, ধ্যানযোগের বাচক নয়। ধ্যানের সাহায্যে মন নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু শুধুমাত্র শাস্ত্র-জ্ঞানে মন নিয়ন্ত্রিত হয় না। ধ্যানের দ্বারা মন নিয়ন্ত্রিত হলে যে শক্তি সঞ্চয় হয়, তদ্রুপ শাস্ত্রজ্ঞানে হয় না। মন একাগ্র হলে সাধক অতি সহজেই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হন। সেইজন্য ভগবান জ্ঞান থেকে ধ্যানকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

‘ধ্যানাত্কর্মফলত্যাগঃ’ — ভগবান এখানে বলেছেন যে ধ্যান অপেক্ষা কর্মফলত্যাগ শ্রেষ্ঠ কারণ কর্মফলের আসক্তি বা বাসনার দ্বারা যদি চিত্ত কলুষিত থাকে, তাহলে ঈশ্বরের প্রতি স্থায়ীভাবে চিত্ত সমর্পণ করা সম্ভব হয় না। ধ্যানাবস্থায় চিত্ত সমাহিত হলেও ধ্যানভঙ্গে যদি আবার মনে ফলাকাঙ্ক্ষা জাগে তাহলে আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতি কিছুই হয় না বরঞ্চ কেবল অভিমান, কপটতা বৃদ্ধি পায়। ‘কর্মফলত্যাগ’ কর্মযোগেরই অপর নাম কারণ কর্মযোগে ‘কর্মফলত্যাগ’ই মুখ্য। সুখ-দুঃখ, মান-অপমান ,স্তুতি-নিন্দা ইত্যাদি সমস্ত অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতি কর্মের ফলরূপে উপস্থিত হয়। কর্মে আসক্তি এবং ফলেচ্ছাই সংসার বন্ধনের   মূল কারণ। এগুলোর প্রতি আসক্তি বা দ্বেষ থাকলে পরমাত্মাকে লাভ করা সম্ভব হয় না।

গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে অর্জুন বলেছিলেন যে বায়ুকে যেমন আবদ্ধ করা দুঃসাধ্য ঠিক তেমনই চঞ্চল মনকে নিরোধ করা খুব কঠিন। ভগবানের কাছে এর উপায় জানতে চাইলে ভগবান বলেছিলেন –

অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে ॥৬.৩৫॥

অর্থাৎ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা সম্ভব। অভ্যাসে দুঃসাধ্য কাজও সুসাধ্য হয়।

কর্মফল ত্যাগের অর্থ হল কর্মফলের ইচ্ছাকে ত্যাগ। 'ইচ্ছা' মনে জাগ্রত হয় এবং 'ফলত্যাগ' বাহ্যতঃ হয়। ফলত্যাগ করলেও অন্তরে ফলের কামনা থাকতে পারে। ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ হলে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হওয়ার কোন হেতুই থাকে না। মুক্তি বস্তুত্যাগের দ্বারা হয় না, কামনা ত্যাগের দ্বারা মুক্তি হয়।

‘ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্’ — এখানে ‘ত্যাগাত্’ পদটি ‘কর্মফলত্যাগের’ জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যা নিজ স্বরূপ অথবা যার সাথে নিজের কোন সম্পর্ক নেই, তাকে ত্যাগ করা যায় না। যেমন সূর্যের থেকে তার দীপ্তি বা তাপকে আলাদা করা অসম্ভব কারণ এগুলো সূর্যের স্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে ত্যাগ তাকেই করা যায় যা নিজের নয় অথচ নিজের বলে ভ্রম হয়। তাৎপর্য হল এই যে, জীব স্বয়ং চেতন ও অবিনাশী এবং জগৎ-সংসার জড় এবং বিনাশশীল। কিন্তু জীব ভ্রমবশত নিজের স্বরূপকে ভুলে গিয়ে বা চিনতে না পেরে নিজের শরীরকে এবং জগৎ-সংসারকে নিজের বলে মনে করে। ‘ত্যাগত্’ পদটির প্রকৃত অর্থ হল জগতের সাথে মনে করা এই সম্পর্ক ত্যাগ। কর্ম এবং তার ফলের সাথে ভ্রমবশতঃ মেনে নেওয়া সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করাই ত্যাগের প্রকৃত স্বরূপ। ‘শান্তিঃ’ পদটির অর্থ হল পরমশান্তি প্রাপ্ত হওয়া, একেই ভগবদপ্রাপ্তি বলা হয়।

নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্ম এবং সগুণ -সাকার ভগবানের উপাসকদের মধ্যে সগুণ-উপাসকদের শ্রেষ্ঠ বলে জানিয়ে ভগবান অর্জুনকে সগুণ-উপাসনা করার উপদেশ দেন। ভগবান অষ্টম থেকে একাদশ শ্লোক অবধি এই বিষয়ে চারটি সাধন প্রণালীও জানিয়েছেন। এবার ত্রয়োদশ থেকে ঊনবিংশ শ্লোক অবধি ভগবান চারটি সাধন দ্বারা সিদ্ধিবস্থা প্রাপ্ত তাঁর প্রিয় ভক্তের লক্ষণসমূহের  বর্ণনা করেছেন।

12.13

অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং(ম্), মৈত্রঃ(খ্) করুণ এব চ
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ(স্) , সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।13।।

কোন প্রাণীর প্রতি দ্বেষভাব না পোষণ করে, সকলের জন্য মৈত্রী ভাব, করুণা, দয়া, মমতা রহিত, অহঙ্কার বর্জিত সুখ দুঃখে সমান ভাব রাখা।

ভগবান এখানে তাঁর  প্রিয় ভক্তের লক্ষণসমূহ জানাতে আরম্ভ করেছেন ---

১) অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাম্ :- অর্থাৎ যিনি কারোর প্রতি দ্বেষভাব পোষণ করেন না। ভক্তের শরীর, মন,বুদ্ধি,ইন্দ্রিয়াদি এবং সিদ্ধান্তের প্রতিকূলে কেউ যতই খারাপ ব্যবহার করুক, ইষ্ট প্রাপ্তিতে বাধা দান করুক, যে কোন ভাবে আর্থিক বা শারীরিক ক্ষতি করুক তাতে তাঁর হৃদয়ে কখনও বিন্দুমাত্র দ্বেষভাব আসে না। কারণ তিনি সকল প্রাণীর মধ্যেই তাঁর প্রভুকেই দর্শন করেন।

প্রাণীমাত্রই স্বরূপতঃ ভগবানেরই অংশ। সুতরাং কোন প্রাণীর প্রতি দ্বেষভাব রাখাই হল ভগবানের প্রতি দ্বেষ করা। কোন প্রাণীর প্রতি দ্বেষভাব থাকলে ভগবানের সাথে অভিন্নতা তথা অনন্যপ্রেম হওয়া সম্ভব নয়। সকল প্রাণীর প্রতি দ্বেষভাবরহিত হলেই ভগবানে পূর্ণ প্রেম হওয়া সম্ভব।

২) সর্বভূতানাম মৈত্রঃ-  অর্থাৎ ভক্তের চিত্তে সমস্ত ভূতমাত্রে (প্রাণীতে) ভগবদ্ভাব থাকায় তিনি সকলের সাথে মৈত্রপূর্ণ এবং সদ্ব্যবহার করেন। সকলের সাথে বন্ধুত্ব কাম্য। অনেক সময় কারো সাথে আমাদের মত বিরোধ হলে আমরা তাকে বারবার বোঝাবার চেষ্টা না করে সমস্ত বিষয়টি তার উপরেই ছেড়ে দেই। এই প্রসঙ্গে রহিমদাস জী বলেন যে-

রুঠে সজন মনাইয়ে জো রুঠে সৌ বার,
রহিমন ফির-ফির পোইয়ে টুটে মুক্তাহার।  

অর্থাৎ: মুক্তার মালা ছিঁড়ে গেলে, ঠিক যেভাবে তা বারংবার তার দিয়ে গাঁথা হয় , ঠিক তেমনই নিজের আপন কেউ একশো বারও (বারবার) যদি রাগ করে, তবুও তাকে বারংবার বোঝান উচিৎ।

এই দোঁহাতে রহিম দাস জী 'সজন' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সাহিত্যিকগণ সজন পদটিকে তিনভাবে বর্ণনা করেছেন:-

প্রথম: সজন অর্থাৎ আত্মীয়, নিজের আত্মীয়-স্বজন।

যেভাবে মূল্যবান মুক্তার মালা ছিঁড়ে গেলে, মুক্তাগুলোকে আবার তার দিয়ে গাঁথা হয়, ঠিক সেইভাবেই তাদেরও বারবার বুঝিয়ে মান ভাঙাতে হয়।

দ্বিতীয়: সজন অর্থাৎ সজ্জন ব্যক্তি। সজ্জন ব্যক্তিকেও বারবার বোঝানো উচিত।

তৃতীয়:  সজন অর্থাৎ আপনার প্রিয়জন, যেমন স্বামী-স্ত্রী।


৩) সর্বভূতানাম্ করুণ:- পতঞ্জলি যোগশাস্ত্রে চিত্তশুদ্ধির জন্য চারটি সাধনের কথা বলা হয়েছে-

- সুখী মানুষের সাথে মৈত্রী

- দুঃখী মানুষের প্রতি করুণা

- পুণ্যাত্মাদের প্রতি প্রসন্নতা ও নম্রতা

- পাপাত্মাদের প্রতি উদাসীনতা

ভগবান বুদ্ধদেব এবং শ্রীমদভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একে দুভাগে ভাগ করেছেন। ‘মৈত্র চ করুণঃ’ অর্থাৎ   সুখী ও পুণ্যাত্মাদের সাথে মৈত্রীভাব রাখা উচিৎ এবং দুঃখী ও পাপাত্মাদের প্রতি করুণার ভাব রাখা উচিৎ । করুণা ও দয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ। করুণা হল দয়ার বিশাল রূপ এবং দয়া পরিস্থিতি অনুসারে আসে। করুণা সর্বদা হৃদয়ে অবস্থান করে, অন্যদিকে দয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠার অহংভাব থাকে, যেমন “আমি শ্রেষ্ঠ, তাই আমি কারও প্রতি দয়া করছি” ইত্যাদি। কিন্তু করুণায় আমরা অন্যের দুঃখ আত্মস্থ করে নিই । সাধু মহাত্মাদের হৃদয়ে সর্বদা সকল জীবের প্রতি করুণার ভাব প্রবাহিত হয় । দয়া হল শক্তি সম্পন্ন মানুষের গুণ।  যেমন রাজা,পুলিশ অফিসার প্রভৃতি প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ দয়া দেখাতে পারে। কিন্তু করুণা একটি মানবিক গুণ, এর জন্য বাহ্যিক সাধনের আবশ্যকতা নেই।

৪) নির্মম :--  মমত্ববোধ  অর্থাৎ আমি এবং আমার, এই ভাব থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়াকে নির্মম বলা হয়  । যদিও প্রাণীমাত্রেরই প্রতি ভক্তের স্বাভাবিক মৈত্রী ও করুণার ভাব থাকে, তথাপি কারও প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র মমত্ববোধ থাকে না। প্রাণী ও পদার্থে মমত্ববোধ মানুষকে সংসারে আবদ্ধ করে। ভক্ত এই মমত্ববোধ–বর্জিত হন।  

একবার এক দম্পতি দোকানে গিয়ে একটা ফ্রিজ পছন্দ করল। দোকানদার বলল, “আপনার নামে একটা ট্যাগ এই ফ্রিজে লাগিয়ে দিই তাহলে আমরা বিল না করা পর্যন্ত অন্য গ্রাহক এটি নিতে পারবে না। ঠিক তখনই দুই শ্রমিক আরেকটি ফ্রিজ নিয়ে যাচ্ছিল। শ্রমিকরা যখন ঐ দম্পতির পছন্দকরা রেফ্রিজারেটরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ভদ্রলোক চেঁচিয়ে বললেন, “সাবধানে! সাবধানে ! আমার ফ্রিজে যেন ধাক্কা না লাগে”। এই 'আমার' ভাবই মমত্ববোধ।


৫) নিরহঙ্কার- অর্থাৎ অহঙ্কারশূন্য হওয়া। শরীর,মন, ইন্দ্রিয়াদি জড় পদার্থগুলোকে নিজ স্বরূপ মনে করলে অহংকার উৎপন্ন হয়। ভক্তের এইসব জড় পদার্থের প্রতি অহংভাব না থাকলে এবং ভগবানের সাথে নিত্য সম্বন্ধ অনুভব করলে তাঁর চিত্তে স্বতঃই দৈবী গুণসমূহ প্রকটিত হয়। এই গুণসমূহকে তিনি নিজের না ভেবে ভগবানের বলে মনে করেন এবং অহংভাব থেকে সর্বতোভাবে রহিত হন।


৬) সমদুঃখসুখঃ :- যিনি সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন থাকেন, তিনি ভগবানের প্রিয় ভক্ত। । সম্পূর্ণরূপে সম থাকা কঠিন, তবে এর তীব্রতা এবং সময়ের অবধিকে হ্রাস করার চেষ্টা অবশ্যই করা উচিৎ। অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতি মানুষকে সুখী ও দুঃখী করে। অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মনে হর্ষ-শোকাদি বিকার না হওয়াকে সুখ-দুঃখে সমত্ব ভাব বলা হয়।

৭) ক্ষমী :- নিজের প্রতি কেউ যদি কোন অপরাধ করে, তবে তাকে শাস্তি দেবার কথা না ভেবে যারা ক্ষমা করে , তাদের বলা হয় 'ক্ষমী'। সাধারণত দেখা যায় যে নিজে কোন দোষ করলে মানুষ শাস্তির বদলে ক্ষমা প্রার্থী হয়, কিন্তু অন্য কেউ দোষ করলে ক্ষমার বদলে শাস্তি দেবার প্রবণতা থাকে। ইংরেজিতে দুটো শব্দ আছে - Forgive & Forget --যাকে আপনি ক্ষমা করেছেন তাকে ভুলে যান এবং যে কারণে আপনি তাকে ক্ষমা করেছিলেন সেটাও ভুলে যান। ক্ষমা স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। যখন অন্য ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা জানায় এই বলে যে আপনি তাকে ক্ষমা করেছেন কিন্তু আপনার সে কথা মনেও নেই, সেটিই হলো প্রকৃত ক্ষমা।

12.14


সন্তুষ্টঃ(স্) সততং(য়্ঁ) য়োগী, য়তাত্মা দৃঢনিশ্চয়ঃ।
ময়্যর্পিতমনোবুদ্ধি(র্), য়ো মদ্ভক্তঃ(স্) স মে প্রিয়ঃ।।12.14।।

ক্ষমাশীল, সদা সন্তুষ্ট যোগী, সংযতদেহ, দৃঢ়চিত্ত ও আমাতে মনবুদ্ধি অর্পিত এরূপ যাঁরা আমার ভক্ত, তাঁরা আমার প্রিয়।

পূর্ববর্তী শ্লোকে ভক্তের সাতটি লক্ষণ জানাবার পর এই শ্লোকে ভগবান পুনরায় পাঁচটি লক্ষণের সূচনা দিয়েছেন।

৮) সন্তুষ্টঃ সততম্ --- সর্বদা সন্তুষ্ট। জীবের মনের অনুকূল প্রাণী,পদার্থ, ঘটনা, পরিস্থিতি ইত্যাদির সংযোগে এবং মনের প্রতিকূল প্রাণী,পদার্থ, ঘটনা, পরিস্থিতি ইত্যাদির বিয়োগে সন্তুষ্টি আসে। কিন্তু এই সন্তোষ বা বিষাদ চিরস্থায়ী হয় না। স্বয়ং নিত্য হওয়ায় জীবের নিত্য পরমাত্মার অনুভুতিই স্থায়ী সন্তুষ্টিদায়ক  হয়।

গৌ-ধন, গজ-ধন, বাজী-ধন
অউর রতন-ধন, খান।
জব আওয়ে সন্তোষ ধন,
সব ধন ধুরী সমান।।

অর্থাৎ যতই ধন - সম্পদ আসুক -- যতক্ষণ না সন্তোষ ধন লাভ হচ্ছে ততক্ষণ সবই অপর্যাপ্ত বোধ হবে ।

‘সন্তুষ্ট’-এর সাথে ‘সততম্’ পদটি ব্যবহার করে ভগবান ভক্তের সেই চিরস্থায়ী সন্তুষ্টির জানিয়েছেন যাতে কখনও কোন তারতম্য হয় না এবং তারতম্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সব যোগমার্গে সিদ্ধিপ্রাপ্ত যোগীদের  এই সন্তুষ্টি সর্বক্ষণ বজায় থাকে।  কর্মযোগ,জ্ঞানযোগ বা ভক্তিযোগের মাধ্যমে পরমাত্মাকে প্রাপ্তকারী ব্যক্তিকে এখানে যোগী বলা হয়েছে।

সন্তোষ অপেক্ষা  বড় আর কোন ধন নেই। মহাভারতে যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে একশত প্রশ্ন করেছিলেন। একটি প্রশ্ন ছিল – “দরিদ্র কে”? যুধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন — “যার কোন কিছুতেই সন্তুষ্টি নেই সেই দরিদ্র”।

৯) য়তাত্মা ---- যাঁর মন,বুদ্ধি,ইন্দ্রিয়সহ শরীরের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, তিনিই ‘যতাত্মা’। সিদ্ধ ভক্তদের মন,বুদ্ধি ইত্যাদি বশ করতে হয় না, বরং এগুলো স্বাভাবিকভাবে তাঁদের বশে থাকে। তাই তাঁদের দ্বারা কোনপ্রকার ইন্দ্রিয়জনিত দুর্গুণ-দুরাচারের আচরণ ঘটে কখনই সম্ভব নয়।

১০) দৃঢ়নিশ্চয়---- সিদ্ধ ভক্তদের দৃষ্টিতে জগতের পৃথক সত্তার কোন অস্তিত্ব থাকে না। তাদের একমাত্র ভগবানের সাথেই নিত্যসিদ্ধ সম্বন্ধ অনুভূত হয়। তাই তাঁরা ভগবানের দৃঢ়নিশ্চয় হয়ে থাকেন। তাদের এই দৃঢ়তা বুদ্ধিতে নয়, ‘স্বয়ং’-এ হয়, যার প্রতিফলন বুদ্ধিতে হয়।

শ্রীরামচরিতমানসে কথিত আছে যে দেবী সতী দেহত্যাগের পর পার্বতী রূপে জন্মগ্রহণ করে পুনরায় মহাদেবকে পতিরূপে পাবার জন্য তপস্যায় ব্রতী হন । সপ্তর্ষিগণ তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য সেখানে উপস্থিত হয়ে মহাদেব সম্বন্ধে অনেক বিরূপ কথা বলেন । কিন্তু দেবী পার্বতী বললেন -- “মহেশ্বরকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য যদি আমাকে হাজার বারও জন্ম নিতে হয় তাও নেবো। তবুও আমি তাঁকেই চাইবো”। এই হলো দৃঢ়নিশ্চয়।

১১) অর্পিত মন --- ভক্তের মন ভগবানের প্রতি সমর্পিত হতে হবে।

১২) অর্পিত বুদ্ধি --- ভক্তের বুদ্ধিও ভগবানের প্রতি সমর্পিত হতে হবে।

মন ও বুদ্ধি ঈশ্বরকে অর্পণের ব্যাপারে অরণ্যকাণ্ডে সুতীক্ষ্ণ ঋষির একটি সুন্দর গল্প আছে।

সুতীক্ষ্ণ ঋষি প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। একবার প্রভু শ্রীরাম সুতীক্ষ্ণ ঋষিকে দর্শন দেবার জন্য তাঁর আশ্রমে গিয়েছিলেন। সুতীক্ষ্ণ ঋষি প্রভুর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন এবং প্রফুল্লিত হৃদয়ে মৃদু হাস্য করছিলেন। প্রভু শ্রীরামচন্দ্র তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঋষি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন। ভগবান রাম শুকনো পাতা মাড়িয়ে আওয়াজ করলেন, তবুও ঋষির ধ্যান ভঙ্গ হলো না। ঋষির ধ্যানের মগ্নতা এতো গভীর ছিল যে বাইরের কোন আওয়াজ তাঁর কানে প্রবেশ করেনি। অগত্যা ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ঋষির ধ্যানের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং ধ্যানে প্রভুর যে রূপ ঋষি দর্শন করছিলেন তা মুছে দিলেন। ঋষি খুব বিচলিত হয়ে চোখ খুলে দেখলেন, ধ্যানে যে প্রভুকে হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। তখন তিনি প্রভুকে বললেন —

নহি সৎসঙ্গ জোগ জপ জাগা,
নহি দৃঢ় চরণ কমল অনুরাগা।

এক বানি করুণানিধন কী,
সো প্রিয় জাকে গতি ন আন কী।।

অর্থাৎ: আমি তো সৎসঙ্গ, যোগ, জপ, যজ্ঞ কিছুই করি নি অথবা আমার প্রভুর চরণকমলে প্রতি কোন গাঢ় অনুরাগ নেই । হ্যাঁ, দয়ার ভাণ্ডার প্রভুর একটি কথা নিশ্চিত যে-- যার আর কেউ সহায় নেই, সে প্রভুর ভীষণ প্রিয় ।

 ভগবানকে মন এবং বুদ্ধি সমর্পণের   এটি একটি অতি সুন্দর দৃষ্টান্ত।  

শ্রীভগবান বলেছেন যে এরূপ ভক্ত আমার অত্যন্ত প্রিয়।

12.15

য়স্মান্নোদ্বিজতে লোকো, লোকান্নোদ্বিজতে চ য়ঃ
হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈঃ(র্),মুক্তো য়ঃ(স্) স চ মে প্রিয়ঃ।।15।।

যাঁর দ্বারা কোনো প্রাণী বিচলিত হয় না এবং যিনি নিজে কোনো প্রাণীর দ্বারা বিচলিত হন না এবং যিনি আনন্দ, অমর্ষ (হিংসা), ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত, তিনিই আমার প্রিয়।

ভগবান বলেছেন যিনি কোন জীবের দ্বারা উদ্বিগ্ন হন না এবং যিনি নিজেও কোন জীবকে উদ্বিগ্ন করেন না এবং যিনি হর্ষ, ক্রোধ, ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত। এই শ্লোকে ভগবান তাঁর প্রিয় ভক্তের ছয়টি লক্ষণের বর্ণনা করেছেন।

১৩) যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো --- অর্থাৎ যার থেকে কোনো প্রাণী উদ্বেগ প্রাপ্ত করে না। ভক্ত সবর্ত্র এবং সর্বভূতে তাঁর পরমপ্রিয় প্রভুকে দর্শন করেন। তাই তাঁর মন, বাক্য ও শরীর দ্বারা কৃত সমস্ত কর্মই একমাত্র ভগবানের জন্য হয়। এরূপ অবস্থায় ভক্ত কোন প্রাণীকে কীভাবে উদ্বিগ্ন করতে পারেন? কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে ভক্তের কোন ক্রিয়া এমনকী তাঁর সৌম্য চেহারা দেখেও কোন কোন ব্যক্তি ঈর্ষাবশতঃ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে এবং ভক্তদের অকারণে হিংসা ও বিরোধিতা করে। আসলে এই সব ব্যক্তির নিজের রাগ-দ্বেষযুক্ত স্বভাবের জন্যই এই উদ্বেগ বা বিদ্বেষ পরিলক্ষিত হয়, এতে ভক্তের কোন দোষ নেই।

নীতি শতকে ভর্তৃহরি ঋষি  বলেছেন-

মৃগমীনসজ্জনানাং তৃণজলসন্তোষবিহিতবৃত্তীনাম্।
লুব্ধকধীবরপিশুনা নিষ্করণবৈরীণো জগতি ॥

অর্থাৎ হরিণ,মাছ ও সজ্জন ব্যক্তি সর্বদা সন্তুষ্টচিত্তে  থাকে। তারা ঘাস, জল এবং সন্তোষের সাথে বাস করে, তবুও হরিণ শিকারীদের দ্বারা, মাছ জেলেদের দ্বারা এবং সজ্জন ব্যক্তিগণ দুষ্ট প্রবৃত্তির মানুষ দ্বারা কোন কারণ ছাড়াই নিপীড়িত হয়। 

১৪) লোকান্নোদ্বিজতে চ য়ঃ — আগে ভগবান বলেছেন যে ভক্তের দ্বারা কোন প্রাণী উদ্বেগপ্রাপ্ত হয় না। এবার তিনি অন্য একটি লক্ষণ উল্লেখ করেছেন। ভগবান বলেছেন যে ভক্তরা নিজেরাও কারও দ্বারা উদ্বিগ্ন হন না। কারণ ভগবানে আন্তরিক প্রেমে নিমগ্ন থাকায় ভক্ত সর্বত্র এবং সর্বভূতে ভগবদ্দর্শন করেন। তাই প্রাণীমাত্রেরই ক্রিয়াতে, সেটি যতই তাঁর ইচ্ছার প্রতিকূল হোক না কেন, তিনি ভগবানের লীলাই দর্শন করে থাকেন অর্থাৎ কোন ক্রিয়ার দ্বারাই তাঁর বিন্দুমাত্র উদ্বেগ হয় না।

অন্যদের দেওয়া কষ্ট থেকে নিজেদের কীভাবে সরিয়ে রাখা যায় , তার একটি সুন্দর স্তবগান রয়েছে-

অর্থাৎ ভগবানের আশ্রয়ে না যাওয়া অবধিই মনে সর্বপ্রকার চিন্তা। যিনি ভগবানের শরণাগত হয়েছেন, তাঁর আর কিসের চিন্তা? ঈশ্বরে পূর্ণ সমর্পণ হলে সংসারের সমস্ত কষ্টের লাঘব হয়।

১৫) হর্ষ মুক্ত --- ভগবানের প্রিয় ভক্তের আর একটি লক্ষণ হল সর্বপ্রকার হর্ষাদি, বিকার থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত। তার মানে এই নয় যে ভক্ত সর্বতোভাবে হর্ষশূন্য(অপ্রসন্ন) হয়ে থাকেন। বরঞ্চ তার  প্রসন্নতা নিত্য, বিশিষ্ট এবং অলৌকিক হয়। তাঁর প্রসন্নতা সাংসারিক পদার্থের সংযুক্তি-বিযুক্তিতে উৎপন্ন ক্ষণিক, বিনাশশীল এবং হ্রাস-বৃদ্ধিসম্পন্ন হয় না। সর্বত্র ভগবদবুদ্ধি হওয়ায় ইষ্টদেব এবং তাঁর লীলা  সর্বদাই অনুভব করে প্রসন্নচিত্তে অবস্থান করেন ।

১৬) অমর্ষ মুক্ত---  কারও সুখ,যশ,উন্নতি ইত্যাদি সহ্য করতে না পারাকে বলা হয় ‘অমর্ষ’। অন্যজনের সুখ-সুবিধা, অর্থ,বিদ্যা,সন্মান। যশ-প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি প্রাপ্ত হতে দেখলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় পরশ্রীকাতর হয়। এমনকী কিছু সাধকের চিত্তেও কখনও কখনও অন্য সাধকদের আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং প্রসন্নতা দেখে বা শুনে ঈর্ষাভাব উৎপন্ন হয়। অমর্ষ মুক্ত তিনিই, যিনি এসব বিকার থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত। কারণ তাঁর কাছে তাঁর একমাত্র প্রিয় ইষ্টদেব ব্যতীত অন্য কারও পৃথক অস্তিত্ব থাকে না।

সাধকের অন্তরে যদি কারও আধ্যাত্মিক উন্নতি দেখে নিজের উন্নতির ভাব জাগ্রত হয়, তাহলে এই ভাবটি তাঁর সাধনার পক্ষে সহায়ক হয়। কিন্তু সাধকের মনে যদি এমনভাবে আসে — “ওর কীভাবে হল, আমার কেন হল না”, তাহলে তার চিত্তে অমর্ষভাব উৎপন্ন হয়, যেটি তাকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

১৭)  ভয় মুক্ত --- দুটি কারণে মানুষের মনে ভয় উৎপন্ন হয়।

  • বাহ্যিক কারণ: হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, চোর,ডাকাত ইত্যাদির থেকে অনিষ্ট হওয়া বা সাংসারিক কোন ক্ষতির আশঙ্কার থেকে উৎপন্ন ভয়।

  • অভ্যন্তরীণ কারণ: ছল-চাতুরী,কপট,ব্যভিচার ইত্যাদি শাস্ত্রবিরোধী ভাব বা আচরণ থেকে উৎপন্ন ভয়।

সব থেকে মানুষের বড় ভয় হল মৃত্যুভয়। এমনকী বিবেকশীল ব্যক্তিদেরও মৃত্যুভয় থাকে। সমস্ত ভয়ই শরীরের আশ্রয়েই উৎপন্ন হয়। সাধক যতক্ষণ সর্বতোভাবে ভগবানের শরণে না যান, ততক্ষণ তার  মনে ভয় থাকে। ভক্ত সর্বক্ষণ ভগবদচরণের আশ্রিত থাকেন,তাই তিনি সদাই ভয়বর্জিত।

১৮) উদ্বেগমুক্ত --- মন একভাবে না থেকে বিক্ষিপ্ত হলে তাকে ‘উদ্বেগ’ বলা হয়। উদ্বেগ হওয়ার কারণ হল অজ্ঞতাজনিত কামনা এবং আসুরীস্বভাব। ভক্তের আসুরীস্বভাব সাধন অবস্থাতেই নষ্ট হয় যায়। ভক্তের অজ্ঞান সর্বতোভাবে দূরীভূত হওয়ায় তাঁর কোন স্বতন্ত্র অভিলাষ থাকে না। ভক্ত তাঁর ক্রিয়ার ফলস্বরূপ অথবা প্রাপ্ত অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভগবানের কৃপাপূর্ণ বিধানই দেখেন এবং নিরন্তর আনন্দে বিভোর হয়ে থাকেন। তাই ভক্তের উদ্বেগ সর্বতোভাবে দূর হয়ে যায়।

12.16

অনপেক্ষঃ(শ্) শুচির্দক্ষ, উদাসীনো গতব্যথঃ
সর্বারম্ভপরিত্যাগী, য়ো মদ্ভক্তঃ(স্) স মে প্রিয়ঃ।।16।।

যিনি প্রত্যাশা বর্জিত (প্রয়োজন), শুদ্ধ (বাহির থেকে এবং ভিতরে), বুদ্ধিমান, উদাসীন, ব্যথামুক্ত এবং যিনি সমস্ত সূচনা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন, অর্থাৎ নতুন কর্মের সূচনা করেন কিন্তু তাতে জড়িয়ে পড়েন না, তিনিই আমার প্রিয়  ভক্ত।

এখানে ভগবান তাঁর প্রিয় ভক্তের অন্য ছয়টি লক্ষণ উল্লেখ করেছেন।

১৯) অনপেক্ষঃ — দেহেন্দ্রিয়, রূপ,রসাদি কোন বিষয়ে যার অপেক্ষা নেই, স্পৃহা নেই বা রুচি নেই। সেই ভক্ত ভগবানকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। তাঁর কাছে ভগবদপ্রাপ্তির থেকে বেশী আর কোন কিছুই মূল্যবান হয় না। তাই সংসারের কোন বস্তুতেই তাঁর কোনোপ্রকার আকর্ষণ থাকে না।

বিনাশশীল স্থায়ী হয় না, তার বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অবিনাশী পরমাত্মার সাথে কখনও বিচ্ছেদ হয় না। এই সত্য জানার ফলে ভক্তের মনে স্বাভাবিকভাবেই বিনাশশীল পদার্থের প্রতি কোন কামনার সৃষ্টি হয় না।

২০) শুচিঃ — শরীরে অহংভাব ও মমত্বভাব না থাকায়, অন্তঃকরণে রাগ-দ্বেষ, সুখ-দুঃখ,কাম-ক্রোধাদি বিকার না থাকায় ভক্তের হৃদয় অত্যন্ত পবিত্র হয়। ভগবান এখানে ভক্তের বাহ্যিক পবিত্রতা (পরিচ্ছন্নতা) এবং অভ্যন্তরীণ পবিত্রতার সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এরূপ ভক্তের সান্নিধ্যে আসলে সাধারণ ব্যক্তিরও আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়।

২১) দক্ষঃ — যিনি করার উপযুক্ত কাজ করে নিয়েছেন, তিনিই দক্ষ। মানবজীবনের উদ্দেশ্যই হল ভগবদপ্রাপ্তি। সুতরাং যিনি নিজ উদ্দেশ্য সম্পন্ন করেছেন অর্থাৎ ভগবানকে লাভ করেছেন তিনিই দক্ষ। শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবান বলেছেন — “যুক্তিশীল ব্যক্তিদের বিবেক এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের বুদ্ধির পরাকাষ্ঠা এতই  যে তারা এই বিনাশশীল, অসৎ ( যা চিরস্থায়ী নয়) শরীরের সাহায্যে আমাকে অর্থাৎ অবিনাশী এবং সত্যতত্ত্বকে প্রাপ্ত করে”।

সাংসারিক দক্ষতা প্রকৃতপক্ষে দক্ষতা নয়। একভাবে দেখলে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অত্যাধিক দক্ষতা আবদ্ধের কারণ হয়ে থাকে। কারণ এর ফলে চিত্তে জড় পদার্থের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায় , যা মানুষের পতনের কারণ হয়।

২২) উদাসীনঃ — উদাসীন = উৎ + আসীন। অর্থাৎ উপরে বসা। উদাসীন শব্দের অর্থ হল পক্ষপাতরহিত।

বিবদমান দুজন ব্যক্তির প্রতি যাঁর সর্বদা তটস্থ ভাব থাকে, তাঁকে উদাসীন বলা হয়। উদাসীন শব্দটি নির্লিপ্ততার দ্যোতক। যেমন উঁচু পর্বতে আসীন কোন ব্যক্তির উপর নিচে প্রজ্জ্বলিত আগুন বা বন্যার কেন প্রভাব পড়ে না, তেমনই কোন অবস্থা, ঘটনা বা পরিস্থিতি ইত্যাদির প্রভাব ভক্তের উপর পড়ে না।

২৩) গতব্যথঃ — অনুকূল বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যাঁর চিত্তে দুঃখ, চিন্তা, শোকরূপ কোন উদ্বেগ কখনও হয় না, তাঁকেই গতব্যথঃ বলা হয়।

২৪) সর্বারম্ভ পরিত্যগী ---  ইহলোক বা পরলোকের জন্য ফল কামনা করে যে কর্মের উদ্যম তাকেই আরম্ভ বলা হয়। যিনি ফল কামনা করে কোন কর্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হন না, যথাপ্রাপ্ত কর্তব্য-কর্ম নিষ্কামভাবে করেন, তিনিই সর্বকর্মপরিত্যাগী।

12.17

য়ো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি, ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি
শুভাশুভপরিত্যাগী, ভক্তিমান্যঃ(স্) স মে প্রিয়ঃ।।17।।

যিনি (কখনও) আনন্দ করেন না, ঘৃণা করেন না, শোক করেন না বা কামনা করেন না (এবং) ভাল ও অশুভ কর্ম থেকে উন্নীত (আসক্তি ও ঘৃণা ব্যতীত), সেই ভক্তিশীল ব্যক্তি আমার প্রিয়।

২৫) ন হৃষ্যতি --- যিনি অত্যধিক প্রসন্ন হন না।

২৬) ন দ্বেষ্টি- যিনি  কাউকে ঘৃণা করেন না।

২৭) ন শোচতি- যিনি কোনো প্রকার শোক করেন না।

২৮) ন কাক্ষতি:-  যাঁর কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। যা পেয়েছেন তাই তাঁর জন্য যথেষ্ট।

২৯) শুভপরিত্যগী --- যাঁর শুভ কর্মের প্রতি কোনো অনুরাগ বা আকর্ষণ নেই।

৩০) অশুভ পরিত্যাগী --  যিনি অশুভ কাজের প্রতি মনে কোন দ্বেষ ভাব রাখেন না।

শুভাশুভপরিত্যাগী অর্থ হল যিনি স্বর্গাদি কামনায় অথবা নরকাদির ভয়ে কর্ম করেন না। যিনি ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত, সমত্ববুদ্ধিযুক্ত এবং সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্যাদি দ্বন্দ্ববর্জিত।

এই সমস্ত গুণসম্পন্ন সাধক ভগবানের অতি প্রিয়।

12.18

সমঃ(শ্) শত্রৌ চ মিত্রে চ, তথা মানাপমানয়োঃ
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু, সমঃ(স্) সঙ্গবিবর্জিতঃ।।18।।

(যিনি) শত্রু ও বন্ধু এবং সম্মান ও অসম্মানে সমান (এবং) যিনি শীতল-উষ্ণ (শরীরের অনুকূলতা-অপ্রতিকূলতা) এবং সুখ ও দুঃখে (মন ও বুদ্ধির অনুকূলতা) সমান।

এই শ্লোকে ভগবান তাঁর প্রিয় ভক্তের লক্ষণ বর্ণনা করে বলেছেন যে, যিনি শত্রু ও মিত্রে, মান-অপমানে, শীত-উষ্ণে, সুখে-দুঃখে সম ভাব পোষণ করেন   এবং আসক্তিবর্জিত , সেই ভক্ত তার প্রিয়।

৩১) সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ – ভগবান এখানে ভক্তের হৃদয়ে মানুষের প্রতি যে সমত্ব ভাব থাকে তার বর্ণনা করেছেন। সর্বত্র এবং সর্বভূতে ভগবদ্-দর্শন এবং রাগ-দ্বেষ বর্জিত হওয়ায় সিদ্ধ ভক্তের কারও প্রতি শত্রু বা মিত্র ভাব থাকে না। সাধারণ মানুষই ভক্তের  ব্যবহারে নিজ স্বভাব অনুযায়ী অনুকূলতা বা প্রতিকূলতা আরোপ করে তাঁর প্রতি মিএভাব বা শত্রুভাব পোষণ করে। কিন্তু ভক্ত নিজের মধ্যে পূর্ণভাবে সম থাকেন। তাঁর চিত্তে কখনও কারও প্রতি শত্রু-মিত্রের ভাব উৎপন্ন হয় না।

৩২) তথা মানাপমানয়োঃ- মান এবং অপমান পরকৃত ক্রিয়া যা শরীরের প্রতি হয়। ভক্তের নিজের দেহের প্রতি অহংবোধ বা মমত্ববোধ থাকে না। তাই শরীরের মান-অপমান হলেও ভক্তের চিত্তে কোন বিকার (আনন্দ-বিষাদ) উৎপন্ন হয় না। তিনি নিত্য নিরন্তর সমতায় স্থির থাকেন।

৩৩) এবং ৩৪) শীতোষ্ণ সুখদুঃখেষু সমঃ — এখানে দুটি ক্ষেত্রে সমতার কথা বলা হয়েছে।

  • ‘শীতোষ্ণ সমঃ’ — শীত-উষ্ণে সমতা অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহ নিজ নিজ বিষয়ে সংযুক্ত হলে চিত্তে যখন কোন বিকার উৎপন্ন হয় না। যদিও ‘শীতোষ্ণ’ পদটি আক্ষরিক অর্থে ত্বক-ইন্দ্রিয়ের বিষয়, কিন্তু এখানে এটি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের বাচক। প্রতিটি ইন্দ্রিয় নিজ নিজ বিষয়ের সাথে সংযুক্ত হলে ভক্তের ঐসব বিষয়ের জ্ঞান হলেও তাঁর হৃদয়ে হর্ষ-শোকদি কোন বিকার উৎপন্ন হয় না। তিনি সর্বদা সমভাবে থাকেন।

  • সুখদুঃখেষু সমঃ’ —সাধারণ মানুষের অনুকূল পদার্থের প্রাপ্তিতে সুখ এবং প্রতিকূল পদার্থের প্রাপ্তিতে দুঃখ অনুভব হয়। কিন্তু এসবের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে সিদ্ধ ভক্তের চিত্তে কোন রাগ-দ্বেষ, আনন্দ-বিষাদ আদি বিকার উৎপন্ন হয় না। তিনি প্রত্যেক পরিস্থিতিতে সমভাবে করেন।

৩৫) সঙ্গবিবর্জিতঃ- এখানে ভগবান প্রাণী বা পদার্থের প্রতি চিত্তে উৎপন্ন হওয়া আসক্তি বর্জনের কথা বলেছেন। কোন মানুষ প্রাণী বা পদার্থকে বাহ্যিকভাবে ত্যাগ হয়ত করেছে কিন্তু তার চিত্তে যদি সেই প্রাণী বা পদার্থটির প্রতি আসক্তি থেকে যায়, তাহলে সেই প্রাণী বা পদার্থের থেকে দূরে থাকলেও বাস্তবে সম্পর্কটি থেকেই যায়। সিদ্ধ ভক্তের ভগবদপ্রাপ্তিই একমাত্র জীবনের লক্ষ্য হওয়ায় সংসারের কোন কিছুর প্রতি এমনকী নিজের শরীরের প্রতিও কোন আসক্তি থাকে না।

12.19

তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী, সন্তুষ্টো য়েনকেনচিত্
অনিকেতঃ(স্) স্থিরমতিঃ(র্), ভক্তিমান্মে প্রিয়ো নরঃ।।19।।

যিনি প্রশংসা ও নিন্দা কে সমান চোখে দেখেন, যা পান তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, গৃহাসক্তিশূন্য, পরমার্থ বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞানযুক্ত এবং ভক্তিযুক্ত ব্যক্তিই আমার প্রিয়।

৩৬) তুল্যনিন্দাস্তুতিঃ — নিন্দা ও স্তুতি পরকৃত ক্রিয়া। লোকেরা নিজ নিজ স্বভাবানুসারে ভক্তের নিন্দা বা স্তুতি করে। ভক্তের নিজের নাম ও শরীরের প্রতি অহংকার বা মমত্ববোধ থাকে না। তাই নিন্দা-স্তুতির কোন প্রভাব তাঁর উপর পড়ে না। ভক্তের প্রশংসাকারীর প্রতি যেমন অনুরাগ হয় না, তেমনই নিন্দুকের প্রতিও কোন বিদ্বেষ থাকে না। উভয়ের প্রতি তাঁর সমভাব থাকে। একটি প্রবাদ আছে:

চাহে করে নিন্দা কোই, চাহে কোই গুণগান রে,
ফুলো সে সৎকার করে, কাঁটো কী চিন্তা ন ধরে।

মান অউর অপমান হী দোনো, জিসকে লিয়ে সমান রে,
ওহ সচ্চা ইনসান রে।


অর্থাৎ: কেউ সমালোচনা করুক বা প্রশংসা করুক, ফুল দিয়ে তাকে বরণ কর; কাঁটার চিন্তা করবে না। যাঁর কাছে মান এবং অপমান উভয়ই সমান,তিনিই প্রকৃত মানুষ।

৩৭) মৌনী — সিদ্ধ ভক্তের দ্বারা স্বতঃ স্বাভাবিকভাবে ভগবদস্বরুপের মনন হতে থাকে, তাই তাঁকে মৌনী বা মননশীল বলা হয়। এই পদে ‘বাক্যে মৌন’ থাকা বলা হয় নি। এখানে ‘মৌনী’ পদটির অর্থ ‘ভগবদস্বরূপ মননকারী’।

৩৮) সন্তুষ্টঃ যেন কেনচিৎ – শরীর নির্বাহের জন্য যা কিছু পাওয়া যায় তাতেই যিনি সন্তুষ্ট থাকেন। কারণ ভগবানে অনুরাগ হওয়ার জন্য তিনি এই অনুভব করেন যে সব পরিস্থিতিই ভগবানের বিধান। তাই প্রত্যেক পরিস্থিতিতে সর্বদা সন্তুষ্ট থাকায় তাঁকে ‘সন্তুষ্ট য়েন কেনচিৎ’ বলা হয়েছে।

৩৯) অনিকেতঃ — এই পদটির অর্থ হল এই যে, যার কোন নিকেতন অর্থাৎ বাসস্থান নেই। কিন্তু এখানে যাঁর নিজের বাসস্থানে এবং শরীরের প্রতি বিন্দুমাত্র আপনভাব ও আসক্তি নেই, তিনিই অনিকেত।

৪০) স্থিরমতিঃ — ভক্তের বুদ্ধিতে ভগবদ্তত্ত্বের সত্তা ও স্বরূপের বিষয়ে কোন সংশয় হয় না। সুতরাং তাঁর মন ও বুদ্ধি ভগবদ্তত্ত্বজ্ঞান থেকে কখনও বিচলিত হয় না। সেইজন্য তাঁকে ‘স্থিরমতিঃ’ বলা হয়।

ত্রয়োদশ শ্লোক থেকে ঊনবিংশ শ্লোক অবধি ভক্তের যে লক্ষণগুলো বর্ণনা করা হল, ভগবান বলেছেন যে এই সমস্ত লক্ষণযুক্ত ভক্তগণ তাঁর অতি প্রিয়।

12.20

য়ে তু ধর্ম্যামৃতমিদং(য়্ঁ), য়থোক্তং(ম্) পর্য়ুপাসতে।
শ্রদ্দধানা মত্পরমা, ভক্তাস্তেSতীব মে প্রিয়াঃ।।12.20।।

কিন্তু যে ভক্তরা (আমাকে) বিশ্বাস করে এবং যারা আমার ভক্ত হয়ে উঠেছে, তারা এই ধার্মিক অমৃতকে যেমন বলা হয়েছে খুব ভালভাবে সেবন করে, তারা আমার খুব প্রিয়।

ভগবান বলেছেন – যে সব ভক্ত তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ভগবদ্পরায়ণ হয়ে উপরিউক্ত সমস্ত সদ্গুণ লাভে সমর্থ, তিনিই প্রকৃত ভগবদ্ভক্ত এবং ভগবানের অত্যন্ত প্রিয়। ত্রয়োদশ শ্লোক থেকে ঊনবিংশ শ্লোক অবধি যে সকল সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সকলের অনুশীলনকেই ধর্মামৃত বলা হয়েছে। এই অমৃতস্বরূপ ধর্মসমূহ আচরণ করলে ভগবানের অনুগ্রহ লাভ হয়; এটিই ভক্তির শ্রেষ্ঠ সাধন।

হরিনাম সংকীর্তনের পর আজকের বিবেচন সত্র সমাপ্ত হয়।

ॐ তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং(য়্ঁ) য়োগশাস্ত্রে
শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে ভক্তিয়োগো নাম দ্বাদশোধ্যায়ঃ।।